ঢাকা, বুধবার 26 December 2018, ১২ পৌষ ১৪২৫, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আমজাদ হোসেন আর নেই

মুহাম্মদ নূরে আলম : আমজাদ হোসেনের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৪ই আগস্ট, জামালপুরে। শৈশব থেকেই তার সাহিত্যচর্চা শুরু। আমজাদ হোসেন ১৯৪২ সালের ১৪ই আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) জামালপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। লেখালেখির মাধ্যমেই তাঁর সৃজনশীল জীবন শুরু। ছড়া দিয়ে সাহিত্যের অঙ্গণে তাঁর প্রবেশ। তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় বিখ্যাত দেশ (পত্রিকা) পত্রিকায়। ছোটদের জন্যেও তিনি লিখেছেন বহু গল্প, ছড়া এবং উপন্যাস। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস ও গল্প লিখেছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িত হন। প্রথমেই তিনি অভিনয়ে নিজেকে তুলে ধরেন মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে। এর পরপরই তিনি অভিনয় করেন মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে। এরপরের ইতিহাস একেবারেই অন্যরকম। সালাহ উদ্দিন আমজাদ হোসেনের লেখা নাটক ‘ধারাপাত’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এতে আমজাদ হোসেন নায়ক হিসেবে অভিনয়ও করেন। এরপর তিনি জহির রায়হানের ইউনিটে কাজ শুরু করেন। এভাবেই দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে ১৯৬৭ সালে তিনি নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। নাম ‘জুলেখা’। এরপর নূরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে যৌথভাবে নির্মাণ করেন ‘দুই ভাই’। তার পরিচালিত ব্যাপক দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘এই নিয়ে পৃথিবী’, ‘বাংলার মুখ’, ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘ভাত দে’, ‘হীরামতি’, ‘প্রাণের মানুষ’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘কাল সকালে’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’, ‘গোলাপী এখন বিলেতে’ ইত্যাদি। গুণী এই পরিচালক ১৯৭৮ সালে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ এবং ১৯৮৪ সালে ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া সাহিত্য রচনার জন্য তিনি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে দুইবার অগ্রণী শিশু সাহিত্য পুরস্কার ও ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ একাধিক পুরস্কার লাভ করেন।
তিনি ১৯৬১ সালে তোমার আমার চলচ্চিত্রে অভিনয় দিয়ে চলচ্চিত্রে আগমন করেন। পরে তিনি চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনায় মনোনিবেশ করেন এবং চলচ্চিত্র পরিচালনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র আগুন নিয়ে খেলা (১৯৬৭)। পরে তিনি নয়নমনি (১৯৭৬), গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮), ভাত দে (১৯৮৪) দিয়ে প্রশংসিত হন।  তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল লোককাহিনী নির্ভর বেহুলা (১৯৬৬)। ১৯৬২ সালে ছবিটির কাজ শুরু হয়। তিনি এই ছবির সংলাপ রচনা করেন এবং এতে অভিনয় করেন। এই ছবিতে কাজ করতে গিয়ে অভিনেতা রাজ্জাকের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব হয়, যে সম্পর্ক রাজ্জাকের মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এছাড়া পরের বছর তিনি জহির রায়হানের আনোয়ারা (১৯৬৭) চলচ্চিত্রেও রাজ্জাকের সাথে অভিনয় করেন।
তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র আগুন নিয়ে খেলা (১৯৬৭)। তিনি এটি নুরুল হক বাচ্চুর সাথে যৌথভাবে নির্মাণ করেন। একক পরিচালক হিসেবে তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র জুলেখা (১৯৬৭)। পরের বছর তিনি নুরুল হক বাচ্চু, মুস্তাফা মেহমুদ ও রহিম নওয়াজের সাথে যৌথভাবে দুই ভাই চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। ছবিটির প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন জহির রায়হান। এছাড়া তিনি এককভাবে বাল্যবন্ধু (১৯৬৮) চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৭০ সালের মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর লেখা চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া, পরবর্তীতে বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৭০-এর দশকে তিনি নয়নমনি (১৯৭৬), গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮), সুন্দরী চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৮০-এর দশকে কসাই (১৯৮০), জন্ম থেকে জ্বলছি (১৯৮২), দুই পয়সার আলতা (১৯৮২), ভাত দে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বাংলা চলচ্চিত্র।
সাহিত্যকর্ম: উপন্যাস: ধ্রুপদী এখন ট্রেনে, দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভালোবাসা, আমি এবং কয়েকটি পোস্টার, রক্তের ডালপালা, ফুল বাতাসী, রাম রহিম, আগুনে অলঙ্কার, ঝরা ফুল, শেষ রজনী, মাধবীর মধাব, মাধবী ও হিমানী, মাধবী সংবাদ। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস: যুদ্ধে যাবো, অবেলায় অসময়, উত্তরকাল, যুদ্ধযাত্রার রাত্রি। জীবনী: মাওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু জীবন ও রাজনীতি, মানবেন্দ্রনাথ রায় জীবন ও রাজনীতি, শ্রী হেমচন্দ্র চক্রবর্তী।
ইতিহাস: বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস (১ম খন্ড), বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস (২য় খন্ড), নকালবাড়ী কৃষক আন্দোলন, বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট, বাঙালির ঐতিহ্য বাঙালির ভবিষৎত, উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব বিকাশ ও পরিণতি, আন্দোলনের রূপরেখা। কিশোর উপন্যাস: জন্মদিনের ক্যামেরা, যাদুর পায়রা, ভূতের রাণী হিমানী, সাত ভূতের রাজনীতি, শীতের রাজা উহু কুহু, টুকটুক, রঙিন ছড়া কৃষ্ণচুড়া। গল্পগ্রন্থ: পরী নামা জোছনায় বৃষ্টি, কৃষ্ণলীলা। ফিকশন: ডারকেনিং ডে। রচনাসমগ্র: মুক্তিযুদ্ধের রচনাসমগ্র, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র, মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত কিশোর গল্প, আমজাদ হোসেনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, উপন্যাসসমগ্র-১, নির্বাচিত গল্প, গল্পসমগ্র, কিশোর গল্পসমগ্র, কিশোরসমগ্র, মাধবী সমগ্র। চলচ্চিত্রের তালিকা: আগুন নিয়ে খেলা (১৯৬৭), জুলেখা (১৯৬৭), দুই ভাই (১৯৬৮), বাল্যবন্ধু (১৯৬৮), পিতা পুত্র (১৯৭০), নয়নমনি (১৯৭৬), গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮), সুন্দরী (১৯৭৯), কসাই (১৯৮০), দুই পয়সার আলতা (১৯৮২), জন্ম থেকে জ্বলছি (১৯৮২), ভাত দে (১৯৮৪), সখিনার যুদ্ধ (১৯৮৪), হীরা মতি (১৯৮৮), গোলাপী এখন ঢাকায় (১৯৯৪), আদরের সন্তান (১৯৯৫), সুন্দরী বধূ (২০০২), প্রাণের মানুষ (২০০৩), কাল সকালে (২০০৫), গোলাপী এখন বিলাতে (২০১০)। নাটক: জব্বার আলী এখন রিমান্ডে, হ্যালো জব্বার আলী। পুরস্কার ও সম্মাননা: শিল্পকলায় অবদানের জন্য একুশে পদক ১৯৯৩, অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার - ১৯৯৩, ১৯৯৪, উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০০৪, ভূতের রাণী হিমানী-এর জন্য ইউরো শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০০৮, ফজলুল হক স্মৃতি কমিটি থেকে ফজলুল হক স্মারক পুরস্কার ২০০৯।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ