ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 December 2018, ১৩ পৌষ ১৪২৫, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সিনিয়র নয় জুনিয়র দলেই ব্যাডমিন্টনের ভবিষ্যত

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বছরের একেবারে শেষদিকে অনুষ্ঠিত হয় ইউনেক্স-সানরাইজ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল চ্যালেঞ্জ ও ইউনেক্স-সানরাইজ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল জুনিয়র প্রতিযোগিতা। সেখানে সিনিয়র বিভাগে একটি মাত্র ব্রোঞ্চপদক জিতলে জুনিয়র বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্বাগতিক দল। আব্দুল হাকিম লোকমান, রেশমা আক্তার, গৌরব সিংরা ৩টি সোনার পদক গলায় ঝুলিয়েছেন পাচঁটি ইভেন্টের মধ্যে। এমনিতে ব্যাডমিন্টন সারা বছরই নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে চলেছে। কোচদের বিরুদ্ধে নানা হয়রানির অভিযোগ খেলোয়াড়রা প্রায়শই করে থাকেন। এবারের আসর নিয়েও অভিযোগ ছিল। সবকিছু ছাপিয়ে নতুন করে সাফল্য পাওয়া খেলোয়াড়দের ধরে রাখা যাবে কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রায় দুই বছর পর আবার বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইউনেক্স আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন। ২০১৬ সালে হয়েছিল। মাঝে ২০১৭ সালে হয়নি। এবার ২০১৮ সালে হলেও বছরটা প্রায় শেষই। তারপরও ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন খুশি। কারণ হাতছাড়া হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক এই টুর্নামেন্টটি হতে পারছে। মাঝে কেন হয়নি তা নিয়ে ক্ষোভ আছে ফেডারেশনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন বাহারের। বলছিলেন, ‘কষ্টতো থাকবেই কেন হলো না।
আগের কমিটি কেন একটা আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন করতে পারল না।’ ১৩ দেশ নিয়ে ইউনেক্স আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন শুরু হয় গত ১১-১৫ ডিসেম্বর। জুনিয়র টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয় ১৭-২০ ডিসেম্বর। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম সংলগ্ন উডেন ফ্লোর জিমনেসিয়ামে নতুন ম্যাট স্থাপন করে সেখানে খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন করে সাজসজ্জার কাজও হয়েছে। মালয়েশিয়ান কোচ অরবিন বার্মা বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। ইউনেক্স টুর্ণামেন্টের জন্য ২২ হাজার ডলার দিয়েছে আর ব্যাডমিন্টন এশিয়া ১১ হাজার ডলার অর্থ সহায়তা দেয়। এদিকে দল বিন্যাস-সংক্রান্ত ক্ষোভ নিয়েই ইউনেক্স-সানরাইজ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলেছে স্বাগতিকরা। ১৪ দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ২২ শাটলার নিয়ে অংশগ্রহণ করেছে স্বাগতিকরা। বহর বড় হলেও ছেলে ও নারীদের দ্বৈত ও মিশ্র দ্বৈত ইভেন্টে জুটি গড়া নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় শাটলাররা। এ নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ফেডারেশন কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে শাটলারদের বাকবিতন্ডা হয়েছে।
আল আমিন জুমার নামের এক খেলোয়াড় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দ্বৈত ইভেন্টে দুজনের মাঝে সমন্বয়টা জরুরি। দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেললে ওই সমন্বয় হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আগে হুট করে অনেক ইভেন্টের জুটি ভেঙে নতুন করে গড়া হয়েছে। এ নিয়ে শাটলারদের মাঝে তো ক্ষোভ থাকবেই’। ছেলেদের একক, দ্বৈত ও মিশ্র দ্বৈত ইভেন্টে খেলেন উদীয়মান এ শাটলার। প্রতিযোগিতা শুরুর আগের দিন দল বিন্যাস নিয়ে গা-ছাড়া ভাব রয়েছে কোচদের মাঝেও। এক সূত্র বলছে, এ নিয়ে সিনিয়র দলের দুই কোচ এসএম জাহিদুল হক কচি ও ওহিদুজ্জামান রাজু পরস্পরকে দোষারোপ করছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেন বাহার দায় নিজের কাঁধে নিচ্ছেন। দাবি করছেন, দল বিন্যাস তিনি নিজে করেছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিনিয়র দলের দুই কোচের একজন ওহিদুজ্জামান রাজু বলেছেন, ‘দল সাজানো হয়েছে ফেডারেশন থেকেই। এ নিয়ে অনেকেই আমাকে দোষারোপ করছেন। কিন্তু দল সাজানোর পর আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে আমি কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। মনোযোগ দিতে চাই খেলার দিকে।’ ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, বাহরাইন, মরিশাস, ভিয়েতনাম ও স্বাগতিক বাংলাদেশের ১৫১ শাটলারের এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। এদিকে টুর্ণামেন্টে কম প্রস্তুতির জন্য খেলোয়াড়দের নানা অভিযোগ ছিল। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম সংলগ্ন উডেন ফ্লোর জিমনেসিয়ামে আট বছর আগের ম্যাট পরিবর্তন করে নতুন ম্যাট স্থাপন করা হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও থেমে নেই। খেলা আয়োজনে বাংলাদেশের সুনাম বরাবর। তবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স সেই মানে পৌঁছাতে পারেনি। এবারও তাই হয়েছে। আয়োজন করতে গিয়ে সংগঠকরা হয়ত বাহবা পাবেন। কিন্তু খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তুষ্টি থাকে এবং থাকছে। কারণ আন্তর্জাতিক এই টুর্নামেন্টটি বাংলার শাটলারদের সেভাবে উপকারও আসেনি। আসেনি পরিকল্পনার অভাবে। এখানে যারা খেলতে আসছেন তারা অনেক দেশে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা ঘরোয়া টুর্নামেন্টই সেভাবে খেলার সুযোগ পান না। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আয়োজনও নেই। যারা বিদেশে খেলতে যান তাদেরকে নিজেদের খেলতে যেতে হয়। মালয়েশিয়ান কোচ আরভিন ভার্মা এসেছেন টুর্নামেন্ট শুরু ২৭ দিন আগে। এতো স্বল্প সময়ে অনুশীলন করে কুলিয়ে উঠা যায় না। খেলোয়াড়রা প্রস্তুতি নিয়ে খুব ভালো কিছু বলেননি। শাটলাররা জানান, সারা বছর খেলা হয়নি। এখন আন্তর্জাতিক খেলা। এই বিদেশি কোচ আরো আগে আনলে ভালো হতো। তাতে প্রস্তুতিটাও ভালো হতো। এতো অল্প সময়ে ফিটনেসই হবে না।
এই টুর্নামেন্টে ২০১১ সালে দ্বৈতে রেহানা পারভিন ও নিগার সুলতানা জুটি ফাইনাল খেলে। সেবার শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে যায়। অবশ্য সেই আসরেও শুধু শ্রীলঙ্কার দলই এসেছিল। ২০১৪ সালে দ্বৈতে ওয়াহিদুল ও মিনহাজ জুটি সেমিফাইনাল খেলে। এদিকে বাংলাদেশ প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের খেলাই শুধু দেখেছে। শাটলাররা দর্শক হয়ে মালয়েশিয়ার পক্ষ নিয়েছিলেন পুরুষ এককের ফাইনালে। মালয়েশিয়ান সু তেক জির সঙ্গে ভিয়েতনামের কাও কুয়ঙের তুমুল লড়াই। সেখানে সু তেক পাশে পেয়েছেন বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের, তাঁর প্রতিটি পয়েন্ট হাততালি দিয়ে উদ্যাপন করেছেন স্বাগতিক খেলোয়াড়রা। শেষমেশ তিনি জিতেছেন এবং জিতিয়েছেন বাংলাদেশিদেরও। এভাবে জেতা ছাড়া উপায়ও নেই দেশি খেলোয়াড়দের।
তরুণ গৌরব সিংও স্বপ্নের ফানুসে না চেপে চোখ রাখেন কঠিন বাস্তবতায়। শিরোপার মুকুটের লোভ সবারই আছে। দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাড়া ফেলতে চায় সবাই। সব খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এটা। কিন্তু এই স্বাদ আর সাধ্যের মধ্যে যে যোজন যোজন ব্যবধান, সেটাও ভালোভাবে বোঝেন দেশি ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়রা। সিনিয়রদের  আসরে বাংলাদেশের একমাত্র অর্জন এলিনা-শাপলা জুটির একটি ব্রোঞ্জ। গরিবের সংসারে চাওয়া-পাওয়া যে আর বড় করার সুযোগ নেই। এলিনা সুলতানা নিজেদের না পারার বিষয়টি নিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টন দিনে দিনে পিছিয়ে পড়ছে। এত সমস্যা থাকলে তো উন্নতি করা যায়না। এই টুর্নামেন্টে যারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তাদের চেয়ে আমরা অনেক অনেক পিছিয়ে। এটা লুকানোর কোনো উপায় নেই। কারণ দীর্ঘদিনের ট্রেনিং-প্র্যাকটিসের সুবাদেই ইন্দেনেশিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা ভিয়েতমানের খেলোয়াড়রা স্কিলে অনেক এগিয়ে থাকে। তারা সারা বছর ট্রেনিং করে আর আমরা কোনো টুর্নামেন্ট সামনে থাকলে ৫/৭ দিন আগে ট্রেনিং শুরু করি’। এতভাবে পিছিয়ে থেকে তো সেরার কথা মুখে আনা যায় না। অথচ এ দেশে ব্যাডমিন্টন খুব পছন্দের খেলা। তবে শীতের অতিথি হয়েই খেলাটি আসে আবার ঠান্ডা ফুরালেই কমে তার ব্যাপ্তি। যেন শীত উপভোগের এক উপায় খেলাটি।
শীতকে বিদায় দিয়ে গ্রীষ্ম-বর্ষায়ও যারা র্যাকেট নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করে, তারাই হলো প্রকৃত ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়। জাতীয় পর্যায়ের খেলে এবং দেশের পতাকা উড়িয়ে বিদেশে খেলতে যায়। কিন্তু অর্জন বলে কিছু নেই। কারণ তাদের ওই দৌড়ঝাঁপ যে আন্তর্জাতিকতার তুলনায় নস্যি! জুনিয়র দলের যে তিনটি স্বর্ণপদক জয় করেছে তাদের পরিচর্যা হবে কিনা সেই প্রশ্ন এখন বেশি করে উড়ছে। জুনিয়র খেলোয়াড়রা পুরো আসরে অর্জন ৩ স্বর্ণ, ৪ রৌপ্য এবং ৫টি ব্রোঞ্জপদক। এমন অর্জনের পরও উচ্ছ্বাসের সুযোগ কই এই ছেলে-মেয়েদের? ভবিষ্যতে চোখ রাখলে যে শুধুই অন্ধকার। তারা জানে না তাদের জন্য সামনে কী অপেক্ষা করছে। আবার কবে খেলার সুযোগ হবে, নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগটাও মিলবে কি না এমন অনেক প্রশ্ন ভিড় করেছে তাদের মনে। জুনিয়র দলের কোচ এনায়েতউল্লাহ খান উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার কিছু দেখছেন না। কিছুটা আক্ষেপ করে সাবেক এই জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ‘ব্যাডমিন্টন এখন আগের সেই অবস্থানে নেই। সাফল্য এসেছে এটা দেশের ব্যাডমিন্টনের জন্য ভালো দিক। জুনিয়রদের এই সাফল্য সিনিয়র পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে সার্বিক কর্মকান্ডে গতি আনতে হবে। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সাজানো। এরজন্য ফেডারেশনকেই উদ্যোগী হতে হবে। বিভিন্ন দেশের ব্যাডমিন্টন উন্নয়নে এশিয়ান ব্যাডমিন্টন সংস্থা এবং বিশ^ সংস্থার বড় অবদান থাকে। তারা নানারকম কর্মসূচী পালন করার পাশাপাশি বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলতেও নানা সহায়তা দেয়। যেটা এ দেশে শুরু হয়নি।
ব্যক্তিগতভাবে এসব কার্যক্রমে শাটলারদের সম্পৃক্ত করা কঠিন।’ জুনিয়র আসর শুরুর এক দিন আগেই শেষ হয়েছে সিনিয়রদের টুর্নামেন্ট। যেখানে প্রাপ্তি বলতে কেবল মেয়েদের ডাবলসে সেমিফাইনাল খেলা। এতেই বোঝা যাচ্ছে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে ভালো করলেও সিনিয়র পর্যায়ে যোজন যোজন পিছিয়ে বাংলাদেশের শাটলাররা। সিনিয়র দলের কোচ ওহিদুজ্জামান রাজু জুনিয়রদের সাফল্যের পেছনের কারণ খোঁজার চেষ্টা করলেন এভাবে, ‘জুনিয়ররা ভালো করছে এর জন্য তারা বাহবা পেতেই পারে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে বাংলাদেশ ভালো করেছে যেসব ইভেন্টে সেসব ইভেন্টে শক্ত প্রতিপক্ষ ছিল না। মেয়েদের সিঙ্গেলসে পারেনি কারণ এই ইভেন্টে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগী ছিল। অর্থাৎ ভারত থেকেও আমরা পিছিয়ে আছি অনেকটা।’ রাজু মনে করেন, সঠিক পরিচর্যায় এই জুনিয়ররাই ভবিষ্যতে দেশকে কিছু দিতে পারবে। এখন খেলাটির উন্নতির জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ