ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 December 2018, ১৩ পৌষ ১৪২৫, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ফুটবল ঘিরে জমজমাট ব্যবসা

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। আধুনিক বিশ্বে অনেক ধরণের খেলা থাকলেও এখনো সবার কাছে প্রিয় হচ্ছে ফুটবল। দেশ ভিত্তিক ফুটবলের পাশাপাশি ক্লাবগুলোর খেলাও বেশ জনপ্রিয়। বিশ্বের আনাচে কানাচে ফুটবল চললেও এটিকে জনপ্রিয় করার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ইউরোপ। এটি এখন শুধু খেলা নয় এটি এখন একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বায়নের যুগে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের কাছে খেলাধুলা তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ভক্তদের আগ্রহ যেমন বাড়ছে খেলাধুলার বিস্তৃতিও তত বাড়ছে। আর এই খেলাধুলাকে ঘিরেই পুরো বিশ্বে চলছে বিরাট বাণিজ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের জন্য খেলাধুলাকেই বেছে নিচ্ছেন। এশিয়া মহাদেশে যেমন ক্রিকেটকে ঘিরে বাণিজ্য হয় তেমনি ইউরোপ-আমেরিকাতে ফুটবলকে ঘিরে বছরের ১২ মাসই চলে বাণিজ্য। বিশেষ করে পুরো বিশ্বের মধ্যে ইউরোপে ফুটবলকে ঘিরে চলে জমজমাট ব্যবসা।
ইউরোপিয়ান ফুটবলের প্রতি সারাবিশ্বের মানুষের আগ্রহ বেশি। ফিফা বিশ্বকাপের সর্বশেষ চার আসরের চারটিতেই ইউরোপিয়ান দল শিরোপা ঘরে তুলেছে। ২০০৬ সালে ইতালি, ২০১০ সালে স্পেন, ২০১৪ সালে জার্মানি ও ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন হয় ফ্রান্স। তাছাড়া বিশ্বের সব প্রান্তের খেলোয়াড়েরই ইউরোপিয়ান ক্লাবে খেলার আগ্রহ থাকে। বর্তমান সময়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় হলেও ইউরোপিয়ান ক্লাব বার্সেলোনাতে খেলেই তিনি এত খ্যাতি অর্জন করেছেন। দক্ষিণ আমেরিকার আরেক দেশ ব্রাজিলের নেইমার খেলেন ইউরোপিয়ান ক্লাবে পিএসজিতে। শুধু তারা দু’জন নন। দক্ষিণ আমেরিকার এমন অসংখ্য খেলোয়াড় ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন। দক্ষিণ আমেরিকার সাবেক অনেক নামকরা খেলোয়াড়ও ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন।
ফুটবলের সঙ্গে শুধু খেলোয়াড় কেনাবেচাই আসল বিষয় নয়। এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু জড়িত। যেমন কোচ নিয়োগ দেয়া, মিডিয়া স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, খেলোধুলার বিভিন্ন সরঞ্জাম, ট্রাভেলিং, দর্শক ইত্যাদি। মোট কথা অন্য অঞ্চলের মতো ইউরোপের ফুটবল বাণিজ্যও গড়ে উঠেছে অনেক কিছুকে ঘিরে। ফুটবল শুধু খেলাই নয়। জাতীয় অর্থনীতি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এর অবদান রয়েছে। গত ২০ বছরে ইউরোপের ফুটবলে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে বাণিজ্য ও বিপণনের ক্ষেত্রে।
মাল্টিন্যাশনাল প্রফেশনাল সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক ডেলোয়েটের গত জুনে প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী ইউরোপিয়ান ফুটবলের বাজারের আর্থিক মূল্য ২৫.৫ বিলিয়ন ইউরো। ২০১৬-১৭ মৌসুমে ইউরোপের সেরা পাঁচ ইউরোপিয়ান লীগ রেকর্ড ১৪.৭ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব উৎপন্ন করে। পূর্ববর্তী মৌসুম থেকে এই মৌসুমে ৯ শতাংশ বেশি রাজস্ব এসেছিল। ইউরোপে দর্শক উপস্থিতির দিক বিবেচনা করলে জার্মানির ঘরোয়া লীগ বুন্দেসলিগা সবচেয়ে এগিয়ে। লীগের গড় দর্শক ৪৪ হাজার।
ইউরোপের মধ্যে স্প্যানিশ লা লিগা দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি লীগ। কিন্তু রাজস্বের বিবেচনায় লা লিগার চেয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ ৮৬ শতাংশ বড়। গত জুনে প্রকাশিত ডেলোয়েটের প্রতিবেদন বলছে, গত দশ বছর ধরে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লীগের (ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ-ইংল্যান্ড, লা লিগা-স্পেন, বুন্দেসলিগা-জার্মানি, সিরি’এ-ইতালি, লীগ ওয়ান-ফ্রান্স) রাজস্ব নিয়মিত বেড়েছে। ২০১৬-২০০৭ মৌসুমে যার পরিমাণ ছিল ২.১ বিলিয়ন ইউরো। ২০১৬-১৭ মৌসুমে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪.৮ বিলিয়ন ইউরো।
২০১৫ সালে Teodor Dima তার The Business Model of European Football Club Competitions শিরোনামে লেখা আর্টিকেলে ইউরোপিয়ান ফুটবল শিল্পের একটি বিজনেস মডেল তুলে ধরেন। তিনি আর বিজনেস মডেলটি তিনটি ইনকাম জেনারেটিং ফ্যাক্টরসের ওপর ভিত্তি করে  তৈরি করেছেন।
বিজনেস মডেলটি হলো :
১. মিডিয়া স্বত্ব : ম্যাচ সম্প্রচারের জন্য টেলিভিশন চ্যানেল কর্তৃক যে অর্থ প্রদান করতে হয় তাকে মিডিয়া স্বত্ব বলে।
২. বাণিজ্যিক আয় : বিভিন্ন ধরনের স্পন্সর থেকে যে আয় হয় তা বাণিজ্যিক আয়ের অন্তর্ভুক্ত। যেমন : খেলোয়াড়দের জার্সিতে, স্টেডিয়ামের ভিতরে বা চারপাশে বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন, ক্যাটারিং সার্ভিসেস ইত্যাদি ধরনের স্পন্সর থেকে আয়।
৩. ম্যাচের দিনের রাজস্ব : টিকেট বিক্রি, স্টেডিয়ামের মধ্যে সমর্থকদের বিভিন্ন জিনিস ক্রয় থেকে যে আয় আসে তা ম্যাচ ডে রেভিনিউ বা ম্যাচের দিনের রাজস্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
ইউরোপিয়ান ফুটবল নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ সংস্থা হচ্ছে উয়েফা (ইউনিয়ন অব ইউরোপিয়ান ফুটবল এ্যাসোসিয়েশন্স)। ইউরোপে শুধু ক্লাব ফুটবলই হয় না। প্রতি মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মোট ৩২টি ক্লাব অংশ নেয়। চ্যাম্পিয়ন্স লীগে ১৯৯৪ সালে অংশ নেয় ১৬টি দল। ১৯৯৮ সালে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৪টি করে উয়েফা। ২০০০ সালে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩২ করা হয়। উয়েফার এই সিদ্ধান্তের কারণে ফুটবল বাণিজ্যের ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয়েছে। দল বেশি হওয়ায় এখানে খেলার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। স্পন্সররা স্পন্সর করতে আগ্রহী হচ্ছেন।
সবমিলিয়ে ক্লাবগুলো যেমন লাভবান হচ্ছে, উয়েফাও তেমন লাভবান হচ্ছে। ইউরোপের ফুটবলে আরেকটি বড় জায়গা হচ্ছে খেলোয়াড় ট্রান্সফার। প্রতি মৌসুমে এই দলবদল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করে থাকে ক্লাবগুলো।
গত আগস্টে বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনী ফুটবল ক্লাবের নাম প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন ফোর্বস। এই দশটি ক্লাবের সবই ইউরোপের। এই তালিকায় শীর্ষে ছিল ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকে যথাক্রমে স্প্যানিশ ক্লাবে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সিলোনা। পাঠক আসুন আমরা এই ক্লাব দশটি সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে নিই।
১. ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (ইংল্যান্ড) : ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী এই ক্লাবের মূল্য ৪.১২ বিলিয়ন ডলার। দলটির ডাক নাম দ্য রেড ডেভিলস। ইংলিশ ফুটবলে এটিই সবচেয়ে সফল ক্লাব। ইংল্যান্ডের অন্য সব ক্লাবের চেয়ে তারা বেশি শিরোপা জিতেছে। তারা ঘরে তুলেছে ২০টি লীগ শিরোপা, ১২টি এফএ কাপ, পাঁচটি লীগ কাপ ও রেকর্ড ২১টি এফএ কমিউনিটি শিল্ডস। চ্যাম্পিয়ন্স লীগে তারা তিনবার চ্যাম্পিয়ন্স হয়েছে। এছাড়া তারা একবার উয়েফা ইউরোপা লীগ, একবার উয়েফা কাপ উইনার্স কাপ, একবার উয়েফা সুপার কাপ, একবার ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ও একবার ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে।
২. রিয়াল মাদ্রিদ (স্পেন) : ক্লাবটির মূল্য ৪.০৯ বিলিয়ন ডলার। ক্লাবটি রেকর্ড ৩৩টি লা লিগা শিরোপাসহ আরও অনেক শিরোপা জিতেছে।
৩. বার্সিলোনা (স্পেন) : ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী স্পেনের এই ক্লাবের মূল্য ৪.০৬ বিলিয়ন ডলার। ক্লাবটি এখন পর্যন্ত ২৫টি লা লিগা শিরোপা জিতেছে। এবারও তারা লা লিগায় ভাল অবস্থানে রয়েছে। তাছাড়া এই ক্লাবের ঘরে আরও অনেক শিরোপা রয়েছে।
৪. বেয়ার্ন মিউনিখ (জার্মানি) : এই ক্লাবটি জার্মানির অন্যতম সফল একটি ক্লাব। তাদের মূল্য ৩.০৬ বিলিয়ন ডলার। ক্লাবটি ২৮টি রেকর্ড জার্মান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে। তাছাড়া জার্মানির ঘরোয়া এবং ইউরোপের মহাদেশীয় পর্যায়ে আরও অনেক শিরোপা জিতেছে।
৫. ম্যানচেস্টার সিটি (ইংল্যান্ড) : ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের এই ক্লাবটির মূল্য ২.৪৭ বিলিয়ন ডলার। ক্লাবটিকে অনেক সময় সংক্ষেপে শুধু সিটি বলা হয়। লীগে তারা এখন পর্যন্ত পাঁচবার শিরোপা জিতেছে। তাছাড়া ক্লাবটি পাঁচবার এফএ কাপ, পাঁচবার লীগ কাপ, পাঁচবার এফএ কমিউনিটি শিল্ডস ও একবার ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপের শিরোপা জিতেছে।
৬. আর্সেনাল (ইংল্যান্ড) : ফোর্বসের হিসাবে এই ক্লাবের মূল্য ২.২৪ বিলিয়ন ডলার। ক্লাবটির ডাক নাম দ্য গানার্স। তারা এখন পর্যন্ত ১৩টি লীগ শিরোপা জিতেছে। এছাড়া তাদের অন্য শিরোপার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এফএ কাপ। এই টুর্নামেন্টে তারা রেকর্ড ১৩ বার শিরোপা জিতেছে।
৭. চেলসি (ইংল্যান্ড) : এই ক্লাবটির আর্থিক মূল্য ২.০৬ বিলিয়ন ডলার। রাশিয়ান বিলিওনিয়ার রোমান আব্রামোভিচের নেতৃত্বাধীন এই ক্লাবটি এখন পর্যন্ত লীগে ছয়টি শিরোপা ঘরে তুলেছে। এছাড়া অন্যান্য টুর্নামেন্টে তাদের আরও বেশ কিছু শিরোপা আছে।
৮. লিভারপুল (ইংল্যান্ড) : ইংল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় এই ক্লাবটির আর্থিক মূল্য ১.৯৪ বিলিয়ন ডলার। লীগে ক্লাবটি এখন পর্যন্ত ১৮টি শিরোপা জিতেছে। অন্যান্য টুর্নামেন্টের মধ্যে তারা সাতটি এফএ কাপ ও আটটি লীগ কাপ শিরোপা জিতেছে।
৯. জুভেন্টাস (ইতালি) : সেরা দলে থাকা ইতালির একমাত্র ক্লাবটির আর্থিক মূল্য ১.৪৭ বিলিয়ন ডলার। ক্লাবটির ডাক নাম দ্য ওল্ড লেডি (অব তুরিন)। ক্লাবটি রেকর্ড ৩৪টি লীগ শিরোপা জিতেছে।
১০. টটেনহ্যাম হটস্পার (ইংল্যান্ড) : ক্লাবটির আর্থিক মূল্য ১.২৪ বিলিয়ন ডলার। লীগে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের এই ক্লাবটি দুইটি শিরোপা জিতেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ