ঢাকা, বৃহস্পতিবার 27 December 2018, ১৩ পৌষ ১৪২৫, ১৯ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আইপিএলের পাতানো নিলাম!

অরণ্য আলভী তন্ময় : আরো একটি হতাশার আইপিএল নিলাম শেষ হলো। সেটি বাংলাদেশের জন্য বেশি হতাশার। অনেকেই তাই এটিকে পাতানো নিলাম হিসেবেও অবিহিত করেছেন। আইপিএলের আট ফ্র্যাঞ্চাইজিতে ২০ জন বিদেশি খেলোয়াড়ের জায়গা ফাঁকা ছিল। তাদের কাতারে নাম ওঠার অপেক্ষায় নিলামে উঠেছিল ভারতীয়, অ-ভারতীয় মিলিয়ে ৩৫১ জন ক্রিকেটারের। সেই তালিকায় দুটি নাম বাংলাদেশেরও, দুই ভায়রা ভাই মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তবে ভারতের জয়পুরে হওয়া খেলায়াড় নিলামে মুশফিককে নেয়নি কোনো দলই। নাম ঘোষণার পর কোনো দল বাংলাদেশের এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানকে কিনতে আগ্রহী হননি কেউই। ইংলিশ ওপেনার স্যাম কারেনকে কিংস ইলেভেন ৭.২ কোটি রুপিতে কেনার পর লুক রনকির নাম উঠেছিল নিলামে। তাঁকে কিনতে কোনো দল আগ্রহ দেখায়নি। এরপরই ঘোষণা হয় মুশফিকের নাম। ক্যামেরাগুলো এ সময় আটটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের প্রতিনিধিদের ওপর ধরা ছিল। মুশফিককে কিনতে কারও মুখে তেমন কোনো অভিব্যক্তি ছিল না। এর আগে ২০১৬ আইপিএলের নিলামেও অংশ নিয়েছিলেন মুশফিক। সেবারও নিলামের প্রথম দিনে তাঁর নাম উঠেছিল। কিন্তু কোনো দলই বাংলাদেশের ‘মি. ডিপেন্ডেবল’কে কিনতে আগ্রহ দেখায়নি। শুধু মুশফিক কেন, তিন বছর আগে যাকে দলে ভেড়াতে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করতে রাজি ছিল ফ্রাঞ্চাইজিগুলো সেই যুবরাজ সিংও রয়ে গেছেন অবিক্রিত! মাঠের খেলাটা এমনই। পারফরম্যান্স থাকলে দাম আছে, না থাকলে তাকিয়ে দেখারও কেউ নেই। বিষয়টি বোধ হয় এখন সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন যুবরাজ। একসময় আইপিএলে ১৬ কোটি রুপিতে বিক্রি হয়েছিলেন, তিনি দলই পেলেন না। ভারতের ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন যুবরাজ। ২০১৫ সালের আইপিএলে মাত্র ২ কোটি রুপি ভিত্তিমূল্য থাকলেও তাঁর দাম উঠেছিল ১৬ কোটি রুপি! রয়েল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু থেকে যুবরাজকে এক ঝটকায় টেনে নিয়েছিল দিল্লী ডেয়ারডেভিলস। সেটি ছিল আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে খেলোয়াড় বিক্রির রেকর্ড। ২০১৪ সালেও তাঁর দাম ছিল ১৪ কোটি রুপি। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকেই নামতে থাকে যুবরাজের দাম। ১৬ কোটি থেকে কমে ৭ কোটিতে যুবরাজকে দলে নিয়েছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। পরের বছরও হায়দরাবাদেই থেকে যান। ২০১৮ সালে ২ কোটি রুপিতে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবে যান। এবার কেউই নিল না তাঁকে। তবে এক দিক থেকে নিজেদের ভাগ্যবান ভাবতে পারেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটাররা। প্রতিবারের মত এবারের নিলামেও ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। খেলাটির এই সংক্ষিপ্ততম সংস্করণে ওয়েস্ট ইন্ডিজই বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।
তাঁদের খেলোয়াড়দের টোয়েন্টি-২০ সংস্করণও টেস্ট-ওয়ানডের তুলনায় বেশি পছন্দ। নানা প্রান্তের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারদের নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখা যায় দলগুলোর মধ্যে। আইপিএলেও শুরু থেকেই ক্যারিবিয়ানদের নিয়ে টানাটানি চলে। এবারের নিলামে যেমন তিন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারের সম্মিলিত দাম উঠল প্রায় ১৬ কোটি টাকা (১৫.৯৪ কোটি)। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সর্বশেষ টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপ জেতানোর নায়ক ব্রাফেটকে কিনতে টানাটানি চলেছে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব আর কলকাতা নাইট রাইডার্সের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত ৫ কোটি রুপিতে ব্রাফেটকে দলে টানতে পেরেছে নাইটরা। ব্রাফেটের নেতৃত্বেই সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে বাংলাদেশকে উড়িয়ে দিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সর্বশেষ ম্যাচেই বোঝা গেছে, ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারেরা টি-টোয়েন্টিতে কতটা ভয়ংকর। ব্রাফেটের ভিত্তি দাম ছিল ৭৫ লাখ রুপি। দলগুলোর কাড়াকাড়িতে এখান থেকে ৫ কোটি রুপি দাম ওঠে এই অলরাউন্ডারের। বাংলাদেশ সফরে থাকা ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান শিমরন হেটমায়ারের ভিত্তি মূল্য ছিল ৫০ লাখ রুপি। তাঁকে ৪.২০ কোটি রুপিতে কিনেছে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। ৭৫ লাখ রুপি ভিত্তিমূল্যের ক্যারিবিয়ান উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান নিকোলাস পুরানকে একই দামে (৪.২ কোটি রুপি) কিনেছে পাঞ্জাব। এই তিন ক্রিকেটারের সম্মিলিত দাম ভারতীয় মুদ্রায় ১৩.৪ কোটি রুপি। এই নিলামে মোট ৭০ জন ক্রিকেটার কিনতে পারবে ফ্র্যাঞ্চাইজি দলগুলো। এর মধ্যে ২০ জন বিদেশি। আইপিএলের শুরু থেকেই রমরমা সময় কাটছে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারদের।
ক্রিস গেইল, সুনীল নারাইন, ডোয়াইন ব্রাভো, কাইরন পোলার্ড, ডোয়াইন স্মিথরা নিজ নিজ ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে ঝড় তুলেছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার এই টুর্নামেন্টে। এবার সাত ভ্যারিয়েশন দিয়েই আইপিএলে ৮ কোটির মালিক হয়ে গেছেন! তার হাতে রয়েছে সাতরকম ভেরিয়েশন। অফ স্পিন, লেগ ব্রেক, গুগলি, ক্যারাম বল, ফ্লিপার, টপ স্পিন এবং ব্যাটসম্যানের পায়ের পাতা লক্ষ্য করে দেয়া স্লাইডার আর্ম ইয়র্ক। কতরকম  বৈচিত্র্যই না তার বোলিংয়ে। একের মধ্যে সাত-এমন একজন বোলারকেই তো চাই আইপিএলের মত জমজমাট ফ্রাঞ্চাইজি টুর্র্নামেন্টের দলগুলোয়। সুতরাং, ২০ লাখ রুপি না কত দাম তার সে দিকে তাকানোর ফুরসত নেই কারো।
বরুন চক্রবর্তীকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেলো আইপিএলের প্রায় প্রতিটি ফ্রাঞ্চাইজির মধ্যে। কলকাতা নাইট রাইডার্সই প্রথম বরুনকে নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু তাকে ছাড়তে রাজি নয় অন্য কোনো ফ্রাঞ্চাইজিও। একে এক তাই বরুনকে নেয়ার দৌড়ে যোগ দেয় দিল্লী ক্যাপিটালস, চেন্নাই সুপার কিংস, কিংস ইলেভেন পঞ্জাব, রাজস্থান রয়্যালস। শেষ পর্যন্ত ৮.৪০ কোটি রুপিতে তাকে দলে ভেড়ায় প্রীতি জিনতার দল কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব। সাত ভ্যারিয়েশনের প্রতিটির মূল্যই ছাড়িয়ে ১ কোটি রুপির উপরে। নিজের বেজ প্রাইস থেকে ৪২ গুণ বেশিতে বিক্রয় হওয়া বিস্ময়কর এই স্পিনারকে নিয়ে তাই এখন পুরো ভারত সরগরম। এক মুহূর্তে কোটিপতি বনে যাওয়া বরুনকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে পুরো ভারতজুড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তো বরুনছাড়া যেন আর কথাই নেই। ভারতের হয়ে তো কখনো খেলার কথাই নেই। ঘরোয়া ক্রিকেটেও খুব একটা নামি-দামি ক্রিকেটার ছিলেন না তিনি। কিন্তু আইপিএল নিলামে হঠাৎ তামিলনাডুর স্পিনারের এমন চড়া মূল্যে বিকোনো নিয়েই তাই তোলপাড় সোশ্যাল মিডিয়ায়। রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সবাই। কারণ, নামটাই যে অধিকাংশের কাছে অজানা! জয়পুরে যখন আইপিএল নিলাম শুরু হয় বরুন চক্রবর্তী তার বাবা বিনোদ এবং মা মালিনি চক্রবর্তীর সঙ্গে নিজের বাড়িতে বসে টিভিতে দেখছিলেন। একসময় তার নাম উঠে আসে এবং শুরু হয় তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি। ২০ লাখ থেকে ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে সেটা গিয়ে পৌঁছালো ৮ কোটি ৪০ লাখ রুপিতে। নিজেদেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না বরুনের। তারা মা-বাবার চোখ তো বিস্ফারিত। স্বপ্ন দেখছেন কি না, সেটাও নিশ্চিত হয়ে নেন। বুঝলেন, স্বপ্ন নয়, বাস্তবেই তাদের ছেলে বরুন আইপিএলে বিস্মকরভাবে অভাবনীয় মূল্যে বিক্রি হয়েছেন। কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের ঝুলিতেই স্থান পেয়েছেন রহস্য স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী। কে এই বরুন চক্রবর্তী? হঠাৎ করেই কিভাবে এমন পাদপ্রদীপের আলোয় চলে এলেন ২৭ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার? আইপিএল নিলামের পর এখন ভারতীয় ক্রিকেটে সবার মুখেই প্রশ্ন কে এই বরুন। কেনই বা এতটা আকাশচুম্বী উচ্চতায় তাকে টেনে আনা হলো? কি আছে তার মধ্যে? তামিলনাড়–র এই রহস্য স্পিনারের ক্রিকেটে হাতেখড়ি মাত্র ১৩ বছর বয়সে।
কিন্তু ক্রিকেট ক্যারিয়ারটা তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবে এগোয়নি। নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতেন। কিন্তু বয়স ভিত্তিক ক্রিকেট টুর্র্নামেন্টে সুযোগ না পেয়ে খেলা ছেড়ে পড়াশোনায় মন দেন বরুন। চেন্নাইয়ের এসআরএম ইউনিভার্সিটি থেকে আর্কিটেকচারে পাঁচ বছরের কোর্স সমাপ্ত করেন। তার পর ফ্রিল্যান্স আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজও শুরু করেন। পাশাপাশি চালিয়ে যান টেনিস বলের ক্রিকেট। এই টেনিস বল ক্রিকেটেই দ্রুত নাম করেন বরুন। চার দিকে তার নাম ছড়িয়েও পড়তে শুরু করে। এর ফলেই কাজ ছেড়ে দিয়ে বরুন যোগ দেন ক্রমবেস্ট ক্রিকেট ক্লাবে। ওই সময় তিনি ছিলেন একজন পেস বোলার অলরাউন্ডার; কিন্তু হাঁটুর চোটের জন্য পেস বোলার থেকে হয়ে যান স্পিনার। তার স্পিনের বাইশ গজে বিব্রত হন ব্যাটসম্যানরা। সাতটি ভেরিয়েশনের জন্য তাকে ‘রহস্য স্পিনার’ বলতে শুরু করেন অনেকেই। চোট সারিয়ে ওঠার পর চেন্নাই লিগের চতুর্থ ডিভিশন ক্লাব জুবলি ক্রিকেট ক্লাবে নাম লেখান তিনি। ২০১৭-১৮ মৌসুমে সাত ম্যাচে ৩১টি উইকেট নিয়ে সাড়া ফেলে দেন বরুণ।
ওয়ানডে ফরম্যাটে তার ইকনমি রেট ৩.০৬। বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিংয়ের হাতটাও বেশ ভালো তার। টানা দু’বছর টিএনপিএলে সাফল্যের পর তামিলনাড়ু দলে ডাক পান বরুন। গত মাসে হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে রঞ্জিতে অভিষেক হয় এই রহস্য স্পিনারের। একটি মাত্র প্রথমশ্রেণির ম্যাচ খেললেও তামিলনাড়ুর হয়ে ৯টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। চলতি বছর বিজয় হাজারে ট্রফিতে দ্বিতীয় সেরা উইকেট শিকারী হন এই তামিল স্পিনার। বিজয় হাজারে ট্রফিতে নেন ২২টি উইকেট। আইপিএলে প্রথমবার নাম উঠলেও, টুর্র্নামেন্টের সঙ্গে আগেই পরিচয় ঘটেছে বরুন চক্রবর্তীর। চেন্নাই সুপার কিংসের নেট বোলার হিসেবে বোলিং করেছেন বরুন। সিএসকে-কেকেআর ম্যাচের আগে ধোনিদের নেটে বোলিং করার সময় নাইট অধিনায়ক দিনেশ কার্তিকেরও নজর আসেন তিনি। এরপর কার্তিকই বরুনকে নাইটদের নেট বোলিং করার জন্য ডেকে নেন। এভাবে একজন বরুনের আগমন ঘটে ভারতীয় ক্রিকেটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ