ঢাকা, শুক্রবার 28 December 2018, ১৪ পৌষ ১৪২৫, ২০ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সাম্প্রদায়িকতা কোথায় থাকে?

শেখ দরবার আলম : নিজের কথা নিজেই কখনো কখনো ভেবে দেখতে বাধ্য হই আমি। কেবল নিজের চিন্তা-ভাবনার এবং কাজ-কর্মের কথা নয়, নিজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের কথাও ভাবি। আমার পরিচিত যে দু’একজন লোক আছেন, তাঁদের কেউ কেউ  আমার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের কথা জানেন। তারা জানেন যে,অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে আমি পুরোপুরিই তৃণমূল স্তরের মানুষ। অন্তত একালে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সহায়-সম্বলহীন কোনো মানুষের কোনো সামাজিক মর্যাদা আদৌ থাকে না। কেউ তার মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে না। ইসলামী জীবনব্যবস্থা অনেকেরই অন্তরে ঠাঁই পায় না। ঠাঁই পেলে মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখার একটা সংস্থান হতো।

ইসলাম অনেকের কাছেই হয়ে গেছে একটা অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম। তাদের ব্যবহারিক জীবনে ইসলাম অনুসরণের তাগিদ তাদের মনে থাকে না।

॥ দুই ॥

ইসলাম বিষয়েও আমার কাছে মনুষ্যত্ববোধটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও অঞ্চল নির্বিশেষে যে কোনো মানুষকে আমি প্রথমে মানুষ হিসাবেই দেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি। একজন মানুষ হিসাবে যেসব অধিকার আমার পাওনা হয়, সেসব অধিকার অন্যেরও পাওনা হয় বলে আমি মনে করি। আমার খুব ছোটো বেলায় আমার আব্বা আমাকে শিখিয়েছেন, যে ধরনের কথা তুমি নিজে শুনতে চাও না, সে ধরনের কথা তুমি অন্য কাউকে বলো না। যে ধরনের ব্যবহার তুমি নিজে পেতে চাও না, সে ধরনের ব্যবহার তুমি অন্য কারো সঙ্গে করো না। তোমার নিজের শরীরে কিংবা মনে অন্য কেউ আঘাত দিক এটা যেমন তুমি চাও না, তেমনি মনে রেখো যে, অন্য কেউই চান না যে, তুমিও তার শরীরে কিংবা মনে আঘাত দাও। কতকগুলো অধিকার তুমি যেমন তোমার পাওনা হয় বলে মনে করো, তেমনি অন্য কেউ মনে করেন যে, তারও কতকগুলো অধিকার পাওনা হয়। তুমি তোমার ধর্ম মেনে চলতে চাও। ঠিক তেমনি অন্য আর একজনও তাদের নিজেদের ধর্ম মেনে চলতে চান। তুমি তোমার নিজের ভাষায় কথা বলতে এবং লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো। অনুরূপভাবে ঠিক তেমনি অন্য একজন মানুষও তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তুমি যেমন চাওনা কেউ তোমাকে তোমার ভিটে-বাড়ি থেকে উৎখাত করুন। অনুরূপভাবে ঠিক তেমনি অন্য আরেকজনও চান যে, কেউ যেন তাকে তার ভিটে-বাড়ি থেকে উৎখাত না করেন। তুমি যেমন চাও যে, তোমার গায়ের রঙ দেখে অন্য রকম গায়ের রঙের কোনো মানুষ যেন তোমাকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু বলে মনে না করেন। এ রকমই অন্য আর একজন মানুষও চান যে, তার গায়ের রঙ দেখে অন্য রকম গায়ের রঙের কোনো মানুষ যেন তাকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু বলে মনে না করেন। তুমি যেখানে জন্মেছ সেখানে থাকতে তুমি যেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করো, অন্যেরাও যেখানে জন্মেছেন সেখানে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আমার আব্বা আমাকে শিখিয়েছেন যে, এভাবে মানুষের অধিকার স্বীকার করাটাই হলো মনুষ্যত্ববোধ। মনুষ্যত্ববোধ সম্পর্কে এ রকম কোনো যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত ধারণা পোষণ করলে কেউ কখনো ধর্ম নিয়ে বর্ণ বা গায়ের রঙ নিয়ে, ভাষা নিয়ে, অঞ্চল বা আঞ্চলিকতা নিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করে কোনো রকম জাতীয়তাবাদী হতে পারেন না। কেননা, জাতীয়তাবাদ এবং একজাতিতত্ব মানুষের মনুষ্যত্ববোধ নষ্ট করে দেয়, ধ্বংস করে দেয়। 

॥ তিন ॥

মনুষ্যত্ববোধ প্রসঙ্গে জাতীয়তাবাদের কথাটা আসছে কেন? জাতীয়তাবাদের কথাটা অপরিহার্যভাবেই আসছে এ কারণে যে, যে কোনো জাতীয়তাবাদ, যে কোনো একজাতিত্ব মনুষ্যত্ব-বোধের পরিপন্থী। পুরোপুরিই পরিপন্থী। সম্পূর্ণরূপেই পরিপন্থী।

জাতীয়তাবাদ মনুষ্যত্ববোধের পরিপন্থী কেন?

জাতীয়তাবাদ মনুষ্যত্ববোধের পরিপন্থী এ কারণেই যে, জাতীয়তাবাদ ধর্ম ভিত্তিক হোক, বর্ণ ভিত্তিক বা গায়ের রঙ ভিত্তিক হোক। ভাষা ভিত্তিক হোক কিংবা কোনো অঞ্চল বা আঞ্চলিকতা ভিত্তিক হোক,ÑÑÑ যে কোনো জাতীয়তাবাদের একটা প্রতিপক্ষ ও শত্রু দরকার হয়। কোনো জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দাঁড় না করালে কোনো জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানো যায় না; তুঙ্গে তোলা তো অনেক দূরের কথা! 

অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দাঁড় না করালে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানো যায় না। অন্য কোনো গায়ের রঙের মানুষদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দাঁড় না করালে গায়ের রঙ ভিত্তিক বা বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানো যায় না। অন্য কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত না করলে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানো যায় না। অন্য কোনো এলাকার বা অঞ্চলের মানুষদেরকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দাঁড় না করালে অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানো যায় না।

॥ চার ॥ 

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, জাতীয়তাবাদ যে রকমই হোক না কেন, কোনো দেশের বা কোনো এলাকার সব মানুষ জাতীয়তাবাদী হন না। সব জনগোষ্ঠীতেই মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ অনেক মহৎ মানুষও থাকেন। আর এটাও মনে রাখা দরকার যে, জাতীয়তাবাদ যে বিষয় নিয়ে গড়ে তোলা হোক বা দাঁড় করানো হোক না কেন, জাতীয়তাবাদ সেই বিষয়ের মধ্যে বা সেই বিষয়টার মধ্যে আদৌ থাকে না। জাতীয়তাবাদ থাকে জাতীয়তাবাদ যারা গড়ে তোরে তাদের মনে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে, তাদেরই আত্মকেন্দ্রিক ও অনুদার এবং অমানবিক হিসাব-নিকাশে। যেমন, ইহুদী ধর্ম হোক, খ্রীস্টান ধর্ম হোক, শিখ ধর্ম হোক, জৈন ধর্ম হোক,বৌদ্ধ ধর্ম হোক, ইসলাম ধর্ম হোক, এ রকম কোনো ধর্মেই অন্য কোনো ধর্মাবলম্বীদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দেখার এবং প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দেখে তাদেরকে অধিকার বঞ্চিত করার সংস্থান নেই। কিন্তু ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের একটা অংশে, খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বীদের একটা অংশে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটা অংশে,হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটা অংশে স্পষ্টতই যে জাতীয়তাবাদ আছে সেসব খবর বিশেষ করে বিভিন্ন দৈনিক কাগজে এবং সাময়িকপত্রে প্রায়ই পাওয়া যায়। বৌদ্ধ ধর্মে অহিংসার বাণী যতই থাকুক না কেন, মিয়ানমার বহু বছর যাবত সেখানকার মুসলমানদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করে জাতীয়তাবাদ দাঁড় করিয়ে স্পষ্টতই হিংসা পোষণ করে এসেছে। সেখানকার মুসলমানদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার মত অমানুষও তারা হতে পেরেছেন। যে কোনো জাতীয়তাবাদ মানুষকে অমানুষই করে। কেননা, যে কোনো জাতীয়তাবাদ একটা জনগোষ্ঠীকে নির্বিচারে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দেখে। প্রতিপক্ষও শত্রু হিসাবে দেখে অধিকার বঞ্চিত করে, প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে দেখে অধিকার বঞ্চিত করে সাম্প্রদায়িক হয়। এভাবে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করে কিছু লোক অনেক লোককে অধিকার বঞ্চিত করে সাম্প্রদায়িক হয়ে নিজেরা উচ্চতর স্তরের সুবিধা ভোগ করার ব্যবস্থা করে নেয়। জাতীয়তাবাদী হয়ে প্রতিপক্ষও শত্রু হিসাবে শনাক্ত জনগোষ্ঠীর মানুষের জানমাল কেড়ে নেয়ার মানসিকতা পোষণ করে ফ্যাসিস্টও হন।

॥ পাঁচ ॥

কোনো জনগোষ্ঠী ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী হয়ে অন্য কোনো ধর্মীয় সমাজের মানুষদের প্রতিপক্ষও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করলে সেই ধর্মীয় সমাজের মানুষদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরাভিত্তিক তাদের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতিসত্বাকেও এই ধমীয় সাংস্কৃতিক জাতিসত্বা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত, স্থাপত্য শিল্প ইত্যাদি সমস্ত কিছুকেই প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করে সে সবকিছুকেই উৎখাত করে বা মুছে ফেলে। এভাবে প্রতিপক্ষও শত্রু হিসাবে চিহ্নিত জনগোষ্ঠীকে অধিকার বঞ্চিত করার মাধ্যমে একজাতিতত্ব কায়েম করে সাম্প্রদায়িক হতে চায়। স্পষ্টতই কোনো জনগোষ্ঠীকে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে কিংবা একজাতিতত্ব আরোপকামী দৃষ্টিভঙ্গিতে অধিকার বঞ্চিত করলে সেটাই হয় সাম্প্রদায়িকতা। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ