ঢাকা, শুক্রবার 28 December 2018, ১৪ পৌষ ১৪২৫, ২০ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নির্বাচনে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ

একাদশ সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেশের বিশিষ্টজনেরা অভিযোগ করেছেন, অতীতের আর কোনো নির্বাচনে এবারের মতো চরম অব্যবস্থাপনা দেখা যায়নি। নির্বাচন কমিশনও ইতিপূর্বে আর কখনো এ ধরনের অব্যবস্থাপনার মধ্যে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীতে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তারা বলেছেন, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে বলে বেরোধী দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে প্রার্থীরা পর্যন্ত প্রতিদিন রক্তাক্ত হচ্ছেন। আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখানো হচ্ছে। বিরোধী দলকে প্রতিহত করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল এবং নির্বাচন কমিশন এক হয়ে গেছে। পুলিশ ও প্রশাসনও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষেই ভূমিকা পালন করছে। সব মিলিয়েই নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হতে পারেনি। 

সামগ্রিক এই নেতিবাচক অবস্থার জন্য নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা ও অবহেলাকে দায়ী করে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, বিরোধী দলের প্রার্থীরা নির্বিঘেœ প্রচারণা চালাতে পারবেন না এবং ভোটার জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীদের নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে নাÑ এমন অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা করতেই হবে। এ ব্যাপারে পরিবর্তন ঘটানোর প্রচেষ্টায় তরুণদের দায়িত্ব নিতে হবে। 

সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকের বিষয়বস্তু ছিল ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮:তরুণ, নারী ও সংখ্যালঘুদের কেন ভোট দেওয়া উচিত’। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, কোনো দলের দিকে তাকিয়ে এবং কোনো নেতা বা প্রার্থীর মুখ দেখে কাজ করে না বলেই সামরিক বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা থাকে। একই কারণে নির্বাচনের প্রাক্কালে সামরিক বাহিনীকে মোতায়েন করায় জনমনে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। কারণ, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নির্দিষ্ট নিয়ম ও আইনের মধ্যে কাজ করতে হয়। 

অন্যদিকে দেশের পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে উঠেছে এবং সংঘাত ও হামলার মতো ঘটনার ক্ষেত্রে তারা কিভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে সে ব্যাপারে এখনো সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। বিদ্যমান ব্যবস্থায় যে কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংশ্লিষ্ট এলাকার ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হবে। যার অর্থ, ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ পালন করতে হবে। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমন করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করে সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন বলছেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব, করণীয় ও ক্ষমতা সম্পর্কে বিবরণ বা বিবৃতি দেয়া। কমিশন এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। 

সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব ও করণীয়র গুরুত্ব প্রসঙ্গে জনাব সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার যাতে বেসামরিক প্রশাসনের আহ্বান বা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করার পরিবর্তে কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা একজন কমিশন্ড অফিসারের নেতৃত্বে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ ও ক্ষমতা পায়। অন্যদিকে বর্তমানে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নেই বলেই সারাদেশে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার পরও দুর্বৃত্তরা আগের মতোই হামলা এবং সংঘাতসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে পারছে। একই কারণে নির্বাচনের পরিবেশও শান্তিপূর্ণ হচ্ছে না। এজন্যই সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব, করণীয় ও ক্ষমতা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনকে সিদ্ধান্ত নেয়ার এবং বিবৃতি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। 

গোলটেবিল বৈঠকের অন্য বক্তারাও সহিংসতা এবং আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সমগ্র ব্যর্থতার জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছেন। তারা বলেছেন, নির্বাচনমুখী কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই দেশের বিভিন্নস্থানে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সহিংসতা শুরু করেছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত হয়েছেন বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তথ্যভিত্তিক অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। প্রশাসন ও পুলিশ উল্টো ঐক্যফ্রন্টের আক্রান্ত ও আহত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেছে। তাদের তাড়িয়ে ফিরেছে। ফলে একদিকে সন্ত্রাস-সহিংসতা অব্যাহত থেকেছে এবং বিরোধী দলগুলোর পক্ষে নির্বিঘেœ প্রচারণা চালানো সম্ভব হয়নি, অন্যদিকে ভীত ও উদ্বিগ্ন মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, তারা আদৌ ভোট দিতে পারবে কি না।

এমন বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই গোলটেবিল বৈঠকের বক্তারা সামরিক বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা একই সাথে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার, ভোট দেয়ার এবং পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটানোর প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন। বক্তারা বলেছেন, তরুণরা উদ্যোগী ও তৎপর হলে পরিবেশ যেমন সংঘাতমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে, তেমনি নির্বাচনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। 

নির্বাচনকেন্দ্রিক আরো কিছু বিষয় নিয়েও গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য পরামর্শও দিয়েছেন বক্তারা। কিন্তু এসবের মধ্যে বিশেষভাবে এসেছে নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতার দিকগুলো। অভিযোগ উঠেছে, কমিশন সরকারের সঙ্গে এক হয়ে গেছে বলেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তথা বিরোধী দলের পক্ষে বাধাহীনভাবে প্রচারণা ও কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। এসব কারণেই সামরিক বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দাবি তুলেছেন তারা। 

আমরা মনে করি, ২৬ ডিসেম্বরের গোলটেবিল বৈঠকে কোনো একটি বিষয়েই বাড়িয়ে বলা হয়নি। কোনো বক্তাই অযৌক্তিক কোনো দাবি যেমন তোলেননি, তেমনি দেননি অপ্রয়োজনীয় কোনো পরামর্শও। আমরা তাই আশা করতে চাই, একেবারে শেষ মুহূর্তে হলেও নির্বাচন কমিশনের উচিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সামরিক বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ তৎপরতা চালানোর সুযোগ ও ক্ষমতা দেয়া। তাহলেই পরিস্থিতি অনেকাংশে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে এবং ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ