ঢাকা, শনিবার 29 December 2018, ১৫ পৌষ ১৪২৫, ২১ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কাপাসিয়ায় দুই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের মর্যাদার লড়াই

কাপাসিয়া (গাজীপুর) থেকে শামসুল হুদা লিটন: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৪, কাপাসিয়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বি ৭ জন প্রার্র্থী থাকলেও কাপাসিয়ার আলোচিত দুই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য বড় দুই দলের প্রার্র্থীর নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের মাঝেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। একজন হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্র্থী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ এর মেঝো মেয়ে সিমিন  হোসেনরিমি। অপরজন হলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্র্থী, দলের স্থায়ী কমটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আ স ম হান্নান শাহ’র পুত্র শাহ্ রিয়াজুল হান্নান। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের প্রার্র্থীর ভরসাই হলো তাদের প্রয়াত পিতার ইমেজ। নির্বাচনী মাঠের প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্র্থী সিমিন  হোসেনরিমি। কিন্ত হামলা-মামলায় জর্জরিত হয়ে কৌশলে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপি দলীয় প্রার্র্থী শাহ্ রিয়াজুল হান্নান। গেণাবাহিনী নামার পরে শাহ্ রিয়াজুল হান্নান অনেকটা প্রকাশ্যে ব্যাপকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। নির্বাচনের বাকী আর মাত্র কয়েকদিন। ইতিমধ্যে সাধারণ ভোটাররা তাদের ভোটের হিসাব কষতে শুরু করেছেন। বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে  জেল-জুলুম, হুলিয়া ও থানা পুলিশের অব্যাহত চাপের মুখে তারা বাড়ি ছাড়া। ইতিমধ্যে বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ প্রায় ৫’শ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবী মামলা হয়েছে। এতোকিছুর পরও বিএনপি প্রার্র্থী শাহ্ রিয়াজুল হান্নান মাঠ ছাড়ছেন না। 
 গাজীপুর-৪ কাপাসিয়া, নির্বাচনী আসনটি উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৩৯৪ জন। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক অন্যতম সংগঠক বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদের নির্বাচনী এলাকা। এই আসনে তাজউদ্দীন আহমদের মেঝো কন্যা সিমিন  হোসেনরিমি বর্তমানে এম পি। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বি এন পি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ্। আগামী সংসদ নির্বাচনে এবার এই আসনে বি এন পি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক মন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহর পুত্র শাহ রিয়াজুল হান্নান রিয়াজ। হান্নান শাহ্’র মৃত্যুর পর উপজেলা বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা শাহ্ রিয়াজুল হান্নানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল বলে জানা গেছে। অন্যদিকে  বর্তমান সংসদ সদস্য সিমিন  হোসেনরিমি আওয়ামী লীগের প্রার্র্থী হয়ে ভোটের মাঠে দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। বঙ্গতাজের একমাত্র পুত্র তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করলে
সারা দেশের মতো গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনেও নির্বাচনের পালে হাওয়া লেগেছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ নির্ধারিত থাকায় সময় গুনে সকল দলের নেতা-কর্মীরা মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সময় যতই ঘনিয়ে আসছে ততই নেতা-কর্মীরাও উজ্জীবিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগের দুইবারের এমপি প্রবীণ প্রার্র্থী বঙ্গতাজ সিমিন  হোসেনরিমি আর  বিএনপির নবীন প্রার্র্থী হান্নান শাহ্ পুত্র শাহ্ রিয়াজুল হান্নান। উভয়েই পরিবারের দীর্ঘদিনের নির্বাচনী অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিজয়ের পথে হাঁটছেন বলে তাদের প্রত্যাশা।  তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নিয়ে চলছে শোডাউন ও প্রচার। বর্তমান সংসদ সদস্য সিমিন  হোসেনরিমি নিয়মিত সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন। তার সমর্থকরা ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সিমিন  হোসেনরিমি বলেন, ‘আমার পিতা তাজউদ্দীন আহমদ দেশ-জাতির জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। আমার বিশ^াস বিগত দিনের মত কাপাসিয়া বাসি আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে। জনগণ আবার আমাকে নির্বাচিত করলে মাদকমুক্ত সমাজ ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখব’। কাপাসিয়াকে সবুজ অর্থনীতি গড়তে চান সিমিন  হোসেনরিমি। কৃষিজাত পন্য উৎপাদন ও বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরীতে আরো মনোযোগ দিতে চান। গ্রামকে শহরে পরিণত করবো।
অপরদিকে প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহর মৃত্যু’র পর তার উত্তরসূরি শাহ্  রিয়াজুল হান্নান রিয়াজের নেতৃত্বে দলের নেতা-কর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয় নবীন ও প্রবীণ নেতাকমীরা হামলা মামলায় জর্জরিত হয়ে প্রতিকুল পরিবেশেও দলীয় কর্মকান্ডে একাট্রা। হান্নান শাহ্’র মৃত্যুর পর তার পুত্র শাহ্ রিয়াজুল হান্নান হাল ধরেছে। নেতা-কর্মীরা মনে করে রিয়াজ তার পিতা হান্নান শাহ্’র প্রতিচ্ছবি। প্রতিকুল পরিস্থিতিতেও ২০০৮ সালের পর থেকে কাপাসিয়ার সব ইউনিয়নের তৃণমূল নেতারা দলীয় কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্র্থী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্র্থী ডাঃ ছানাউল্লাহ্ , ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। এ নির্বাচনে  ১৫ দলীয় ঐক্যজোটের মনোনীত প্রার্র্থী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নির্বাচিত হন।  ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্র্থী মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওবায়দুল্লাহ্ নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএন পি থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ্ আওয়ামী লীগের প্রার্থী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের সহধর্মিনী জোহরা তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১২জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের ছোট ভাই অ্যাডভোকেট আফছার উদ্দিন আহমদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ স ম হান্নান শাহ’র সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের পুত্র তানজিম আহমদ  সোহেল তাজ  হান্নান শাহ্’র সঙ্গে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। তারপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি থেকে অর্থনীতিবিদ এম, এ আব্দুল মজিদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় ৬৭ হাজার ভোট পেলেও সোহেল তাজ বিজয়ী হন। তারপর সোহেল তাজ প্রথমে মন্ত্রীত্ব থেকে পরে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করলে এ আসনে উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে তার বড় বোন সিমিন  হোসেনরিমি তার আপন চাচা অ্যাডভোকেট আফছার উদ্দিন আহমদের (স্বতন্ত্র প্রার্থী) সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি’র অংশগ্রহণ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. মিয়া মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সিমিন  হোসেনরিমি আবারও নির্বাচিত হন।
স্বাধিনতার পর এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্র্থী ৬ বার নির্বাচিত হয়। বিএনপি ৩ বার এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্র্থী হিসাবে নির্বাচিত হন। কাপাসিয়ায় বরাবরই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ-বিএনপি প্রার্র্থীর মাঝে ভোটের ব্যবধানও খুব একটা বেশী নয়। তবে বিভিন্ন কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে সাধারণ ভোটারের মতামত অন্যরকম। ভোটের মাঠে সচেতন ভোটাররা মুখ খুলতে নারাজ। বাহ্যত ভোটাররাও যেন কৌশলী। এসব নীরব ভোটাররাই জয়-পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখবেন বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। আগামী ৩০ ডিসেম্বর সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিজয়ের শেষ হাসি কে হাসবে তার জন্য নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
এছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রার্র্থী মানবেন্দ্র দেব (কাস্তে), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল মনোনীত প্রার্র্থী অ্যাডভোকেট মোঃ নাজিম উদ্দিন শেখ (তারা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত আলহাজ¦ মোঃ নূরুল ইসলাম সরকার (হাতপাখা), জাকের পার্টি মনোনীত প্রার্র্থী ডাঃ মোঃ জুয়েল কবির (গোলাপ ফুল), বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্র্থী মোহাম্মদ সারোয়ার-ই-কায়নাত (টেলিভিশন)। ইতিমধ্যে সকল প্রার্র্থীই এলাকায় সাধ্যমত তাদের গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কাপাসিয়ায় ১১৯টি ভোট কেন্দ্রে ৫২৬টি বুথে ভোট গ্রহণ করা হবে।  ১ হাজার ৫২ জন পুলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। এ আসনে এবারের মোট ভোটার ২ লক্ষ ৬৭ হাজার ৩৯৪ জন। যার মাঝে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩১ হাজার ৮৮৫ জন ও নারী ভোটার ১ লক্ষ ৩৫ হাজার ৫০৯ জন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ