ঢাকা, রোববার 30 December 2018, ১৬ পৌষ ১৪২৫, ২২ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ ২ ॥
কঠোর সাধনার মাধ্যমে ইন্দ্রিয় শক্তি দমিত হয়ে বজ্র হয়। এই বজ্র ভাবকে আশ্রয় করে যে সাধনার পথ তৈরী হয় তাই বজ্রযান। দ্র. নজরুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮”।, মন্ত্রযান, “মন্ত্রের মাধ্যমে মন্ত্রতযানীরা বৌদ্ধ ধর্ম গড়ে তুলে। তাদের মূল কথা হল মন্ত্রই মূল প্রেরণা। জনসাধারণ বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্বকথা বুঝতে পারত না। ফলে তারা মন্ত্রযানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। দ্র. নজরুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮”। কালচক্রযান “কালচক্র যানীলা তিথি নক্ষত্র, রাশিকে প্রাধান্য দেয় তাদের মতে কালচক্রই বুদ্ধের জন্মদাতা। যোগসাধনার মাধ্যমে প্রাণ প্রক্রিয়াকে নিরুদ্ধ করতে পারলেই কালচক্র নিরস্ত হয়। ফলে মোক্ষ লাভ হয়। দ্র. নজরুল ইসলাম প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮”। প্রভৃতি অংশে বিভক্ত হয়ে নতুন আঙ্গিক ধারণ করে।
সেন বংশের মধ্যে লক্ষণ সেন ও তার বংশধরগণ বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী ছিলেন। এরা দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল। যারা সংসার ধর্ম পালন করে না তাদের শ্রীকৃষ্ণ এবং যারা সংসার ধর্ম পালন করে তাদের গৃহী বৈষ্ণব বলা হয়। “দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, সিলেটে ইসলাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা ১৯৯৫, পৃ. ৬”।
পাল চন্দ্র যুগে শৈব ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। “নজরুল ইসলাম, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫-২৭”। সৌর ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল বাংলায়। পাল চন্দ্র যুগে সৌর পূজার বিশেষ প্রসার ঘটে। “তদেব, পৃ. ২৫-২৭”। রাজশাহী জেলার মান্দায় ত্রিশিব সূর্য মূর্তিটি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মত। “তদেব, পৃ. ৩১”।
বাংলা বিভিন্ন ধর্মে-বর্ণের লালন ক্ষেত্র হিসেবে এক বৈশিষ্ট্যের দাবীদার। আর্য ধর্ম থেকে শুরু করে জৈন, বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য, শৈব, সৌর প্রভৃতি ধর্ম ও বর্ণের আশ্রয়ে বাংলার বিভিন্ন কালের মানুষ তাদের সংস্কৃতিতে পেয়েছে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা। সুলতানি যুগে এই সমস্ত ধর্ম-বর্ণের লীলাভূমি বাংলায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত পরবর্তী গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সমসাময়িক কবি ও লেখকদের অনেকে এই সময়ের ধর্মীয় পরিবেশ ও সমাজকে অত্যন্ত বিপর্যয়কর বলে বর্ণনা করেছেন। আবার অনেকে এই সময়ে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক এবং সমকালীন সমাজকে চমৎকার বলে মন্তব্য করতেও কোনোরূপ দ্বিধা করেনি। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একই সমাজে পরস্পর দু’টি বসবাসরত জাতি হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্ক ও সমঝোতার একটি সূত্র তৈরি হয়েছিল। “তবেদ, পৃ. ৩১”।
মুসলিম আগমনের পূর্বে বাংলার ধর্ম ও সমাজ ঃ মুসলিম বিজয়ের পূর্বে বাংলায় বসবাস করতো মূলত হিন্দু, বৌদ্ধ এবং অন্ত্যজ শ্রেণীর অধিবাসী ও কিছু সংখ্যক জৈন। পাল বংশের পতনের পর থেকে বৌদ্ধদের রাজনৈতিক প্রাধান্য কমতে থাকে। গৌড়ের সিংহাসনে হিন্দু সেনবংশের আরোহণের ফলে বৌদ্ধ, জৈনসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপর অত্যাচার উৎপীড়নের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। “এম. এ. রহিম, বাংলার সামাজিক ও সংস্কৃতিক ইতিহাস, প্রথম খন্ড (১২০৩-১৫৭৬ খ্রি.) (মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অনুদিত), বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮২, পৃ. ৩০”। লক্ষণ সেন বৈদিক ও পৌরাণিক ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচছায় অন্যান্য ধর্মের মানুষদের উৎপীড়ন করেছেন। “অবশ্য, রাখাল দাস বন্দোপাধ্যায় এবং রমেশচন্দ্র মজুমদার বখতিয়ার খলজীকে একজন লুটেরা হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা এও উল্লেখ করেন, লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে বাংলায় সুখ ও শান্তির ফোয়ারা বইছিল। একজন লুটেরা সেখানে আক্রমণ করে শান্তি ও সুখ বিনষ্ট করেছিল। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তারা জাতীয় পক্ষপাতিত্বের নীতি অবলম্বন করেছেন”। তাঁর সময়েই ব্রাহ্মণদের রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে সাধারণ মানুষের উপর নেমে আসে নির্যাতন। “ড. হরপ্রসাদ  শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপাল থেকে উদ্ধারকৃত বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদে এ সম্পর্কে অনুধাবন করা যায়। চর্যাপদের কবি চনচন পাদ উল্লেখ করেছে।
“জো সো বুধী সোই নিবুধী
জো সো চৌর সোই সাথী
অর্থ যে বুঝে সে নির্বোধ, যে চোর সেই সাধু।”
আর একটি চর্যার কবি ভুলুকুপাদ উল্লেখ করেছেন,
“কাহেরে খিনি মেলি আচ্ছুহু কীস
বেঢ়িল হাক পড়ই চৌদীস॥
অপনা মাংসে হরিণা বৈরী।
খনহ ন ছাড় অ ভুসুকু অহেরী॥
তিন ন চুপই হরিণা পিরই না পানী।
হরিণা হরিণির নিল অ ণ জানী॥
হরিণা হরিণির নিল অ ণ জানী॥
হরিণী বোল অ হরিণা সুন হরিআ তো।
এ বন লেড়ী হোহু জান্তো ॥
তরঙ্গতে হরিণার খুর ন দীস অ।
ভুলুকু ভণই নূঢ়া হিজহি ন পইসঈ॥”।
উল্লেখিত পদগুলির অর্থ করলে দাড়ায়, “কাকে নিয়ে ছেড়ে কেমন করে আজো, আমাকে ঘিরে চারদিকে হয়ে পড়ে। আপন মাংসের জন্যই হরিণ শত্রু। এক মুহুর্তের জন্যও শিকারী ভুসুকু ছাগে না। হরিণ ঘাস ও  পানিও পান করে না। হরিণ-হরিণীর নিলয় জানা যায় না। হরিণী বলে হরিণ তুমি শোন, এ বন ছেড়ে দূরে চলে যাও। দ্র. অতীন্দ্র মজুমদার, চর্যাপদ, নয়া প্রকাশ, কলিকাতা, ১৯৯৫), পৃ. ৭৪, ১০২, ১০৪।”
ত্রয়োদশ শতকের কবি রামাই পন্ডিত তার শূণ্যপুরাণে শ্রী নিরঞ্জন রুষ্মায় ব্রাহ্মণ শাসিত সমাজের নির্যাতন-নিপীড়নের করুণ চিত্র একেছেন কবিতার মাধ্যমে। “কবিতাটি নিম্নরূপ:
 “জাজপুর পুরবাদি সোলসঅ স্বর বেদি
পবদি লয় কন্নয় যুন।
দখিন্যা, মাগিতে জাঅ,
আধুনিক বাংলায় এর অর্থ করলে দাঁড়ায় “জাজপুরে ষোল শ’ বৈদিক ব্রাহ্মণের বাস। তারা কানে পৈতা তুরে দক্ষিণা চাইতে যায়। যায় ঘরে দক্ষিণা পায় না অভিশাপ দিয়ে তার সংসার পুড়িয়ে দেয়। মালদহে তারা আপন পর না ভেবে কর বসিয়ে দেয়। তাদের জাল জুয়াচুরীর শেষ নেই্ তারা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। দল বেঁধে সদ্ধর্মীকে (বৌদ্ধ জনসাধারণকে) বিনাশ করছে। তারা বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে, তাদের মুখ থেকে ঘন ঘন অগ্নি বের হয়, সকলে তা দেখে কম্পমান। সকলে মনে মনে অর্থ বুঝে বলে ‘হে ধর্ম দেবতা, রক্ষা করো, তুমি ছাড়া কে আমাদের উদ্ধার করবে?” দ্র. দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, প্রথম খনড (অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায় সম্পাদিত) (কলিকাতা : পশ্চিমবঙ্গ পুস্তক পর্ষদ, ১৯৯১), পৃ. ৫৫-৫৬, কাজী আব্দুল ওদুদ, বাংলার মুসলমানদের কথা, মুস্তফা নুরউল  ইসলাম (সম্পাদিত) বাংলাদেশ : “বাঙালী আত্মপরিচয়ের সম্মানে” সাগর পাবলিশার্স, ঢাকা, পৃ. ৮৬”।
সামাজিকভাবে ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যদের তেমন প্রভাব লক্ষ করাযায় না। তারা শূদ্র “বৃহদ্ধর্ম পুরাণে শূদ্র জাতিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে ১. উত্তম সংকর যথা করণ, অস্বষ্ঠ, উগ্র, মাগধ, তপ্তবায়, গন্ধবণিক, নাপিত, গোপ, কর্মকার, ভৈলিক, কুপ্তকার, শঙ্খকার, দাসচাষী, বারুজীবী, মোদক, মালাকার, সুভ, রাজপুত্র ও তাম্বুলী। ২. মধ্যম সঙ্কর যথা ভক্ষণ, রজক, স্বর্ণকার, স্বর্ণবণিক, আভীর, তৈল কারক, ধীবর, শৌন্ডিক, নট, শাবাক, শেখর, জালিক ৩. অধম সঙ্কর যথা মলেগ্রহি, কুড়র, চন্ডাল, বরুড়, তক্ষ, চর্মকার, খট্টজীবী, ডোলবাহী ও মল্ল। প্রথমে তাদের সংখ্যা ছিল ৩৬ পরবর্তীতে ৫ জাতিতে সংযোজিত করা হয়েছে। দ্র. নজরুল ইসলাম, বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি., কলিকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ১৪০২ বঙ্গাব্দ), পৃ. ৪০-৪২”। সমাজের মধ্যে গণ্য হতো। শূদ্রদের চেয়ে নিম্নে ছিল অন্ত্যজ শ্রেণি। এই উভয় শ্রেণী সমাজে অবহেলিত ছিল। ব্রাহ্মণরা এই নিম্নশ্রেণী থেকে সব সময় দূরে থাকত। সমাজে পতিতাবৃত্তি হিন্দু সমাজের উঁচুশ্রেণীর মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং পতিতাবৃত্তি সমাজে কোন নিন্দনীয় কাজ হিসেবে বিবেচিত হত না। “এ সম্পর্কে চর্যাপদে উল্লেখ পাওয়া যায় :
নগর বাহিরে রে ডোম্বী তোহোরি কুড়িয়া।
ছই ছোই সাইসি ব্রাহ্ম নাড়িয়া।
অর্থাৎ ডোম্বীনীর সঙ্গে মিলিত হবার বাসনায় ব্রাহ্মণরা তাদের ঘরের আশেপাশে সময়ে অসময়ে কামতাড়িত হয়ে বেড়াত।
চর্যাপদের অন্য একটি স্লোকে এ সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়।
 দিবসই বহুড়ী কাউই ডরে ভাআ।
রাতি ভইলে কামরু জাঅ॥
অর্থাৎ দিনে বউটি কাকের ভয় পায় কিন্তু রাত্রে অভিসার যাত্রায় যত দূরে হোক না কেন সে পিছপা হয় না। দ্র. অতীন্দ্র মজুমদার, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫, পৃ. ৪১”। সেন যুগে (১০৯৭-১২২৫ খ্রি.) নর-নারীরা বিলাসিতার মাঝে জীবন অতিবাহিত করত। ধোয়ীপবন দূত ও গোবর্দ্ধন আচার্য্যরে ‘আর্য্যা সপ্তশতী’ পড়লে তৎকালীন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের অভিরুচি এবং ব্রাহ্মণগণের যৌনতায় কুরুচিপূর্ণ চিত্র সহজেই অনুমান করা যায়। “বিরচিত কয়েকটি স্লোক-
বৃদ্ধোহ্মাণস্তন পরিসরা; কুঙ্কুম স্যাঙ্গরাগা
দোলা : ফেলি ব্যসনবসিকা; সুন্দরীগাং সমূহা;
ক্রীড়াবাপ্য ; প্রতনু-সলিলা মালতীদাম রাত্রি;
স্ত্যানজ্যোৎরামুদবিরতং কুর্ব্বতে যত্র যুনাং ॥
ভ্রাম্যন্তীনং ভ্রমসি নিবিড়ে বল্লভাকাঙ্খিনীনাং
লাক্ষারাগাশ্চরণগলিতা, পৌরসীমন্তিনীনাম।
রক্তাশোকন্তবকললি তৈর্বালভানোর্ময়ুখৈ
নালক্ষ্যন্তে রজনিবিগমেপৌরমার্গে ষু ষত্র।
উপরোক্ত স্লোকের সাধারণ যে অর্থ দাড়ায় “এই সময় দেশের মধ্যে ব্যভিচার স্রোত এত প্রবল ভাবে প্রবাহিত হচ্ছিল যে, সম্ভ্রান্তবংশীয় রমনীরাও জ্যোৎরালোকে প্র্রকাশ্য রাজপথে দোলায় আরোহিত ইমররানিগণের সহিত প্রেমালাপে সম্পূর্ণ রজনী অতিবাহিত করত। রাজপথ বার বিলাসীগণের সঞ্জীবনিক্কনে সরক্ষিতও মুখরিত থাকিত। বল্লভাকাঙ্খিনী স্বেচ্ছা বিহারিনী অভিসারিকারা গভীর রজনীর অন্ধকারে রাজপথে ইতস্তত; ভ্রমণ করত।” দ্র. সুশীলা মন্ডল, বঙ্গদেশের ইতিহাস: মধ্যযুগ, ১ম পর্ব, প্রকাশ মন্দির  ২৭ সি, কলিকাতা, পৃ. ৬৭-৬৮। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ মদ পান করতো। বিভিন্ন ধরনের মদের প্রচলন ছিল। দোকানে প্রকাশ্যে মদক্রয়-বিক্রয় হতো। মদের সর্বগ্রাসী প্রভাব সমাজকে স্থবির করে রেখেছিল। “সুমক্তি কর্ণামৃত গ্রন্থের একটি শ্লোকে মদপানের স্বাভাবিক রীতি সম্পর্কে বিরুবাপাদ উল্লেখ করেছেন।
“এক সে শুন্ডিনি দুই ঘরে সানধ অ।
চী অন বাকল অ বারুনী বন্ধতা।
*************
দশমী দু আরত চিহ্ন দেখিয়া
আইল গরাহক আপনে বহিয়া
চউশটি গড়িয়ে দেল পসারা।
পইঠেল গরাহক নাকি নিসারা ॥
এক সে ষড়লী সরুই নাল।
ভগন্ত বিরুআ গির করি চাল ॥

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ