ঢাকা, সোমবার 31 December 2018, ১৭ পৌষ ১৪২৫, ২৩ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি সাহিত্য

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : চলমান মানব জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি হচ্ছে সাহিত্য। ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতি, বোধ-বিশ্বাস, স্বাতন্ত্র্য ও রুচিবোধ সবই সাহিত্যের অংশ। এসব যখন শিল্পীর নিপুণ কারুকাজ, কৌশলী গাঁথুনি ও নির্মোহ উপস্থাপনায় একটি বিশেষ রূপ নেয় তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য।  তাই কোন জাতির জীবনাচরণ, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য জানতে হলে সেই জাতির সাহিত্য-সংস্কৃতি  সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা দরকার।  কারণ,  সাহিত্য দর্পণেই  প্রতিবিম্বিত হয় জাতির আশা-আকাক্সক্ষা, হাসি-কান্না, অনুরাগ-বিরাগ ও আবেগ-অনুভূতির প্রকৃত রূপ। তাই সাহিত্য ও মানব জীবন একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দু’টিকে আলাদা করার তেমন সুযোগ নেই।
বিশ^মানচিত্রে আমাদের ভৌগোলিক স্বাধীনতা নবীনতর হলে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ভান্ডার কিন্তু খুবই সমৃদ্ধ। বৈশ্বিক সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যেমন শাখা-প্রশাখা রয়েছে, ঠিক আমাদের ক্ষেত্রে তা মোটেই আলাদা নয়।  আমাদের সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মধ্যে লোকসাহিত্যও একটি উল্লেখযোগ্য ও খুই সমৃদ্ধ শাখা। লোকসাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপশাখা হলো লোকসঙ্গীত। আর আমাদের লোকসঙ্গীত যেমন সমৃদ্ধ, ঠিক তেমনিভাবে এর আবেদন ও প্রভাব আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে খুবই ক্রিয়াশীল। শুধু যে ক্রিয়াশীল এমন নয় বরং এই সমৃদ্ধ লোকসঙ্গীতে মিশে আছে আমাদের বোধ, বিশ^াস, আধ্যাত্মবাদ ও জীবনবোধের অন্যন্য সাধারণ ব্যঞ্জনা। তাই আমাদের লোকসঙ্গীত আমাদের দেশ ও জাতিসত্বার চিরায়ত রূপ। 
আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে আমাদের নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি কিছুটা কোনঠাসা হলেও আমাদের দেশের লোকসঙ্গীতের আবেদন এখনও শেষ হয়ে যায়নি। কারণ, এসব আমাদেরকে শেকড়ের সন্ধান দেয়। পরিচয় করিয়ে দেয় আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাথে। সাহিত্যের কল্পলোকের আবহ থেকে বেড়িয়ে একটা নির্মোহ বাস্তবতার দিকেই পথনির্দেশ করে। অনেক সময় এসবকে শিল্পীর নিপুণ কারসাজি বলে মনে হলেও আমরা যখন বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি তখন  বাস্তবতা এসে ধরা দেয়। আমরা মহূর্তেই কল্পলোক থেকে বেড়িয়ে বাস্তবতায় ফিরে আসি। তাই লোকসঙ্গীত আমাদের জীবন ও উপলব্ধির সাথে একেবারে একাকার হয়েই আছে।
বলছিলাম আমাদের  লোকসঙ্গীতের কথা। আমরা অনেকেই তা আত্মবিনোদনের মাধ্যম হিসেবে মনে করি। কিন্তু আমাদের লোকসাহিত্যের ভান্ডারে এমন এমন লোকসঙ্গীত স্থান করে নিয়েছে যা সত্যিই আমাদের চলমান বাস্তব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আমাদের ইন্দ্রিয়ানুভূতির দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তা উপলব্ধি করতে পারি না। ‘পরের জাগা পরের জমি ঘর বানায়া আমি রই, আমি  তো সে ঘরের মালিক নই’ এ ধরনের অসংখ্য লোকসঙ্গীত যেমন আমাদেরকে আধ্যাত্মবাদে উদ্বুদ্ধ করে, ঠিক তেমনিভাবে ‘প্রাণ সখীরে....’ আমাদের মধ্যে রোমান্টিক আবহ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। আমাদের লোকসঙ্গীত সম্ভারের একটি অন্যতম ও জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত হলো, ‘ মধু হৈ হৈ বিষ খাওয়াইলা’। যা আমাদের ঘুনে ধরা সমাজের প্রতি এক নির্মম চপেটাঘাত। কিন্তু  আমরা এই সঙ্গীতে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ি। আবেগে আপ্লুত হই। সাহিত্যের পাত্র-মিত্রের মধ্যে একটা বিরহগাঁথা খুঁজে ফিরি। মনে হয় কোন এক রূপকথার রাজ্যের রাজকুমার ও রাজকুমারীর মধ্যে বিরহ-বেদনায় আবর্তিত হয় এর আবেদন। তাই এর মধ্যে বাস্তবতার সন্ধান করার খুব তাগাদা আমাদের মধ্যে থাকে না বরং এটাকে কথার পিঠে কথা বা রূপকথা হিসেবেই মনে করা হয়। কিন্তু এই লোকজ গানের মধ্যে আমাদের গীতিকবি আমাদের সমাজের যে একটা বাস্তবচিত্র উপস্থাপন করেছেন তা আমরা কোনভাবেই উপলব্ধি করতে পারি না।
আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনীতি যে আত্মপ্রবঞ্চনার দলিল তা যারা রাজনীতিসচেতন তাদের মুখে মুখে শোনা যায়। হয়তো তা আমরা উপলব্ধিই করতে পারি না। মানুষের কল্যাণে রাজনীতির ধারণা ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হলেও তা আর নিজস্ব অক্ষরেখায় চলে না। মূলত একশ্রেণির অতিউচ্চাভিলাষী মানুষের কারণেই আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনীতি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে যোজন যোজন তফাতে চলে গেছে।  রাজনীতির ঠাটবাট ও জৌলুস আগের তুলনায় বাড়লেও তা এখন নিছক বহিরাবরণ বলেই মনে হয়। একশ্রেণির রাজনীতিবিদ প্রতিনিয়ত জনগণের কল্যাণের কথা বলে মুখে খৈ ফোটালেও বাস্তবে বিষের বড়ির ওপর মধুর প্রলেপ দিয়ে তা দেশের সহজ-সরল মানুষকে গলধকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা বেশ সফল হচ্ছেন। হয়তো এই উপলব্ধিগুলোই গীতিকবি তার কাব্যিক দ্যোতনায় আমাদের মধ্যে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।
‘মধু হৈ হৈ......’  আমাদের লোকসাহিত্যের অতি জনপ্রিয় গান। এটি নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় রচিত হলেও এর মর্ম বুঝতে কারোরই তেমন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এই গানে প্রতারিত হওয়ার অভিব্যক্তিই প্রকাশ করা হয়েছে। মূলত কাক্সিক্ষত বস্তুর অপ্রাপ্তি থেকেই এই ব্যথাটা কবি মনে জাগ্রত হয়েছে। আমাদের দেশের মানুষ যে প্রতিনিয়ত এ ধরনের প্রতারাণার শিকার সে কথায় আমাদের গীতিকবি খুব সফল ও স্বার্থকভাবেই উপস্থাপন করেছেন। যদিও গীতিকবির উদ্দেশ্য চটুল রাগ-অনুরাগ ও বিরহের আবহ সৃষ্টি কিন্তু এই অভিব্যক্তির মধ্যেই লুকায়িত আছে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আমাদের অবক্ষয় যে একেবারে প্রান্তসীমায় নেমে গেছে তা কবির ছন্দবিন্যাসে ও শিল্পীর সুর মূর্ছনায় করুণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ একটা শ্রেণি যে আমাদের সাথে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে যাচ্ছে সেকথাই ফুটে উঠেছে গানের প্রতিটি ছত্রে ছত্রে।
আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও পারিবারিক পরিসরে এই গানের  বাস্তব প্রয়োগ সহজেই দৃশ্যমান। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় অবাধ গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের কথা বলা হলেও প্রায়োগিক দিক থেকে তা খুবই ভঙ্গুর। গণতন্ত্রের নামে জনগণকে মধুমিশ্রিত কথা শোনালেও তারা নিজেরাই গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী নয় বরং তারা গণতন্ত্রে দীক্ষার নামে আত্মতন্ত্রেরই পূঁজা-অর্চনায় ব্যস্ত রয়েছেন। দেশে গণতন্ত্র আছে, আছে সংবিধান; নির্বাচন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু সে নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন হচ্ছে না। ভোটের নামে তামাশা ও প্রহসন এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে, আমরা এ বৃত্ত থেকে কোনভাবেই বেড়িয়ে আসতে পারছি না বরং প্রতিনিয়ত আমরা আত্মপ্রতারণার শিকার হচ্ছি।
মূলত মধুর নামে বিষ বিক্রেতার  নতুন সংস্করণ হচ্ছে বৈরী ও হিংসা পীড়িত রাজনীতি পুনর্গঠনের পর নতুন যারা আসেন তখন তারা নির্বাচন নিয়ে গালভরা গল্প শুনিয়ে থাকেন। আমরাও আশায় বুক বাঁধি।  কিন্তু বাস্তবে এর কোন প্রতিফলন দেখা যায় না বরং বরাবরই তারা মধুর নামে দেশের মানুষকে বিষই গলধকরণ করতে বাধ্য করে। আর সে প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন আমাদেরকে মধুর নামে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিষের বড়ি গিলিয়েছে। কথিত সে নির্বাচনের গণসম্পৃক্ততা না থাকলেও নির্বাচন কমিশন তাতে চিনির প্রলেপ দিয়েছে। কিন্তু কমিশন আমাদেরকে বিষক্রিয়া মুক্ত করার কোন চেষ্টাও করেনি মনে করা হয়েছিল যে, রকিব কমিশনের বিদায়ে আমরা কিছুটা হলেও সুবিধাবোধ করবো। কিন্তু সে আশায় গুঁড়ে  বালি পড়েছে। ফলে দেশের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি এখন খাদের কিণারে এসে দাঁড়িয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ