ঢাকা, সোমবার 31 December 2018, ১৭ পৌষ ১৪২৫, ২৩ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ তিন ॥
শব্দগুলির সরল অর্থ করলে  দাঁড়ায়, “এক শুঁড়িনী দুই ঘরে সান্ধে বা ঢোকে, সে চিকণ বাকল দ্বারা বারুণী (মদ) রাঁধে। গুড়ির ঘরের চিহ্ন (আছে) দরজায় দেয়া থাকে সে চিহ্ন দেখে গ্রাহক নিজেই চলে আসে। চৌষট্টি গড়ায় মদ ঢালা হয়েছে, গ্রাহক যে ঘরে ঢুকল তাঁর আর সাড়াশব্দ নেই (মদের নেশায় এমনই বিভোর), সরুনালে একটি ষড়ায় মদ ঢালা হচ্ছে বিরূপা সাবধান করতেন, সরু নল দিয়া চাল স্থিরকরিয়া  বারুনী ঢালো। দ্র. নীহাররঞ্জন রায়, [প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪৮] কর্তৃক উল্লেখিত”। ‘শেক শুভোদয়ার’ এক কাহিনীতে দেখা যায়, রাজা লক্ষণসেনের শ্যালক (রাজমহিষী বল্লভার ভাই) কুমার দত্ত মাধবী নাম্নী এক বণিক বধূর উপর নির্যাতন করেছিলো। নির্যাতিতা মাধবী তার আত্মসম্মান ক্ষুণœ করেও এই অপমানের প্রতিবিধান কল্পে লক্ষণ সেনের রাজ সভায় অভিযোগ করেন। রাজমহিষী বল্লভা সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। রাজা লক্ষণ সেন মাধবীর অভিযোগে নিরুত্তর থাকলেন এবং রাজমহিষী স্বয়ং মাধবীকে অভিযোগ করার অপরাধে প্রহারে প্রহারে জর্জরিত করলেন। “সুশীলা মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২” হিন্দু ধর্মের বহুল আলোচিত সহমরণ “স্বামীর সাথে সহমরণকে সতীদাহ প্রথা বলা হয়। পূর্বে হিন্দুদের  অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ায় অনুসৃত একটি প্রথা।  ইহাতে স্ত্রী স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় প্রাণ বিসর্জন দিত। ব্রিটিশ বারতে ১৮২৯ খ্রি: লর্ড কেসটিংত আইস কায়েম করে এই প্রথা রহিত করেন। দ্র. খান বাহাদুর আব্দুল হাকিম (সম্পা.) বাংলা বিশ্বকোষ, ৪র্থ খন্ড, কিতাবিস্তান ও গ্রীন বুক হাউস লিমিটেড, ঢাকা, ১৯৭৬, ৫২৬”। ছিল প্রাক-মুসলিম বাংলার সামাজিক রীতিনীতি ও ধর্মীয় গোঁড়ামীর এক নির্যাতনের দলীল।
মুসলমান বিজয়ের পূর্বে বাংলায় বাংলাভাষার কোনোরূপ সম্মান ছিল না। ব্রাহ্মণ্য হিন্দু সমাজে বাংলা ভাষাকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখা হয়েছে। তাঁরা সংস্কৃত ভাষাকে দেবভাষা বলে মনে করতো। “এ.কে. এম শাহ নাওয়াজ, মুদ্রায় ও শিলালিপিতে মধ্যযুগের বাংলার সমাজ সংস্কৃতি, পৃ. ১৭৬”। অন্য ধর্মাবলম্বীদের অধিকাংশই ছিল শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং বাংলাও ছিল অবহেলিত ও ঘৃণিত। “ব্রাহ্মণগণ বাংলা ভাষাকে এই বলে অভিশাপ দিয়েছিল যে, যারা অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ বাংলায় শেষে তারা রৌরব নামক নয়কে প্রবিষ্ট হবে। দ্র. Dr. M. Shahidullah, The Infiuence of Hindi on Bengali Language and Literature, Journal of the Asiatie Soclaty of Fatistau, ৭ম খন্ড, প্রথম অধ্যায়, পৃ. ০১।”
এ কথা অবিদিত নয় যে, মুসলমান শাসকগণই ঘৃণিতও অবহেলার স্থান থেকে বাংলা ভাষাকে রাজ দরবারের ভাষা হিসেবে সম্মান প্রদান করেন এবং বাঙালি কবিও বিদ্বানদের প্রতি সহানুভুতি প্রদর্শন করে বাংলা ভাষাকে পরিপূর্ণ একটি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। “দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, পৃ. ৭৩-৭৫”। ড. দীনেশ চন্দ্রসেন মুসলমান শাসকগণের বাংলা ভাষার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। “প্রাগুক্ত”
নিম্নশ্রেণী এড়িয়ে চলাই ছিল হিন্দু উচ্চশ্রেীর একটি সংস্কার। তথাপি এই উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা নিম্নশ্রেণীর ডোম্বীনীর সঙ্গে বিবাহ বর্হিভূত রতিক্রিয়ায় মিলিত হতে দ্বিধাবোধ করতো  না। “নগর বাহিরে ডোম্বী তোহোরি কুড়িয়ে, ছ, ছোই যাইসি ব্রাহ্মণ নাড়িয়া।’
অর্থাৎ ডোম্বীনীর সঙ্গে মিলিত হবার আশায় ব্রাহ্মণরা তাদের ঘরের আশেপাশে সময়ে অসময়ে কামতাড়িত হয়েঘুড়ে বেড়াতো। দ্র. অতীন্দ্র মজুমদার, চর্যাপদ, নয়া প্রকাশ, কলকাতা, ৬ষ্ঠ মুদ্রণ, ১৯৯৫, পৃ. ৩৫।”
গৌড়ের যুবক-যুবতিদের কামলীলার কথা, তাদের কামনাও পোশাকের কথা এবং বঙ্গের রাজ দরবারের অভ্যস্তরে মহিলাদের যে নির্লজ্জ যৌনতা, ব্রাহ্মণ, রাজকর্মচারী ও দাস ভৃত্যদের সঙ্গে তাদের কাম-ষড়যন্ত্রের বিবরণ বাৎস্যায়ন লিখেছেন। “নীহাররঞ্জন রায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬৫।” ধোয়ীর ‘পবনদূত’ কাব্যেও কামচরিতার্থতার অবাধ লীলা অত্যন্ত সাড়ম্বরপূর্ণভাবে বর্ণনা করেছেন।
কেশব সেনের ‘ইদিলপুর লিপি’ এবং বিশ্বরূপ সেনের সাহিত্য পরিষদ লিপিতেও সে সময়ের সমাজ-সংস্কৃতির অবক্ষরে চিত্রগুরি ফুটে ওঠে। এগুলোতে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা  হলো, প্রতি সন্ধ্যায় বারাঙ্গনা সভানন্দিনীদের নিক্কন ঝংকারে সভা ও আমোদ গৃহগুলো যৌনতা ও অশ্লীলতায় মেতে উঠতো। সে সময়ে উচ্চ হিন্দুদের বাড়িতে দাসী রাখা হতো শুধু কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য। এ দাসীরা উত্তরাধিকার হিসেবে হাত পরিবর্তন হতে পারতো। এ ছাড়াও এ সময়ে বাংলায় দেবদাসীও ছিল। রামচরিত কাব্যে এদের দেব-বারবনিতা এবং পবনদূতে এদের বাররামা বলা হয়েছে। “প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬৬।” এই সমস্ত বর্ণনায় তৎকালীন সমাজের উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের নৈতিক আদর্শ, বাসনা ও ব্যসনের সামান্য পরিচয় পাওয়া যায়। অথচ সে সমরে হিন্দু নেতৃবৃন্দ বলগাহীন কাম বাসনার বিরুদ্ধে নিজেরা বক্তব্য ও লেখনী চালাতেন, যদিও তারাই ছিল সমাজের এই অপকর্মের মূল হোতা। “প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬৬-৪৬৭।”
সে সময়ে হিন্দু সমাজে মেয়েদের চরিত্রহীনতার অনেক নজীর দেখা যায়। “কুকুবীপাদের একটি গীতে বর্ণিত রয়েছে,-
‘দিবসেই বহুড়ি কাগ ডরে ভাতা’।
অতি ভইলে কামরু জাঅ ॥
অর্থাৎ বৌটির এতই ভয় যে, দিনের বেলা কাজের ভয়েই চিৎকার করে উঠে, অথচ রাত হলেই কোথায়যে চলে যায়। দ্র. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬৯।” হিন্দুদের মধ্যে যৌতুক প্রথা তখনও প্রচলিত ছিল। এমনকি শ্রেণী কৌলিন্যের এত কঠিন যুগে যৌতুকের লোভে অনেকেই নিম্ন জাতের কন্যা বিয়ে করতে আপত্তি করতো না। এই সমস্ত বর্ণনা তৎকালীন কবিতার মূল বিষয় ছিল। একটি সমাজের সাংস্কৃতিক অবকাঠামো কতটা নোংরামীতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলে এই সমস্ত কাব্য জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। “এ আমলের চর্যাপদের কয়েকটি লাইন এরকম,
নর অ নারী মাঝে উভিল চীরা’।
অর্থাৎ-নর ও নারী মাঝে উর্ধ্ব করলাম লিঙ্গ।” দ্র. Dr Muhammed Shahidullah, Budhist Mystic Songs, Dacca; 1966, p. 12.”
প্রাচীন বাংলায় বৈধব্যজীবন নারী জীবনের চরম অভিশাপ বলে বিবেচিত হতো। বিধবা হিন্দু মহিলাগণকে সিঁদুর, প্রসাধন অলঙ্কার সহ সমস্ত সুখ সম্ভোগ ও মাছ, মাংস প্রভৃতি খাওয়া হতে বিরত থাকতে হতো। ব্রাহ্মণরা তাদের সহমরণে যাবার জন্য উৎসাহিত করতো। “নীহাররঞ্জন রায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৪” উঁচু সমাজে নারীদের সতীত্বের গুরুত্ব কিছুটা থাকলেও পুরুষদের অনেকেরই চরিত্র ঠিক ছিল না। “অতুল সুর, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৫৫-১৫৬”। সে সময়ের কবিদের লেখনীতেও চরিত্রহীনতার নজীর দেখা যায়। জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যের মধ্যে কবি যা লিখেছেন তার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় : “ওগো প্রিয়ে, তোমার কৃষ্ণকুঞ্জের উপরে যে মনিহার দুলছে তার দীপ্তিতে তোমার বুক আলোকিত হয়ে উঠুক। তোমার যখন-জখনের মেঘলা রতিরঙ্গে মুখরিত হয়ে মল্মাত্থের জলবার্তা ঘোষণা করুক। স্থল কমল গুঞ্জন আমার হৃদয়রঞ্জন ওগো প্রিয়ে, তুমি আদেশ কর রতিরঙ্গে সুশোভিত তোমার ঐ রক্ত চরণখানি আমি অলক্তরাগে রঞ্জিত করি। মদনের দহন জ্বালায় আমার সর্বাঙ্গ জ্বলে যাচ্ছে। অতএব হে প্রিয়ে-স্মর গরল খণ্ডনং মম শিরসি মণ্ডনম”।
প্রাক-মুসলিম বিজয়ে বাংলায় জনজীবনে অপসংস্কৃতির ছোবলে মূলত ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল নিম্নে বর্ণের অন্ত্যজ শ্রেণীর লোকেরা। আর গোটা সমাজে অশ্লীলতা ও যৌনতার ছড়াছড়ি ঘটিয়েছিল উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ হিন্দু সমাজ। উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণ হিন্দুদের নিম্নবর্ণের সুন্দরি মেয়েকে বিয়ে করতে কোন বাধা না থাকলেও নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা কখনই উচ্চবর্ণে বিয়ে করতে পারতো না। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা সৌন্দর্য্যে ও যৌতুকের লোভে অনেক সময় নিম্নবর্ণে বিয়ে করলেও সামাজিক মর্যাদা তারা কখনই পেতো না।
অষ্টম শতকের বাংলায় হিন্দু ধর্মের নামে যৌন অনাচারের সংস্কৃতির সয়লাব দেখা যা। কলহন নামক লেখকের ‘রজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থে পুন্ড্রবর্ধনের কোহনা মন্দিরের কমলা নাম্নী প্রধান দেবদাসীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে। এ ধরনের অনেক দেবদাসী গোটা বাংলায় তাদের রূপসৌন্দর্য্য, ছলা কলা ও যৌনতার বিভিন্ন কলাকৌশল প্রদর্শন করে উচ্চতর লোকদের কামনা ও বাসনা পুরণের একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল। সে যুগের বিখ্যাত কবি ধোয়ী, সন্ধ্যাকর, নন্দী, ভবদেব, ভট্ট, বিবিধ শব্দালংকারে তাদের সৌন্দর্য্য, বিলাস,লাস্য ও আম কলা ভিজ্ঞতার প্রশস্তি রচনা করেছেন। ভবদেব ভট্ট এই বারবনিতাদের রূপ-যৌবন বর্ণায় উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছেন, বিষ্ণু মন্দিরে উৎসর্গীকৃত শত দেবদাসীযেন কামাতুর জনের কারাগৃহ, যেন সংগীত লাস্য ও সৌন্দর্য্যরে সভামন্দির এবং এদের দৃষ্টি মাত্রে ভস্মীভূত কাম পুনরুজ্জীবিত হয়। শারদীয় দুর্গাপূজার সময় গ্রামে-নগরে নারী-পুরুষ সামান্য গাছের পাতার পোশাক পরিধান করে কোনো রকমে লজ্জা নিবারণের ছলনায় সারা গায়ে কাদা মেখে নানা রকম যৌনকিয়াগত অঙ্গভঙ্গি সহকারে এবং কুৎসিত ভাষায় অশ্লীল যৌন বিষয়ক গান গেয়ে উন্মত্তের মত নৃত্য করতো। “আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫-৪৬” হোলাকা’ নামে এক ধরনের উৎসব চালু ছিল। বর্তমানে এটি হোলি উৎসব নামে চালু আছে। স্ত্রী-পুরুষ সকলেই এতে যোগদান করতো। ‘দ্যুত প্রাতপদ’ নামে একটি বিশেষ উৎসব কার্তিক মাসের শুল্কা প্রতিপদে অনুষ্ঠিত হতো বলে ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার তাঁর ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। “ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রাচীন যুগ, পৃ. ২০৩”
উৎসবের দিন সকালে বাজী রেখে পাশা খেলা হতো। এর ফলাফল পরবর্তী বছরগুলোর শুভাশুভ নির্দেশ করে বলে তাদের বিশ্বাস ছিল। অতঃপর বসন-ভূষণ পরিধান ও সুগন্ধি দ্রব্য গায়ে মেখে সবাই বন্ধু-বান্ধব প্রণয়ী-প্রণয়িনীসহ যোগদান করে ভোজন শেষে আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠতো। রাত্রে শয়ন কক্ষ ও বিছানা সুন্দরভাবে সজ্জিত করে পুরুষ-মহিলারা একত্রে রাত্রি যাপন করতো। সে সমস্ত অনুষ্ঠানের পূর্বে উল্লেখিত অশ্লীল গীত কাব্য গাওয়া হতো। এই অপসংস্কৃতির গড্ডালিকা বাংলার গোটা সমাজদেহকে ধ্বংসের দিকে এগিয়েনিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে সামাজিক গোঁড়ামী ও অধিকার বঞ্চিত মানুষের নিদারুণ হাহাকার, অন্যদিকে ঐশ্বর্য বিলাস ও কামবাসনার উচ্ছ্বাসময় আতিশয্য। একদিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেহগত বিলাস, চারিত্রিক লাম্পট্য, অমানুসিক গৃণা ও অবহেলা এবং অন্যদিকে সাহিত্য-কাব্য কবিতা, সংস্কৃতির মধ্যেও যৌন কাম-বাসনার মদিরতা বাংলার সমাজকে অন্তঃসার শূন্য করে দিয়েছিল। চারদিকে নিচ্ছিদ্র সুগভীর অন্ধকার। অধিকার বঞ্চিত মানবতা কোথাও একটু আশার ক্ষীণ আভাও দেখছিল না। মোটকথা বাংলার সাংস্কৃতিক অবস্থা এতটাই অধঃপতনে নেমে গিয়েছিল যে তা থেকে উত্তরণের কোন পথ তৎকালীন বঞ্চিত নিপীড়িতদের জানা ছিল না।
মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির অবস্থার এই অধঃপতনের পেছনে তৎকালীন মানুষের সমাজ, জাত-বর্ণ এবং অর্থনৈতিক শ্রেণী উভয় দিক হতে স্তরে স্তরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্তি এবং পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব। দ্বিতীয়ত, তৎকালীন জনজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রে, ধর্মে, শিল্প-সাহিত্যে দৈনন্দিন জীবনে যৌন অনাচার নির্লজ্জ কামপরায়ণতা, মেরুদ-হীন ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা এবং রুচির অভাব। “নীহাররঞ্জন রায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২১-৭২২” ধর্মের নামে অধর্ম, সামাজিকতার বদলে অসামাজিকতা, সংস্কৃতির স্থানে অপসংস্কৃতি এই সময়ের বাংলাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙ্গালীর ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন, “একটা বৃহৎ গভীর ব্যাপক সামাজিক বিপ্লবের ভূমি পড়িয়াই ছিল, কিন্তু কেহ তার সুযোগ গ্রহণ করে নাই্ মুসলমানেরা না আসিলে কিভাবে কী উপায়ে কী হইতে বলিবার উপায় নাই। “প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২২”
যে কোন সমাজের জন্য সে সমাজের মানুষের নৈতিক শক্তি সমাজ জীবনের মেরুদণ্ড। আর যে সমাজ থেকে এই দিকটি দুর্বল হয়েছে সে সমাজও ধীরে ধীরে পতনের দিকেই এগিয়ে গেছে। তৎকালীন বাঙালী সমাজে নৈতিক বল ও চরিত্র বলের অভাব সুস্পষ্ট। সে বংশীয় রাজাগণ এবং এমনকি রাজা লক্ষণ সেনও এই দুর্বলতার গন্ডি থেকে বের হতে পারেননি। ফলে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ সমাজ পরিবর্তনে স্বপ্ন দেখতো। তৎকালীন রাজকবি হলায়ূধ মিশ্রের কাব্যেও হিন্দুদের নিন্দা ও মুসলমানদের গুণকীর্তনের বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায়। “সুশীলা মন্ডল, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৩”। বাংলার সামাজিক অবস্থা দ্রুত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। সমাজে শ্রেণীবৈষম্য, ব্রাহ্মণদের নির্যাতন, উশৃংঙ্খল যৌনতা ইত্যাদি সমাজকে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। একটু ক্ষীণ আশার আলো বুকে নিয়ে সাধারণ মানুষ এ থেকে মুক্ত হবার পথ খুঁজছিল।
বাংলায় ইসলাম : অষ্টম ও নবম শতক থেকে বাংলা ইসলামের সংস্পর্শে আসতে থাকে। মুসলমান মিশনারী জাতি। মহানবী (সা) ইসলামের সুমহান বাণীকে পৃথিবীর সর্বত্র পৌঁছে দেয়ার আহবান জানিয়েছেন। রাসুল (সা) বলেছেন, ‘আমার নিকট হতে একটি বাক্য শুনে থাকলে তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেবে।’ উপস্থিত ব্যক্তি আমার নিকট থেকে যা শুনবেতা অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট অবশ্যই প্রচার করবে। “মিশকাত আল মাসাবীহ, কিতাব আল ইলম, নুর সুজস্সত লাইব্রেরী, করাচী, পৃ. ৩২, ৩৫” মহানবীর (সা) এই নির্দেশে সহাবাগণ থেকে শুরু করে পরবর্তী অনুসারীগণ যুগে যুগে তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের সক্রিয় চেষ্টা করেছেন এবং তার বাস্তব উদাহণ আমাদের জন্য রেখে গেছেন। “এ. কে. এম. ইয়াকুব আলী, রাজশাহীতে ইসলাম, তাম্রলিপি, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৩৯”। ভারতের সিন্ধু মুসলমান নিয়ন্ত্রণাধীন হওয়ার পর থেকে এতদঞ্চলে তাদের আগমন বৃদ্ধি পায়। এ সময়েই বাংলা ইসলামের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসতে শুরু করে। বাংলায় ইসলাম প্রচারে উলামা-মাশায়েখ ও সুফি-সাধকগণ ব্যাপক অবদান রেখেছেন। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতক পর্যন্ত ইসলাম প্রচারক উলামা-মাশায়েখবৃন্দ বাংলায় ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের অনেকেই ইসলাম প্রচারের স্বার্থেএ দেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং এ দেশবাসীর ভাষা ও সংস্কৃতি আয়ত্ব করে তাদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে ইসলামের মহান বাণীকে তাদের মাঝে ছড়িয়ে দেন। ধৈর্য, ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফলে বাংলার জনগণের ব্যাপক অংশ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করতে থাকে।এ সমস্ত উলামা-মাশায়েখ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান হতে বাংলায় আগমন করেন। এদের অধিকাংশই আরব এবং ইরানীয় বংশোদ্ভুত। “প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১”। এদের কেউ কেউ ব্যবসার উদ্দেশ্যে এবং কেউ কেউ শুধুমাত্র ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছেন। আল-কুরআনের নির্দেশনা এবং মহানবীর (সা) বাণীকে উপলক্ষ করে উলামা-মাশায়েখ ধর্মীয় কর্তব্যবোধের তাগিদে শহর-বন্দরসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলামের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকতেন। তাঁদের ধর্মীয় অনুরাগ, ধর্ম প্রচারের আগ্রহ, আদর্শ চরিত্র ও জনকল্যাণমূলক কার্যাবলির দ্বারা সাধারণ মানুষ গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে তাদের ধর্ম ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ