ঢাকা, সোমবার 31 December 2018, ১৭ পৌষ ১৪২৫, ২৩ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কেন্দ্র দখলে নিয়ে নৌকার পক্ষে গণহারে সিল মারার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর মূল রাস্তায় সেনাবাহিনী এবং বিজিবির ব্যাপক টহল দেখা গেলেও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের বাধার মুখে ধানের শীষের সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান করতে পারেন নি। কেন্দ্র দখলে নিয়ে নৌকার পক্ষে গণহারে সিল মেরেছে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ কর্মীরা। এমনকি তাদের তৎপরতার কারণে সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রের ধারেকাছেও যেতে পারেন নি। গতকাল রোববার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে এমন চিত্র দেখা গেছে। ধানের শীষের সমর্থকরা প্রার্থীর পক্ষে তৎপরতা চালাতে গিয়ে ব্যাপক বাধার মুখে পড়ে এবং তাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের ওপর হামলা চালালে অনেকেই রক্তাক্ত জখম হন।
গতকাল রোববার সকাল থেকে সারাদিন আওয়ামী লীগের প্রার্থী কামাল মজুমদারের সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করে রেখে নিজেদের খেয়ালখুশি মত সিল মারে নৌকা প্রতীকের পক্ষে। সাধারণ ভোটারদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি ভোটকেন্দ্রে। তাদের গেইটের মুখে আটকে রেখে আটকে রেখে সিল মারে নৌকার সমর্থকরা। সেইসাথে ধানের শীষের সমর্থকরা ভোট দিতে গেলে তাদের ওপর পুলিশ চড়াও হয়।
এর আগে শনিবার রাতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কামাল আহমেদ মজুমদারের কর্মীরা লাইট অফ করে ও কেন্দ্রের পাশে থাকা বাড়িগুলোর সিসি ক্যামেরা জোরপূর্বক খুলে নিয়ে সন্ধ্যা ৭ টা থেকে কেন্দ্রগুলো দখলে নিয়ে নৌকায় সিল মারে। এছাড়া কাফরুল এর ১৩ সেকশন আল জাহরা কেন্দ্র, আদর্শ স্কুল, মিরপুর-১০ এর পূর্ব দিকে ১৩নং হাজী আলী হোসেন স্কুল, পশ্চিম শেওড়াপাড়া ইস্ট ওয়েস্ট স্কুল, ইউনানী আইয়ুবেদী মেডিকেল কলেজ, আবুল হোসেন স্কুল, মনিপুর বালক স্কুল ও মনিপুর বালিকা স্কুল ভবনের মোট ৫০ টি কেন্দ্র দখল করে ভোট কেটে নেয় তারা।
গতকাল মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় মুসলীম বিরিয়ানি হাউসের উল্টোপাশে বসে পানের দোকান করছিলেন আমেনা খাতুন। তার আফসোস সারাদিন চেষ্টা করেও ভোট দিতে পারেননি তিনি। গতকাল বিকাল তিনটার দিকে কথা হয় আমেনা বেগমের সাথে। পঞ্চাশোর্ধ বয়সী আমেনা বেগম জানালেন কেন্দ্রের বাইরে লোকজন দাড়িয়ে আছে। কিন্তু ভোট দিতে পারেনি। ভেতরে অন্যরা ভোট দিয়ে দিছে।
হালিম ফাউন্ডেশন স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, ধানের শীষের কোনো এজেন্ট নেই। এই ঘটনা স্বীকার করে প্রিজাইডিং অফিসার কামাল উদ্দীন বলেন এই কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা দুই হাজার। দুপুরে সাড়ে এগারটার মধ্যেই চারশ’ ভোট কাস্ট হয়ে গেছে। তবে ভোট বাক্সে বেশি দেখা গেছে। এই ভোট কেন্দ্রের ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থাকলেও ভোট দিতে পারছেন না তারা। আওয়ামী লীগের লোকজনের ইচ্ছে মত ভেতরে লোক ঢুকানো হচ্ছে। তারাই ভোট দিয়ে দিচ্ছে।
ইব্রাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের এক ভোটার অভিযোগ করে বলেন, নাস্তার ব্রেকের কারণে বেলা ১১টার সময় তিনি তার এক বন্ধুসহ ভোট দিতে যান কাফরুল থানা সংলগ্ন ইব্রাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। ওই সময় তিনি স্কুলের মূল ফটক আটকানো দেখতে পান। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা বলেন, আপনারা পরে আসেন নাস্তার ব্রেক চলছে। ইতোমধ্যে দুই শতাধিক ভোটার সেখানে ভিড় করে। আধা ঘন্টা পর কেন্দ্রের ভেতর থেকে আওয়ামী লীগের লোকজন বের হয়ে আসে। তারা ভিড়ের মধ্যে থাকা পরিচিত লোকজনকে বাসায় ফিরে যেতে বলে। এ সময় কয়েকজন ভোটার প্রতিবাদ করলে তাদের ধাওয়া দেয় আওয়ামী লীগের লোকজন এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় তারা আর বিকট শব্দে ভয়ে সাধারণ ভোটাররা তখন দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করে। কিছু সময় পর বিজিবির সদস্যরা এসে ওই ভোটকেন্দ্রের সামনে অবস্থান নেয়। তখন ভোটার শূন্য হয়ে যায় ওই কেন্দ্র। এই কেন্দ্রের ছবি তুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েন দৈনিক সংগ্রামের ফটোসাংবাদিক নয়ন। তার ক্যামেরা থেকে ছবি মুছে দেয় আওয়ামী লীগের লোকজন।
ভোটাররা জানান, পুলিশের কাছে ভোটকেন্দ্রের দরজা বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে তারা জানান ভেতরে তাদের প্রবেশের অনুমতি নেই। ভেতরে কি হচ্ছে জানতে না পারলে তারা ভোটারদের জানাবেন কি করে! ঢাকার তিনটি নির্বাচনী এলাকার হারম্যান মেইনর কলেজ, ইউনানি আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ, রোটারী স্কুলে এন্ড কলেজ, পীরেরবাগ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, নলেজ হেভেন স্কুল, নিউ মডেল ইন্টার ন্যাশনাল স্কুল, মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ শাখা-২, ইব্রাহিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রসহ প্রায় অর্ধশত কেন্দ্র ঘুরে কোনো কেন্দ্রে ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট পাওয়া যায়নি।
একাধিক ধানের শীষের সমর্থক জানান পোলিং এজেন্ট হিসেবে নির্বাচনে কাজ করতে সকালে কেন্দ্রেগেলে আমাদের সমর্থকদের মারধোর করে পুলিশ গ্রেফতার করে। পুলিশ ভোটারদের কেন্দ্রের গেইটেই আটকে রেখে সময়ক্ষেপণ করে। একারণে সকাল ১১ পর্যন্ত কোনো কোনো কেন্দ্রের বুথে ৪০ কি ৫০টি ভোট মাত্র কাস্ট হয়।   
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকা-১৫ আসনে পুলিশের সহায়তায় সরকারি দলের কর্মীদের সীমাহীন বাধার মুখোমুখী হয়েছেন ধানের শীষের প্রতীকের পোলিং এজেন্টসহ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্তরা। কোথাও কোথাও তাদের নির্দয়ভাবে পিটিয়ে গুরুতর যখম করা হয়। আলী হোসেন কেন্দ্রের প্রধান এজেন্ট জাহিদ হোসেনকে রক্তাক্ত যখম করে।
এতে বলা হয়, ঢাকা-১৫ আসনে প্রায় সকল কেন্দ্রেই ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতেই দেয়নি পুলিশ ও নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা। অর্ধশতাধিক ধানের শীষ প্রতীকের  এজেন্টকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্তৃক অপহরণ ও পুলিশ গ্রেফতার করেছে। মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ ব্রাঞ্চ-৩ কেন্দ্রে, ইব্রাহিমপুর সালাউদ্দিন শিক্ষালয়ে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের যুবলীগ নেতা আলমগীরের কার্যালয়ে আটকে রাখে। তাছাড়া মিরপুর আদর্শ স্কৃুল, রোটারী স্কুল এন্ড কলেজ, মমতাজ উদ্দিন মেমোরিয়াল কিন্ডার গার্ডেন, হলি চাইল্ড কিন্ডার গার্ডেন, হাজী আলী ইউসুফ স্কুলে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। এ ছাড়া শেরেবাংলা নগরের হালিম ফাউন্ডেশনের তিনটি কেন্দ্র আওয়ামী লীগ সভাপতি বেলাল হোসেন ধানের শীষের এজেন্টদের ঢুকতে দেয়নি। বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্রে ঢাকা মেট্রো-১২-২১৩৩ গাড়ি ব্যবহারকারী ম্যাজিষ্ট্রেট, ১১-০০০৫ গাড়ি সম্পর্কে বিজিবিকে জানানো হলেও তার কোন প্রকার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং ধানের শীষের লোকজনদেরকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেছেন।
এছাড়া কাজী পাড়া সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে  ধানের শীষের পুলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তারা তাদের হাত-পা ভেঙে দেয়ার হুমকী দেয়। মনিপুর ব্রাঞ্চ ৩ ও হাজী ইউসুফ স্কুলে ধানের শীষ এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। হারামাইন মাইনর কেন্দ্রে পুলিশ এজেন্টদের মেরে তাড়িয়ে দেয়। তারা হলেন রুমেল, বাচ্চু, জাহিদ, আয়েশা, সুমী, রওজাতুন রুম্মান ও জান্নাতি বেগম। আলী হোসেন কেন্দ্রে ধানের শীষের প্রধান এজেন্ট জাহিদ হোসেনকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আহত ও রক্তাক্ত করা হয়। আদর্শ স্কুল কেন্দ্রেও একজনকে মারধর করা হয়।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ইব্রাহীমপুর সালাহউদ্দীন শিক্ষা কেন্দ্রে ধানের শীষ এজেন্টদের ধরে নিয়ে যুবলীগ নেতা আলমগীরের অফিসে আটকে রাখে। নদার্ন স্কুলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা এজেন্টদের ঢুকতে দেয়নি। শেরেবাংলা নগরে ৩টি কেন্দ্রে ধানের শীষের কোনো এজেন্টকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এসব কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ নেতা বেলাল হোসেনে নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা তান্ডব চালায়।
১০ নং সেনপাড়া পশ্চিম এলাকায় সরোজ ইন্টারন্যাশনাল ও ওয়াই এম সি ভবন থেকে এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। পীরেরবাগ এলাকায় নিউ মডেল ইন্টারন্যাশনাল থেকে পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়। মনিপুর ব্রাঞ্চ-৩ এ গিয়াস উদ্দীন তালুকদারকে পিটিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। ফুলকুঁড়ি কিন্ডার গার্টেন কেন্দ্র থেকে পুলিশ একজনকে আটক করে।
মিরপুর ১৪ নং ওয়ার্ড অংশে মমতাজ উদ্দীন মেমোরিয়াল স্কুল, স্কলার কিন্ডার গার্টেন, কাজীপাড়া সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসা, মনিপুর ব্রাঞ্চ-৩ এ সকল ভবনে পুলিং এজেন্ট ঢুকলে সবাইকে বের করে দেয়। এছাড়া মিরপুর-১০ এলাকার ১০ টি কেন্দ্রের ৪৫ টি বুথের সকল বুথ থেকেই ধানের শীষের পোলিং এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া হয়। সেখান থেকে দু’জনকে সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে গেছে। পীরেরবাগ আলীমুদ্দীনের স্কুলের ৪ নং বুথকে থেকে এজেন্টদের বের করে দিয়ে তাদেকে আটকে রাখা হয়। ইব্রাহিমপুুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাউকেই ঢুকতে দেয়া হয়নি। হাজী আশরাফ আলী কেন্দ্রে শামসুল হুদা নামের একজনকে পিটিয়ে আটকে রাখা হয়। চেরিগ্রাম স্কুলের এজেন্ট ইমরানকে কমিশনার মতি মোল্লার অফিসে আটকে রাখে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আবু হানিফ, সামিউল হুদা, কামাল উদ্দীন, পিতা-মকবুল আহমদ,  শিপন, পিতা-আব্দুল বারেক, আব্দুল কুদ্দুস, রাসেল ও ইমরানকে তুলে নিয়ে যায়। এদের মধ্যে আব্দুল কুদ্দুসকে মিরপুর থানা পুলিশ আটক দেখালেও অন্যরা এখনও নিখোঁজ।
বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশের সহায়তায় সরকারি দলের ঢাকা-১৫ আসনের প্রায় সকল কেন্দ্রের পুরোপুরি দখলে নিয়ে নৌকার পক্ষে গণহারে সিল মারে। পুলিশ বিজয় ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনে থেকে হাসান আল ফেরদাউস ও বান্না নামের দু’জনকে আটক করে। ইব্রাহীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষের সমর্থক তালিব ও আলমগীর কে ব্যাপক মারধর করে সেখানে বোমা ফাটিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা জাল ভোট দেয়। কাফরুলে কাজ করতে আশা মশিউর রহমান ও মীর হোসেন এখনো নিখোঁজ।
এলাকায় ধানের শীষের পোলিং এজেন্টদের খুঁজে পেতে মিছিল, সাধারণ মানুষের ধাওয়া ও হয়রানি করা হয়। এছাড়াও বোমাবাজি ও ফাঁকা গুলি করে সাধারণ মানুষকে আতংকিত করা হয়। মিরপুর ও কাফরুল বিরোধী দল নিয়ে বিভিন্ন উত্তেজনাকর স্লোগানও দিয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। মূলত গোটা নির্বাচনী এলাকায় শত শত মানুষকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে। কিন্তু  তাদের কোন পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ ও সরকার দলীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হয়েছেন জাহিদ হোসেন, রুমেল, বাচ্চু, জাহিদ, গিয়াস উদ্দীন তালুকদার, মুস্তাফিজ, হাসানুজ্জামান, শামিউল হুদা, আব্দুল কুদ্দুস, রাসেল ও ইমরানসহ অসংখ্য মানুষ।
এদের মধ্যে আলেয়া, সুমী, রওজাতুন রুম্মান ও জান্নাতি বেগম নামীয়া মহিলারাও রয়েছেন। এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক মানুষকে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়ে গেছে। এদের মধ্যে আবু হানিফ, শামিউল হুদা, আব্দুল কুদ্দুস, রাসেল, ইমরান, শামসুল হুদ, শাহজাহান ও সোহাগের পরিচয় জানা গেছে। এরা প্রত্যেকেই সন্ত্রাসী হামলা গুরতরভাবে আহতও হয়েছেন। অন্যদের এখন পর্যন্ত পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ