ঢাকা, মঙ্গলবার 01 January 2019, ১৮ পৌষ ১৪২৫, ২৪ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাস

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ চার ॥
“এ. কে. এম. নাজির আহমদ, বাংলাদেশে ইসলামের আগমন, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা, ১৯৯৯, পৃ. ২৪”। ইসলাম ধর্মের বিধানাবলি পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণের মাধ্যমে উলামা-মাশায়েখ ও সুফি সাধকগণের নৈতিক চরিত্রে সৌন্দর্য্য ও মাহাত্ম্যের যে সমাহিত চিত্র ফুটে উঠেছিল তা বাংলার সাধারণ মানুষকে একদিকে যেমন আকৃষ্ট করেছিল, তেমনিভাবে বাংলার আধ্যাত্মিক ও নৈতিক বিজয়ে এবং বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ও সুসংহতকরণে এ বিষয়গুলো যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। উলামা-মাশায়েখ সে সময়ে সমাজের নিগৃহীত হতদরিদ্র বঞ্চিতদের আশ্রয়স্থল ও আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। সমাজে তাদের বিপুল জনপ্রিয়তায় বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম নৃপতি, বিজেতা ও শাসনকর্তাবৃন্দ রাজ্য বিজয় অথবা ইসলাম ধর্মের গৌরব মহিমা প্রতিষ্ঠায় তাদের সাহায্য কামনা করতেন। তাঁরা কখনো সেনাবাহিনীর সঙ্গে অস্ত্র ধরেছেন, আবার কখনো তারা নিজেরাই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। যুদ্ধ বিজয়ী এই উলামা-মাশায়েখের কেউ কেউ বিজিত ভূখন্ডের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে সমাজে ইসলাম প্রচারে উদ্যোগী হয়েছেন। বাংলায় ইসলাম প্রচার করতে এসে এ পর্যন্ত উলামা-মাশায়েখকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি রাজনৈতিক বহু সমস্যা ও সংকটের মোকাবিলা করতে হয়েছে। হিন্দু অধ্যুষিত বাংলায় স্বাভাবিকভাবেই এ সমস্ত উলামা-মাশায়েখকে ইসলাম প্রচারে হিন্দু রাজা সমাজপতিদের কোপানলে পড়তে হয়েছে। হিদু রাজা ও সমাজপতিদের অকথ্য নির্যাতনে জর্জরিত হতে হয়েছে তাদের। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তাদের কার্যধারাকে বন্ধ ও ব্যাহত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে উলামা-মাশায়েখকে অনেক সময় বাধ্য হয়েই তাদের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়েছে। এ সংগ্রামে কখনো তারা নৈতিকভাবেবিজয়ী হয়েছেন, কখনো যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শহীদ হয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের জীবন, কর্ম, চরিত্র, চিন্তা, চেতনা চতুষ্পার্শ্বস্থ অমুসলিম তথা হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এরই এক প্রেক্ষাপটে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা জয় করেন। ফলে পরবর্তীতে ইসলাম প্রচারের ধারা রাজকীয় নেতৃত্বে ব্যাপকভাবে অগ্রসর হতে থাকে। “আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৯৯, পৃ. ১৫৮” এইভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র বাংলা ইসলামের আলোয় প্রজ্জ্বলিত হয়ে যায়। বাংলা বিজয়ের পূর্বে বাংলায় ইসলাম প্রচারে উলামা-মাশায়েখ কোন রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা লাভ তো দূরের কথা প্রায় ক্ষেত্রেই তাদেরকে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বরং তাদের ইসলাম প্রচারে পরবর্তীতে বাংলায় মুসরিম রাজশক্তির আগমন ও মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত হয়েছিল বলা যায়।
ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের সময় থেকে এই অহ্চলের মুসলমানদের বসতি ব্যাপকভাবে শুরু হয়। মুসলিম বিজয়ের ফলে বাংলার সমাজ জীবনেও একটা পরিবর্তনের আভাষ পরিলক্ষিত হতে থাকে। এ সময় থেকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তর থেকে ইসলাম ধর্ম প্রচারকবৃন্দ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় আগমন করতে থাকেন। “কোনো কোনো পন্ডিত মনে করেন যে, খ্যাতিমান তুর্কী সেনাপতি বখতিয়ার খলজির লক্ষণাবতী অধিকারের পূর্বে কিছু সংখ্যক আরব বণিক বসতি স্থাপন করেছিলেন। এ অভিমতের প্রামাণ্য দলীল না থাকলেও এখানে আগে থেকেই ইসলাম ধর্ম প্রচারকগণ কখনো ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে কখনো ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাংলায় অনেক আগে থেকেই সম্পর্ক ছিল। দ্র. ড. এম.এ. রহিম, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১-৩২, ৩৯”।  মুসলিম বিজরে ফলে বঞ্চিত নিম্নশ্রেণীর হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা ইসলামের সুমহান ঔদার্য্যে বিমোহিত হয়ে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে মুসলমান হতে থাকে। এইভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলার জনসংখ্যার অধিবাসীদের এক বিরাট অংশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। হিন্দুদের সামাজিক অনাচার উশৃঙ্খলতা, অশ্লীলতা ও যৌনতার বিরুদ্ধে ইসলামের মহান আদর্শ, উদারতা, নৈতিকতা দর্শনে স্থানীয় বাঙালী সমাজ ইসলামকে সাদরে গ্রহণ করতে থাকে। দুই ধর্মের সম্প্রীতি ও সহাবস্থান সহজ চিল না। এ ক্ষেত্রে ইসলামের উদারতায় হিন্দু সমাজের দুর্নীতির চিত্রগুলো সমাজ থেকে কমতে শুরু করলেও হিন্দুরা সমাজে প্রাধান্য বিস্তারের সুযোগ কখনো হাতছাড়া করতে চায়নি।
হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের দিক : মুসলমানগণ বাংলায় বিজয়ীর বেশে আগমন করার পর এদেশকে  তারা মনেপ্রাণে ভালবেসেছিলেন, এ দেশকে স্থায়ী আবাসভূমি হিসেবে গ্রহণ করেন এবং দেশের অমুসলিম  অধিবাসীদের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করতে চেয়েছিলেন। শাসক হিসাবে শাসিতের উপরে কোনো অন্যায় অবিচার তারা করেনি। জনসাধারণও তাদের শাসন মেনে নিয়েছিল। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পর আভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা  করেন। বিজয়ের পরপরই তিনি নিজে ও তাঁর আমীরদের সহযোগিতায় বালায় মানুষের জন্য মসজিদ, মাদরাসা ও উপাসনালয় দ্রুত সুন্দরভাবে নির্মাণ করেন। “মীনহাজ-ই-সিরাজ, তবতাক-ই-নাসিরী, আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া অনুদিত ও সম্পাদিত, দিবা প্রকাশ, ঢাকা,  ২০০৭, পৃ. ২৭” একজন বিজেতা হিসেবে বাংলার অমুসলিমদেও প্রতি তিনি উদার নীতি অবলম্বন করেন। যদুনাথ সরকার তার The History of Bengal গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “....But he was not blood-thirsty, and no delight in massacre or inflictng inflictng misery on his subjeets. The porblems  cinternal administration and the conciliation of his military chiefs were regether solved by the establishment of a sort of feudal government in the history” ÒJadunath Sarkar, The Histpru pf Nemga;.Vp;-II Muslim Period 1200-1757, The University of Dhaka, First Edition Fourth Impession, 2006, p. 9.”
এই কারণে বাংলার অধিবাসীরা বখতিয়ারকে শুধু গ্রহণই করেনি, তাদের অনেকেই তার হাতে ইসলাম ধর্ম  গ্রহণ করে তার সৈন্যদলে যোগ দিয়েছে।  এমনকি সেনাদলের নেতৃত্বও দিয়েছে। আলী মেচ তেমনই একজন। “মীনহাজ-ই-সিরাজ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭” বখতিয়ার খলজির পরবর্তী শাসকগণও দেশ পরিচালনায় তার নীতি অবলম্বন করেছিলেন। মুসলিম শাসকগণ অনুধাবন করেছিলেন যে, দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের কল্যাণের মাধ্যমেই রাষ্ট্র সুচারুভাবে পরিচালনা সম্ভব। এ জন্য ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকলের কল্যাণে তারা এগিয়ে এসেছেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ বিবেচনা না করে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জ্ঞান, যোগ্যতা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।মূলত তাদের এ নীতির বলেই সকল শ্রেণীর নাগরিকের সহযোগিতায় বাংলার সমাজকে ধর্মীয় সহিষ্ণুতাও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে চেয়েছেন। মুসলমান শাসকগণ মুসলমান শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন মকতব, মাদরাসা ইত্যাদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছিলেন, তেমনি হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্যও শিক্ষার দরজা ছিল অবারিত।
হিন্দু বালিকারাও পাঠশালায় পড়াশোনা করতে যেত। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের “বঙ্গসাহিত্য পরিচয়” সূত্রে জানা যায় যে, জনৈক রাজকন্যা ময়নামতি তার পিতার গৃহসংলগ্ন পাঠমালায় গুরুর নিকট শিক্ষা লাভ করতো। এ ধরনের অনেক তথ্য মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে জানা যায়। সারদা মঙ্গল কাব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ড. দীনেশ চন্দ্র লিখেনযে, একটি পাঠশালায় হিনউদ রাজার ছেলেমেয়েরা অন্যদের সঙ্গে শিক্ষালাভ করেছিল। এই পাঠমালায় পাঁচ রাজার কন্যা সন্তান অন্যান্য বালক ছাত্রের সঙ্গে অধ্যয়নরত ছিল। এই বর্ণনা থেকে হিন্দু সমাজের দু’টি বিষয়ের চিত্র ফুটে উঠে। প্রথমত, স্বতঃস্ফূর্ত নারী শিক্ষা প্রচলন, দ্বিতীয়ত, সহশিক্ষার প্রসার। হিন্দু  সমাজের উচ্চ শিক্ষিত মহিলাদের সম্পর্কেও বহু তথ্য বিভিন্ন উপাদানে উল্লেখ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে রামী, মাধবী, চন্দ্রাবতী, খনা, বিদ্যা, রাণী ভবানী প্রমুখ মহিলা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন। বাংলার সুলতানি পর্বে কয়েকটি সংস্কৃত শিক্ষার কেন্দ্র খুবই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কেন্দ্র ছিল নবদ্বীপ। বৃন্দাবন দাস নবদ্বীপের খ্যাতি সম্পর্কে চৈতন্যভাগবতে উল্লেখ করেন যে, নবদ্বীপে বহু টোল ছিল এবং সেখানে ছিলেন হাজার হাজার খ্যাতনামা পন্ডিত, বিদ্বান ব্যক্তি ও অধ্যাপকবৃন্দ।
বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস গ্রন্থে দুর্গাদাস সান্যাল লিখেন যে, ইলিয়াস শাহী শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়ই রাজশাহী জেলায় বিখ্যাত সান্যাল এবং ভাদুড়ি পরিবারের উৎপত্তি হয়। ইলিয়াস শাহ জয়ানন্দ ভাদুড়িকে দীওয়ান, সুবুদ্ধি খান (খান উপাধি মুসলমান শাসক থেকে প্রাপ্ত), শিখাই সান্যালকে সেনাপতি পদে দায়িত্ব দেন। অভূতপূর্ব কর্তব্য পরায়ণতার জন্য শিখাই সান্যালকে সুলতান চলনবিল এলাকার বিশাল স্থানজায়গীর মঞ্জুর করেন। কালক্রমে এই জায়গার নাম হয় সান্যালগড়। সোনারগাঁওয়ের সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহের রাজত্ব উত্তরকালে ভাতুড়িয়ার কংস নামক এক ব্রাহ্মণ উজির পদ লাভ করেন। তবে এই কংস রাজা পরবর্তীতে মুসলমান উচ্ছেদের অপচেষ্টায়লিপ্ত ছিল। আলাউদ্দীন হোসেন শাহ একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান হলেও হিন্দুদের প্রতি তিনি উদার ছিলেন। তিনি অনেক হিন্দুকে উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত করেন। রূপ ও সনাতন নামক দুই ভাই তার মন্ত্রী ছিল। রূপের উপাধি ছিল দবীর খাস বা মুখ্য সচিব এবং শাকের মালিক ছিল সনাতনের উপাধি। সনাতনের বড় ভাই রঘু নন্দন এবং ছোট ভাই বল্লভও সুলতানি দরবারের একজন উচ্চপদে কর্মরত কর্মকর্তা ছিলেন। বল্লভের উপাধি ছিল অনুপম মল্লিক। কেশব বাবু রাজার দেহরক্ষীদের নায়ক ছিলেন। তিনি রাজার নিকট হতে খানও ছত্রী উপাধি পান। এই কারণে তাকে কেশব খান বা কেশব ছত্রী বলা হতো। (এম. এ, রহিম, পৃ. ২৯৩)
সুবুদ্ধি রায় ছিলেন গৌড়ের অধিকারী বা গৌড়ের শাসনকর্তা অথবা গৌড়ের কোতওয়াল। মুকুন্দ দাস সুলতানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। তার পিতা নারায়ণ দাস ছিলেন বারবক শাহের চিকিৎসক।  সুতরাং দেখা যাচ্ছে এই পরিবারটি পুরুষানুক্রমে রাজবৈদ্য ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ