ঢাকা, বুধবার 02 January 2019, ১৯ পৌষ ১৪২৫, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধী কাটারীভোগ চাল

মো: জোবায়ের আলী জুয়েল : ঐতিহাসিক ও প্রাচীনতম জেলাগুলির অন্যতম দিনাজপুর জেলা, প্রাচীনতম দিনাজপুর জেলার রাজাদের ইতিহাস খুবই প্রসিদ্ধ এবং ঘটনাবহুল। পর্যায়ক্রমে অনধিক ১১ জন রাজা শাসন করেছেন এই জেলা। এই বংশের প্রথম রাজা ছিলেন শ্রীমন্ত দত্ত। পরবর্তী সময়ে রাজা হরিশ্চন্দ্র, রাজা সুখদেব রায়, রাজা প্রাণনাথ, রাজা রামনাথ, রাজা বৈদনাথ, রাজা রাধানাথ, রাজা গোবিন্দনাথ, রাজা তারকনাথ, মহারাজা গিরিজানাথ, মহারাজা জগদীশনাথ এছাড়া রাজকুমার জলধীনাথ ছিলেন এই রাজবংশের শেষ উত্তরাধিকারী। তিনিও মহারাজা উপাধি প্রাপ্ত ছিলেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে দিনাজপুর রাজবংশের সর্বশেষ উত্তরাধিকারী মহারাজা জলধীনাথ মৃত্যুবরণ করেন ১৯৪১ সালে। শেষ হয়ে যায় দিনাজপুর রাজবংশের সর্বশেষ ইতিহাস। ধানের দেশ, গানের দেশ দিনাজপুর।
ড. বুকানন হ্যামিল্টন কে উদ্ধৃত করে হান্টার এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। সমগ্র উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে দিনাজপুর ও রংপুরে ১৭০ জাতের রোপা আমন ধানের বর্ণনা পাওয়া যায়-
মালশিরা, কচুডুমা, শাটিয়া, ঢেপা, মোটা গাঞ্জিয়া, তিলা ফুর, উক্নিমধু, বিবি পাকড়ি, জশোয়া, শাল কুমার, বড়োপানি শাইল, বাঘফুল, শাওবাজ, কাটি শাওবাজ, খিরশাপাত, কালিয়া ঝাও, মুগি মালশিরা, লেনডাং, কান্দি বংশি, জাফার, নাওডুম, কলম ঢেপি, ছোট পানি শাইল, শ্যামরসা, প্যারা মালশিরা, বিন্নাফুল, হরিশংকর, সজনী, নাইল জশোয়া, ফুল গাঁজিয়া, চেং মাগুরি, বিতি কান্দিশাও, বাছি, কার্তিক শাইল, কালাপাক্রি, হরিণ পাঁজর, তুলা পাঁজর, কালামানা, মটর শাইল, কাঁচকলস, কই শাইল, মান্দিগিরি, তূরা মালশিরা, রসুলভোগ, ইতি কাঁন্দিশাও, চিনিভোগ, বড় গাঁজিয়া, কাতরা যশোয়া, পুরামাগরি, নারিকেল ঝুঁকি, শ্যামরাজ, বাঙাল দাড়িয়া, শংকর মুখি, গজাল গাড়িয়া, কংসহার, জন করাই, ডালকচরা, মাই, খুসনী মালশিরা, সুন্দরী, ঝাঁকড়, পাক্ড়ি খিরশা, পাকশিরাজ, আশাববরা, ঝুলঝুলি, নুলি, আটিয়াটেপা, বোয়া পাক্ড়ি, বীর মাদলী, আর্শ্বিনা, সমাস ঝালি, গজাল গাড়িয়া, ভোগবাগরা, হরিনখোল, বিটু, গাজিয়া, পর্বতজিরা, কালামাই, ভোগজিরা, নাওজিরা, কাটারিভোগ, মৌভাঁজ, বাকুর, বাওয়াই ভোগ, দুধকলম, বাঁশপাতারি, আমলা, অলিয়া, বারুনি, বই দুলালী, বুড়াবাকুর, চাঁপা, দোল কলম, গুজরি, হলদিয়াবচি, হরিন কাজলিয়া, হনি, হাতীঝুল, ইন্দ্রশাইল, জগন্নাথ ভোগ, খিরশাভোগ, বিলবচি, মধুশাইল, নারিকেল ফুল, পানাতি, ফুল পাকড়ি, শাইলনা, শামলাল, রাধুনি পাগল, শীলকুমার, রাজভোগ, কালা শাইলনা, ধলা শাইলনা, কৃষ্ণচূড়া, বট পাকুড়, কালাপাকড়ি, অঞ্জনা, কানকুয়া, পানি শাইল, এলাই, পাতিশাইল, সেনগাড়িয়া, সিন্দমাই, বড় যশোয়া, ছোট যশোয়া, বেত, ঢোল, নেড়াবাচি, খোদনী, হাতিদন্ত, সূবর্ণখর্গ, হাতি, চন্দনচূড়া, পায়ামুশরী, উদয়গৌরী, মালশিরা, খৈচুর, বাজনাও, খড়গমূতি, পাটেশ্বরী, পরীজল, চরাইচটি, কলডমা, দেবকন্যা, দুধসর, সূর্বন যশোয়া, পাক্ড়ি মালশিরা, বামন ভোগ, শাপাহার, সূর্য উজ্জ্বল।
এক সময় বঙ্গ রমনীরাই লাউয়ের বস, বাশেঁর চোঙ, ডুলি ইত্যাদিতে বীজ ধান প্রস্তুত করতো। ধান চাষের আদি রূপকার ছিল বাংলার নারী। বন্যার বাড়ন্ত পানিতে টিকে থাকে এবং দিনে দিনে বেড়ে যেতে সক্ষম কতিপয় ধানের নাম হলো- মাগুড়ি, বেতো, চাঁপাকলি, সিঙ্গারিয়া, আমলা কাচাঁ, কাঁন্দিশাও, খলিশানীবেত, কালীমন, ফুলকাঁচা, মুড়িয়া, বাঙাল দাঁড়িয়ে আবালী, কানশাহারা, কংশ, চাঁদা, দংশ, খোঁড়া, আগুর পাঠ, চেঙ্গা, আশ্বিনা, পাথর নুটি এবং ঠাকুরবীন।
দিনাজপুরের স্বর্ণ প্রসূত লাল মাটি আর প্রকৃতির অকৃপণ দান এলাকাবাসীকে যেন স্নেহভরে তুলে দিয়েছিল এক বিশেষ সম্পদ “কাটারীভোগ” ধান। দিনাজপুরের মাটি ও মানুষ ধন্য সে সম্পদ পেয়ে। গর্বিত ও সম্মানিত দেশ বিদেশের কাছে। কাটারীভোগ ধান ছাড়াও এ জেলায় আরো নানা জাতের সুগন্ধি ধান জন্মে। তার মধ্যে বিধান-৩৪, জিরা কাটারী (চিনিগুঁড়া), ফিলিপিন কাটারী, চল্লিশা জিরা, বাদশা ভোগ, কালোজিরা, জটা কাটারী, চিনি কাটারী, বেগুন বিচি ও ব্রিধান-৫০ উল্লেখযোগ্য।
এ জেলার ঐতিহ্যবাহী “ কাটারীভোগ ধান” বাংলাদেশের যে কোন ধানের চেয়ে গুণগত মানের দিক থেকে উন্নত।
কখন কিভাবে দিনাজপুর জেলার কাটারীভোগ ধানের উৎপাদন শুরু হয়েছিল তা” সঠিকভাবে জানা যায়নি, তবে বিভিন্নভাবে সংগৃহীত  তথ্যে দেখা যায় যে, কাটারীভোগ দিনাজপুরের আদি ও অকৃত্রিম ধান, ইতিহাস থেকে জানা যায় আর্যদের এ দেশে আগমনের পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলে এ ধানের উৎপাদন হতো এবং তখন থেকেই মাটি ও মাটির উর্বরতা বিশেষে সুগন্ধি যুক্ত কাটারীভোগ ধানের উৎপাদন শুরু হয়েছিল। কাটারীভোগকে ঘিরে রয়েছে অনেক কিংবদন্তী, লোককথা, লোকগাঁথা ও কাহিনী গল্প। কাটারীভোগ ছুরি যেমন মাথার দিকে চোখাও একটু খানি বাঁকা, কাটারীভোগ ধানও দেখতে ঠিক তেমনি এবং সুগন্ধি। কথিত আছে যে, এই উন্নত ধানের চাল দিয়েই দেবতাকে ভোগ দেওয়া হতো বলেই এর নামকরণ করা হয়েছে “কাটারীভোগ”। দিনাজপুরের প্রতাপশালী রাজা প্রাণনাথের বিরুদ্ধে মোগল স¤্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে দুর্নীতি, দুঃশাসন, দিল্লীর দরবারে রাজস্ব না পাঠানোর হঠকারিতা, মোগল আনুগত্য অস্বীকার ইত্যাদি অভিযোগ উত্থাপিত হলে স¤্রাট রাজা প্রাণনাথকে তার দরবারে তলব করেন। ভীত সন্ত্রস্ত জমিদার প্রাণনাথ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খন্ডানোর উদ্দেশ্যে মোগল দরবারে উপযোগী বিপুল সংখ্যক উপঢৌকন নিয়ে যান। তার মধ্যে ঢাকার মসলিন, রাজশাহীর গরদ, বহু হীরা পান্না, জড়োয়, অলঙ্কার ও বিরাট অংকের স্বর্ণ মুদ্রা এবং দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী সুরভিযুক্ত “ কাটারীভোগ চাল” ও “চিড়া” সঙ্গে নিয়ে দিল্লীর দরবারে গমন করেন। এই সমস্ত উপঢৌকনাদি প্রাণনাথের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলি খন্ডাতে পুরোপুরি সাহায্য করে এবং তিনি সসম্মানে “রাজা” উপাধিতে ভূষিত হন। উপঢৌকন হীরা-পান্না, স্বর্ণমুদ্রা পেয়ে স¤্রাট যত না খুশি হয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলেন “কাটারীভোগ চাল” ও “চিড়া” পেয়ে। বর্তমান যুগেও এ জেলার মানুষ আত্মীয়-স্বজনকে খুশি করতে উপঢৌকন হিসেবে “ কাটারীভোগ চাল” ও “চিড়া” পাঠাতে ভুল করেন না।
 দেশি-বিদেশী বড় বড় মেহমান এবং রাষ্ট্র প্রধান ও কূটনীতিকরা এদেশে এলে কাটারীভোগ চালের পোলাও দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করা হয়। পরিতৃপ্ত হয়ে অতিথিবৃন্দ সুগন্ধি চালের অকুণ্ঠ প্রশংসা করে থাকেন এবং চালের উৎস ও প্রাপ্তিস্থান সম্পর্কে কৌতুহল হয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে থাকেন। সুগন্ধি এবং মসৃণতার জন্য এখনও বিদেশে বিশেষ করে বৃটেন, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে এর চাহিদা অপরিসীম। পোলাও ছাড়াও কাটারীভোগ চাল দিয়ে বিরানী, জর্দা পোলাও, পায়েশ, ফির্নী ও পিঠা সহ নানা প্রকার উপাদেয় খাবার তৈরি করা যায়। বাসমতি বা দাদখানি চালের চেয়ে উন্নত বলে সারা বিশ্বে এর চাহিদা রয়েছে ব্যাপক এবং এককালে এ চালের প্রধান বাজার ছিল কলকাতা।
অতীতে সুরভীযুক্ত কাটারীভোগের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে তৎকালীন রাজা, জমিদারও সামন্ত প্রভুরা এই ধানের উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে তৎপর ছিলেন। তারা লাঙল বলদ ও গোবর সার দিয়ে কৃষকদের সর্ববিষয়ে সহায়তা ও উৎসাহিত করতেন। কাটারীভোগ উৎপাদনের ব্যাপারে গল্প প্রচলিত আছে যে ভাল ফলনের আশায় নাকি প্রথম বর্ষায় বীজ জমিতে ছিটিয়ে দিতো, লক্ষী দেবী সন্তুষ্ট হলে মৌ-মৌ সুগন্ধি ভরা সোনালী সরু ধানে গৃহ ভরে দিতো।
কাটারীভোগ ধান দিনাজপুরের ঐতিহ্য হলেও দিনাজপুরের সবখানেই এই ধানের চাষ হয় না। কাটারীভোগ ধান চাষের উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হচ্ছে- সদর উপজেলার ফাঁসিলাহাট, চিরির বন্দরের কাঁউগা, করিমুল্লাপুর, খানপুর, সদর উপজেলার ছোট বাউল, বড় বাউল, চিরিরবন্দর উপজেলার বাউগাঁও, বিষ্টপুর, তালপুকুর, ভিয়াইল, পশ্চিম বাউল, দুর্গাডাঙ্গা এবং কাহারোল উপজেলার কয়েকটি এলাকায়। কাটারিভোগের জমিকে বার বার চাষ দিতে হয় এবং এই জমিতে মাত্র একবারই ফসল ফলানো সম্ভব। এই ঐতিহ্যবাহী ধানটির আরও বিশেষত্ব হলো এটা গোবর সার ছাড়া রাসায়নিক সারে হয় না। এর ফলন হয় প্রতি বিঘায় উর্ধ্বপক্ষে ৯/১০ মন। সাম্প্রতিক বিশ্বে বেড়ে  যাওয়া মানুষের মুখের অধিক খাবার জোগানোর প্রয়োজনে কাটারীভোগ চাষের ব্যাপারে চাষীরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছে। তদুপরি ১৯৬৮ সালের দিনাজপুরের স্মরণকালের বন্যা এবং ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রকৃত কাটারীভোগ ধানের বীজের দুষ্প্রাপ্যতা দেখা দেয়। স্বাধীনতা পরবর্তী ফিলিপাইন হতে আগত ধান গবেষক মিষ্টার মালপতি এই ধানের উপর গবেষণা করে ঐতিহ্যবাহী কাটারীভোগের সাথে ফিলিপাইনের সরু ধানের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন জাতের ফিলিপাইন কাটারীভোগের উদ্ভাবন করেন। এই ধানের জন্য উঁচু জমির প্রয়োজন হয়। রাসায়নিক সারেও এই ধানের ফলন হয় তবে ঐতিহ্যবাহী কাটারীভোগ ধানের মতো সুরভি থাকে না। যদিও বর্তমানে ফিলিপাইন কাটারীভোগ বিঘা প্রতি ১৭/১৮ মন হচ্ছে তথাপিও এর উৎপাদন ও বেচা কেনা খুবই সীমিত।
সমগ্র দিনাজপুরের কাঁউগা হাট, ফাসিলা গোদাগারী, সাহেব গঞ্জ হাট, রাজরাড়ী, গাবুরা, আমবাড়ী ও পাট বাড়ী হাটে ফসল উঠার সময়ে সামান্য কিছু বেচা-কেনা হয়। দামও অনেক বেশি। সাধারণ ধানের চাইতে দেড়-গুণ দামে এই ধান বিক্রি হয়।দিনাজপুরে ঐতিহ্যবাহী কাটারীভোগ এখন লুপ্তপ্রায় এবং ফিলিপাইন কাটারীও অনেকটা গড়িয়ে গড়িয়ে চলার মতো করে টিকে আছে। এছাড়া কাটারীভোগ ধান উৎপাদনের যে পরিশ্রম এবং যতেœর প্রয়োজন হয় সে অনুপাতে বর্তমানে দামও পাওয়া যায় না। এ ধান থেকে উৎপাদিত হয় উন্নত মানের চিড়া। দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার তেরানি, চিরিরবন্দর উপজেলার বিন্নাকুড়ি, সদর উপজেলার শশরা, ভাটপাড়া এলাকার প্রায় ৭শ পরিবার কাটারীভোগ চাল দিয়ে চিড়া ও মুড়ি তৈরি করে। বর্তমানে দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কাটারীভোগ ধান বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে দিনজপুরের সচেতন নাগরিকবাসী মনে করেন। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে কাটারীভোগ চাল ও চিড়া রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। গুণগত মানের কারণেই কাটারীভোগ চাল বিশ্ব বাজারে স্থান করে নিতে সক্ষম। কোনো কোনো ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাটারীভোগ চাল বিদেশে নিয়ে বিপুল সাড়া পেয়েছেন। ১৯৮০ সালে টি সি বি কাটারীভোগ চাল রপ্তানীর উদ্যোগ নিলেও অজ্ঞাত কারণে সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
কাটারীভোগের ঐতিহ্যকে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অথবা আন্তরিক ইচ্ছায় যারা ধরে রেখেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- দিনাজপুরের স্টেশন রোডের নরেন্দ্র নাথ দাস, রবিন্দ্রনাথ দাস, অসীম কুমার দাস, আশফাকুজ্জামান ও খালেকুজ্জামান। এরা কাটারীভোগ চাল, চিড়া বিক্রির পেশায় দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে জড়িত। ধানের যুগে এই কতিপয় হাতে গোনা ব্যবসায়ীর মন মানসিকতায় এখন ও কিছু কৃষক এই কাটারীভোগের চাষে নিয়োজিত রয়েছেন। সুরভিমুক্ত চাল ও চিড়া জনগণের হাতে তুলে দিয়ে এই ধানের ঐতিহ্য এখনও তাঁরা বজায় রেখে চলেছেন।
কাটারীভোগ ধানের আবাদ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বা উৎসাহ দেয়া হয়েছে এমন কথা কখনোও শোনা যায়নি। ফলে এই কাটারীভোগ ধান তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। ভেজালের যুগে কাটারী  ভোগ চালের ঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির পথে। মাত্র কয়েকজন হাতে গোনা ব্যবসায়ী অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এই ঐতিহ্যবাহী ধানকে এখনও ধরে রেখেছেন। প্রয়োজন এবং বাস্তবতার তাগিদে একদিন হয়তো এরাও অন্য পেশায় নিয়োজিত হবে। ফলে সুগন্ধী কাটারীভোগ চাল হারিয়ে যাবে চিরতরে দিনাজপুরের মাটি থেকে।
১৯৮৭ সালে ঢাকা শেরে বাংলা নগরের বিসিক মেলায় প্যাকেটস্থ কাটারীভোগের চাল, চিড়া লাইন ধরে বিক্রি হয়েছিল। এছাড়া ব্রিটেন, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য দেশগুলোতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং কাটারীভোগ ধানের উৎপাদনকে যদি কৃষি দপ্তরের সহায়তায় প্রসার ঘটানো যায় এবং উৎপাদনের ব্যাপারে কৃষকদের উৎসাহ ও সহায়তা দেয়া হয় তা’হলে এই কাটারীভোগ ধান আন্তর্জাতিক বাজারে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে বলে মনে করে জেলার সচেতন নাগরিকবাসী। বছরে পৃথিবীতে ১৭০ টি আন্তর্জাতিক রপ্তানী মেলা হয়। এই সমস্ত আন্তর্জাতিক রপ্তানী মেলায় “কাটারীভোগ চাল” ও “চিড়া” কে পরিচিত করানো হলে পাকিস্তান বাসমতি চালের মাধ্যমে এবং ভারত দেরাদুন চালের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কাটারীভোগ চাল ও চিড়া রপ্তানীর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার চাইতেও অধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে বলে মনে করেন সচেতন অভিজ্ঞ দিনাজপুরের নাগরিকবাসী।
লেখক: কলামিষ্ট, সাহিত্যিক, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ