ঢাকা, বুধবার 02 January 2019, ১৯ পৌষ ১৪২৫, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

খেজুরের উপকারিতা ও পুষ্টিগুণ

র ম আওরঙ্গজেব : খেজুর অতি পরিচিত গাছ। পাম পরিবারভুক্ত এ গাছ ২০-৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। ১২-১৯ প্রজাতির গাছ রয়েছে। মিসর ও মেসোপটেমিয়া এলাকায় এর আদি নিবাস বলে জানা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান খাদ্য খেজুর। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচুর খেজুর গাছ হয়। সবচেয়ে বেশি খেজুর উৎপন্ন হয় মিসর, ইরান, আলজেরিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, পাকিস্তান, সুদান, ওমান ও তিউনিসিয়ায়।
বাংলাদেশের খুলনা, যশোর, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, ফরিদপুর, লালমাই পাহাড়ী এলাকা, ভাওয়াল ও মধুপুর গড়ে এ গাছ বেশি এবং সর্বত্রই কমবেশি জন্মে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব মতে, বাংলাদেশে ৬৮.১০ বর্গকিলোমিটার জমিতে খেজুর গাছ জন্মে। এদেশে খেজুর গাছের সংখ্যা ৬ কোটি ৬৭ লক্ষের বেশি।
খেজুর গাছ স্ত্রী, পুরুষ উভয়ই হয়। শতকরা ৫০ ভাগ স্ত্রী গাছ হয়। ৪-৮ বছরের মধ্যে গাছে ফল আসে। স্ত্রী গাছে ফুল ও ফল হয়। ফল প্রথমে সবুজ. পাকলে খয়েরি লাল রঙের হয়। শীতের শেষে ফুল ধরে ও গ্রীষ্মে ফল পরিপক্ব হয়। একটি গাছে ৭০-১৪০ কেজি ফল পাওয়া যায়। এ দেশের খেজুর বিস্বাদ হয়। সারা বছর বিশেষত পবিত্র মাহে রমজানের ইফতারে মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর খাই। মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর যেমন মিষ্টি তেমন সুস্বাদু। এ দেশের খেজুরের স্বাদ না থাকায় রস ও গুড়ের ব্যবহারই বেশি।
শীতকালে সারাদশে শীতের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে। শীতের শুরু হতে শেষ অবধি খেজুর রস সংগ্রহ করা হয়। এজন্য গাছের উপরের দিকে কেটে ফেলতে হয়। কাটা অংশের নিচে বাঁশ বা গাছের খিল লাগানো হয় যার মাধ্যমে ফোঁটা ফোঁটা রস নিচে লাগানো হাড়িতে জমে। সারারাতে হাড়ি রসে ভর্তি হয়। খুব সকালে হাড়ি নামানো হয়। রস সংগ্রহ ও খাওয়ার জন্য সাবধানতা জরুরি। কেননা রাতে বাদুড় রস খাওয়ার জন্য হাড়িতে মুখ লাগায়। এতে বাদুড়ের লালা রসের সাথে মিশে যায়। যা খুব বিষাক্ত। এজন্য রস জ্বাল দিয়ে পান করলে বিষাক্ত বস্তু নষ্ট হয় ও কোন ক্ষতি হয় না। রসের হাড়ি জ্বাল দিয়ে ঢাকতে হবে যাতে বাদুড় মুখ লাগাতে না পারে। গাছ কাটা ও রস আহরণকারীকে বলা হয় গাছি। গাছিরা কাঠ দা ও গাছি দা এ দু প্রকার দা ব্যবহার করে। শীতকালে গাছিদের কদর বাড়ে।   
খেজুর শক্তিবর্ধক ফল। খেজুরের রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা। প্রতি ১০০ গ্রাম খেজুরে আছে ১৪৪ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ৩৩.৮০ ভাগ শর্করা, ১.২০ গ্রাম আমিষ, ০.৪০ গ্রাম চর্বি, ২২ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৫১.২০ গ্রাম জলীয় অংশ ও ৭.৫ ভাগ আঁশ। ফল শর্করা, চিনি, আঁশ, চর্বি, আমিষ, সকল প্রকার খাদ্যপ্রাণ, বিটাক্যারোটিন, বিভিন্ন খনিজ উপাদান, ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, দস্তা ও লৌহ সমৃদ্ধ। মিষ্টি খেজুরে শতকরা ৮০ ভাগ চিনি ও ২০ ভাগ পানি আছে।
ইসলামে অন্যান্য ফলের তুলনায় খেজুরের মর্যাদা বেশি। পবিত্র কোরআন শরীফে ২০ বার খেজুরের বর্ণনা রয়েছে। পবিত্র কোরআন শরীফ প্রথম লেখা হয় খেজুর পাতায়। মহানবী রসুলুল্লাহ্ (সা:) এর প্রিয় ফল ছিল খেজুর। মহানবী (সা:) প্রতিদিন সকালে খেজুর দিয়ে নাস্তা করতেন। তিনি (সা:) মুমিন মুসলমানদের খেজুর খেয়ে পবিত্র রমজানের ইফতার করতে বলতেন। পবিত্র কোরআন শরীফ ও রসুলুল্লাহ্ (সা:) এর হাদিস হতে খেজুরের গুণের কথা জানা যায়।
খেজুর ফল পুষ্টিকরই নয়, ভেষজ গুণ সম্পন্ন। বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে খেজুরের কার্যকারিতা রয়েছে। ফল খুব সুস্বাদু ও ক্ষুধা নিবারক। হৃদরোগ, বিষক্রিয়া, জ¦র, পেটের পীড়া, পাতলা পায়খানা, গলাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথাব্যথা. ঠান্ডা, কফ, নারীদের শ্বেতপ্রদর, শিশুর রিকেট নিরাময়ে ফল খুব কার্যকর। ফল শারীরিক, মানসিক শক্তি বাড়ায়, হজমশক্তি বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ও যৌন দুর্বলতা দূর করে। গরম পানিতে খেজুর সিদ্ধ করা পানি পান করলে গলার ক্ষত ও ঠান্ডা সারে। ফল পেশি সংকোচন ও শক্তিশালী করে বৃহদান্ত্র ও ক্ষুদ্রান্ত্রের পীড়া উপশম ও বীজের গুড়া কালাজ্বর নিরাময় করে। রস খেলে কৃমি দূর হয়।
খেজুরের পাতা, কান্ড, বীজ ও আঠার নানা উপকারিতা রয়েছে। পুরাতন গাছের চিলেপাতা নামক পরগাছা ভেষজ গুণ সম্পন্ন। কান্ডের আঠা পাতলা পায়খানা ও প্রস্রাবের সমস্যায় উপকারী। শিকড় হতে ওষুধ হয়। গাছের কান্ড ঘরের খুঁটি, তক্তা, বাটাম, রোয়া তৈরিসহ জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাতা দিয়ে পাটি, চাটাই ও মাদুর হয়। কান্ড ও পাতা জ্বালানীর কাজেও ব্যবহৃত হয়। রস দিয়ে তৈরি হয় পিঠা, পায়েস, ক্ষীর, চিনি, মিছরি, ভিনেগার ও গুড়। রস হতে নলেন গুড়, চিটা গুড়, দানা গুড়, ঝোলা গুড়, মৌঝোলা গুড় ও পাটালি গুড় তৈরি হয়। যশোর ও ফরিদপুরের গুড়ের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে।
খেজুর গাছ পরিবেশ সুরক্ষা, মাটির ক্ষয়রোধ করে। পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও নানা রোগের ওষুধ হিসেবে এর জুরি নেই। ময়মনসিংহের ভালুকা, যশোর, মাগুরা ও বেশ কিছু অঞ্চলে সৌদি আরবের খেজুর চাষ করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে বাগান করে, ক্ষেতের আইলে, রাস্তার পাশে খেজুর গাছ লাগিয়ে অনেক আয় করার পাশাপাশি পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। খেজুর চাষ, পরিচর্যা, রোগবালাই দমন বিষয়ে চাষিদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। খেজুরকে কেন্দ্র করে কুটির শিল্প গড়ে তুললে বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ