ঢাকা, বৃহস্পতিবার 3 January 2019, ২০ পৌষ ১৪২৫, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রংপুর অঞ্চলে লিচু ও সরিষা ক্ষেতে মৌচাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় সরিষা ক্ষেত এবং লিচু বাগানে পরিকল্পিতভাবে মৌমাছির চাষ করা হলে মধু উৎপাদনের মাধ্যমে বছরে শত কোটি টাকা আয়ের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞগণ অভিমত পোষণ করেছেন। এর ফলে একদিকে বিপুল সংখ্যক বেকার পুরুষ ও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি চাষির বাড়তি আয়ে সাথি ফসল হিসেবে নতুন সম্ভাবনাময় পণ্য হিসেবে তাঁদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বিশাল এক সহায়ক শক্তির সৃষ্টি হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, রংপুর অঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী জেলায় বিপুল পরিমাণ লিচু বাগান এবং বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির চাষ করে প্রতি বছর শত কোটি টাকা মূল্যের মধু উৎপাদন করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কারিগরী সহযোগিতায় গত কয়েক বছর ধরে এসব জেলায় বিভিন্ন সরিষা ক্ষেত এবং লিচু বাগানে মৌমাছির চাষ করার পাশাপাশি চাষিরা সাথি ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌমাছি চাষ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ জনান, প্রতিটি মৌবাক্সে প্রতি মওসুমে নুন্যতম ৪ থেকে ৫ কেজি করে মধু পাওয়া যায়। এছাড়া মৌচাষের প্রকল্প ভুক্ত সরিষা ক্ষেতের ফলনও অন্ততঃ ২০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ঐ এলাকায় বিভিন্ন ফলের গাছের মুকুল এবং ফসলের ক্ষেতে মৌমাছির ব্যাপক সমাগমের মাধ্যমে প্রচুর পরাগায়ণের সৃষ্টি হয়। একারণে ঐসব ফলের বাগান এবং ক্ষেতের ফলনও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় ।
এই কর্মসূচির আওতায় গত অর্থ বছরে এসব জেলার বিভিন্ন সরিষা ক্ষেতে ৫ হাজারের বেশি মৌ বাক্স স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে এই অঞ্চলে ৩ হাজার ৩ শো ১৪ টি মৌমাছির বাক্স স্থাপন কারা হয়েছে । এর মাধ্যমে চাষিরা সাথি ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পেরে অর্থনৈতিক ভাবে প্রচুর লাভবান হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলায় সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন হয়েছে বলে জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে- রংপুর বিভাগের রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী এই ৫ জেলায় গত রবি মওসুমে প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়। এসব সরিষা ক্ষেতের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে মধু উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নিয়ে ৫ হাজার ৫৫ টি মৌমাছির বক্স স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে গোটা মওসুম জুরে এসব সরিষা ক্ষেতে ৩ হাজার ৩১৪ টি মৌ বক্স স্থাপন করে গত মওসুমে ৫৫ হাজার ২০০ কেজির বেশি পরিমাণ মধু উৎপন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে চাষকৃত সকল সরিষা ক্ষেত মৌচাষ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হলে কেবল এসব সরিষা ক্ষেত থেকেই প্রতি মওসুমে অন্তঃত ৪ লাখ কেজির বেশি মধু উৎপাদনের মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হতো। এছাড়া এই অঞ্চলের লিচু বাগানের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে মৌমাছির চাষ করে আরও অন্তঃত ২০ থেকে ২৫ লাখ কেজি মধু উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের মধু উৎপাদনের অপার সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব উৎপাদিত মধু দেশের স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে একদিকে যেমন বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করা সম্ভ। অপর দিকে পশ্চাদপদ এবং অবহেলিত এই অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির এক অপার ভা-ারও তৈরি হবে।
প্রাপ্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের গত মওসুমে রংপুর জেলায় সরিষা চাষ করা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ১০৬ হেক্টর জমির সরিষা ক্ষেতে ৯৮ টি মৌ বক্স স্থাপন করে ২০৫ কেজি এবং জেলার ৪৬৪ হেক্টর জমিেিত চাষকৃত লিচু বাগানের মধ্যে ৪৫ হেক্টরে ৭২৫ টি মৌ বক্স স্থাপন করে ৯ হাজার ৭১০ কেজি মধু উৎপন্ন হয়েছে । কুড়িগ্রাম জেলায় ১২ হাজার ৮৫৩ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৬৯ হেক্টর সরিষা ক্ষেতে ২ হাজার ৪০১ টি মৌ বক্স স্থাপন করে ৫২ হাজার ৭৪০ কেজি। গাইবান্ধা জেলায় ৬ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫০ হেক্টর সরিষা ক্ষেতে ৬০৩টি মৌ বাক্স স্থাপন করে ২ হাজার ৫০ কেজি। নীলফামারী জেলায় ৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এর মধে ১৩১ হেক্টর সরিষা ক্ষেতে ৩৯ টি মৌ বাক্স স্থাপন করে ১৫৫ কেজি। লালমনিরহাট জেলায় ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ হেক্টর সরিষা ক্ষেতে ২০৫ টি মৌ বাক্স স্থাপন করে ৮৫ কেজি মধু উৎপাদন হয়েছে ।
মৌমাছি চাষে কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় কারিগরী সহায়তা প্রদান করছে। মৌমাছি চাষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার চাষীরা সাথি ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের। সীমিত পর্যায়ে মৌমাছি চাষে সাফল্য অর্জিত হওয়ায় রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় গত রবি মৌসুমে প্রায় পৌণে ৩ কোটির বেশী টাকা মূল্যের ৫৫ হাজার কেজিরও বেশি মধু উৎপাদন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপ পরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ সরওয়ারুল হক এই প্রতিনিধিকে জানান, রংপুর অঞ্চলে লিচু এবং সরিষা ক্ষেতে মৌচাষ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অঞ্চলের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে মৌচাষ ইতি বাচক প্রভাব হিসেবে ব্যাপক সাফল্যের কাজ করছে। ফলে চাষিরাও এতে ক্রমান্বয়ে উৎসাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী চড় এলাকাসহ বির্স্তীন সরিষার ফসলের মাঠে মৌচাষে চাষিরা উৎসাহিত হয়ে তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দক্ষ মৌয়ালের অভাবে অনেকেই কাংকিত লক্ষ্যে মৌচাষে এগিয়ে আসতে পারছেনা বলে তিনি জানান। দেশের উত্তরাঞ্চলের সিরাজগজ্ঞ এবং বগুড়ার কিছু এলাকায় দক্ষ মৌয়াল আছে তারাই প্রত্যেক মৌসুমে এসে সীমিত পর্যায়ে এই এলাকায় মৌয়ালের দায়িত্ব পালন করে থাকে। সিরাজগজ্ঞের মওসুমী মৌয়াল চান মিয়া জানান, প্রত্যেক গ্রীস্ম মওসুমে তারা এই অঞ্চলে মধু সংগ্রহের জন্য আসেন। সাধারণতঃ এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মধু সংগ্রহ শুরু হয়। মৌয়ালরা অভিযোগ করে জানান, আমাদের দেশে লিচু বাগানে মৌচাষ বা মধু সংগ্রহের জন্য কোন নিয়ম সৃংখলা নেই। বাজারজাত করার ব্যাপারেও কোন পরিকল্পিত উদ্যোগ নেই। এব্যাপারে সুষ্ঠু বাজার ব্যাবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে কেবল মৌচাষ করেই রংপুর অঞ্চলের চাষিরা আর্থ সামাজিক উন্নয়নসহ স্বাবলম্বি হ’তে পারবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ