ঢাকা, শনিবার 5 January 2019, ২২ পৌষ ১৪২৫, ২৮ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রংপুরের চরাঞ্চলে ব্যাপক শাক-সবজি চাষে সবুজের বিপ্লব

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : রংপুরের চরাঞ্চলের কৃষিজমিতে একই সথে বিভিন্ন জাতের ব্যাপক ফসল চাষের মাধ্যমে রূপালি চরে সবুজ বিপ্লব ঘটেছে। এসব ফসল চাষে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে কৃষকদের মাঝে। চরাঞ্চলের উর্বর পলি মাটিতে এসব ফসল চাষের মাধ্যমে সম্ভাবনার সৃষ্টি হচ্ছে শত কোটি টাকার ফসল উৎপন্নের।

রংপুর অঞ্চলের খরা-বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে মাটি চষে বেঁচে থাকে মানুষ। এ অঞ্চলে প্রতি বছর বন্যার ভয়াবহতায় পাহাড়ি ঢল, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বালি ও পলিমাটি বন্যার পানির সাথে জমিতে এসে পড়ায় এখানকার ভূমি অধিকাংশ উর্বর হয়ে ওঠে। তাই ভূমির প্রকারভেদে এখানে ফসল চাষে কৃষিতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে ফসলের জমিতে একই সাথে নানা ধরনের ফসল চাষে চাষিরা এগিয়ে আসছেন। সমতল ভূমিতে ইরি-বোরো চাষ করা ছাড়াও অসমতল ও বেলে মাটিতে চাষ করা হচ্ছে বিভিন্ন জাতের রবিশস্য। এরই ধারাবাহিকতায় রংপুর অঞ্চলে চলতি বছর শীতকালীন সবজি চাষে বিপ্লব ঘটেছে। চলতি মওসুমে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের শাক-সবজি চাষ করে প্রায় ১৯ লাখ মেট্রিকটন শাক-সবজি উৎপন্ন হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। এসব সবজির প্রতি কেজি সর্বনিম্ন মূল্য গড়ে ২০ টাকা ধরা হলে এসময়ে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের শাক-সবজি কৃষকের ঘরে উঠেছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চরের শত শত একর জমিতে চাষ করা হয়েছে নানা জাতের ফসল। চাষিরা জানান, তাদের চরাঞ্চলের জমি অসমতল ও বালির পরিমাণ বেশি হওয়ায় ইরি-বোরোর পরিবর্তে একই জমিতে একই সাথে ছয়-সাত প্রকার ফসল চাষ করে ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন। এর মধ্যে মওসুমের শুরুতেই আখ চাষের জন্য জমি তৈরি করা হয়। পরে ওই জমিতে নানা জাতের শাক, চাষ করে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বাদাম, মরিচ, ঢেঁড়স ও পুঁই শাকের বীজ বপন করা হয়। এক মাসের মধ্যে এসব সবজি বাজারে বিক্রি করা হয়। পরে বাকি ফসলের মধ্যে বাদাম, বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়স ও পুঁই শাক মাসাধিক কাল ধরে বাজারজাত করে চাষীরা প্রচুর অর্থ আয় করেন। আখের গাছ পরিপক্ক হওয়ার আগেই বাদাম ও সবজি জাতীয় ফসল উঠে আসে। আখ খেতে এসব সবজি চাষ করায় জমির পরিচর্যা ভালো হয়। ফলে আখের ফলনও হয় বেশি। কঠোর পরিশ্রমে একই জমিতে বহু সাথি ফসল চাষে তারা ব্যাপক লাভবান হয়েছেন।

নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদী ১১৫ কিলোমিটার দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে। ভারত তিস্তার উজানে পশ্চিমবঙ্গের গজলডোবায় বাঁধ দিয়ায় বর্ষায় তিস্তার দুই কূল উপচে সৃষ্ট বন্যা ও ভাঙনে লোকজন সর্বস্বান্ত হচ্ছে। শুকনো মৌসুমে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে নদীতে তীব্র পানি সংকট দেখা দেয়। ফলে তিস্তার বুকজুড়ে জেগে উঠে ধু ধু বালুচর। এই বালু চরে চাষ হচ্ছে শত কোটি টাকার ফসল। এসব ফসল এই অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের চাহিদা মিটিয়ে রফতানী হচ্ছে দেশ-বিদেশে। এছাড়া জেলার তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ এবং সদর উপজেলায় মধ্যদিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনেশ্বরী, ঘিলনাই, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর উভয় তীরের বালু চরের জমিতে ব্যাপক সবুজ বিপ্লব ঘটেছে। এসব চরের জমিত ধান, মিষ্টিকুমড়া, আলু ও ভুট্টা চাষ করার পর থেকে এই অঞ্চলের চাষীদের সংসারের অভাব অনেকটা দূর হয়েছে। কাউনিয়ার হারাগাছ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রকিবুল হাসান পলাশ জানান, চরে আর অভাবী মানুষ নেই। চাষাবাদ করে চরের মানুষ এখন স্বাবলম্বী হয়েছে। প্রতি মওসুমে আলু ও মরিচ চাষ করেন চররে বাসিন্দারা। এসব ফসল চাষ করে তারা লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। রংপুর নগরী সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে মাঠ থেকেই কিনে সবজি ক্রয় করেন বলে জানালেন গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মর্নেয়ার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। তিনি জানালেন, গত বছর তিনি ২ একর জমিতে মিষ্টিকুমড়া এবং ২ একর জমিত স্কোয়াশ আবাদ করে ভাল লাভ পেয়েছেন। কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছ ইউনিয়নের চর নাজিরদহের চাষী আব্দুল কুদ্দুস জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থার তেমন উন্নতি না হওয়া চরবাসী ফসলের ন্যায্য মূল্য পায়না। 

গঙ্গাচড়া উপজেলার মর্নেয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী আজাদ জানান, চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। ভারী যানবাহন আসতে পারে না। ফলে ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। যোগাযোগ ও বিপণন ব্যবস্থা ভাল হলে চাষীরা ভাল মূল্য পেত। তিস্তার চরে এখন ধান, আলু, পাট, গম, ভুট্টা, সরিষা, মুগ ডাল, মশুর ডাল, মাষকালাই, খেসারি, পিঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, মৌরি, মরিচ, তিল, তিশি, কালোজিরা, কাউন, চিনাবাদাম, তামাক, শালুক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো, ঢেঁড়স, মিষ্টিকুমড়া, স্কোয়াশ, কলা, আখ সহ বিভিন্ন ফসল চাষ হচ্ছে। চরের জমি উঁচু করে পেয়ারা এবং কুলবাগানও করা হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ আলী জানান, কয়েক বছরের ব্যবধানে তিস্তার চরে কৃষি বিপ্লব ঘটে গেছে। চরের জমিতে প্রায় ৪০ প্রকার বিভিন্ন জাতের ফসল চাষ হচ্ছে। ফলনও হচ্ছে ভালো। জেলা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা চরের কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন। এছাড়া উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে। তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। একই কথা জানালেন মিঠাপুকুর উপজেলার ভাংনি ইউনিয়নের সবজি চাষি ইয়াকুব আলী। তিনিও ৫০ শতক জমিতে বেগুন ও বাঁধাকপি আবাদ করে লাভবান হয়েছেন। একই কথা শোনালেন এলাকার অনেক চাষি। 

৮ জেলার বড় চাষিদের পাশাপাশি হাজার হাজার হাজার ক্ষুদ্র, বরগা ও প্রান্তিক চাষি শাকসবজির চাষ করে অভাব দূর করছেন। তারা সবজি চাষ করে সংসারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি সন্তানদের ভালোভাবে লেখাপড়া করাচ্ছেন।

রংপুর চেম্বার এন্ড কমার্সের প্রেসিডেন্ট মোস্তফা সোহবার টিটু জানান, সবজি চাষে এই অঞ্চলের চাষিদের আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে এখানকার সবজি কৃষকের সমৃদ্ধির দুয়ার খুলে দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে রংপুর অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক। রংপুরে কৃষি তথ্য সার্ভিস কর্মকর্তা আবু সায়েম জানান, কৃষি বিভাগের সুষ্ঠু মনিটরিংয়ের ফলে বিগত কয়েক বছরের তুলানায় এ অঞ্চলে শাকসবজির আবাদ বেড়েছে। কৃষকরাও ভালো দাম পেয়ে উপকৃত হচ্ছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডক্টর সরওয়ারুল হক জানান, চরাঞ্চলের সবজি জাতীয় ফসল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ