ঢাকা, শনিবার 5 January 2019, ২২ পৌষ ১৪২৫, ২৮ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মমতাজের শেষ বাসনা ও  আগ্রার তাজমহল

 

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥ এক একটি বিরাট আকারের চুনি বসানো ছিল ময়ূরের বুকে। সেখান থেকে ৫০ ক্যারটের একটি হলুদ রঙের মুক্তা ঝুলে থাকতো। সিংহাসনটি ঠেস দিয়ে বসবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দিকে অগণিত মণি-মুক্তা শোভাপেত। ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে পারস্যের মহামান্য সম্রাট আব্বাস তৎকালীন ১ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি হীরা বাদশাহ্ কে উপহার দেন। সম্রাট শাহজাহান এই পিতার হীরাটিকেও ময়ূর সিংহাসনে সংযোগ করেছিলেন। এই ময়ূর সিংহাসনের নির্মাণ ব্যয় নিয় দুটো তথ্য পাওয়া যায়- সেকালে এটি নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল ৮ কোটি টাকা। যা এই প্রবন্ধের আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে তৎকালীন ইউরোপীয় পর্যটক টাভার্নিয়ার উল্লেখ করেছেন, এই শিল্প মন্ডিত বহু মূল্যের রতœ খচিত সিংহাসন টি নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি টাকার হীরা-মুক্তা পান্না, ৯০ লক্ষ টাকার জহরত, ২০ লক্ষ টাকা মূল্যের ১ লক্ষ তোলা ওজনের স্বর্ণ। এই মহামূল্যবান ময়ূর সিংহাসনটি ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্য সম্রাট নাদির শাহ ভারতবর্ষ অভিযানকালে লুন্ঠন করেন। এর অবর্ণনীয় সৌন্দর্যে পাগল-পারা হয়ে নাদির শাহ এটাকে সঙ্গে নিয়ে যান নিজ দেশ পারস্যে। পরবর্তীতে এই ময়ূর সিংহাসনের জন্য তার প্রতিপক্ষের কাছে নিদারূনভাবে খুন হন তিনি। যদিও আজ এটা ভারত ছাড়া। তবুও পারস্যে এখন আর এটা নেই। অনেক রাজার রাজত্বে হাত বদল হয়ে কালের গর্ভে ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশ্বখ্যাত কোহিনুর হীরা ময়ূর সিংহাসনে বসানো ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশের হাতে কোহিনুর হীরাটি চলে যায়। ইংল্যান্ডের রানী মহারানী ভিক্টোরিয়ার মুকুটে সেটা শোভা পায়। বর্তমানে বংশ পরস্পরায় মহারানী এলিজাবেথের মুকুটে শোভা পাচ্ছে। বিশ্ববিখ্যাত কোহিনুর হীরা এক সময় আমাদের ভারতবর্ষের সম্পদ ছিল। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে নাদির শাহ যখন ভারত বর্ষ আক্রমণ করেন তখন দিল্লির সম্রাট ছিলেন মুহাম্মদ শাহ্। মুহাম্মদ শাহ্ ২৯ বৎসর রাজত্ব করেন। (১৭১৯-১৭৪৮ খ্রি.)।

আবার ফিরে যাই তাজমহলের কথায়। ইতিহাসের উত্থান পতনে বার বার তাজমহলের বুকে আঘাত হানা হয়েছে। কালের গর্ভে ইতিহাস তার স্বাক্ষী। দূর্দান্ত জাঁঠ দস্যূগন কর্তৃক তাজমহলের গাত্রের মনি-মানিক্য ও নিরেট স্বর্ণ নির্মিত কারুকার্য্যময় দরজা-জানালা লুন্ঠিত হয়েছে। তাজমহলের জীবনে নানা উত্থান-পতন ঘটেছে। মোঘলরা যতদিন ক্ষমতায় ছিল ততদিন একে যথাযথভাবে রক্ষনা বেক্ষন করেছিল। মোঘলদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাজমহলের প্রতি নেমে আসে দুর্যোগ। একদিকে বাগান ধ্বংস করা হয়, অন্যদিকে পানি প্রবাহের স্থাপনা গুলো নষ্ট করা হয়। আরেক দিকে চলে অবাধ লুন্ঠন। তাজের মূল্যবান পাথর ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী খুলে নেয়া হতে থাকে। বিংশ শতকের দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত তা চলতে থাকে। লর্ড কার্জন লক্ষ্য করেন- “প্রায়ই দেখা যায় আনন্দ করতে আসা ব্যক্তিরা তাজের গাত্র থেকে বিকালে হাতুড়ি বাটাল দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে সম্রাট ও তাঁর প্রাণ-প্রিয় রাণীর কবর থেকে মূল্যবান পাথর বাগিয়ে নিচ্ছে।” এ ধরনের লুট তরাজের আগেও অতীতে তাজমহল আর একটি মারাত্মক নির্মম পরিণতির মুখে পড়েছিল। আর তা’ ঘটেছিল প্রজাহিতৈষী (!) হিসেবে পরিচিত লর্ড উইলিয়াম বেন্টিকের আমলে (১৮২৮-১৮৩৩ খ্রি:)। এই বৃটিশ আমলেই তাজমহলের সবচেয়ে ভয়ানক আঘাত হানার পরিকল্পনা করেছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টীংক। তিনি ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে তাজমহলের সব শ্বেত পাথর খুলে নিয়ে নিলাম করবার সব ব্যবস্থা প্রায় চুড়ান্ত করে ফেলে ছিলেন। কথা মতো বৃটেন থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছে গিয়েছিল আগ্রায়। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আগ্রা ও দিল্লির সকল মনুমেন্ট ভেঙ্গে ফেলা হবে এবং সেগুলোর সব দামী সামগ্রী ইংল্যান্ডে নিয়ে বিক্রি করা হবে। তিনি সে কাজও শুরু করে দিয়েছিলেন। খোদ লাল কেল্লার  কিছু অংশ ভেঙ্গে সেগুলোর মার্বেল পাথর ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল। তিনি তার অমানবিক কাজের আরেক পদক্ষেপ হিসেবে তাজ মহলের ভাঙ্গা’র ঠিকাদারিও চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন। তাজমহলের বাগানটি ভাঙ্গার কাজ দিয়ে এটি শুরু হচ্ছিল।  কিন্তু তাজমহল ভাঙ্গার কাজ আরম্ভ করার ক’দিন আগে লন্ডন থেকে একটা বার্তা আসে, “কাজ বন্ধ থাকুক”। ছোট্ট এই বার্তাটি সেদিন না’এলে সাধের তাজমহলের আর কোন অস্তিত্বই থাকতো না আমাদের এই পৃথিবীর বুকে। ভাগ্য ভালো- ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর তদানীন্তন ডিরেক্টরগণ তাজমহলের এরূপ শোচনীয় প্রয়াস থেকে বেন্টিংকে নিবৃত্ত করেছিলেন। এরপরেও যে, তাজমহলের বুকে ছোট খাটো আঘাত আসেনি তা নয়। অনেক বাধা বিপত্তির পরেও তাজমহল আজও টিকে রয়েছে। শুধু ভারতে নয় সমগ্র বিশ্বের একটি অবিস্মরণীয় বিস্ময় এই আগ্রার তাজমহল। অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস শাহজাহানের রাজত্বকাল কে মোঘল যুগের স্বর্ণ যুগ বলে অভিহিত করা হলেও তথাপি তাঁর রাজত্বকালের শেষের দিকে সম্রাট যখন ১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৭ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়েন তখন তাঁর মৃত্যু আশঙ্কা করে তদীয় ৪পুত্রের মধ্যে দিল্লির সিংহাসন নিয়ে এক রক্তক্ষয়ী ভয়ানক আত্মঘাতী যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সম্রাট শাহজাহান তখন বার্ধক্যের কোঠায়। ৪ভাইয়ের আত্মঘাতী যুদ্ধে তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব জয়লাভ করেন। ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে ৩০ আগস্ট দারাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। সিংহাসনে বসেন আওরঙ্গজেব। পিতার দারার প্রতি অন্ধ সমর্থন ও ভালোবাসার জন্য দারার মাথা কেটে মহামূল্যবান উপঢৌকন হিসেবে পিতার নিকট পাঠিয়ে দেন। 

এ দৃশ্য অবলোকন করে মুহুর্তে শাহজাহান মুর্ছা যান। ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে সুজা আরাকানে পালিয়ে যান এবং সেখানে মগরাজার সৈন্যদের হাতে স্ব-পরিবারে করুণভাবে নিহত হন। ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে মুরাদকেও প্রাণদন্ড দেয়া হয়। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে ২২ জুন পরম শ্রদ্ধেয় পিতাকে আগ্রার দূর্গে নজরবন্দী করে রাখেন আওরঙ্গজেব। বন্দী করে রাখেন পিতার সঙ্গে নিজ ভগ্নী জাহানারাকেও। আগ্রা থেকে ৩ কিলোমিটার দুরে যমুনার অপর পাড়ে আকবরের হাতে আগ্রা দুর্গের গোড়াপত্তন। এই দুর্গে নিথর নিস্তব্ধভাবে ঘরের মধ্যে বসানো আয়নায় তাজমহলের প্রতিবিম্ব দেখে দেখে শাহজাহান চোখের জলে হৃদয়ের গভীরতম অন্তরে প্রিয়তমা পতœী মমতাজ কে স্মরণ করেছেন আর কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের শেষ কয়টা দিন। আনন্দে নয়, বন্দী অবস্থায়। আওরঙ্গজেবের অধীনে তাঁকে এখানে বন্দী করে রাখা হয় এবং এখানেই এই আগ্রা দুর্গেই মৃত্যু কাল পর্যন্ত ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে বন্দী অবস্থায় থাকেন ঔরসজাত সন্তানের হাতেই। এখানেই ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারী ৭৪ বছর বয়সে সম্রাট শাহজাহান মারা যান। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস, যাঁর কীর্তি তাজমহল, বিশ্বজোড়া খ্যাতি যাঁর, তাঁরই করুণ পরিণতি। সত্যিই আশ্চর্য্য হতে হয় সেই চরম দূর্দিনে শাহজাহানের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কুমারী জাহানারা রইলেন পিতার পাশে। স্থবির পিতার পরিচর্যা করলেন অমিত নিষ্ঠা ও অবিচলিত ধৈর্য্য নিয়ে। তারপর পিতার মৃত্যুর পর জাহানারা প্রত্যাবর্তন করলেন দিল্লিতে। অবশেষে রমজানের এক পূণ্য তিথিতে মৃত্যুর শান্ত শীতল ক্রোড়ে মুক্তি লাভ করলেন দুখিনী জাহানারা। তারই ইচ্ছায় তাঁর সমাধি হলো দিল্লির দরবেশ নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার কবরের পাশে। জাহানারা ছিলেন- “পবিত্র কুসুম রমনী রতœা”। আরবী ও ফারসী ধর্মতত্ত্বে তিনি বুৎপন্না ছিলেন। তিনি চিরকুমারী ছিলেন। জাহানারা বিদুষী রমনী ছিলেন। তিনি ফারসীতে খুব সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখতে পারতেন। প্রেমের পবিত্র শিখায় বিন্দু বিন্দু পরশ দিয়ে হয়তো মমতাজ সম্রাট শাহজাহানের হৃদয়ে এই মহল গড়েছিলেন; কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস যার ভালোবাসায় হৃদয়ের শেষ পরশটুকু উজার করে দিয়েছিলো সেই প্রাণপ্রিয় সম্রাট শাহজাহানের আগেই মৃত্যুবরণ করেন মমতাজ। ইতিহাসে তাজমহল এক গভীর অকৃত্রিম প্রেমের নিদর্শন হিসেবে অমর, অক্ষয় ও অনির্বাণ শিখা হয়ে আমাদের হৃদয়ে আজীবন বিরাজ করবে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ইন্দো-পারসিক স্থাপত্যে গড়া শ্বেত মর্মরের এই সৌধটি আজ ভূবন বিখ্যাত তাজমহল। মমতাজের সমাধির পাশেই রয়েছে শাহজাহানের কবর। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহান মারা গেলে পুত্র আওরঙ্গজেব পিতাকেও সমাধিস্থ করেন মায়ের কবরের পাশে এই তাজমহলে।

প্রথমে যিনি আরজুমান্দ বানু বেগম, পরবর্তীতে তাজবিবি, সর্বশেষ সেই মমতাজ আজ আর নেই। সম্রাট শাহজাহানও নেই। স্মৃতি হয়ে পড়ে আছে সেই অমর কীর্তি তাজমহল; যা অবাক বিস্ময়ে সমগ্র পৃথিবীর প্রেমিক-প্রেমিকাকে অভিভুত করে। কতো কবি, শিল্পী, সাহিত্যিককে দান করেছে অমরতা। কীর্তির চেয়ে মহৎ এই মানুষটি মৃত্যু শয্যায় শায়িত প্রিয়তমা পতœীর শিয়রে বসে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তা’অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ইতিহাসে চির অক্ষয় হয়ে রইলেন। যদি মৃত্যু শয্যায় শায়িত মমতাজ মহল তাঁর প্রতিজ্ঞার কথা স্বামীকে না বলে যেতেন হয়তো বা আমরা পেতাম না সপ্তাশ্চর্য্যরে অন্যতম এই তাজমহলকে। তাজমহল তৈরির মূলে ছিল মৃত্যুপথ যাত্রী মমতাজের শেষ বাসনা। (সমাপ্ত)

তথ্যসুত্র :

(১) অধূনালুপ্ত পাক-ভারতের ইতিহাস- ড. মহোর আলী

(২) বাংলাদেশ ও ভারতের ইতিহাস- বাংলাদেশ স্কুল টেকষ্ট বুক বোর্ড, ঢাকা

(৩) ষ্ট্রাটিজ ইন মুঘল ইন্ডিয়া- (পৃষ্ঠা নং- ১৫) যদুনাথ সরকার

(৪) ভারতের জাতীয় ইতিহাস- (পৃষ্ঠা নং- ৪৩১) শ্রী বিনয় ঘোষ

(৫) সম্রাট শাহজাহান- ফরাসী ঐতিহাসিক ও পর্যটক টাভার্নিয়ার

(৬) পাক ভারতের ইতিহাস- কে. আলী

(৭) ঘুরে এলাম ভারত- সালাউদ্দিন ঠান্টু (১৯৮৩ ইংরেজী)

(৮) ইতিহাস কথা কও (বানু বেগমের শেষ ইচ্ছা)-সচিত্র ঝিনুক ১৮শ বর্ষঃ ৫ম সংখ্যা (স্বাধীনতা সংখ্যা- ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দ)

(৯) তাজমহল- প্রথম আলো (২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ অমর সাহা ও শিবব্রত বর্মণ

লেখক: সাহিত্যিক গবেষক ও ইতিহাস

jewelwriter53@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ