ঢাকা, রোববার 6 January 2019, ২৩ পৌষ ১৪২৫, ২৯ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঐতিহাসিক মান্ড্রা মসজিদ

মান্ডা নন্দু বেপারী মসজিদ

মোহাম্মদ আবদুর রহীম : ঢাকার প্রাচীন স্থাপত্যের মধ্যে মসজিদ অন্যতম। সুলতান জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ শাহের আমলের একটি প্রাচীন মসজিদের শিলালিপি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ইতিহাসে এটি মান্ড্রা মসজিদ নামেই খ্যাত। ড. আবদুল করিমের ‘মোগল রাজধানী ঢাকা’ বইয়ে এ মসজিদের বর্ণনা রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, এটি ঢাকার সর্ব প্রাচীন মসজিদ। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে, এটি ঢাকার মুগদা থানায় মান্ডা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত বর্তমান মান্ডা মসজিদ। ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটিও একই মত পোষণ করেছেন। মসজিদের শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি ১৪৩৩ সালের জানুয়ারিতে নির্মিত হয়েছিল। এটি তার আদি আকৃতিতে এখন আর নেই। হারিয়ে গেছে গম্বুজও। স্থানীয়ভাবে মসজিদটি এখন নন্দু বেপারী মসজিদ নামে পরিচিত। আহমদ হাসান দানী ও আবদুল করিমের মতে, বিলুপ্ত দোলাই নদীর তীরে ছিল মান্ডার অবস্থান। সুলতানি ও মোগল আমলে দোলাই নদী ছিল ঢাকার অন্যতম প্রধান নৌপথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. হাবিবা খাতুনের ডক্টরাল থিসিসে এ মসজিদের বর্ণনা আছে। তিনি জানান, ১৯৮২ সালে তিনি মসজিদটি প্রথম পরিদর্শন করেন। তখন মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, এটি সুলতানি আমলের মসজিদ। মসজিদটিতে আগে গম্বুজ ছিল। গম্বুজ ভেঙে পড়লেও মসজিদে সুলতানি আমলের আদি কাঠামোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।
শিলালিপিটি কালো পাথরে উৎকীর্ণ। এর পরিমাপ ৭৭.৭২ সে.মি ী ৫৩.৩৪ সে.মি। ড. ইউসুফ সিদ্দিক বলেন, এর লিপি শৈলি বিহারী। তবে একে সেমি বেংগল তুগরা বলা যায়। এধরণের লিপি শৈলি তৎকালীন মিশরের বাহরি মামলুক সুলতানদের শিলালিপিতে বিদ্যমান।  আরবি ভাষায় চার লাইনে চমৎকার বাহরি বা বিহারী শৈলির এ ক্যালিগ্রাফি ফলকটি সুলতানি আমলের ক্যালিগ্রাফির উৎকৃষ্ট একটি নিদর্শন। চার লাইনের প্রথম লাইনে কুরআনের আয়াত- “মসজিদসমূহ আল্লাহ তা’আলাকে স্মরণ করার জন্য। অতএব, তোমরা আল্লাহ তা’আলার সাথে কাউকে ডেকো না। (সুরা জ্বীন : ১৮)”। দ্বিতীয় লাইনে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুলুল্লাহ সা. এর ওপর দরুদ, তৃতীয় লাইনে মহান সুলতান জালাল উদ্দীন- এবং চতুর্থ লাইনে সুলতানের নামে উলুঘ খান দীনার খানের নির্দেশক্রমে ভূমি জরিপ কর্মকর্তা (শিকদার) নায়েক মোহাম্মদ হিজরী ৮৩৬ সালের ১০ জমাদিউল আউয়াল (৩ জানুয়ারি ১৪৩৩) এটি নির্মাণ করেন।
শিলালিপিটির তৃতীয় লাইনের শেষের অংশ এবং চতুর্থ লাইন খোদাই সম্পন্ন করা হয়নি। ইতিহাসে জানা যায়, ঐ সময়ে প্রচন্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। এজন্য হয়ত  কাজ সম্পন্ন করা যায়নি। তবে এই শিলালিপির মাধ্যমে তৎকালীন পাথর খোদাইয়ের কলাকৌশল সম্পর্কে ভাল ধারণা পাওয়া যায়।
সরজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, কমলাপুর রেলস্টেশনের পেছনে অতীশ দীপঙ্কর মহাসড়ক থেকে মুগদা বাজার রোড দিয়ে উত্তর মান্ডা বড়পাড়া জোডা মসজিদ লেনে ঐতিহাসিক এ মসজিদটি অবস্থিত। কমলাপুর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত মসজিদটি ১৫ ফুট বর্গাকার মাপের মূলকাঠামোর সাথে পূর্বপাশে পরবর্তীতে বারান্দা যুক্ত করা হয়েছে। একতলার ওপর যে গম্বুজটি ছিল, সেটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর এখন উপরে আরো একতলা ও ছাদে অতিরিক্ত একতলা টিনসেড দেয়া হয়েছে। মসজিদটি এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। মসজিদ লাগোয়া নন্দু বেপারীর পুরান বাড়ীর কয়েকটি কক্ষ এখনও প্রাচীন কাঠামো নিয়ে দাড়িয়ে আছে। এর ইটগুলো ১২ ইঞ্চি ী ৬ ইঞ্চি ী ৩ ইঞ্চি মাপের। মসজিদটিতে মুসল্লী সংকুলান হয় না বলে এর ১০০ গজ পশ্চিমে আরেকটি বড় পরিসরের মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। নন্দু বেপারীর উত্তরপুরুষ মনির মিয়া জানান, তার পরদাদার দাদা ছিলেন আবু মিয়া, তার চার ছেলের মধ্যে নন্দু ছিলেন বুদ্ধিমান ও বড় ব্যবসায়ী, তাদের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া মসজিদ ও বাড়ীর উত্তর পাশে মান্ডা খাল, এটা একসময় বড় নদী ছিল, এই নদী দিয়ে পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা ও পূর্বে শীতলক্ষ্যা নদীতে যাওয়া যেত। ঢাকা শহরে প্রবেশে মান্ডার এ এলাকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ স্থান। নন্দু বেপারীর সময়ে (মোগল আমলের শেষ দিকে) মসজিদটি জীর্ণ অবস্থায় পতিত হলে তিনি এর মূল কাঠামোর ওপর পুনরায় মসজিদটি নির্মাণ করেন, এজন্য মহল্লাবাসী একে নন্দু বেপারীর মসজিদ নাম দেয়। গত শতকের ৮০ দশকে মসজিদটির গম্বুজ ভেঙ্গে যায় এবং এর দেয়ালগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এলাকাবাসী এর কাঠামো ভেঙ্গে নতুন করে এটি নির্মান করে এবং এর শিলালিপিটি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য প্রদান করা হয়। মসজিদটিতে চিনামাটির টুকরা দিয়ে প্রাচীন নকশার আদলে করা যে মটিফ দেখা যায়, সেটা সুলতানি আমলের মসজিদে করা মটিফের মত। তবে শিলালিপিটি এ মসজিদের প্রাচীনত্বের গৌরব বহন করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ