ঢাকা, শুক্রবার 18 January 2019, ৫ মাঘ ১৪২৫, ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ক্যান্সার গবেষণায় সাম্প্রতিক অগ্রগতি

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক:

ক্যান্সার অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন সংক্রান্ত রোগসমূহের সমষ্টি। এখনও পর্যন্ত এই রোগে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ সহজে ধরা পড়ে না, ফলে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ভালো কোন চিকিৎসা দেয়াও সম্ভব হয় না। বাস্তবিক অর্থে এখনও পর্যন্ত ক্যান্সারের চিকিৎসায় পুরোপুরি কার্যকর কোনও ওষুধ আবিষ্কৃত হয় নি। ক্যান্সার সারানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পরলে এই রোগ সারানোর সম্ভাবনা অনেকাংশ বেড়ে যায়। ২০০ প্রকারেরও বেশি ক্যান্সার রয়েছে। প্রত্যেক ক্যান্সারই আলাদা আলাদা এবং এদের চিকিৎসা পদ্ধতিও আলাদা। 

যতই দিন যাচ্ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও যেন দিন দিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীরা এই ভয়ঙ্কর রোগটির কথা জানতে পারেন অনেক দেরি করে।তাও জটিল সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর।বর্তমানে ক্যান্সার নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে এবং এ সম্পর্কে নতুন নতুন অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।ইদানিং কিছু পদ্ধতি আবিষ্কারের কথা জানা যাচ্ছে, যার মাধ্যমে আগে থেকেই ক্যান্সারের উপস্থিতি বুঝা যাবে।আর দ্রুত শনাক্ত করা গেলে ক্যান্সারের চিকিৎসাও দ্রুত শুরু করা যায়।চিকিৎসকরা বলেন প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে ক্যান্সারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সম্ভব।

বিশ্বে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি, যার মাধ্যমে আগে থেকেই ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়। তবে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যারয়ের একদল গবেষক। তাঁদের গবেষণায় শুধু রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই ক্যান্সারের ভবিষ্যদ্বাণী করার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এরই মধ্যে এ গবেষণার ফলের পেটেন্টের জন্য একযোগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করা হয়েছে।নতুন উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ননলিনিয়ার অপটিকস’ পদ্ধতি।এই পদ্ধতিতে রক্তের একটি পরীক্ষার মাধ্যমে মাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিটেই ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের গবেষকদের এই সফলতার কথা গণমাধ্যমে আসে।শাহজালাল পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকদের উদ্ভাবিত এই পদ্ধতিটি এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি পায়নি কিংবা কোনো জার্নালেও প্রকাশিত হয়নি। তবে গবেষকরা অল্প সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এর পেটেন্ট পাওয়ার আশা করছেন।

গবেষকদলের প্রধান অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক এ বিষয়ে বলেন, ‘এই গবেষণা মূলত ক্যান্সার নির্ণয়ের সহজ একটা পদ্ধতি। আমরা হেকেপের সহায়তায় এই ভিন্নধর্মী গবেষণা করেছি। হেকেপের দেশি-বিদেশি স্পেশালিস্টরা এ গবেষণা দেখার পরই তা ইউএসএ পেটেন্টের জন্য আবেদনের আগে কাউকে না জানানোর জন্য বলেন। কারণ এ ধরনের গবেষণা বিশ্বে প্রথম। নিশ্চয়ই এ গবেষণার গুরুত্ব আছে বলেই তাঁরা পেটেন্টের জন্য আবেদন করতে বলেছেন। তবে এ বিষয়ে আরো অনেক উচ্চতর গবেষণা প্রয়োজন।’    

তিনি বলেন, তারা ক্যান্সারের রোগী এবং সুস্থ মানুষের রক্ত এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা করেছেন, যার ফলাফল শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।

ইয়াসমিন হক বলেন, তাদের উদ্ভাবিত ‘ননলিনিয়ার অপটিকস’ পদ্ধতির মাধ্যমে শরীরে ক্যান্সারের প্রাথমিক উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব হবে। 

এই পদ্ধতিতে ক্যান্সার শনাক্তের জন্য সংগ্রহ করা রক্তের নমুনার (সেরাম) মধ্যে উচ্চক্ষমতার লেজার রশ্মি ফেলে রক্তে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা দেখা হবে।

“রক্তে পরিবর্তনের বিষয়টি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধরা পড়বে এবং ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ফলাফল পাওয়া যাবে,” বলেন গবেষক দলের সদস্য ড. মানস কান্তি বিশ্বাস।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি বছরের মধ্যেই তারা রক্তের নমুনা পরীক্ষার একটি ডিভাইস তৈরি করতে পারবেন, যাতে বিভিন্ন কোম্পানি এটি তৈরিতে এগিয়ে আসতে পারে।

অধ্যাপক ইয়াসমিন বলেন, “গবেষণায় ব্যবহৃত সব প্রযুক্তি এবং যন্ত্র আমরাই উদ্ভাবন করেছি। এমনকি মাত্র ৫০০ টাকায় রক্তের নমুনা সংরক্ষণের পাত্রটি তৈরি করা হয়েছে, যেটি আমদানি করতে ব্যয় হতো ২৭ হাজার টাকা।”

তবে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের হিস্টোপ্যাথলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফরিদা আরজুমান মনে করেন, ক্যান্সারের প্রাথমিক অবস্থা শনাক্তে বর্তমানে যেসব পদ্ধতি রয়েছে, এটি (নতুন) সেই তালিকায় কেবল নতুন সংযোজন।     

এছাড়া যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা কেবল নিঃশ্বাস পরীক্ষা করেই ক্যান্সার শনাক্ত করার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করে দেখছেন।গবেষকেরা এজন্য পনেরশ' মানুষের নিঃশ্বাসের নমুনা সংগ্রহ করবেন, এর মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীও রয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজের ক্যান্সার গবেষকেরা দেখতে চান, কেবলমাত্র নিঃশ্বাসের অনুসমূহ পরীক্ষা করে কয়েক ধরণের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্তরা যায় কি না।

এই পদ্ধতি যদি সফল হয়, তাহলে চিকিৎসকেরা শুরুতেই নির্ধারণ করতে পারবেন ঐ রোগীর আরো বিশদ পরীক্ষানিরীক্ষার দরকার আছে কি না।

নিঃশ্বাস ছাড়াও এজন্য একজন ব্যক্তির রক্ত ও মূত্র পরীক্ষার মাধ্যমেও ক্যান্সার প্রাথমিক ধাপেই শনাক্ত করা যাবে।

এর ফলে ক্যান্সারে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার অনেকটা কমে যাবে।

তবে, এই পরীক্ষার ফলাফল জানার জন্য দুই বছর অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে, চিকিৎসকেরা বলছেন, এই পরীক্ষা জেনারেল ফিজিসিয়ানের মত সাধারণ জায়গায় হবার সম্ভাবনা কম।

কীভাবে কাজ করবে এই পরীক্ষা

মানুষের শরীরের কোন কোষে কোন রকম প্রাণ-রসায়নিক পরিবর্তন ঘটলে সেটি নিঃশ্বাসে ভোলাটাইল অরগ্যানিক কমপাউন্ডস নামে এক ধরণের অনু নিঃসৃত হয়।

সফল হলে এই পরীক্ষার মাধ্যমে অনেক আগে ক্যান্সার শনাক্ত করা যাবে

কিন্তু যদি তাতে ক্যান্সার বা অন্য কোন রোগের আভাস থাকে, তাহলে কোষের স্বাভাবিক ধরণে পরিবর্তন আসে এবং ভিন্ন ধরণের অনু তৈরি করে এবং গন্ধের মাধ্যমে ভিন্ন বার্তা পাঠায় মস্তিষ্কে।

নিঃশ্বাসের বায়োপসি করার মধ্য দিয়ে নিঃশ্বাস পরীক্ষা করে মুখের গন্ধের এই প্রক্রিয়াটি চিহ্নিত করার চেষ্টা করছেন গবেষক দল।

এই পরীক্ষা সফল হবার সম্ভাবনা কতটা?

নতুন এই পদ্ধতি মাত্র পরীক্ষা করে দেখা শুরু হয়েছে। ফলে এর সফলতা নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলতে হলে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা।

তবে, যে পদ্ধতির মাধ্যমে এই পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে নতুন নয়।

কয়েক বছর যাবত পৃথিবীর অনেক গবেষকই বিশেষ করে ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার জন্য ব্যবহার করছেন।

ইতিমধ্যেই নিঃশ্বাস পরীক্ষা করে ক্যান্সারের আগের ধাপ শনাক্তে কিছুটা অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে।

কাদের ওপর পরীক্ষা চালানো হচ্ছে?

ইতিমধ্যেই যেসব মানুষের পাকস্থলীতে ক্যান্সার হবার পর প্রোস্টেট, কিডনী, ব্লাডার, লিভার এবং প্যানক্রিয়াসে তা ছড়িয়ে পড়েছে, এমন মানুষের একটি অংশ এই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।

তবে, এদের বাইরেও সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষেরা অংশ নিচ্ছেন এই গবেষণায়।

এছাড়া ক্যামব্রিজের অ্যাডেনব্রুক হাসপাতালের ডাক্তারেরা রোগীদের একটি মুখোশের মধ্যে ১০ মিনিট ধরে নিঃশ্বাসের নমুনা দেবার অনুরোধ করেছেন, যাতে সেটা গবেষণার কাজে লাগানো যায়।

গবেষকেরা বলছেন, ক্যান্সার যত দ্রুত শনাক্ত করা যায় তত মঙ্গল, তাতে চিকিৎসা শুরু করা যায় তাড়াতাড়ি।

ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় কি কমবে?

এক অর্থে ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় কমবে। কারণ কারো শরীরে যদি ক্যান্সারের আভাস পাওয়া যায়, আর সেটি আগে থেকে শণাক্ত করা যায়, তাহলে খুব দ্রুত তার চিকিৎসা শুরু করা যাবে।

এছাড়া একটি মাত্র পরীক্ষা কিংবা খুব সাধারণ পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে, সেটি পরবর্তী ধাপগুলোতে সাশ্রয় সম্ভব হয়।

এর আগে গত বছর জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল, একটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার শনাক্ত করে চিকিৎসা দেবার পদ্ধতি উদ্ভাবন করে।

ঐ পরীক্ষায় ৫০০ ডলারের মতো খরচ হবে। কিন্তু তার তুলনায় এই পরীক্ষাতে খরচ কম হবে কি না তা এখনো জানা যায়নি।

ক্যান্সার সেল

ক্যান্সারের লক্ষণ

মানুষের যত রকম ক্যান্সার হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীর সে সম্পর্কে কোন না কোন পূর্বসংকেত দেয়। কিছু লক্ষণ দেখে আপনি সন্দেহ করতে পারবেন যে আপনার দেহে হয়তো ক্যান্সার হয়ে থাকতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন সেই সংকেত মূলত সাতটি।

• কোন বিশেষ কারণ ছাড়াই হঠাৎ শরীরের ওজন কমতে শুরু করেছে।

• হজম ও মল-মূত্র ত্যাগের অভ্যাসে কোন ধরনের পরিবর্তন হওয়া। যেমন ডাইরিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য। যেমন আপনার হয়ত কোষ্ঠকাঠিন্য নেই কিন্তু সেটিই হচ্ছে ইদানীং। অথবা পাতলা পায়খানা।

• সারাক্ষণ জ্বর বা খুসখুসে কাশি যা ঠিক যাচ্ছেই না।

• শরীরের কোথাও কোন পিণ্ড বা চাকার উপস্থিতি।

• ভাঙা কণ্ঠস্বর যা কোন চিকিৎসায় ভালো হচ্ছে না।

• তিল বা আঁচিলের সুস্পষ্ট পরিবর্তন।

• শরীরের কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ।

মোটা দাগে এই উপসর্গ বা শরীরের সংকেতের কোন একটি যদি দু থেকে তিন সপ্তাহ ধরে থাকে আর সেগুলোর সাধারণ চিকিৎসায় না কমে যায় - তবেই ক্যান্সার শব্দটি মাথায় রেখে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

সূত্র: বিবিসি

ডিএস/এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ