ঢাকা,মঙ্গলবার 8 January 2019, ২৫ পৌষ ১৪২৫, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গা বিতাড়ন অব্যাহত রেখেছে সৌদি আরব

৭ জানুয়ারি, মিডল ইস্ট আই : আটককৃত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে সৌদি আরব। গত রবিবার জেদ্দার শুমাইসি আটক কেন্দ্রে থাকা বেশ ক’জন রোহিঙ্গাকে বিতাড়নের জন্য প্রস্তুত করতে দেখা গেছে। নিজেদের হাতে পৌঁছানো কয়েকটি ভিডিও ফুটেজকে উদ্ধৃত করে খবরটি জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও সৌদি আরব থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের প্রস্তুতির খবর জানিয়েছিল সংবাদমাধ্যমটি।

গত বছরের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই’র দীর্ঘ চার মাসের অনুসন্ধানে জানা যায়,কোনও অভিযোগ ছাড়াই সৌদি আরবে বেশ কয়েক বছর ধরে আটক রাখা হয়েছে কয়েকশ রোহিঙ্গা পুরুষ নারী ও শিশুদের। এদের বেশিরভাগ ২০১১ সালের পর মিয়ানমারের নিপীড়ন এড়াতে ও জীবিকার তাগিদে তেল সমৃদ্ধ দেশটিতে পৌঁছায় ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপাল থেকে ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব পাড়ি জমাচ্ছে। সৌদি আরবে প্রবেশের পরই বিদেশি পাসপোর্টধারী সবাইকে সৌদি অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে আঙুলের ছাপ দিতে হয়। ২০১০ সালে এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এতে করে ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে আসা রোহিঙ্গারা ধরা পড়ছে। এই ব্যবস্থার আগে যাদের আটক করা হয়েছে তাদেরকে চিহ্নিত করতে স্থানীয় রোহিঙ্গাদের সহায়তা নেওয়া হতো।

গত রবিবার সৌদি আরব থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন নিয়ে আরও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মিডল ইস্ট আই। এদিন শুমাইসি আটক কেন্দ্রে গোপনে ধারণ করা কিছু ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে। মিডল ইস্ট আইয়ের দাবি, বেশ ক’জন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি অব্যাহত রেখেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। রবিবার শুমাইসি আটক কেন্দ্রের রোহিঙ্গাদেরকে সারিবদ্ধভাবে প্রস্তুত করতে দেখা গেছে। যেসব রোহিঙ্গা এর বিরোধিতা করছিলো, তাদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে রাখতে দেখা গেছে ভিডিওতে।

আটককেন্দ্রে থাকা এক ব্যক্তিকে রোহিঙ্গাদের ভাষায় কথা বলতে দেখা গেছে। তিনি বলছিলেন, ‘আমি গত ৫-৬ বছর ধরে এখানে আছি, এখন তারা আমাকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে, আমার জন্য দোয়া করবেন।’

মিডল ইস্ট আই জানায়, আরেক ভিডিওতে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর আলামত পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করে এক রোহিঙ্গা বন্দি বলেন, ‘রাত ১২টার দিকে তারা আমাদের কক্ষে আসে, ব্যাগ গুছিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলে। এখন আমাকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে এবং এমন এক দেশে নেওয়া হচ্ছে যে দেশ আমার নয়। আমি রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি নই।’  

১৯৫১ সালে রিফিউজি কনভেনশন অনুযায়ী কোনও শরণার্থী নীতি নেই সৌদি আরবেরর। ফলে শরণার্থীদের কাজের অনুমতি কিংবা চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয় না দেশটির।  দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে সৌদি আরবেই সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। ১৯৭৩ সালে বাদশা ফয়সালের সময় মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়। সেদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়।

মিয়ানমারে জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখ রোহিঙ্গা

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট অন রিটার্ন অব ডিসপ্লেসড পার্সন্স ফ্রম রাখাইন স্টেট’ নামে  বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেওয়ার সুনিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ বলছে,এখন পর্যন্ত কোনও রোহিঙ্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার।

সৌদি আরব থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের নিন্দা জানিয়েছেন রোহিঙ্গা মানবাধিকারকর্মী নায় সান লোয়িন। মিডল ইস্ট আইকে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে যদি রোহিঙ্গা বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হতো, তবে তারা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে থাকা পরিবারের সদস্যদের সহায়তা দিতে পারতেন। তারা অপরাধী নয় যে তাদেরকে হাতকড়া পরিয়ে রাখতে হবে। তাদের সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের অপরাধীর মতো আচরণ দেখে আমি ব্যথিত হয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন তাদেরকে শরণার্থী শিবিরে পাঠানো হবে এবং বাংলাদেশে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাবে।’ বিতাড়িত না করে আটককৃত রোহিঙ্গাদেরকে মুক্তি দিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন লোয়িন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ