ঢাকা,মঙ্গলবার 8 January 2019, ২৫ পৌষ ১৪২৫, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রধানমন্ত্রীর চতুর্থ মাত্রার অভিযাত্রা ও সুশাসন

২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি রোববারের পর দুনিয়ার ইতিহাসে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি সোমবার দিনটিও লাল অক্ষরে লিখা থাকবে। ২০১৪ সালের ঐ দিন বাংলাদেশের ভোটারদের মধ্যে আড়াই শতাংশেরও কমসংখ্যক ভোটারের সমর্থন নিয়ে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া একটি পরিহাসের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নামক একটি দল জাতীয় সংসদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসন দখল করে একটি নতুন সরকার গঠন করেছিল। ঐ সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাসকদল ও তার জোটের প্রার্থীরা এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে জনগণের প্রতিরোধের মুখে এবং তাদের অংশগ্রহণ ছাড়াই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরীক দলগুলো এতে অংশগ্রহণ করেছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক কোন সংস্থাই বলতে গেলে এতে পর্যবেক্ষক পাঠাননি, একমাত্র ফেমা এবং আওয়ামী লীগের বশংবদ দু’একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া। ঐ নির্বাচনে সরকার ও তার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে ভয়ভীতি এবং প্রলোভন দেখিয়েও ভোটারদের কাছে টানতে পারেনি। অনির্বাচিত এই সংসদ নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তার তৃতীয় মাত্রার অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন। বিনা বাধায় তিনি এই সংসদ ও তার থেকে সৃষ্ট সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারী চতুর্থ মাত্রার অভিযাত্রা শুরু করেছেন। ২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর যে নির্বাচনটি করেছে তা অভূতপূর্ব। ২০১৪ সালে তৎকালীন নির্বাচন তৎকালীন নির্বাচন কমিশন, সরকারি প্রশাসন এবং আইন-শৃৃঙ্খলা বাহিনী আপ্রাণ চেষ্টা করেও ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আনতে পারেনি। এবার তারা কৌশল পরিবর্তন করে সকলে মিলে গ্রেফতার নির্যাতন ও হুমকি-ধামকির মাধ্যমে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসা থেকে বিরত রেখে পরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ দলের প্রতীকে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে সেই দলকে বিজয়ী করেছেন। বিরোধী দলের প্রার্থীদের যেমন প্রচার প্রচারণা চালাতে দেয়া হয়নি তেমনি তাদের পোলিং এজেন্টদেরও দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া হয়েছে। বিবিসি সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এর রিপোর্ট ও ভিডিও ক্লিপ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। জামায়াতের ২২টি আসনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, এই আসনগুলোতে আপ্রাণ চেষ্টা করে সকাল ১১টা পর্যন্ত তারা টিকে ছিলেন। এর মধ্যে অন্তত ১২টি আসনে দলটির প্রার্থীদের বিজয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। এ অবস্থায় তাদের আর এগুতে দেয়া হয়নি। সকাল ১১টার পরই অভিযোগ অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা বিরোধী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে কেন্দ্রের দখল নেয় এবং ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট কেন্দ্রে আসা থেকে বিরত রাখে ও ইচ্ছামত কারচুপির আশ্রয় নেয়। ভোটের প্রবণতা থেকে এটা পরিষ্কার বুঝা যায়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এই সময় পর্যন্ত দিনাজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছে ৭৮ হাজার ৯২৮ ভোট, দিনাজপুর-৬ আসনে ৬৯ হাজার ৭৬৯ ভোট, নীলফামারী-২ আসনে ৭৯ হাজার ৭৪৮ ভোট, নীলফামারী-৩ আসনে ৪৪ হাজার ৯৩ ভোট, গাইবান্ধা-১ আসনে ৬৫ হাজার ১৭৩ ভোট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে ৫৯ হাজার ৫১৭ ভোট, ঝিনাইদহ-৩ আসনে ৩২ হাজার ২৪৯, খুলনা-৫ আসনে ৩২৯৫৯, সাতক্ষীরা-৪ আসনে ৩০ হাজার ৪৮৬, সাতক্ষীরা-২ আসনে ২৭ হাজার ৭১১, ঢাকা-১৫ আসনে ৩৯ হাজার ১৭৫ ভোট এবং চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ৫২ হাজার ৫৫৬ ভোট পেয়েছেন। এই ১২টি আসনে জামায়াত দলীয় প্রার্থী গড়ে পেয়েছে ৫১০০০ ভোট। ভোটের স্বাভাবিক প্রবাহ যদি বাধাহীন থাকতো এবং ভোটাররা যদি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতেন তাহলে এই ১২টি আসনে তাদের জয় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। একইভাবে অন্য ১০টি আসনে জামায়াত প্রার্থীদের অবস্থাও অত্যন্ত ভাল ছিল। মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। ভোটাধিকার হরণের এই দৃষ্টান্ত নজিরবিহীন। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে এই নজিরবিহীন কারচুপি ও সন্ত্রাসে সারা দুনিয়া স্তম্ভিত; জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সুজন এর নিন্দা জানিয়েছেন এবং ভোট চলাকালে দুপুরেই জামায়াত এর প্রতিবাদে নির্বাচন বর্জন করে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। একইভাবে বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন প্রভৃতি দল ও জোটও ফলাফল বর্জন করে পুনঃতফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। কারচুপির এই নির্বাচনে বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যজোটের প্রার্থীদের দেয়া হয়েছে ৭টি আসন। অবশিষ্ট আসনগুলো ক্ষমতাসীন জোট ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এই অবস্থায় ঐক্যজোটভুক্ত ৭ জন এমপি শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অবশিষ্টরা শপথ নিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো সরকার প্রধান হিসাবে ৪৭ সদস্যের মন্ত্রী সভা গঠন করেছেন। এতে পুরাতন মন্ত্রীদের মধ্যে ৩৬ জন বাদ পড়েছেন এবং নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ৩১ জন।   এই মন্ত্রী সভার আকেরটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি নিখাত আওয়ামী লীগের মন্ত্রী সভা, ১৪ দলীয় জোটের অন্যান্য শরিক দলের কেউ এই মন্ত্রী সভায় ঠাই পাননি। জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি নতুন সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসাবে কাজ করবেন এবং এরশাদ হবেন বিরোধী দলীয় নেতা। ক্ষমতাসীন দল এতে খুবই উৎফুল্ল; তাদের বিজয়ে উৎফুল্ল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী গত রোববার সারা দেশের ৬৩৩টি থানায় পুলিশ বাহিনীর তরফ থেকে ভোজ ও কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। এটি অভূতপূর্ব একটি ঘটনা। বিজয়ের রেশ হিসাবে নোয়াখালী ও মৌলভীবাজারে নারীর শ্লীলতাহানির দুটি ঘটনা ও তানোরে একটি গ্রামের ভোটারদের শাস্তি হিসাবে বিদ্যুৎ, যানবাহন চলাচল ও হাট-বাজার বন্ধ করে দেয়া ছাড়া অন্যকোন দুর্ঘটনার ব্যাপক কোন খবর পাওয়া যায়নি।
নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। দেশ ভাল থাকুক, দেশের মানুষ ভাল থাকুক এবং তারা দলমত নির্বিশেষে দেশের মানুষের সাথে মানুষের মত আচরণ করুন এটাই সকলের কামনা।
বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে আইনের শাসন। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চতুর্থ বারের ন্যায় সরকার গঠন করেছেন। ৩০ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি এবং প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে নির্বাচনের আগের রাতে এবং  নির্বাচনের দিন ব্যালট পেপারে নৌকা মার্কায় সীল মেরে বাক্স ভর্তি করেছে এই অভিযোগ সর্বত্র। কিন্তু এই অভিযোগে কোথাও কোন মিছিল হয়নি। আন্দোলনের কোনও কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি ধানের শীষে ভোট দেয়ার কারণে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের পারুল বেগম যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন তার বিরুদ্ধেও লক্ষণীয় কোন হরতাল বিক্ষোভ হয়নি। এ ক্ষেত্রে ধারনা করা যায় যে ২০১৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনের ন্যায় এই নির্বাচনটিও আওয়ামী লীগ হজম করতে সক্ষম হবে। কোন দেশ কোন সংস্থা কি বললো সেটা বিচার্য হবে বলে মনে হয় না। অর্থাৎ ভোরের সূর্য দিনের আবহাওয়ার যদি মাপকাঠি হয় তাহলে বলা যায় যে আওয়ামী লীগের দিনগুলো ভালই যাবে। এবং এ ক্ষেত্রে নতুন সরকারের জন্য আমার কয়েকটি পরামর্শ আছে। এই সরকারের চ্যালেঞ্জ অনেক। এগুলোর মধ্যে সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, সামাজিক অবক্ষয় রোধ, দেশব্যাপী রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হানাহানি বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার ফিরিয়ে এনে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পূন:প্রতিষ্ঠা, বিচারবিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস রোধ প্রভৃতি প্রধানমন্ত্রী তার প্রশাসন পরিচালনায় দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি দলের প্রধানমন্ত্রী নন, দেশের প্রধানমন্ত্রী, দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে তাকে প্রশস্ত দিল হতে হয় এবং তিনি যদি তা হতে পারেন তাহলে সকলের জন্যই মঙ্গল। এখন আইনের শাসন প্রসঙ্গে আসি।
উনবিংশ শতাব্দির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডিকের কথা আমার মনে পড়ে। তিনি আইনের শাসনের একটা সংজ্ঞা দিয়েছেন যা সার্বজনিন সংজ্ঞা হিসেবে স্বীকৃত। তার মতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনটি উপাদান প্রয়োজন। এগুলো হচ্ছে:
1. That there should be no sanction without breach, meaning that nobody should be punished by the state unless they had broken a law.
2. That one law should govern, everyone, including both ordinary citizen and state officials.
3. That if the rights of the individuals were not secured by a written Constitution it is secured the decisions of judges in ordinary law.
অর্থাৎ (১) আইন ভঙ্গ না করা পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেয়া যাবে না (২) একই ভাবে সাধারণ জনগণও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা সকলের বেলায় আইন সমভাবে প্রযোজ্য হবে। (২) ব্যক্তি অর্থাৎ নাগরিকের অধিকার যেখানে লিখিত সংবিধান দ্বারা নিশ্চিত হয়নি সেখানে আদালতের রায়ে তা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
আইনের শাসনের উপরোক্ত তিনটি উপাদান যদি প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত করতে পারেন তা হলে তার পথ চলা সহজ হতে পারে। আমি শুধু ভবিষ্যতের কথা বলছি না, গত ১০ বছরে সুশাসনের এই অপরিহার্য উপাদানগুলোর প্রত্যেকটিই মর্মান্তিকভাবে লংঘিত হয়েছে। বিনা অপরাধে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী লক্ষ লক্ষ লোককে শাস্তি দেয়া হয়েছে।
নাশকতা করেনি অথচ নাশকতার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তারা গ্রেফতার হয়েছেন পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন এবং বেড়াচ্ছেন। আইনের প্রয়োগ সকলের জন্য সমান হয়নি। আইনের প্রয়োগ সকলের জন্য সমান হয়নি। ফলে সংবিধান লংঘিত হয়েছে এবং মানুষ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই ভাবে বিচারের আদালত ও ইনসাফ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালীদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা জন্মেছে। এই অবস্থার অবসান একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই করতে পারেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ