ঢাকা,মঙ্গলবার 8 January 2019, ২৫ পৌষ ১৪২৫, ১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)

হযরত আসমা ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) এর কন্যা। তার মাতা ফাতীলা ছিলেন কোরাইশের প্রসিদ্ধ ও সম্মানিত সর্দার আবদুল উযযার কন্যা। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর ছিলেন তার আপন ভাই এবং হযরত আয়েশা ছিলেন তার সৎ বোন এবং বয়সে তার চেয়ে ছোট। তার লকব বা উপাধী ছিল যাতনুনেতাকাইন বা দুই-নেতাকওয়ালী। এ সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, মক্কার কাফেররা নবীজীকে সব রকম অত্যাচার-নির্যাতন এমন কি হত্যা করার জন্য উদ্যত হলে তিনি মক্কা ছেড়ে মদীনা হিজরত করার সংকল্প করেন। অবশেষে এক রাতে রাসূল (সা.) হযরত আবু বকর (রা.) কে সঙ্গে নিয়ে মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং মক্কার অদূরে সাওর পর্বতের একটি গুহায় অবস্থান করেন। কাফেররা তাদের সন্ধানে চারিদিকে ছুটাছুটি করে, এমনকি সে গুহার মুখ পর্যন্ত বার বার হাযির হয়। কিন্তু যেহেতু নবুওয়াতের আলোকে দুনিয়াকে আলোকিত করা আল্লাহ ইচ্ছা ছিল, তাই কাফেররা তাঁর কাছে পৌঁছতে পারেনি। যারা গুহায় আটক অবস্থায় হযরতের সাহায্য সহযোগিতা করেন, হযরত আসমা ছিলেন তাদের একজন। তিনি রাত্রিতে তাঁদের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন এবং রাত্রেই ফিরে আসতেন।
হযরত আসমার ভাই আবদুল্লাহ তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি সারাদিন কাফেরদের ইচ্ছা আর পরামর্শ সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতেন এবং রাত্রে নবীজীকে সব জানাতেন। হযরত আবু বকর (রা.) এর মেষ পালক আগের রাতের বেলা মেষ নিয়ে গুহায় মুখে হাযির হতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ দিয়ে ফিরে আসতেন। এমনিভাবে মেষের যাতায়াতের ফলে হযরত আসমা এবং তার ভাই আবদুল্লাহ পদচিহ্ন মুছে যেতো। এ কারণে কাফেররা গুহা খুঁজে বের করতে সক্ষম হতো না। নবীজীকে খুঁজে বের করার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হলে কাফেরা তার সন্ধানদাতাকে  একশ উট পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। তৃতীয় রাতে হযরত আসমা খাবার নিয়ে গেলে নবীজী তাকে বলে, আলীকে বলবে তিনটি উট এবং রাস্তা সম্পর্কে ওয়াকেফহাল একজন লোক নিয়ে কাল রাতে গুহার সামনে উপস্থিত হতো। কথামতো হযরত আলী যথাসময়ে তিনটি উট এবং একজন রাহবর সঙ্গে নিয়ে হাযির হন। হযরত আসমাও দু’তিন দিনের খাবার নিয়ে হাযির হন। নাস্তা এবং পানির মশক বাঁধার জন্য রশি দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে হাতের কাছে কোন রশি নেই। হযরত আসমা নেতাক  বা উড়না খুলে দু’টুকরো করে রশির কাজ সারেন। এক টুকরা দিয়ে নাস্তা আর অপর টুকরা দিয়ে মশকের মুখ বন্ধ করা হয় তখন দরবারে নবুওয়াত থেকে তাকে যাতুননেতাকাইন উপাধী দেওয়া হয়। চৌদ্দশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ উপাধী তার নামের সাথে যুক্ত হয়ে আছে।
উল্লেখ্য যে, কামীজ-এর উপরে যে রুমাল বা উড়না পরিধান করা হয়, আরবে তাকে নেতাক বলা হতো। হিজরতের ২৭ বৎসর আগে মক্কা শরীফে তার জন্ম হয়। তখন তার পিতার বয়স ২০ বছরের কিছু বেশি। নবীজীর ফুফাতো ভাই হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম এর সাথে তার বিয়ে হয়। হযরত আসমা ছিলেন বড় উঁচু স্তরের মহিলা সাহাবী। মক্কায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি নবীজীর হাতে বায়রাতের গৌরব অর্জন করেন। প্রথমে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। ১৭ জনের পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
রাসূল (সা.) এবং হযরত আবু বকর (রা.) মদীনা মুনাওওয়ারা পৌঁছার পর নিশ্চয়তা ফিরে এলে মহিলাদেরকে নেওয়ার প্রস্তাব হয়। নবীজী যায়েদ ইবনে হারেসা এবং গোলাম আবু রাফেকে মক্কায় প্রেরণ করেন। হযরত আবু বকরও একজন লোক প্রেরণ করেন। তার পুত্র আবদুল্লাহ, মাতা এবং দুবোন হযরত আসমা ও হযরত আয়েশাকে নিয়ে মক্কা রওয়ানা হন। হযরত আসমা কোবা নামক স্থানে পৌঁছলে আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়ের এর জন্ম হয়। হযরত আসমা প্রিয় পুত্রকে নবীজীর খেদমতে নিয়ে যান তিনি নবজাতককে কোলে নিয়ে খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দেন এবং তার জন্য দোয়া করেন। হিজরতের পর ইসলামে এ হচ্ছে প্রথম সন্তানের জন্ম। হযরত আসমার গর্ভে হযরত যুবায়ের এর পাঁচ পুত্র-আবদুল্লাহ্, ওরওয়া, মুনযের, আছেম ও মুহাজের এবং তিন কন্যা খাদীজা, উম্মুল হাসান, ও আয়েশা জন্ম গ্রহণ করেন। হযরত আসমা ছিলেন অত্যন্ত বিনয় ও নম্র স্বভাবের মহিলা। কষ্ট-ক্লেশ করতে তিনি কোন লজ্জা বোধ করতেন না। স্বামীর অভাব-অনটন, গৃহের দায়িত্ব পালন ইত্যাদি কাহিনী তিনি নিজেই বর্ণনা করেন:
যুবায়ের ইবনুল আওয়াম এর সাথে আমার যখন বিয়ে হয়, তখন তার ধন-দৌলত, খাদেম নৌকর কিছুই ছিল না। তখন তিনি ছিলেন একেবারেই নিঃস্ব। কেবল একটা ঘোড়া আর একটা উট ছিল। আমিই এর দেখাশুনা করতাম। রাসূল (সা.) যুবায়েরকে এক খণ্ড খেজুর বাগান দান করেন। এ খেজুর বাগান ছিল মদীনার অদূরে। আমি প্রতিদিন সেখানে থেকে মাথায় করে খেজুরের বীচি ঘরে আনতাম, নিজে তা কুটে ঘোড়াকে খাওয়াতাম। বালতি দিয়ে পানি তুলতাম। ঘরের সমস্ত কাজ-কর্ম নিজ হাতে করতাম। যেহেতু আমি ভালো রুটি তৈয়ার করতে পারতাম না, তাই আমি শুধু আটা মলে রাখতাম। আমার ঘরের কাছেই থাকতেন আনসারের স্ত্রীরা। নিষ্ঠা-ভালোবাসায় এ স্ত্রীরা পরের কাজ করে আনন্দ পেতেন। তারা আমাকে রুটি তৈয়ার করে দিতেন। প্রতিদিন আমাকে এসব কষ্ট সইতে হতো। একদিন আমি খেজুর বাগান থেকে খেজুরের বীচি মাথায় করে নিয়ে আসছিলাম। পথিমধ্যে নবীজীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তার সাথে অন্যান্য সাহাবীরাও ছিলেন। তিনি আমাকে উটের পিঠে তুলে নেয়ার জন্য তার উট বসান। কিন্তু লজ্জা আমায় অনুমতি দেয়নি। তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে, লজ্জার কারণে আমি তার সাথে উটের পিঠে বসছি না, তখন তিনি চলে যান। আমি ঘরে ফিরে স্বামী যুবায়ের-এর নিকট এ কাহিনী বলি। তিনি বললেন, আল্লাহ্ জানেন, তোমার মাথায় করে খেঁজুরের বীচি বয়ে আনা তার সাথে বসার চেয়ে আমার কাছে কঠিন। কিছুদিন পর আমার পিতা হযরত আবু বকর (রা.) আমার জন্য একজন খাদেম পাঠান। এর ফলে ঘোড়ার সেবা থেকে আমি মুক্তি পাই। বিপদ থেকে অনেকাংশে অব্যাহতি লাভ করি।
ইসলাম গ্রহণ কালে হযরত আবু বকর (রা.) এর নিকট প্রায় ১ লক্ষ দিরহাম ছিল। কিন্তু দ্বীনের খাতিরে তিনি সব সম্পাদই নবীজীর সাহায্যে ব্যয় করেন। হিজরতের সময় তার কাছে দেড়-দু’হাজার দিরহামের বেশি ছিল না এ নিয়েই তিনি মক্কা থেকে মদীনা গমন করেন আর সন্তানদেরকে আল্লাহ্র হাতে ছেড়ে যান। হযরত আসমা পিতাকে বিদায় দিয়ে ঘরে ফিরে আসেন। হযরত আবু বকর-এর পিতা আবু কোহাফা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। বয়সের ভারে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। দৃষ্টি শক্তিও রহিত। পিতা আবু কোহাফা ভোরে হযরত আসমার ঘরে আসেন এবং অতি দুঃখের সাঙ্গে বলেন, আবু বকর নিজেও চলে গেছে, টাকা-কড়িও সব নিয়ে গেছে। হযরত আসমা তার মনকে সান্ত¡না দেওয়ার জন্য একটি থলিতে পাথর ভরে তাকের মধ্যে সে স্থানে রাখেন, যেখানে আবু বকর টাকা-কড়ি রাখতেন। তিনি আবু কোহাফাকে বলেন, দাদাজান! আব্বা তো আমাদের জন্য অনেক টাকা কড়ি রেখে গেছেন-এই বলে তিনি তাঁর হাত তাকের মধ্যে রাখেন। আবু কোহাফা হাতড়িয়ে দেখে মনে করেন, সত্যিই বুঝি টাকা-কড়ি আছে। এমনি করে তার মনে সান্ত¡না আছে। হযরত আসমা বলেন, আমি কেবল তার সান্ত¡নার জন্য এমনটি করেছি। আসলে ঘরে একটা দানা কড়িও ছিল না। হযরত আসমার মাথা ব্যথা দেখা দিলে তিনি মাথায় হাত রেখে বলতেন, হে আল্লাহ! যদিও আমি অনেক গুনাহগার, কিন্তু তুমি তার চেয়েও বড় ক্ষমাশীল। একবার তার ঘাড়ে ব্যথা দেখা দেয়। নবীজী ব্যথার স্থানে হাত রেখে বলেন, আল্লাহ তোমার এ কষ্ট দূর করুন। দুঃখ দৈন্যের কারণে হযরত আসমা পারিবারিক ব্যাপারে অত্যন্ত হিসেব করে চলতেন। সব কিছুই প্রয়োজন অনুপাতে মেপে-ঝেঁপে ব্যয় করতেন। নবীজী তাকে নিষেধ করে বলেন, মেপে-ঝেঁপে ব্যয় করবে না। এমনটি করলে আল্লাহ ও তোমাকে তাই দেবেন। নবীজীর কথায় তিনি এ অভ্যাস ত্যাগ করেন। হযরত আসমা ছিলেন পাকা ঈমানের মুসলিম মহিলা। এ কারণে মুশরেকরা ছিল তার কঠোর শত্রু। একবার তার মাতা কিছু হাদিয়া-তোহফা নিয়ে তাকে দেখতে আসেন। যেহেতু তখনও তিনি ছিলেন মুশরেক, তাই তিনি মাতার হাদিয়া গ্রহণ করেননি, তাকে ঘরে উঠতেও দেননি। হযরত আয়েশার কাছে খবর পাঠান যে, আপনি নবীজীকে জিজ্ঞেস করে নিন, এ ক্ষেত্রে আমি কি করবো আর তার হুকুম কি? নবীজী জানান যে, হাদিয়া গ্রহণ কর এবং তাকে ঘরে মেহমান হিসেবে থাকতে দাও। আল্লাহ নির্দেশও তাই। কালামুল্লাহয় বলা হয়েছে: যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি আর তোমাদের গৃহ থেকে বিতাড়িতও করেনি, তাদের সাথে সদাচারণ এবং ইনসাফের আচরণ করতে আল্লাহ্ বারণ করেন না, কারণ যারা ইনসাফের আচরণ করে, আল্লাহ্ তাদেরকে ভালোবাসেন। আল্লাহতো তোমাদেরকে বারণ করেন এমন লোকদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতে, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং তোমাদেরকে গৃহ থেকে বিতাড়িত করেছে এবং তোমাদেরকে বিতাড়িত করার ব্যাপারে সাহায্য করেছে। আর যারা এদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তারাই যালেম। (সূরা মুমতাহিনা: ৮-৯)
এরপর তিনি হাদিয়া গ্রহণ করেন এবং মাতাকে আপন গৃহে অবস্থানের অনুমতি দেন। পরবর্তীকালে অনেক ধন-সম্পদের মালিক হলেও ইসলামের সরল ও অনাড়ম্বর জীবন-যাপনের ধারা তিনি ত্যাগ করেননি। তিনি সব সময় মোটা কাপড় পরতেন, শুকনা রুটি খেতেন, ফকীরের ন্যায় জীবন যাপন করতেন। তার সরল-অনাড়ম্বর জীবন যাপনের প্রমাণ হিসেবে একটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়।
তার পুত্র মুনযের ইরাক যুদ্ধে বিজয় লাভ করে গৃহে ফেরার সময় নারীদের জন্য নক্সা করা কিছু চিকন কাপড়’ নিয়ে আসেন। কাপড় নিয়ে মায়ের খেদমতে হাযির হন। মা তখন বার্ধক্যের কারণে দৃষ্টি শক্তি হারা। তিনি হাত দিয়ে স্পর্শ করে কাপড় সম্পর্কে জানতে পেরে রাগান্বিত হন। এ মিহিন কাপড় পরতে তিনি অস্বীকার করেন। পুত্র মুনযের পরে মোটা কাপড় এনে দিলে খুশি হয়ে তা গ্রহণ করেন এবং বলেন, পুত্র ! আমাকে এমন কাপড় পরাবে।
উদারতা-দানশীলতা : তার মধ্যে উদারতা-দানশীলতা ছিল অনেক বেশি। ছেলেদেরকে সর্বদা উপদেশ দিয়ে বলতেন, অন্যের কল্যাণ বিধান, তাদের সাহায্যের জন্যই তোমাদের টাকা-কড়ি, ধন-দৌলত, জমা করে রাখার জন্য নয়। তোমরা যদি টাকা-পয়সা আল্লাহ সৃষ্টিকুলের জন্য ব্যয় না করে কার্পণ্য কর, তবে আল্লাহ্ও তোমাদেরকে তার দান-অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করবেন। তোমরা যা কিছু ইচ্ছা করবে বা ব্যয় করবে, আসলে তা-ই হবে তোমাদের জন্য উত্তম সম্বল। এ এমন এক সঞ্চয়, যা কখনো কমবে না, তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও নেই। তিনি কোন সময় অসুখে পড়লে দাস-দাসীকে মুক্ত করে দিতেন। হযরত আয়েশা ইন্তিকালের সময় একখ- ভূমি রেখে যান, তা হযরত আসমার ভাগে পড়ে। তিনি তা এক লক্ষ দিরহামে বিক্রি করে সবই আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। হযরত যুবায়ের-এর মেজায ছিল খুব কড়া। তাই তিনি নবীজীকে জিজ্ঞেস করে নেন যে, স্বামীর অনুমতি না নিয়ে আমি তার মাল ফকীর-মিসকীনকে দিতে পারি কি-না? নবীজী বললেন, হ্যাঁ , দিতে পার। একবার তার মাতা মদীনা মুনাওয়ারা এসে তার কাছে কিছু টাকা দিতে বলেন। তিনি নবীজীকে জিজ্ঞেস করেন, আমার মাতা মুশরেকা। তিনি আমার কাছে টাকা চান। এমতাবস্থায় আমি তাকে সাহায্য করতে পারি কি? নবীজী বললেন, হ্যাঁ, তিনিতো তোমার মা। অর্থাৎ তুমি তার সাহায্য করতে পার।
সাহস ও চরিত্র : হযরত আসমা ছিলেন সুন্দর চরিত্রের মূর্ত প্রতীক। নিষ্ঠা-আন্তরিকতা ছিল তার স্বভাব ধর্ম। আপনজদের কল্যাণ চিন্তায় তিনি সদা মগ্ন থাকতেন। একবার হযরত (সা.) সূর্য গ্রহণের নামায পড়াচ্ছিলেন। তিনি নামায অনেক দীর্ঘায়িত করেন। হযরত আসমা ঘাবড়ে যান। তিনি ক্লান্ত হয়ে এদিক-ওদিক দেখেন। তার পাশে আরও দু’জন মহিলা ছিলেন। একজন মোটা-সোটা, অপরজন হেংলা-পাতলা ও দুর্বল। এরা দাঁড়িয়ে আছে দেখে তিনি সাহস পান। তিনি মত পরিবর্তন করে বলেন, আমারতো এদের চেয়ে বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকা উচিৎ। নামায শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। নামায কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়। শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বেহুঁশ হয়ে গেলে মাথায় পানি দিতে হয়।
গুণ-বৈশিষ্ট্য : অনেকেই হযরত আসমার ভক্ত ছিলেন এবং একান্ত ভক্তি সহকারে তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে আসতেন। তাঁর পবিত্রতা ও মহত্বের ব্যাপক খ্যাতি ছিল। অনেকেই তাঁর কাছে দোয়ার জন্য আসতেন। বিপদের সময় খাছভাবে দোয়ার জন্য আসতেন। কোন নারীর জ্বর হলেও তার কাছে দোয়ার জন্য আসতো। তিনি মহিলার বুকে পানি ছিটিয়ে দিয়ে বলতেন, নবীজী বলেছেন, জ্বর হচ্ছে জাহান্নামের আগুনের তাপ। পানি দিয়ে তা ঠা-া করবে। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তিনি নবীজীর জুব্বা-যা হযরত আয়েশার(রা:) ইন্তিকালের সময় হযরত আসমাকে দিয়ে যান-ধুয়ে পানি পান করাতেন। তিনি কয়েকবার হজ্ব করেন। প্রথমবার নবীজীর সঙ্গে হজ্ব করেন নবীজী থেকে তিনি প্রায় ৫৬টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এসব হাদীস বুখারী-মুসলিমে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। যে সব রাবী তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো,
আবদুল্লাহ, ওরওয়া, ফাতিমা ইবনেতে মুনযের, ইবনে যুবায়ের, ইবনে আব্বাস, ইবনে আবী মুলাইকা, ওয়াহাব ইবনে কায়সান, মুসলিম মুয়াররি প্রমুখ। তিনি ছিলেন সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারিণী। তার বিশ্বাস ছিল দৃঢ়, অন্তর ছিল বলিষ্ট, ধৈর্য ছিল অটুট আর ছবর ছিল অঢেল।
তালাক : হযরত যুবায়ের কর্তৃক হযরত আসমাকে তালাক দেয়ার ব্যাপারটি সব গ্রন্থকারই সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন। তালাকের কারণ কেউই উল্লেখ করেননি। ইবনুল আসীর বলেন, তালাকের দুটি কারণ ছিল। এক হযরত আসমা খুব বয়স্কা ছিলেন, বয়সের কারণে তিনি দৃষ্টি শক্তিও হারান। এ কারণে হযরত যুবায়ের তাকে বিচ্ছিন্ন করতে বাধ্য হন। দুই, উভয়ের সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হওয়ার ফলে তালাক হয়েছে। আমাদের মতে প্রথম কারণটি গ্রহণযোগ্য নয় এজন্য যে, তখন পর্যন্ত ইসলামের নৈতিক শিক্ষার ভিত এতটা দুর্বল হয়নি যে, হযরত যুবায়ের-এর মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ অপরাধে স্ত্রীকে তালাক দেবেন যে, সে বৃদ্ধা হয়ে গেছে। অন্য কারণ আছে বিধায় আন্দাজ-অনুমানও এটা মেনে নিতে অক্ষম। অবশ্য দ্বিতীয় কারণটি বুঝে ধরে এবং এটা হওয়া সম্ভবও। কারণ, হযরত যুবায়ের এর মেযাজ ছিল কঠোর এবং তিনি বাড়াবাড়ি করতেন এটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। পারস্পরিক বিরোধের ফলে তিক্ততা দেখা দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত যা তালাকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রেওয়াতে এবং দেরয়াত উভয় অবস্থায়ই প্রথম কারণেই তুলনায় দ্বিতীয় কারণ অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়। উপরন্তু ইবনুল আসীর-এর আর একটি বর্ণনা থেকেও আমাদের মতের সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, একবার কোন এক ব্যাপারে হযরত যুবায়ের হযরত আসমার উপর ক্রুদ্ধ হন। এমনকি মারপিট পর্যন্ত গড়ায়। হযরত আসমা পুত্র আবদুল্লাহ্র সাহায্য চান হযরত যুবায়ের পুত্র আবদুল্লাহকে আসতে দেখে বলেন, তুমি এখানে এলে তোমার মাকে তালাক দেব। হযরত আব্দুল্লাহ্ বলেন, আপনি আমার মাকে কসমের লক্ষ্যবস্তু করেছেন। এই বলে তিনি যান এবং পিতার হাত থেকে মাতাকে উদ্ধার করেন। যাই হোক, তালাকের পর তিনি পুত্র আবদুল্লাহর কাছে চলে আসেন এবং সেখানেই থাকেন। আবদুল্লাহর মতো অনুগত পুত্র পাওয়াও কষ্টকর। তিনি বৃদ্ধা মাতার আনুগত্য করতেন এবং তার সন্তুষ্টিকে সমস্ত লক্ষ্যের চাবিকাঠি মনে করতেন।
আরব ভূমির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সেখানকার শিশুরা উদার এবং দানশীল হয়ে থাকে, তেমনি বীরত্ব আর সাহসিকতাও তাদের স্বভাবজাত ধর্ম। দানশীলতায় হযরত আসমার যেমন খ্যাতি ছিল, তেমনি বীরত্বের জন্যও তিনি ছিলেন মশহুর। সাঈদ ইবনুল আছ এর শাসনকালে মদীনায় যখন ফেতনা-ফাসাদ-বিপর্যয় দেখা দেয়, শহরে অশান্তি বিরাজ করে, চারিদিকে চুরি-ডাকাতি শুরু হয়, হযরত আসমা তখন শিয়রে খঞ্জর নিয়ে ঘুমাতেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করে, আপনি কেন এমন করেন? জবাবে তিনি বলেন, কোন চোর-ডাকাত এসে আমার উপর হামলা করলে আমি তার ভূড়ি কেটে ফেলবো। তার পুত্র আবদুল্লাহ পরিণত বয়সে হিজরী ৬৬ সালে আরবীয় ইরাকের শাসনকর্তা হন। এটা ছিল এমন সময়, যখন উমাইয়্যা শাসনকর্তা ইয়াযীদ ইসলামে পাপ-অনাচার বিস্তার করা শুরু করে, চারিদিকে বিপর্যয়-অরাজকতা দেখা দেয়। হাজার হাজার লোক এই বিভ্রান্ত ইয়াযীদের হাতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে। কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ ইয়াযীদের হাতে বায়আত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। মক্কাকে কেন্দ্র করে তিনি সেখান থেকে খেলাফতের আওয়ায তোলেন। যেহেতু সকলেই তাঁর বীরত্ব, মহত্ব, সত্যবাদীতা ও সহজ-সরল জীবন ধারার কথা স্বীকার করতো, তাই দলে দলে লোকেরা তার খেলাফতের দাবিতে সাড়া দিয়ে তার প্রতি সমর্থন জানাতে থাকে।
পরবর্তীকালে আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ান উমাইয়্যা সাম্রাজ্যের শাসন-কর্তৃত্ব হাতে নিয়ে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফকে মক্কার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। হাজ্জাজ আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবায়ের-এর সাথে লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং হিজরী ৭২ সালের পয়লা জিলহজ্ব মক্কা অবরোধ করে। মক্কায় রসদ সামগ্রী প্রেরণ বন্ধ করে দেয়। উভয় বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘ ৬মাস ধরে লড়াই চলতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অবরোধের ফলে কাহিল হয়ে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এর সমর্থকদের অনেকেই পলায়ণ করতে বাধ্য হয়। মাত্র গুটি কতেক লোক তার সমর্থক থাকে। এ সময় হযরত আব্দুল্লাহ্ মাতা আসমার খেদমতে হাযির হয়ে আরয করেন:
আম্মাজান! ওফাদারদের বে-ওফায়ী আর অবশিষ্টদের অধৈর্যের ফলে আমি অস্থির হয়ে উঠেছি। কি করি, কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। আপনার অনুমতি পেলে আনুগত্য মেনে নেবো। কারণ, আনুগত্য স্বীকার করে নিলে হাজ্জাজ এবং তার সমর্থকদের কাছে যা কিছু দাবি করবো, সবই তারা মেনে নিতে পারে। জবাবে মাতা হযরত আসমা বলেন, প্রিয় পুত্র ! তুমি ভালো জান। তুমি মনে কর যে, সত্য ও ন্যায়ের জন্য লড়ছ, তাহলে তোমাকে অটল-অবিচল মেনে নেবে না। সম্মানের সাথে তরবারীর আঘাত খাওয়া অপমানের জীবনের চেয়ে অনেক উত্তম। তুমি শাহাদাত বরণ করলে আমি আনন্দিত হবো। আর তুমি নশ্বর দুনিয়ার লোভী প্রমাণিত হলে তোমার চেয়ে খারাপ আর কে হতে পারে? এমন লোক নিজেও খারাপ হয়, আর অপরকেও ধ্বংস ও জিল্লতীর চরমে নিয়ে ছাড়ে। তুমি যদি মনে কর যে, তুমি একা, আনুগত্য ছাড়া আর কোন উপায় নেই; এটা শরীফ লোকদের কাজ নয়। তুমি কতকাল বেঁচে থাকবে? একদিন তো মরতেই হবে। তাই তোমার জন্য উত্তম হচ্ছে সুনাম রেখে মরা। এতে আমি আননিন্দত হবো। মাতার সোনালী উপদেশ শুনে হযরত আব্দুল্লাহ বললেন, আমার আশঙ্কা হচ্ছে সিরীয়রা মৃত্যুর পর আমাকে নানা প্রকার শাস্তি দেবে।
হযরত আসমা জবাবে বলেন, পুত্র তুমি যে আশঙ্কা প্রকাশ করছ, তা নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু বকরী জবাই করার পর তার খাল ছিলে ফেলা হোক, বা তাকে দিয়ে কিমা করা হোক, তাতে বকরীর কোন কষ্ট হয় না।
অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ প্রিয় মাতার হাতে চুমু খেয়ে বলেন, আসলে আমিও তাই মনে করি। আমি সত্যের জন্য দুনিয়াকে তুচ্ছ মনে করি। আমি নিছক দ্বীনের স্বার্থে এ কাজ করছি। আজ আমি লড়াই করে অবশ্যই শাহাদাত লাভ করবো। আপনি কোন দুঃখ, কোন অনুতাপ করবেন না। মা! প্রিয় মা আমার! আজ পর্যন্ত তোমার পুত্র কোন পাপ কাজ করেনি। শরীয়তের বিধান জারীর ক্ষেত্রে ইচ্ছা করে কোন ভুলও করেনি। শাসন কর্তাদের যুলুম-নির্যাতনে আনন্দিতও হয়নি।
অতঃপর আকাশের দিকে মুখ তুলে বলেন, আল্লাহ! তুমি জান, আমি মাকে যা কিছু বলেছি, তা সবই বলেছি তার সান্ত¡নার জন্য, যাতে তিনি অবস্থা দেখে দুঃখ না পান। হযরত আসমা আরো বলেন, প্রিয় পুত্র! আমি আশা করি, তোমার ক্ষেএে আমার ধৈর্য হবে এক নযীরবিহীন ধৈর্য। তুমি আমার সামনে শহীদ হলে তা হবে আমার মুক্তির কারণ, আর তুমি বিজয়ী হলে তা হবে আমার জন্য আনন্দ ও শোকর আদায়ের কারণ। এখন আল্লাহর নাম নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হও এবং পরিণাম কি হয় দেখ।
অতঃপর হযরত আবদুল্লাহ মায়ের নিকট দোয়া চেয়ে লৌহবর্ম পরিধান করে শেষবারের মতো মায়ের সাথে দেখা করতে আসেন। মাতা হযরত আসমা দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। হযরত আব্দুল্লাহকে বিদায় দিতে গিয়ে তার সাথে কোলাকুলি করার সময় হাতে লৌহবর্ম অনুভব করে বললেন, প্রাণ প্রিয় পুত্র আব্দুল্লাহ! যারা শাহাদাতের জন্য আকাঙ্খী, তারা লৌহবর্ম পরিধান করে না। হযরত আবদুল্লাহ বলেন, আমি আপনার মন জয় করার জন্য লৌহবর্ম পরিধান করেছি মাত্র। মাতা বললেন, লৌহবর্ম দ্বারা আমার মনকে তুষ্ট করা যাবে না। বুকে সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। হযরত আব্দুল্লাহ তাই করলেন। একটি কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তিনি ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন, শত্রু বাহিনীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ধীরে  বিক্রমে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত শাহাদত  বরণ করেন।
শাহাদাতকালে আবৃত্তি করা কবিতাটি ছিল এই :
-আমি যখন আমার দিনে অবস্থা দেখি, ধৈর্য ধারণ করি।
আর স্বাধীনচেতা ব্যক্তি তো তার দিন সম্পর্কে ভালোই জানে।

কিন্তু কিছু লোক এমনও আছে, যারা জেনেও অস্বীকার করে।

শাহাদাতের পর হাজ্জাজ হযরত আব্দুল্লাহর লাশ প্রকাশ্য রাজপথে ঝুলিয়ে রাখে। তিন দিন পর হযরত আসমা দাসীকে সাথে নিয়ে এসে দেখেন, নিচের দিকে মাথা দিয়ে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এহেন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে নিজেকে সংবরণ করে তিনি বললেন, ইসলামের ঘোড়সওয়ার দ্বীন-মিল্লাতের জন্য উৎসর্গীকৃত প্রাণ এ বীর।
সত্যবাদীতা ছিল হযরত আসমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের মতো নিষ্ঠুর যালেমের সামনেও সত্য বলতে তিনি ইতস্তত করেননি। বরং তিনি তাঁকে দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেন। হযরত আব্দুল্লাহ্র শাহাদাতের পর হজ্জাজ হযরত আসমার নিকট এসে বলে, তোমার ছেলে আব্দুল্লাহ্ আল্লাহর ঘরে বেদ্বীনী বিস্তার করেছিল, তাই আল্লাহ তার উপর কঠোর শাস্তি নাযিল করেছেন। জবাবে হযরত আসমা বলেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আমার ছেলে বেদ্বীন ছিল না। আমার ছেলে ছিল রোযাদার, রাতে নামাযগুযার, পরহেযগার ও ইবাদতগুযার। পিতা-মাতার একান্ত বাধ্য অনুগত সন্তান। আমি নবীজীর কাছে একটি হাদীস শুনেছি। তিনি বলেছেন, সকীফ গোত্রে দু’জন লোক হবে। এদের প্রথমজন হবে দ্বিতীয় জনের চেয়ে জঘন্য। এদের মধ্যে একজন মিথ্যাবাদী অর্থাৎ মোখতার সকফীকে তো আমি দেখেছি। আর অপর যালেম তুমি, যাকে আমি এখন দেখছি তার এই তিক্ত জবাবে হাজ্জাজ  জ্বলে উঠলেও শেষ পর্যন্ত চুপ থাকে। এক বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, হাজ্জাজ হযরত আসমাকে বলে, আমি তোমার পুত্রের সাথে এ আচরণ করেছি। তখন তিনি জবাবে বলেন, তুমি আমার পুত্রের দুনিয়া বরবাদ করেছ আর নিজের করেছ আখেরাত বরবাদ। আমি এটাও শুনেছি যে, তুমি উপহাস করে আমার পুত্রকে বলতে ইবনু যাতিন নেতাকাইন-দুই নেতাকওয়ালীন পুত্র। হ্যাঁ, আমি আমার নেতাক দিয়ে আঁ-হযরত সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আমার পিতা হযরত আবু বকর (রা.) এর খানা বেঁধেছিলাম। আমি এ হাদীসও শুনেছি যে, সকীফ গোত্রে একজন মিথ্যাবাদী এবং একজন যালেমের জন্ম হবে। মিথ্যাবাদীকে তো আমি দেখেছি। আর যালেম হচ্ছে তুমি। হাজ্জাজ এ হাদীস শুনে প্রভাবিত হয় এবং কেটে পড়ে। কিছুদিন পর আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের নির্দেশে লাশ নামানো হয় হযরত আসমা লাশ চেয়ে নিয়ে গোসল করান। লাশের জোড়া বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। গোসল করাতে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু এই মর্মবিদারী দৃশ্য দেখেও হযরত আসমা ধৈর্য ধারণ করেন। হযরত আসমা ইবনেয় ও নম্র স্বভাবের হলেও বোন হযরত আয়েশার মতো ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছিলেন। হাজ্জাজের দম্ভ আর ঔধ্যত্যের সামনেও তার ব্যক্তিত্ব ইসলামের ইতিহাসে অক্ষয় ও স্মরণীয় হয়ে আছে।
ওফাত : হযরত আসমা আল্লাহর দরবারে দোয়া করতেন, আল্লাহ! আব্দুল্লাহর লাশ দেখার আগে আমাকে মৃত্যু দেবে না। আল্লাহ্ তাঁর এ দোয়া কবুল করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহর শাহাদতের এক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই হিজরী ৭৩ সালের জমাদিউল আওয়াল মাসে নশ্বর জীবনের শতবর্ষ পূর্ণ করে মক্কা মুয়াযযামায় তিনি ইন্তিকাল করেন। বয়স একশ বছর পূর্ণ হলেও তার একটা দাঁত পড়েনি। হুঁশ-জ্ঞানও সম্পূর্ণ ঠিক ছিল। তার কদ ছিল লম্বা। দেহ ছিল মাংশল ও সুঢৌল। শেষ পর্যন্ত শক্তি-সামর্থ সবই অটুট ছিল।
৩১হিজরী সালে তার স্বামী হযরত যুবায়ের যখন জামাল যুদ্ধ থেকে ফিরে আসছিলেন, তখন আমর ইবনে জরমুয মুজাশেয়ী নামে জনৈক ব্যক্তি সেবা উপত্যকায় তাকে হত্যা করে। তিনি এ ঘটনা জানতে পেরে ব্যথিত হন এবং এ শোক গাথা পাঠ করেন :
ইবনে জরমুয যুদ্ধের দিন একজন সাহসী যোদ্ধার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। আর তা করেছে এমন সময় যখন সে ছিল নিরস্ত্র। আমর! তুমি তাকে আগে জানিয়ে দিলে তার মনে ভয় দেখতে পেতে না, হাতে দেখতে না কম্পন। তোমার মাতা তোমার জন্য কাঁদন করুক, তুমি একজন মুসলমানকে হত্যা করেছো। তোমার উপর অবশ্যই আযাব আসবে। একদিকে স্বামীর হত্যা আর অপর দিকে বক্ষের পুতুল কলিজার টুকরা পুত্রের শাহাদত, এদুটি ঘটনা তার জন্য কেয়ামতের চেয়ে কম ছিল না। কিন্তু এ হৃদয় বিদারক ঘটনা যে অশেষ ধৈর্য-সহ্যের সাথে তিনি হযম করেছেন, তা কেবল হযরত আসমার মতো মহাপ্রাণ মহিলার পক্ষেই সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ