ঢাকা, বুধবার 9 January 2019, ২৬ পৌষ ১৪২৫, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চলতি শীতে দূষণের কারণে কালচে হয়ে গেছে শীতালক্ষ্যার পানি

তমিজউদ্দিন আহমদ, নারায়ণগঞ্জ থেকে : নারায়ণগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা নদীর পানি বর্ষাকালে থাকে অনেকটাই টলমলে। আর বর্ষা শেষ হলেই হয়ে যায় কালচে। খেয়া পারাপারের সময় বা নদীর তীরে দাঁড়ালে নাকে রুমাল দিয়েও আটকে রাখা যায় না দুর্গন্ধ। নদীতে শুধু বিভিন্ন কলকারখানার দুষিত পানি নয় বরং বিভিন্ন এলাকার লোকজনও বর্জ্য ফেলছে নদীর তীরে। আর সেগুলোও ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ছে নদীতে। বর্ষাকালে নদীতে প্রচুর পানি থাকায় পানির বিবর্ণ রঙ কিছুটা মিইয়ে আর কালো রঙ না থাকলেও শীতকালে নদীর পরিধি যেমন ছোট থাকে তেমনি নদীর পানিও একেবারে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যায়। আর বাধ্য হয়ে যারা এ পানি ব্যবহার করছে তারা আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে।
নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ও আশেপাশ অন্তত ২শ’ শিল্প কারখানাসহ ডাইং রয়েছে। এ ছাড়া অনেক কারখানার দুষিত পানি ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে নিস্কাশনের ব্যবস্থা করেছে। এ সব কারখানার বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই নদীতে এসে পড়ে। সেই সাথে নদীতে পড়ছে নারায়ণগঞ্জ শহর ও শহরতলির নাগরিক বর্জ্য।
শীতলক্ষ্যা দূষণ রোধে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করা পরিবেশবাদী সংগঠন নির্ভীক এর প্রধান সমন্বয়ক এটিএম কামাল নদী দুষণের ব্যাপারে ক্ষোভের সাথে বলেন, আমরা বহু বছর ধরে আন্দোলন করলেও কার্যত কোনো সুফল পাচ্ছি না। বরং দিন দিন দূষণ বেড়েই চলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও কারখানা স্থাপনের কারণেই এ দূষণ হচ্ছে। আমরা শুধু বক্তব্য গোলটেবিল বৈঠক সভা সেমিনার করে দূষণের কারণ বললেও এগুলো রোধে কোনো উদ্যোগ নেই।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সমন্বয়ক মোস্তফা করিম এ বিষয়ে বলেন, ‘বিভিন্ন শিল্প কারখানা, ব্যক্তি মালিকসহ আমরা সবাই কোনো না কোনভাবে শীতলক্ষ্যাকে দূষণ করছি। নির্দ্বিধায় আমরা বর্জ্য, বাড়ির সুয়ারেজের পানি নদীতে ফেলে দূষণের মাত্রা বাড়াচ্ছি। আর যেসব সরকার প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মকর্তারা নদীকে বাঁচাতে হবে বার বার বলেন তারাও কাজের ক্ষেত্রে যথার্থভাবে এগিয়ে আসতে পারছেন না। দূষণ রোধে আমাদের সকল সরকারি দফতর, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্প কারখানা মালিকদের সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
শীতলক্ষ্যা দুষণের কথা জানান একজন মাঝি। তিনি বাধ্য হয়েই পেশা পরিবর্তন করেছেন। নারায়ণগঞ্জ সেন্ট্রাল খেয়াঘাটের (টার্মিনাল-বন্দর) নৌকা মাঝি ৬০ বছর বয়সী রমজান মিয়া। তিনি জানান, এক সময়ে মাছ ধরতেন। তিনি ২০ বছর আগেও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে তিনি আর নদীতে মাছ ধরেন না। নদীর যে অবস্থা তাতে মাছ থাকাটাই একেবারে অসম্ভব। সে কারণেই এখন তিনি নৌকা চালান। আর নৌকা চালাতেও বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বর্ষাকালে গন্ধ না থাকলেও শীতকালে কখনো কখনো দুর্গন্ধে বমি আসার উপক্রম হয়।
তিনি আরো বলেন, আমার মতো বাধ্য যারা এ পানি ব্যবহার করছে তারা শরীর চুলকানি, সর্দি, কাশিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ সময় একই মত প্রকাশ করেন খেয়াঘাটের পাশে গড়ে উঠা বেসরকারি একটি ডকইয়ার্ডে কাজ করা আমির আলী। তিনি বলেন, এক সময় কাজের ফাঁকে বন্ধের দিনে এ নদী থেকে মাছ ধরে নিতাম। এখন মাছ তো দূরের কথা মানুষ পানির কাছে গেলে বমি আসে।
পরিবেশ অধিদফতর নারায়ণগঞ্জ জোনের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) একজন কর্মকর্তা জানান, অনেক কারখানার ইটিপি প্লান্ট তৈরি করা আছে। জরিমানা কিংবা প্রশাসনিক ঝামেলা এড়াতে ইটিপি প্লান্ট নির্মাণ করে রাখলেও সেটা ব্যবহার করে না। কারণ অনেক মালিকের দাবি, এটা ব্যবহার করলে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা খরচ হয়। সে খরচ বাঁচাতেই বিকল্প পাইপ দিয়ে অনেক ডাইং ও শিল্প কারখানা মালিকেরা তাদের কেমিক্যালযুক্ত পানি সরাসরি নদীতে ফেলে দিচ্ছে। আর রাতে এ কাজটি বেশি করায় প্রায়ই তাদের ধরা যাচ্ছে না। আমরা যখন দিনের বেলায় কারখানা পরিদর্শনে যাই তখন দেখানো হয় ইটিপি প্লান্ট আছে। আর অনেক কারখানা এখন প্লান্টের পাশে বিশাল আকৃতির ট্যাংকি করে রাখে। এখানে দিনের বিষাক্ত পানি জমা করে রাখে যা সন্ধ্যার পর কিংবা গভীর রাতে নদীতে ছেড়ে দেয়।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতর সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জে ৩৬৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে তরল বর্জ্য নিস্কাশন হয়। এর মধ্যে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা ইটিপি আছে ২৪৭টির। ২৮৭ ডাইং কারখানার মধ্যে ইটিপি নির্মাণাধীন ২৯টির। বাকি কারখানার দূষিত পানি গিয়ে পড়ছে নদীতে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ