ঢাকা, বুধবার 9 January 2019, ২৬ পৌষ ১৪২৫, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে চাই না

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : নির্বাচন ২০১৮ নিয়ে কোন কথা বলতে চাই না। দু’একজন বন্ধু বা পাঠক ফোন করে বলছেন “ভাই কিছু লিখেন, আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।” যেখানে বিদেশী পর্যবেক্ষকরা বলেন, “খুব সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। সেখানে আমার মতো ছাপোষা লেখকের কথা কে শুনে। আমাদের সম্মানিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন “আমরা তৃপ্ত সন্তুষ্ট লজ্জিত নই।” মাননীয় নির্বাচন কমিশনার মহোদয়কে, কে লজ্জিত হতে বলেছে তা আমাদের জানা নেই। সব লোককে কি মহান আল্লাহ লজ্জা পাওয়ার সুযোগ দেন। লজ্জা পেতে হলে লজ্জা পাওয়ার অনুভুতি থাকা দরকার, কথাটা বললো চায়ের দোকানদার আল আমীন। টকশোতে বড় বড় বুদ্ধিজীবী ও বিশ্লেষকগণ বলেন “অত্যন্ত সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও উৎসব মুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে”। এক বুদ্ধিজীবীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, “নৌকা প্রতীকে ২ লাখ ১২ হাজার আর ধানের শীষে মাত্র ৫ হাজার ভোট, এমনটি কি হওয়ার কথা”? উত্তরে তিনি বলেন “হ্যাঁ এদের জনপ্রিয়তা এতটাই কমেছে যে জনগণ তাদের ভোট দেয়নি এবং ২ কোটি নতুন ভোটার যারা স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানতে পেরে সকলেই উন্নয়নের পক্ষে ও স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছে”। প্রতিদিনই বিশ্বনেতারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন বার্তা প্রেরণ করছেন। গাজিপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেছিলেন, “নির্বাচন ফেয়ার হয়নি।” সে সময় আওয়ামী লীগ নেতা ড. আবুদর রাজ্জাক বলেছিলেন, “আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে তার মন্তব্য করা ঠিক হয় নাই। তার কাছে কি অনিয়মের কোন তথ্য রয়েছে”। জনাব ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, “নিজের চরকায় তেল দেন।” ওবায়দুল কাদের সাহেবের কথা তারা আমল করেছেন অক্ষরে অক্ষরে, সে কারণেই এবার তারা নিজের চরকায়ই তেল দিয়েছে। নিজের চরকায় তেল দিয়েছে আরো একটি কারণে তাহলো যুক্তরাষ্ট্রের মুরুব্বিরা সব সময় খেয়াল রাখেন ভারতের মুরুব্বিগণ কি বলেন। এবারের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ভারতের মুরুব্বিরা খুব খুশি। তারা একটি অসম্ভব সুন্দর নির্বাচন দেখেছেন। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে গেল না তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ভারতে গিয়ে মনমোহন সাহেবের সাথে বৈঠক করেন এবং বলেন, “বাংলাদেশ বিষয়ে আমরা দু’দেশই এক মত”। সে একমত ছিলো সকলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়ে। ব্রিটিশ হাই-কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী বিএনপি এবং জামায়াত নেতাদের ডেকে বলেছেন সকলের ঐক্যমতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হবে।” এবারও বিশ্ব নেতারা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চেয়েছিলেন বলে বিশ্লেষকদের মন্তব্য। সকলের ঐক্যমতের ভিত্তিতেই নির্বাচন হয়েছে এবং এ নির্বাচন দেশের বুদ্ধিজীবী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, নায়ক-নায়িকা, খেলোয়াড়, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এমন কি দেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার শেষ ভরসা দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর নিকটও অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয়েছে অতএব মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্যার স্বস্তি অনুভব করবেন এটাই তো স্বাভাবিক, লজ্জিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। যারা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় তারা বড়ই অন্যায় কথা বলছেন। রাত ৩টার সময় দেশের প্রত্যেকটি আসনের প্রায় সকল কেন্দ্রে ভোট বাক্স যদি ভরেই থাকে তাতে সমস্যা কি আমাদের আর কষ্ট করে ভোট দিতে হলো না। এর চেয়ে সুন্দর নির্বাচন আর কি ভাবে হবে? আগুন সন্ত্রাস, এতিমের টাকা আত্মসাতকারী আর দেশ বিরোধী জামায়াতকে নিয়ে নির্বাচন করতে যাওয়া বিএনপি যে ক’টি আসন পেয়েছে তা বেশি নয় কি? জনাব তোফায়েল আহমদ যথার্থই বলেছেন এ নির্বাচন “৭০ এর নির্বাচনের সাথে তুলনা করা যায়।” আমার মতে এ নির্বাচন “৭০এর নির্বাচন থেকে শতগুণে সুন্দর হয়েছে। ‘৭০ এর নির্বাচনে বিরোধী দলের তেমন নেতাকর্মীদের দেখা না পাওয়ায় কেন্দ্রে গিয়ে ভোট কাটা হয়েছে আর এবার কেন্দ্রে কোন ভোট কাটা হয়নি। ‘৭০ এর নির্বাচনে বিরোধী দলের মাত্র ৯ জন সদস্য হয়ে তাদেরকেও সম্মোধন করা হয় টাউটবাটপার হিসেবে, এবার যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরকে কি এমনটি বলা হয়েছে। সে সময় সিরাজ সিকদারকে নাকি মহান সংসদে চেয়ার দিয়ে পেটানো হয়েছে এখন সংসদে বিরোধী দলকে কত সম্মান করা হয় গত সংসদের বিরোধী দলতো জামাই আদরে ছিলো। বিএনপিকে না হয় কথা বলতে দেয় না চেয়ার দিয়ে তো পেটানো হয় না। রাস্তায় জয়নাল আবদীন ফারুককে কাপড় খুলে ফেলে, মাহবুব উদ্দিন খোকনকে গুলি করে এটাতো পুলিশের সাথে বাড়াবাড়ি করার জন্য। অতএব এত সুন্দর নির্বাচন নিয়ে অন্তত আমি কিছু বলতে চাই না। আমার ভাগ্নে শরীফ মোল্লা বললো “মামা পৃথিবীর সব দেশেই এখন পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনী সরকারের এজেন্ডাই যেন বাস্তবায়ন করছে।” আমি তাকে বললাম তুমি ঠিকই বলেছো, তাদের প্রতি সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকে তারা সরকারের কথা মানতে বাধ্য হবে আমাদের বাহিনীর সদস্যরা যে সব বাধ্য হয়ে করে এমনটি মনে হয় না তাদের অনেকেই সরকার দলীয় নেতাকর্মীর ভূমিকায়, যেমন এক ওসি প্রকাশ্যে নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার জন্য সিইসি তাকে অন্যত্র বদলী করেছেন। তাকে কি সরকার বলে দিয়েছিলো তুমি পুলিশের পোশাক পরে একটি দলের পক্ষে ভোট চাইবে। সংগত কারণেই বিএনপি নেতা আবদুস সালাম বলেছেন “আমরা তো আওয়ামী লীগের সাথে নির্বাচন করিনি আমাদের প্রতিপক্ষ ছিলো পুলিশ। সারাদেশে প্রতিটি কেন্দ্রে রাত ৩টার সময় ভোট বাক্স ভর্তি করে রেখেছে। ভোট শুরু হওয়ার পূর্বে ভোট বাক্স খালি কিনা কে দেখবে অন্যসব দলের কোন এজেন্ট ছিলো না তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি আর যারা ঢুকেেছ তাদের পিটিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে।” এ বিষয় মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার সুন্দর করেই বলেছেন “তাদের এজেন্ট না আসলে তো কিছু করার নেই।” ছোট সময় আমরা যখন মারে চোখ ফাঁকি দিয়ে কোন খাবার খেয়ে ফেলতাম অর্থাৎ চুরি করতাম এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে অন্তত চুপ থাকতাম। কেউ কেউ আবার বড় গলায় বলতো ‘কই আমি তো খাইনি একেবারে খোদার কসম আমার ওপর ঠাটা পড়বে ইত্যাদি বলতো।” একেই বলে চোরের মার বড় গলা। এখন চোরেরা অন্তত আমার ওপর ঠাটা পড়বে এ কথা বলে না কারণ চোরদেরও ঈমান আমান বৃদ্ধি পেয়েছে এমন কথা বললে যদি আবার আল্লাহ কবুল করে ফেলেন সে ভয়ও আছে। অনেকেই বলেন নির্বাচন যা হয়েছে তা নিয়ে কথা নয় বড় কথা হচ্ছে নির্বাচন কেমন হয়েছে তা যেমন পরাজিতরা জানেন তা জানেন বিজয়ীরাও। এমন কি আমাদের দেশ-প্রেমিক বিভিন্ন বাহিনী তা জানেন, জানেন বিশ্বনেতা ও পর্যবেক্ষকরাও। দুঃখ হলো এরপরও এমনভাবে কথা বলা হচ্ছে যে, কলা কে খেয়েছে তা যেনো তারা জানেনই না বা কাকে সাবান কোথায় লুকালো তাও কেউ দেখেনি। আইজিপি স্যার বলেছেন, “পুলিশ সারারাত পরিশ্রম করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করেছে।” সারা রাত পরিশ্রম করে যে পুলিশ জনগণের শাস্তি রক্ষা করলো আমরা নাক ডেকে নিদ্রায় মগ্ন আর কষ্ট করলো ঘুম নষ্ট করলো যে পুলিশ আর তাদের চা নাস্তা খাওয়ানোর মহান দায়িত্বটি পালন করলো যুবলীগ আর ছাত্রলীগের পরেও যদি বলা হয় পুলিশের সহায়তায় যুবলীগ ছাত্রলীগ ভোট বাক্স পূর্ণ করেছে তা মানা সম্ভব নয়। পরাজিতরা কত কথাই বলবে তা কে শোনে? আমি বলেছি নির্বাচন নিয়ে কিছু বলতে চাই না। আমার কথা রক্ষা করেছি কেবল অন্যদের কথাই তুলে ধরেছি কিঞ্চিত। তবে সরকার ও বিরোধী শিবিরকে একটি পরামর্শ দিতে চাই, কি দরকার আন্দোলন সংগ্রামের আমরা চাই দেশ সুন্দরভাবে চলুক, দেশের উন্নয়ন হউক আর এ উন্নয়ন যদি আওয়ামী লীগ সরকার দ্বারা হয় তাতে সমস্যা কি? বাংলাদেশের প্রায় সকল বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও প্রশাসনের লোকেরা দেখছে সুন্দর নির্বাচন হয়েছে। বিশ্ননেতারাও দেখেছে অসাধারণ নির্বাচন আর আওয়ামী লীগ ভিশন ২১ থেকে এখন ৪১ এ উন্নীত হয়েছে। অন্তত ৪১ সাল পর্যন্ত তাদের সুযোগ দেওয়া উচিত যদিও ৪১ সালের পর ক্ষমতা ছাড়তে চায়তো ছাড়বে না হয় আরো যতদিন থাকতে চায় থাকবে যখন তাদের আশা পূর্ণ হবে তখন ক্ষমতা ছাড়তে চাইলে ছাড়বে সমস্যা কোথায়? তবে ক্ষুধা যতই থাক আর খাবার যত মজারই হোক এক সময় খাবারও বিরক্তির কারণ হয়, মজার মজার খাবারও ক্ষতির কারণ হয়Ñ বিষয়টি খেয়াল রাখলেই চলবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ