ঢাকা, বুধবার 9 January 2019, ২৬ পৌষ ১৪২৫, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাদকের ক্যান্সারে বাংলাদেশ

খন্দকার হালিমা খাতুন : বর্তমান বিশ্বে মানুষ যে সকল মারাত্বক সমস্যার সম্মুখিন হচ্ছে তার অন্যতম কারণ মাদকা শক্তি, নব্বই সতাংশ মুসলমানের জন্মভূখী বাংলাদেশ। আজ মাদকা নামক ক্যান্সারে আক্রান্ত। যুব সমাজ বিধ্বংশী নেশার মরণ থাবার শিকার সমাজের সকল স্তরের মানুষ। সমাজের যুবক- যুবতী, কিশোর- কিশোরী এমন কি পৌঢ় পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছেনা, বিশেষ করে যুবসমাজ আজ চরমভাবে এর শিকারে পরিণত হয়েছে। একটি জাতির ভবিষাৎ হলো যুব সমাজ। তাদেরকে মাদকাশক্তকার পঙ্গু করে দিতে পারলে জাতির ভবিষ্যৎ বিনষ্ট হয়ে নিশ্চিত ধংস ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। দেশের যুবসমাজ মাদকাশক্ত হওয়ার অর্থ-দেশের সার্বিক অবঃপতন। যুব সমাজই জাতির কর্ণধার। এরাই দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, শিক্ষক, সমাজ সেবক এক কথায় দেশের চালিকাশক্তি। এ যুব সমাজই যদি চরিত্রহীন হয় তবে দেশের রাজনীতি প্রশাসন, অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা সবকিছুতেই এর প্রতিফলন ঘটতে বাধ্য। যার নিশ্চিত পরিণাম একটি অধ:পতিত জাতি। বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে মাদক দ্রব্য আমদানী করাও সহজ হয়ে পড়েছে। যার ফলে আজ আমাদের দেশে মাদকের বন্যা বইছে। আর এর ব্যবসাও সহজ থেকে সহজতর হয়ে পড়েছে। মহল্লার অলি গলিতে এর বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। সমাজের প্রথম শ্রেণী থেকে শুরু করে নিম্ন শ্রেণী পর্যন্ত এর রমরমা ব্যবসা চলছে। বহুনারী ও শিশুরাও এ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশে শহর গ্রামগঞ্জের অলিতে গলিতেও সাধারণ পণ্যের মত সহজ লভ্য হয়ে পড়েছে মাদকদ্রব্য। এলাকার কোন মুদি দোকানদার নিত্য প্রয়োজনীয় সওদা আপনার ঘরে পৌছে দিতে রাজী হবে না, কিন্তু একজন নেশাখোর যখন কোন দোকানদারকে নেশা সামগ্রীর জন্য ফোন করে তখন ইথারে কথা পৌঁছার আগেই নেশার সামগ্রী পৌছে যায় তার ঘরে এভাবে মাদকের ব্যবহার প্রতিদিন নিয়ে যাচ্ছে ধংশের অত গহবরের দিকে। আর এরই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সমাজে বেড়ে চলেছে খুন, গুম, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হাইজ্যাক, রাহাজানী, অপহরণ, নারী-নির্যাতন, চাঁদাবাজ। সেই সাথে মাদকাসক্তদের বংশ অর্থাৎ তাদের সন্তান জন্ম নিচ্ছে পঙ্গু-বিকলঙ্গ স্বাস্থ্যহীন হয়ে। দেশের উন্নয়নের সকল কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শুধুই এই মাদকাসক্তির কারণে। এভাবে বেপোরোয়া মাদক ব্যবহারে দেশ থেকে মেধা বিদায় হবে।
মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ বুদ্ধি বিবেচনা মাদক সেবনে তা আচ্ছ্বাদিত হয়, যার ফলে তার আচার-আচরণ স্বাভাবিক থাকে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তি-নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে। আর ইসলামে নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষকে পশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নৈতিক মূল্যবোধের কারণে আজ বিশ্বময় মরণ ব্যাধি এইডস্ ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধির প্রধান মাধ্যম হচ্ছে অবৈধ মেলামেশা এবং মাদকাসক্ত। মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষে অবৈধ অনৈতিক ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করা খুবই অসম্ভব হয়ে পড়ে। সুস্থ বিবেক বুদ্ধি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন চিকিৎসার। আর এই চিকিৎসা সময় সাপেক্ষ এবং ব্যায়বহুল। তাই এ চিকিৎসা সরকারিভাবেই হওয়া প্রয়োজন কোন পরিবারে একজন সদস্য যদি কোনভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই পরিবারে সকলেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে। এ সকল ক্ষতির থেকে রক্ষাপেতে সরকারি-বেসরকারি সবার সহযোগীতা একান্ত প্রয়োজন। সমাজ থেকে প্রথমেই মাদকের সহজ লভ্যতা বন্ধ করা এর সমাজ থেকে প্রথমেই মদের সহজ লভ্যতা বন্ধ করা, এর ক্রয়-বিক্রয়ের উপর সীমাবদ্ধতা থাকা, এর চোরা পথগুলো বন্ধ করা আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকা এবং যে সকল কারণে মানুষ মদ পান করে সে সকল কারণ দুরিকরণ করা। এক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাষণ মেনে চলতে উৎসাহিত করলে সুফল পাওয়া যাবে। একমাত্র ধর্মীয় অনুভূতিই মানুষকে পাপ কাজ থেকে ফিরাতে পারে। মদ পরিহারের ঘোষণা দিতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, মাদক হচ্ছে সকল অপরাধের প্রসূতি “উম্মল খাবায়িস”, মদের নেশায় মানুষের বিবেক বুদ্ধি মানশিক ভারসাম্য শারিরীক শক্তি কর্মক্ষমতা সবই বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ কারণে সকল ধর্মে মদ নিষিদ্ধ এবং সকল ধর্মে এর শাস্তির বিধানও রয়েছে। যেমন, হিন্দু ধর্মে মদ পান ‘সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, যারা মদ পান করে তাদের সাথে কথা বলবেনা, তাদের সাথে মেয়ে বিয়ে দেবেনা এবং তাদেরকে ঘৃণা কর। আর তাদের পরিবার যেন তাদেরকে ত্যাগ করে। ইসলাম ধর্মে মদ নিষিদ্ধ সম্পর্কে পর্যায়ক্রমে আল-কুরআনে আল্লাহ রাব্বুলআলামীন চারটি আয়াত নাজিল করেছেন। ইসলাম পূর্ব যুগে আরগন নানা কুসংস্কার এবং মাদকাশক্তিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ছিল। মদ জুয়া ছিলো তাদের জীবনের প্রধান অবলম্বন। সে যুগে তারা মদপান করে এমন কোন অপকর্ম ছিলনা যা তারা করতো না। তাই ইসলাম আগমনের পর প্রথমে সুরা বাকার ২১৯ নং আয়াত নাজিল হয়। তারা আপনাকে মদ, জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মস্ত বড় গোনাহ। আর মানুয়ের জন্য উপকারীতাও রয়েছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারীতা অপেক্ষা অনেক বড়। এ আয়াত মুসলমানদেরকে মদ ও জুয়া থেকে দূরে রাখার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, মদ ও জুয়াতে যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে কিছু উপকারীতা পরিলক্ষিত হয়, কিন্তু এ দুটির মাধ্যমেই বড় বড় পাপের পথ উন্মুক্ত হয়। যা এর উপকারীতার তুলনায় অনেক বড় ক্ষতিকর। এ আয়াতে মদ হারাম করা হয় নাই। বরং এর অনিষ্ট ও অকল্যাণের দিকগুলো তুলে ধরে মদ ত্যাগ করার জন্য এক প্রকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পরামর্শের ভিত্তিতে কেউ কেউ মদপান ত্যাগ করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেছেন যে হারাম তো করা হয় নাই। তখনও পর্যন্ত অনেকে মদপান করতে থাকেন এবং মদের কুফল সমাজে পরিলক্ষিত হতে থাকে। একদিন এক সাহাবী মাগরিবের নামাযের ইমামতি করতে গিয়ে সুরা কাফেরুন ভুল পড়তে লাগলেন। ঠিক তখনই নামাযের সময় মদপান করা থেকে বিরত রাখার জন্য সূরা নিছার ৫৩ নং আয়াত নাজিল হয় মদ থেকে বিরত রাখার দ্বিতীয় নির্দেশ। ইরশাদ হলো: হে ঈমানদারগণ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা নামাজের কাছেও যেও না। এ আয়াতে নামাজের সময় মদ হারাম করা হয়েছে অন্যান্য সময়ের জন্য তা পান করা অনুমতি রয়ে গেছে। তৃতীয় ও চতুর্থ নির্দেশ সূরা সায়েদা আয়াত ৯০-৯১ ইরশাদ হয়েছে। ৯০, হে মমিনগণ, মদ জুয়া প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক  শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ আর কিছুই নয়। অতএব এগুলো থেকে বেচে থাকো যাতে তোমাদের কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। ৯১, শয়তান তো চায়, মদ জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা বিদ্বেষ সমচারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্বরণ ও নামাজ থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা এখনও কি নিবৃত্ত হবে না। এ আয়াত দুটি নাজিল করে পরিস্কার ও কঠোরভাবে মদ পান চিরকালের জন্য নিষিদ্ধ ও হারাম ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয় শরিয়াতের এমন পর্যায় ক্রমিক ব্যবস্থা গ্রহণের কারণ এই ছিলো যে, মানুষের আজীবনের অভ্যাস ত্যাগ করা বিশেষত নেশা জনিত অভ্যাস হঠাৎ করে ত্যাগ করা মানুষের পক্ষে খুবই কষ্টকর হতো, এ জন্যই ইসলাম একান্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রথমে মদের মন্দ দিকগুলো মানব মনে বদ্ধমূল করেছে। অতএব নামাজের সময় একে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এবং সব শেষে বিশেষ বিশেষ সময়ের পরিবর্তে কঠোরভাবে সর্বকালের জন্য নিষিদ্ধ ও হারাম ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে। হারাম ঘোষণার পর এর নিষিদ্ধতার আইন কানুন যারী করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদপান সম্পর্কে কঠোর শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেছেন ইরশাদ হয়েছে। সর্ব প্রকার অপকর্ম এবং অশ্লিলতার জন্মদাতা হচ্ছে মদ এটি পান করে মানুষ নিকৃতর পাপে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন তিন প্রকার মানুষের জন্য আল্লাহ তায়ালা বেহেশত হারাম করে দিয়েছে। ১. মদ পানে অভ্যস্ত ব্যক্তি ২. মাতাপিতার অবাধ্য সন্তান ৩. যারা দায়ুস অর্থাৎ নিজের পরিবার অস্লিলকাজে লিপ্ত জেনেও নিরব ও নিস্ক্রিয় থাকে। (নাসায়ী আহমদ) হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) মদের সাথে সম্পর্ক রাখে এমন দশ ব্যক্তির উপর অভিশম্পাদ দিয়েছে।
১. মদ প্রস্তুত কারক ২. মদ প্রস্তুতের উপদেষ্টা ৩. মদ পানকারী ৪. মদ বহনকারী ৫. যার নিকট মদ বহন করা হয় ৬. যে মদ পান করায় ৭. মদ বিক্রেতা ৮. মদের মূল গ্রহণকারী ৯. মদ বিক্রয়কারী ১০. মদ ক্রয় কারী। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশা করেছেন: নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কারো যদি এক ওয়াক্তের নামাজ কাযা হয়ে যায়, তাহলে সে যেন তার যাবতীয় সম্পদ হারিয়ে ফেললো। আর কেউ যদি নেশাগ্রস্ত হয়ে একা ধারে চার ওয়াক্ত নামাজ কাযা করে তাহলে তার উপযুক্ত খাদ্য হবে। ‘তীনাতুলখিবাল’ তখন প্রশ্ন করা হলোঃ হে আল্লাহর রাসূল তীনাতুল খিবায়েল অর্থ কি? তিনি বললেন যাহান্নামীদের দেহ থেকে নির্গত রক্ত ও পুজ। আল-কুরআন এবং হাদিসে মদ পানকারীর শাস্তির যে ভয়াবহ বর্ণনা উল্লেখ্য রয়েছে, তা জানার পর কোন মানব সে দিকে দৃষ্টি দিতেও ভয় করা উচিত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে জিনিসকে হারাম ঘোষণা করেছেন, রাসূলুল্লা (সা.) যে বস্তুর মূল্য উপোটনের জন্য যিহাদ ঘোষণা করেছেন, যে বস্তু পান করার শাস্তির বিধান জারি করেছেন, তার মধ্যে মানুষের জন্য কোন কল্যাণ থাকতে পারে না। মদপানের অকল্যাণে প্রতিদিন ধ্বংশ হচ্ছে বহু প্রাণ। মানুষের কাছে মানুষের জীবন অমূল্য সম্পদ, মদ পানে তা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে চলে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলেন মদ পানে মানুষের আয়ু কমে যায়। মদপানকারীদের তুলনায় যারা মদ পান করে না তারা দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। মাদক সেবনে মস্তিস্কের লক্ষ লক্ষ সেল ধ্বংশ হয়ে যায় যেটা কোনভাবেই সারানো সম্ভব নয়। অতিরিক্ত মদপানকারী ব্যক্তি গেসটিক আলসারে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। মাদক গ্রহণের ফলে হজম শক্তি হ্রাস পায় ও খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়।
মাদকসেবনকারী ব্যক্তি- লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয় যার চিকিৎসা দুরুহ। হেরোইন সেবীরা ক্যান্সার, এইডস রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। মদপানকারীদের দ্বারাই সমাজের অধিকাংশ অপরাধ হয়ে থাকে। এ রকম অসংখ্য রোগের জন্ম দেয় মানব দেহে এই মাদকদ্রব্য। সকল ধর্মেই মাদক দ্রব্য ব্যবহার নিষিদ্ধ! তাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের সকলকেই মাদক দ্রব্যের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। অন্যথায় দেশ ও জাতিকে মাদক দ্রব্যের হাত থেকে রক্ষা করার আর কোন বিকল্প নাই। আল্লাহ আমাদের ভালো কাজে সাহায্য করুন। আমিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ