ঢাকা, বুধবার 9 January 2019, ২৬ পৌষ ১৪২৫, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঢাকা নিয়ে কিছু কথা

আবদুল্লাহ হারুন : আধুনিক নগর পরিকল্পনাবিদ্যার জনক বলে খ্যাত প্যাট্রিক গেড্ডিস-এর মত অনুসারে স্বনামধন্য শহর বিশারদ লুই মার্ম ফোর্ড ১৯১৭ সালে ঢাকা শহর পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি জনপদ ও শহরকে চারটি অনুক্রমে সাজিয়েছিলেন। যেমন EOPOLIS বা গ্রামপর্যায়, POLIS বা শহর পর্যায়, METROPOLIS বা মাতৃসমা নগরী। অনেক অঞ্চল বা জনপদ যখন এর ওপর সবদিক থেকে নির্ভরশীল হতে থাকে, যেটি আদর্শ নগরীর প্রকৃত অবস্থা এবং MEGAPOLIS যখন আগের অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে পতন আরম্ভ হয়। যদিও ঢাকা শহরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এখন METROPOLIS নগরীর পর্যায়ে, তা অতি দ্রুত MEGAPOLIS বা একটি পতনশীল নগরীর অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে স্থাপত্য বিশারদরা মনে করছেন।
১৯৭১ সালে ঢাকা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ায় এ নগরের জীবনে ঘটে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। নগরে অভিবাসনের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে বাড়তে থাকে। শুরু হয় নানাবিধ সমস্যা- গৃহায়ন, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ, ময়লা নিষ্কাশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যাতায়াত, বাজার-হাট সর্বত্র। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প ক্ষেত্রে ঢাকার ক্রমাগত শক্তি বৃদ্ধির ফলে নগরের প্রসার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করা যায় না। ঢাকার জনসংখ্যা এখন দেড় কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ১৬৪০ সালের দু’লাখের এক ক্ষুদ্র শহর এখন দেড় কোটি মানুষের মেগাসিটি। কিন্তু ঢাকার বৃহৎ আকারের নগরায়ন কোনো যুৎসই কাঠামোর মধ্যে গড়ে ওঠেনি।
স্বাধীনতার পর এভাবে বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের প্রথা ও ঐতিহ্য ঢাকা শহরে প্রবর্তিত হয়। বিশেষ করে স্বাধীনতার পরে এই কর্মকান্ড জোরদার হতে থাকে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে মহানগর ঢাকায় প্রায় ২,০০০টি বহুতল দালান নির্মিত হয়েছে।
নয়তলা অথবা তার বেশী উঁচু ভবনকে আন্তর্জাতিকভাবে বহুতল বিশিষ্ট ভবন বলা হয়ে থাকে। আধুনিক যুগ হচ্ছে উঁচু দালানের যুগ। এই বহুতল ভবন নির্মাণ বৈচিত্র্য পৃথিবীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে যেমন আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি মহানগর ঢাকাতেও এর দারুণ প্রভাব পড়েছে। আর মহানগর ঢাকায় সুউচ্চ দালান হওয়ার কারণ হিসেবে স্থাপত্যবিদরা মনে করছেন সবাই যার যার কর্মস্থলের আশপাশে থাকতে চায়, দূরে যেতে চায় না। তাদের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণেই স্বল্প জায়গার মধ্যেই সরু হয়ে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে সুউচ্চ ইমারতরাজি। এই দালানেরই ছোট ছোট ফ্ল্যাটে গড়ে নিচ্ছে নিজেদের ভূবন। বর্তমানে ফ্ল্যাট বাড়ীকে বিবেচনা করা হয় এইভাবে-ড্রইং রুম হচ্ছে উঠোনের মত, বেডরুম হচ্ছে হোটেল আর পাকঘর হচ্ছে জেনারেল স্টোর যেখানে সবকিছু পাওয়া যায়। অর্থাৎ ফ্ল্যাটগুলোতে সারাবিশ্বের আমেজ সৃষ্টি করা হয়।
সামাজিকভাবে এই দালান নাগরিকদের জীবনাচরণসহ সাংস্কৃতিক ও সৌন্দর্যগত মূল্যবোধকেও দারুণভাবে প্রভাবান্বিত করেছে। সঙ্গে সঙ্গে একটি শহরের আকাশ সীমাকেও পরিবর্ধিত করেছে। এক সময় চন্দ্র-সূর্য পরিষ্কার আকাশের পটভূমিকায় উদিত ও সবুজবৃক্ষ শোভিত দিগন্ত রেখায় নিমজ্জিত হতো। এখন সেই একই গ্রহ-উপগ্রহ সুউচ্চ দালানের পিছনে ওঠানামা করে। আমাদের এসব দালানের বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। আমরা বন্দী থাকি এর ভেতরে যেখানে চারদিকে দৈব্যসদৃশ দালানগুলো থাকে পাহারায়। যেগুলো মানুষ নিজের কল্পনা, শৈলী ও প্রয়োজনীয়তা দিয়ে সৃষ্টি করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা শিল্পকর্ম
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের স্বাধীনতার যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের ওপর ভাস্কর শিল্পী আফজালুর রহমানের নির্মিত স্থাপনা হলো কালরাত্রি (Dark Hous)। স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাসে শিল্পকলা একাডেমীর গ্যালারিতে কালরাত্রি স্থাপনা প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এই শিল্পকর্মটি ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে জাপানের ফর্মওকাতে অনুষ্ঠিত এশীয় ত্রিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে পূর্ণাঙ্গরূপে প্রদর্শন করা হয়। এই শিল্পকর্মটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত স্থাপনা।
তিন নেতার মাজার
ভাস্কর শিল্পী মাসুদ আহমদের স্থাপত্যকলার অনুপম নিদর্শন তিন রাষ্ট্রীয় নেতা শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও ব্যারিস্টার খাজা নাজিমুদ্দিনের এই তিনটি কবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দোয়েল চত্বরের কাছে কার্জন হলের উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।
স্বোপার্জিত স্বাধীনতা
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে স্মরণ করে রাখার জন্য ভাস্কর শিল্পী শামীম সিকদারের পরিকল্পনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে ১৯৮৯ সালের ২৫ মার্চ তৈরি করা হয় স্বোপার্জিত স্বাধীনতা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ