ঢাকা, বৃহস্পতিবার 10 January 2019, ২৭ পৌষ ১৪২৫, ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দেশজুড়ে হামলা-নির্যাতন প্রসঙ্গে

নির্বাচনের পরও বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে চলেছে। আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিশেষ করে যারা নৌকার পরিবর্তে ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন বলে পরিচিতি পেয়েছেন এবং চিহ্নিত হয়েছেন। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। এতে জানা গেছে, হামলার মাধ্যমে শুধু শারীরিকভাবে আহত করা হচ্ছে না, পাবনার চাটমোহরের মতো অনেক এলাকায় ধানের শীষ তথা বিএনপি-জামায়াত এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘরে আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। আগুনে পুড়ে যাচ্ছে টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড়, স্বর্ণালংকার ও দলিলপত্রসহ অনেক সম্পদ।
কোনো কোনো এলাকার হাট-বাজারে দোকানপাটও তছনছ করে পুড়িয়ে দিচ্ছে আওয়ামী দুর্বৃত্তরা। একযোগে চালানো হচ্ছে এলাকা ছাড়া করার অভিযানও। পাশাপাশি বেড়ে গেছে পুলিশের তৎপরতা। মিথ্যা ও সাজানো মামলায় গ্রেফতার করা হচ্ছে বিরোধী দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী-সমর্থককে। পুলিশের ধাওয়ার মুখে এলাকা ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকেই। এভাবে সব মিলিয়েই সারাদেশে ভয়ংকর এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে আওয়ামী দুর্বৃত্তরা। বিপন্নদের সাহায্যে এগিয়ে আসার পরিবর্তে পুলিশও উল্টো দুর্বৃত্তদের পক্ষেই ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ করেছেন আক্রান্ত সকল এলাকার অধিবাসীরা। এ ব্যাপারে প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, নির্বাচনের পর এ রকম একটি ঘটনারই অসহায় শিকার হয়েছিল নোয়াখালির সুবর্ণচর উপজেলার মধ্যম বাগ্যা গ্রামের এক নারী। সে একজন সিএনজি চালকের স্ত্রী। নৌকায় ভোট না দিয়ে ধানের শীষে ভোট দেয়ার কথিত অপরাধে তাকে গণধর্ষণের শিকার বানিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের দুর্বৃত্তরা। গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ওই নারী আওয়ামী দুর্বৃত্তদের কথা অনুযায়ী নৌকায় ভোট না দিয়ে ধানের শীষে ভোট দিয়েছিল এবং ভোট দেয়ার কথাটা বলিষ্ঠভাবে জানিয়েছিল। এই বলিষ্ঠতার শাস্তি হিসেবে ভোটের দিন অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর রাতেই তার ওপর সওয়ার হয়েছিল দুর্বৃত্তরা। ১০/১২ জনের একটি দল পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে ওই নারীকে। কিন্তু তারও আগে তার সিএনজি চালক স্বামী ও চার ছেলে-মেয়েকে ইচ্ছামতো পিটিয়ে ঘরের মেঝেতে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছিল দুর্বৃত্তরা। খবরটি জানাজানি হওয়ার পর সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। ফলে পুলিশ কয়েকজন দুর্বৃত্তকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু ওখানেই শেষ হয়েছে পুলিশের মাধ্যমে সরকারের তৎপরতা। ধর্ষিতা নারীকে কোনো রকম সাহায্য দেয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বলা হচ্ছে, মূলত গোপনে প্রশ্রয় দেয়ার সরকারের এই নীতি-কৌশলের কারণেই দেশজুড়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের তান্ডব ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্রতিদিন আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক এবং ধানের শীষের ভোটাররা। আমরা এই হামলাকে ন্যক্কারজনক এবং সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত বিপদজনক বলে মনে করি। আমাদের আপত্তির কারণ, গণতন্ত্রে একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই যে কোনো দলকে সমর্থন করার এবং যে কোনো দলের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার একশ ভাগ অধিকার রয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের নির্দেশনা। বাংলাদেশের সংবিধানও প্রতিটি নাগরিককে সে অধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে কেবলই ক্ষমতাসীন দলকে ভোট না দেয়ার কারণে দলটির সন্ত্রাসীরা জনগণের ওপর সশস্ত্র হামলাই শুধু চালাচ্ছে না, তাদের ঘরবাড়িও জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ধর্ষণ করছে নারীদের, লুণ্ঠন করছে অর্থ-সম্পদ। ওদিকে গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে পুলিশও উল্টো আক্রান্তদেরই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের নামে মামলা দায়ের করছে, অনেককে জেলে পর্যন্ত ঢোকাচ্ছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এলাকাবাসীরাও প্রকাশ্যে এবং এক বাক্যে বলছেন, নৌকা মার্কায় তথা ক্ষমতাসীন দলকে ভোট না দেয়ার কারণেই জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়া হচ্ছে। জনগণ আসলে প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে, এখনো হচ্ছে।
মনে করি, হামলার প্রতিটি ঘটনাই সংবিধান ও গণতন্ত্রের পরিপন্থী। সরকারের উচিত হামলা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগসহ দেশজুড়ে চলমান প্রতিহিংসার অভিযান বন্ধে দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠা। আইন-শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীগুলোকে দিয়ে এমন পরিবেশ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দেশের কোথাও আর কোনো হামলা-সহিংসতা ঘটতে না পারে এবং কোথাও যাতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থক ও ভোটাররা হামলা ও নির্যাতনের শিকার না হন। এ উদ্দেশ্যে সততার সঙ্গে সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে, যাতে তারা আর কোথাও কোনো প্রার্থী ও তার সমর্থকদের ওপর হামলা চালানোর সাহস না পায় এবং যাতে সকলেই সংবিধান প্রদত্ত অধিকার ভোগ করার সমান সুযোগ পান। আমরা আশা করতে চাই, দুর্বৃত্তদের প্রশ্রয় ও সমর্থন দেয়ার পরিবর্তে সরকার দেশের রাজনীতিতে সুষ্ঠু ও গণতন্ত্রসম্মত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে অনতিবিলম্বে উদ্যোগী হয়ে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ