ঢাকা, শুক্রবার 11 January 2019, ২৮ পৌষ ১৪২৫, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

২০১৮ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক

স্টাফ রিপোর্টার : মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) দাবি করেছে, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোর অগ্রগতির ধারা ২০১৮ সালে অব্যাহত থাকলেও মানবাধিকারের আরেকটি সূচক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। বিগত বছরগুলোর মতো ২০১৮ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে আসকের এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আসকের উপপরিচালক নীনা গোস্বামী ও জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির।

আসক’র তদন্ত কর্মকর্তা আবু আহমেদ ফয়জুল কবির লিখিত বক্তব্যে জানান, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেড়েছে। গত ২০১৮ সালে সারাদেশে ১ হাজার ১১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২৮৩ জনের। নির্যাতনের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে ১০৮ জন। এ ছাড়া রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছে ২৮ জন এবং যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৪৪ জন শিশু। তবে এ বছর নারী ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা কমে ৭৩২ জনে নেমেছে। বিগত ২০১৭ সালে তা ছিল ৮১৮ জনে।

আসক’র তদন্ত কর্মকর্তা আবু আহমেদ ফয়জুল কবির লিখিত বক্তব্যে বলেন, বিগত বছরগুলোর মতো ২০১৮ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। বছরজুড়ে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন ৪৬৬ জন। এর মধ্যে মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে ২৯২ জন নিহত হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, নিখোঁজ ও গুমের শিকার হয়েছেন ৩৪ জন। এদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ১৯ জনের সন্ধান পাওয়া গেলেও তাদের অধিকাংশ বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আটক রয়েছে। এছাড়া ২০১৮ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩২ জন নারী। ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৬৩ জন ও আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন। তবে ২০১৭ সালে নারী নির্যাতন ও গণধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৮১৮ জন, ২০১৬ সালে ছিলো ৭২৪ জন।

অপরদিকে, ২০১৮ সালে শিশু নির্যাতন ও হত্যা বেড়েছে। এ বছর বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয় মোট ১ হাজার ১১ জন শিশু। তার মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের কারণে অসুস্থ ধর্ষণের পরে মৃত্যু, ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে ২৮৩ জন নিহত হয়েছে। তাছাড়াও আত্মহত্যা করে ১০৮ জন, রহস্যজনক মৃত্যু হয় ২৮ জনের এবং যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৪৪ জন শিশু।

রাজনৈতিক সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার পর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৭০টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৪ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৯ জন ও বিএনপির ৪ জন। ২০১৮ সালে ৭০১টি সহিংতার ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছে ৬৭ জন।

এছাড়াও ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’র বিতর্কিত ৮টি ধারা সন্নিবেশিত করা হয়েছে এসব ধারায় মত প্রকাশের অধিকারকে বাধ্যগ্রস্ত করার আশঙ্কা রয়েছে বলেও সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়।

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আরো জানান, ২০১৮ সালে বখাটেদের কাছ থেকে যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৭৩ জন। যার মধ্যে রয়েছে ১১৬ জন নারী। উত্ত্যক্তকরণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৮ জন। এছাড়াও যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারীসহ খুন হয়েছে ১২ জন। সালিশ ও ফতোয়ার মাধ্যমে ৭ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাড়াছা যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়ছেন ১৯৫ জন। এর মধ্যে নির্যাতনের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৮৫ জনের এবং আত্মহত্যা করেছে ৬ জন।

অন্যদিকে, পরিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪০৯ জন নারী। ৫৮ জন নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ২৬ জন এবং নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের। অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ২২ জন। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

আসক’র পক্ষ থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়, ২০১৮ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ের ৯৭টি প্রতিমা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং ২৯টি বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে একজন নিহত ও ৪৬ জন আহত হয়।

আসকের পর্যবেক্ষণে সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্রও তুলে ধরে বলা হয়, বিগত ২০১৮ মালে হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানিসহ বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২০৭ জন সাংবাদিক। এছাড়া দুর্বৃত্তদের হাতে ৩ জন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়ছেন। এ বছর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র গুলীতে ৮ জন ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে ৬ জনসহ মোট ১৪ জন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সুপারিশে বলা হয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে মানবাধিকার রক্ষায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, সরকারকে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, গুম ও গুপ্ত হত্যাকান্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন, গুম/নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের জরুরিভিত্তিতে খুঁজে বের করাসহ গুম-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স-এ বাংলাদেশের অনুস্বাক্ষর, নারী ও শিশুর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ, মত প্রকাশের অধিকারে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ