ঢাকা, শুক্রবার 11 January 2019, ২৮ পৌষ ১৪২৫, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে যেতে বসেছে খেজুর রস

কলসে ভরা হচ্ছে খেজুরের রস

খুলনা অফিস: প্রভাতের শিশির ভেজা ঘাস আর ঘন কুয়াশার চাদরে ভেজা হেমন্তের শেষে শীতের আগমনের বার্তা জানিয়ে দিচ্ছে আমাদের। একসময় মওসুমী খেজুর রস দিয়েই গ্রামীণ জনপদে শুরু হতো শীতের আমেজ। শীতের সাথে রয়েছে খেজুর রসের এক অপূর্ব যোগাযোগ। গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সুমধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে পুরোদমে শুরু হতো পিঠা, পায়েস ও গুড় পাটালী তৈরির ধুম। গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস দিয়ে তৈরি করা নলেন গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও বাঁলী গুড়ের মিষ্টি গন্ধেই যেন অর্ধভোজন হয়ে যেতো। খেজুর রসের পায়েস, রসে ভেজা পিঠাসহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারেরতো জুড়িই ছিলোনা। এসময় মায়ের হাতে বানানো হরেক রকমের পিঠা-পুলি খাওয়ার ধুম পড়ে যেত। এজন্য একসময় তীব্র শীতের মাঝেও খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত থাকতেন গাছিরা। কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে খেজুরের রস। খুলনাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান মানুষের বাড়িঘর নির্মাণ, ইটভাটার জ্বালানি চাহিদা পূরণে নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ক্রমেই খেজুর গাছের সংখ্যা কমে গেছে। খেজুর গাছের অভাবে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন অনেক গাছি। গাছির অভাবে খেজুর গাছ কাটতে পারছেনা অনেক মালিক। মুজগুন্নী মেলার মাঠের পাশে কাজি রমিজ রাজা বাবু বলেন, ১৫ দিন ধরে গাছি খুঁজছি। আমাদের ৩টা গাছ আছে কিন্তু শহরে কোথাও একজন গাছি পেলাম না। গত কয়েক বছর পূর্বেও শীতকালে খুলনাঞ্চলের গাছিরা খেজুর গাছের রস সংগ্রহে খুবই ব্যস্ত সময় কাটাতেন। তারা খেজুরের রস ও পাটালী গুড় বিক্রি করে বাড়তি টাকা উপার্জন করতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে গত দু’তিন বছর ধরে তা ক্রমশ বিলুপ্ত হতে বসেছে। খেজুর রস দিয়ে শীত মওসুমে পিঠা ও পায়েস তৈরির প্রচলন থাকলেও শীতকালীন খেজুর গাছের রস এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনাঞ্চলের কয়রা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়ার সেনহাটিসহ কিছু কিছু এলাকায় এখনও চাহিদা মতো খেজুর গাছ থাকলেও সঠিকভাবে তা পরিচর্যা না করা, নতুন করে গাছের চারা রোপণ না করা এবং গাছ কাটার পদ্ধতিগত ভুলের কারণে প্রতি বছর অসংখ্য খেজুর গাছ মারা যাচ্ছে। এছাড়া এক শ্রেণির অসাধু ইটভাটার ব্যবসায়ীরা জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ ব্যবহার করার কারণে ক্রমেই কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা। প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও শীত পড়ার শুরুতেই উপজেলার সর্বত্র পেশাদার খেজুর গাছির চরম সঙ্কট পড়ে। তার পরেও কয়েকটি এলাকায় শখের বশে গাছিরা নামেমাত্র খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের কাজ করছেন। প্রকৃতি থেকে আজ খেজুরের রস একেবারেই হারিয়ে যেতে বসেছে।  সূত্রমতে, প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য খেজুর গাছ আর গুড়ের জন্য একসময় এ অঞ্চল বিখ্যাত ছিলো। অনেকে শখের বশে খেজুর গাছকে মধুবৃক্ষ বলে থাকতো। ওইসময় শীতের মওসুমে খেজুর রসের নলেন গুড়ের মৌ মৌ গন্ধে ভরে উঠতো গ্রামীণ জনপদ। খেজুর রস দিয়ে গৃহবধূদের সুস্বাদু পায়েস, বিভিন্ন ধরনের রসে ভেজানো পিঠা তৈরির ধুম পড়তো। রসনা তৃপ্তিতে খেজুরের নলেন গুড়ের পাটালির কোনো জুড়ি ছিলোনা। গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁপতে কাঁপতে ঠা-া খেজুর রস না খেলে যেন দিনটাই মাটি হয়ে যেতো। কিন্তু ইট ভাটার আগ্রাসনের কারণে আগের তুলনায় খেজুর গাছের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ইটভাটায় খেজুর গাছ পোড়ানো আইনত নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও ইটভাটার মালিকেরা সবকিছু ম্যানেজ করে ধ্বংস করে চলেছে খেজুর গাছ। গত কয়েক বছর ধরে ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছকে ব্যবহার করায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দ্রুত খেজুর গাছ ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে। ফলে এ জনপদের মানুষ এখন খেজুর রসের মজার মজার খাবার অনেকটাই হারাতে বসছে। 

সেনহাটির গাছি সলেমান বলেন, আগের মতো খেজুর গাছ না থাকায় এখন আর সেই রমরমা অবস্থা নেই। ফলে শীতকাল আসলে নিজের বাড়ির ৪-৫টা খেজুর গাছ শখের বসে কাটি। এসব অঞ্চলে প্রতি হাড়ি খেজুর রস ১৫০-৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাও চাহিদার তুলনায় খুবই কম।  রসের জন্য অপেক্ষায় থাকা আব্দুল মালেক বলেন, যখন মেয়ে জামাই আসবে জেনে একসপ্তাহ আগেই গাছিকে বলে রেখেছি এখন গাছি বলছে রস নেই। খেজুর গাছ রক্ষায় বন বিভাগের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ না থাকায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে খেজুর গাছ আর শীতের মওসুমে খেজুর গাছের রস শুধু আরব্য উপন্যাসের গল্পে পরিণত হতে চলেছে। ঐতিহ্যবাহি এ খেজুর রসের উৎপাদন বাড়াতে হলে টিকিয়ে রাখতে হবে খেজুর গাছের অস্তিত্ব। আর সে জন্য যথাযথভাবে পরিবেশ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ইটভাটাসহ যেকোনো বৃক্ষ নিধনকারীদের হাত থেকে খেজুর গাছ রক্ষা করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ