ঢাকা, শনিবার 12 January 2019, ২৯ পৌষ ১৪২৫, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে সুনাম হারাচ্ছে যশোরের খেজুরের পাটালী

মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস, যশোর থেকে : দেশে-বিদেশে পরিচিত যশোরের লোভনীয় খেজুরের পাটালি সুনাম হারাচ্ছে। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে এর স্বাদ-গন্ধ বিলীন হবার পথে। শীত মওসুমে শহরের অলি-গলি ও দোকানে পাটালির যে পশরা বসছে তার বেশিরভাগই ভেজাল। কম দামের চিনি মিশিয়ে খেজুরের পাটালি বলে তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এসব ভেজাল গুড় পাটালিতে এখন সয়লাব যশোরের হাটবাজার। ইতোমধ্যে শহরের আশপাশে ভেজাল পাটালি তৈরির কিছু কারখানাও গড়ে উঠেছে। ‘চিনি ছাড়া পাটালি শক্ত হয় না’ এমন প্রচারণা চালিয়ে ব্যবসায়ীরা অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে এ কারবার।
খেঁজুরের রস গুড় ও পাটালির জন্যে বিখ্যাত যশোর। এখানকার নলেন গুড়ের মৌ মৌ গন্ধ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছছে। বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে যশোরের গুড়। হালে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে যশোরের সেই সুনাম ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি পাটালি ১৫০ টাকা থেকে ২শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অধিক দামের পাটালিকে চিনিমুক্ত ফ্রেশ খেঁজুর গুড়ের পাটালি বলে দাবি করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা সঠিক নয়। কমবেশি চিনি মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে পাটালি। খেঁজুর রসের ভেজাল মুক্ত খাটি পাটালি পাওয়া দুস্কর। ফুটপাতের ক্ষুদে ব্যবসায়ী ও দোকানে বসা বড় ব্যবসায়ীরা একথা স্বীকার করেছেন। তাদের মতে, চিনি ছাড়া পাটালি ভাল হয় না। পাটালিকে শক্ত করার জন্যেই চিনি ব্যবহার করা হয়। ফ্রেশ খেঁজুর রস দিয়ে পাটালি বানালে যে খরচ পড়বে তা অনেকের পক্ষে কেনা সম্ভব হবে না। ব্যবসায়ীদের এ দাবি সঠিক নয়। আসল ব্যাপার হচ্ছে চিনি মিশ্রিত পাটালিতে কমপক্ষে তিনগুণ লাভ। কারণ, বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী প্রতিকেজি চিনির দাম ৫০ টাকা। প্রায় সমপরিমাণ গুড় চিনির সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে পাটালি। অর্থাৎ ৫০ টাকার ‘চিনি’ পাটালির সাথে মিশে দেড়শ’ পৌনে দুইশ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অবশ্য, চিনি মেশানোর বিষয়টি এখন কেউ লুকোচুরি করে না। সবাই স্বীকার করেন। ক্রেতারাও জানেন। তারপরও তারা উচ্চমূল্যে ভেজাল পাটালি কিনে ঘরে ফিরছেন। শীত মওসুমে পিঠা পায়েশের বাড়তি চাহিদা মেটাতে গুড়-পাটালির কোন কিল্প নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামের কিছু লোক ক্ষুদ্র পরিসরে পারিবারিক উদ্যোগে পাটালিতে ভেজাল দিচ্ছে। কিন্তু শহরের কিছু বড় ব্যবসায়ী  বাণিজ্যিকভাবে এ কারবার শুরু করেছেন। যশোর বড় বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ভেজাল পাটালি তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা এক্ষেত্রে কম দামের গুড় ব্যবহার করছেন। এখানে নাটোর থেকে আসছে ৭০ টাকা কেজি দরের বাটির মতো পাটালি। এর সাথে ৫০ টাকার  চিনি মিশিয়ে ওই ব্যবসায়ীরা যশোরের ‘লোভনীয়’ পাটালি তৈরি করছে এবং তিনগুণ বেশি দামে বাজারজাত করছে। বড় বাজারের গুড়  পাটালির একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চিনি মিশ্রিত পাটালি বিক্রি করা কোন প্রতারণা নয়। ক্রেতা-বিক্রেতা সকলেই বিষয়টি জানেন। বিক্রির সময়ও তা জানিয়ে দেয়া হয়।
গোবরা গ্রাম থেকে আসা একজন বৃদ্ধ বিক্রেতা জানান, চিনি না মেশালে পাটালি শক্ত  হয়। অবশ্য, আগে শক্ত হতো কীভাবে ? এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
ভেজাল পাটালির রমরমা বাণিজ্যের কারণে একদিকে, যশোরের সুনাম ও ঐতিহ্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে কিছু ব্যবসায়ী। এ বিষয়ে নজর দেয়া প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ