ঢাকা, শনিবার 12 January 2019, ২৯ পৌষ ১৪২৫, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সুবর্ণচর মানে সমগ্রদেশ বেঁচে থাকবার অধিকার

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : সুবর্ণ। মানে স্বর্ণ। সুন্দর রঙ। সোনা। সুবর্ণচর। অর্থাৎ সোনার চর। সমগ্র বাংলাদেশই আমাদের সুবর্ণচর। যেখানে পারুলরা নিরাপদ নন। তাঁর ইজ্জত-আব্রু অনিরাপদ এবং সংসার ও স্বামী-সন্তান বিপন্ন। অথচ এ সুবর্ণচরে সোনা ফলে। সোনার ধান ও গমের চাষ হয়। সোনালি আঁশ পাটও জন্মে সুবর্ণচরে। এ পাট একসময় সোনার দামে বিক্রি হতো বিদেশে। অর্জিত হতো সোনামাখা টাকা। যদিও পাটের সেসুদিন এখন আর নেই বললেই চলে।
হ্যাঁ, এ সুবর্ণচরেই স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘর বেঁধেছিলেন পারুল আখতার। স্বপ্ন ছিল অনেক মনের গহীনে তাঁদের। কিন্তু হায়েনার দল পারুল আখতারের সোনার সংসার তছনছ করে দিল। গুঁড়িয়ে দিল জীবনের সকল আশা-ভরসা গত ৩০ ডিসেম্বর গভীর রাতে। ঝাঁপিয়ে পড়লো নরপশুরা পারুলের শরীরে। তার আগে তাঁর স্বামী-সন্তানদের বেঁধে রাখে। এরপর সর্বনাশ ঘটায় পশুরা পারুলের।
পারুলের স্বামী খুব সাধারণ মানুষ। লেখাপড়া জানা নেই তাঁর। পেশায় সিএনজি বেবিচালক। থানায় মামলা করেছেন তিনি। কিন্তু মামলা নেবার সময় পুলিশ কৌশলে মূল আসামির নাম এজাহারভুক্ত করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে গ্রেফতারকৃতদের। এরপরও প্রকৃত অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবেই তা বলা যায় না। কারণ তারা ক্ষমতাসীন দলের লোক। হ্যাঁ, শুধু লোক বললে হবে না। দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা এবং কর্মীও ওরা। এছাড়া সদলবলে এমন দুষ্কর্ম করবার সাহস আর কার আছে?
সুবর্ণচরের গৃহবঁধূ ৪ সন্তানের জননী পারুল আখতারকে ভোটের দিন নৌকা মার্কায় ভোট প্রদানে চাপ প্রয়োগ করা হলে তিনি এর প্রতিবাদ করেন। তখন তাঁকে দেখে নেবার হুমকি দেয়া হয়। সেদিনের রাতেই সত্যিই সত্যিই তারা পারুলের বাড়িতে হামলা চালায়। বাড়ির সবাইকে বেঁধে রেখে তাঁকে গ্যাং রেপ ও পরে পাশবিকভাবে মারপিট করে। মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। পারুল এখন নোয়াখালি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। প্রাণে বাঁচলেও তিনি মানসিকভাবে সুস্থ হবেন কিনা বলা মুশকিল।
ক্ষমতাধর সন্ত্রাসীরা শুধু একজন  পারুলকেই ধর্ষণ করেনি। ওরা সুবর্ণচরের সমস্ত সৌন্দর্যও ম্লান করেছে। বলা যায়, গণতন্ত্র এবং সমগ্রদেশকেই ধর্ষণ করেছে পশুরা। হিংস্র জানোয়ারের চাইতেও ওরা বর্বর এবং ভয়ঙ্কর। ওরা কাউকে রেহাই দেয় না। সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্যের ওপর। লুটে নেয় নীরিহ নারীর সম্ভ্রম।
ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেবার অপরাধে ঘরবাড়িতে হামলা, স্বামী-সন্তানসহ পরিবার-পরিজনদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করে তাঁদের সামনে ওরা কেবল গৃহবঁধূ পারুল আখতারেরই শ্লীলতা হরণ করেনি। দেশের গণতন্ত্রকেই  মর্যাদাহীন করেছে। পাক হানাদার বাহিনীর মতোই নারীসমাজের ওপর হামলে পড়েছে। আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপরই ঘৃণ্য পৈশাচিকতা চালিয়েছে। এর নিন্দা জানাবার কোনও উপযুক্ত ভাষা আমাদের জানা নেই। আমরা বাকরুদ্ধ। স্থবির। স্থাণু প্রায়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু বলেন, “এবছর আমরা বারবার সতর্ক করেছিলাম নির্বাচনের আগে ও পরে যেন এমন ঘটনা না ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি ও যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তারপরও শিশুদের সামনে মাকে চরম লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে। মহিলা পরিষদ এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়। এই ঘটনার কেউ পার পাবে না বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমরা তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চাই।”-- ইত্তেফাক : ৭ জানুয়ারি, ২০১৯।
মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, “যে বাচ্চাদের সামনে মাকে অত্যাচার করা হয়েছে, সে বাচ্চারা কি কোনওদিন ট্রমা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে? আমি এমন পরিস্থিতির অপমান থেকে নারীসমাজের মুক্তি দেখে যেতে চাই।”-- প্রাগুক্ত।
কেয়ারটেকার সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “নতুন বছরে নতুন সরকার বিশাল মেন্ডেট নিয়ে এসেছে। তাদের কাছে প্রত্যাশা থাকবে নারী নির্যাতনকারীর রাজনৈতিক পরিচয়ে পার পেয়ে যাওয়া রোধ করতে হবে। অপরাধী অপরাধীই। এটি কথায় নয় কাজে প্রমাণ করবেন।” -- প্রাগুক্ত।
নারীপক্ষের আন্দোলন সম্পাদক  ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, “ধানের শীষে ভোট দেয়ায় নোয়াখালির সুবর্ণচরে গৃহবঁধূকে ধর্ষণঘটনায় নারীপক্ষ ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে  আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা এবং চরজুবিলি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য রুহুল আমিন এই নারীকে নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। তা সত্ত্বেও এই নারী ধানের শীষে ভোট দেয়ায় ক্ষুব্ধ রুহুল আমিনের নেতৃত্বে ১০-১২ জন তার স্বামী-সন্তানদের বেঁধে রেখে তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে এবং টাকাপয়সা ও স্বর্ণালঙ্কারসহ দামি জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।” -- প্রাগুক্ত। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাক আর্মির বর্বর আক্রমণ এবং এদেশের বাঙালি নারীদের ওপর  পৈশাচিক নির্যাতনের নিন্দা আমরা করি। সমগ্রবিশ্বও ধিক্কার দিয়েছে বর্বর পাকসেনাদের। কিন্তু গত ৩০ ডিসেম্বর সুবর্ণচরে পারুল আখতার ও তাঁর পরিবারের ওপর 'বিজয়ী' সন্ত্রাসীরা যা করলো তা ৭১ এর পাকসেনাদের চাইতে কি কম? এ লজ্জা আমরা কীভাবে ঢাকবো?
সুবর্ণচরের গৃহবঁধূ পারুলের শ্লীলতা হরণকারীদের বেশ ক'জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে। অপরাধ স্বীকারও করেছে ওদের কেউ কেউ। তবে ওরা যদি ক্ষমতাসীন দলের সত্যি সত্যিই হয় তাহলে নানা অপকৌশলে ওদের রক্ষার ব্যবস্থা হতে পারে। অবশ্য দল থেকে ওদের বহিষ্কারের খবর শোনা গেছে। তবে তা কতটা সত্য আমরা নিশ্চিত নই।
যাই হোক, পারুলের ইজ্জতের ওপর বর্বর হামলাকারীরা কোনও দলের হোক বা না হোক, ওদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া খুবই জরুরি। এছাড়া নিরাপদ থাকবে না সুবর্ণচর এবং এর বাসিন্দারা। সুবর্ণচর মানে নোয়াখালির একটি চর শুধু নয়। সুবর্ণচর মানে সোনার চর। সুবর্ণচর মানে আমাদের প্রিয় স্বদেশ। সমগ্র সোনার বাংলা। আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। আমাদের স্বাধীনতা। বেঁচে থাকবার অধিকার।
যেকোনও ত্যাগের বিনিময়ে এই সুবর্ণচরের গণতন্ত্র, মান-মর্যাদা এবং আব্রু-সম্ভ্রম আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। হিং¯্র হায়েনাদের রুখতে না পারলে আমাদের গণতন্ত্র যেমন বিপন্ন হতে পারে, তেমনই পারুল আখতারদের ইজ্জত-সম্ভ্রমও দীর্ঘদিনের জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ