ঢাকা, শনিবার 12 January 2019, ২৯ পৌষ ১৪২৫, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বদ্বীপ পরিকল্পনায় পোল্ডার ও অন্যান্য বাঁধ স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে

গতকাল শুক্রবার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্কের উদ্যোগে বদ্বীপ পরিকল্পনার এবং বাংলাদেশের স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : বিশ্ব প্রতিনিধি ও বাপার সহ সভাপতি ড. নজরুল ইসলাম বলেন, বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ এর সমালোচনা করে দেশীয় জলবায়ু অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বদ্বীপ পরিকল্পনায় যথেষ্ট গবেষণা ও সংশ্লিষ্টদের স¤পৃক্ত করা হয় নাই। পোল্ডার ও অন্যান্য বাঁধ স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। সেগুলো বিবেচনা নেয়া হয়নি।
গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন) সহ ৪০ টি পরিবেশবাদী সংগঠনের আয়োজনে খামার বাড়িস্থ’ কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে ২ দিন ব্যাপী বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ এবং বাংলাদেশের স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এইসব কথা বলেন। আজ সম্মেলনের শেষ দিন।
বাপার সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে  বক্তব্য রাখেন বেন এর বিশ্ব প্রতিনিধি ও বাপার সহ সভাপতি ড. নজরুল ইসলাম, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জেষ্ঠ সচিব ড. শামসুল আলম, সম্মেলন প্রস্তুতি পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ এবং বাপার সাধারণ স¤পাদক ডা. মো. আব্দুল মতিন, বাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির প্রমুখ। শত বছরের এ মহাপরিকল্পনা নিয়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবাদীদের নিয়ে এই সম্মেলন।
ড. শামসুল আলম, ড. নজরুল ইসলাম এর বক্তব্যের জবাবে বলেন, সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এই পরিকল্পনা করেছেন। পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিভিন্ন গবেষণা সমীক্ষার ভিত্তিতে এই প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-তে ২০৩০ সালের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে মোট দেশজ (জিডিপি) আয়ের ২.৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে মোট দেশজ (জিডিপি) আয়ের ০.৮ শতাংশ। ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় এ বরাদ্দ ২.৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নে প্রতিবছর এ পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রের মতো বাস্তু পরিবেশ নিয়ে ভাবতে হবে। বাস্তু পরিকল্পনাও সুচিন্তিত হওয়া জরুরি।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশ অনুযায়ী বদ্বীপ পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষ করে অতীতের পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে ভুল ভ্রান্তি হয়েছে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ঝুঁকি বিবেচনায় ছয়টি হটস্পট চিহ্নত করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। সেইসঙ্গে এসব হটস্পটে ৩৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হটস্পট গুলো হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী ও মোহনা অঞ্চল এবং নগরাঞ্চল। এক্ষেত্রে দেশের আটটি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মাত্রার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে একই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন জেলাগুলোকে একেকটি গ্রুপের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। পানি ও জলবায়ুজনিত অভিন্ন সমস্যাকবলিত এই অঞ্চলগুলোকেই হটস্পট হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
তারা আরও বলেন, ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় হটস্পটগুলোর এসব চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা সমাধানে বেশকিছু কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বন্যার ঝুঁকি কমাতে নদী ও পানিপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখা, পানিপ্রবাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীগুলোকে স্থিতিশীল রাখা, পর্যাপ্ত পরিমাণে ও মানসম্মত স্বাদু পানি সরবরাহ করা, নদীগুলোর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা, নদীগুলোতে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য নৌপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা, বন্যা ও জলাবদ্ধতাজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানো, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করা, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় টেকসই জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা, বন্যা থেকে কৃষি ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা, সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সঠিক নদী ব্যবস্থাপনা, টেকসই হাওর ও জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত পানি ও ভূমিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা ও ঝড় বৃষ্টি থেকে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শহর রক্ষা, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ছাড়াও নগর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়ানো ও নগর এলাকায় বন্যার ঝুঁকি কমানো গুরুত্ব পেয়েছে।
সরকার প্রস্তাবিত বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১শ’ সঠিক বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জাতীয় পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতি রাখা জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশের পানি ও ভূসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১শ’ নেয়া হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের বদ্বীপ পরিকল্পনার আলোকে পরিকল্পনাটি নেয়া হয়েছে। তবে, এখানকার নদী প্রবাহ, ঋতু ভিন্নতার কারণে সেখান থেকে বাংলাদেশের উপকৃত হওয়ার সুযোগ কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডেল্টা প্ল্যান’ নিয়ে গণশুনানির প্রস্তাব পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, পানি ও ভূসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ চূড়ান্ত করার আগে আর্থ-সামাজিক অবস্থা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ এসেছে পরিবেশ বিষয়ক একটি সম্মেলন থেকে।
সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, “পরিবেশ ও জলবায়ুর পরিবর্তন আমাদের জন্য বড় বিপর্যয়ের সংবাদ। মানুষ যদি এই যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পারে, যদি জলবায়ু পরিবর্তনের আক্রমণ প্রতিহত করতে না পারি, তবে বাংলাদেশের মানুষকে বড় খেসারত দিতে হবে। ডেল্টা প্ল্যান’নামে বেশি পরিচিত শতবছরের এ মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে একটি গণশুনানির প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেন, অন্তত বড় এক সমস্যা সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদী এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। আমি মনে করি, এতে অংশীজনের আরো অনেক মতামতের প্রয়োজন রয়েছে।
আওয়ামী লীগের গত সরকারের শেষ সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ডেল্টা প্ল্যানে বলা হয়েছে, নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবছর জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) আড়াই শতাংশের মত অর্থের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ অর্থায়ন বেসরকারি খাত থেকে এবং ২ শতাংশ সরকারি খাত থেকে যোগান দিতে হবে। এ বিনিয়োগ যেন সঠিক ধারায় সঠিক প্রকল্পে ব্যয় করা হয়, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন সম্মেলনে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা।
দুই দিনব্যাপী  এই সম্মেলনে প্রস্তাবিত বদ্বীপ কমিশনের সঙ্গে জাতীয় পরিকল্পনা কমিশন, নদী টাস্কফোর্স, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের বিষয়গুলো নিয়েও পর্যালোচনা হবে বলে আয়োজকরা জানান। বাপা ও বেন এর উদ্যোগে এই সম্মেলনে দেশের ১৩টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ১০টি শিক্ষা-গবেষণা- পেশাজীবী সংগঠন এবং ৪০টি বেসরকারি সামাজিক সংগঠনসহ পরিবেশ সচেতন অনেকে অংশগ্রহণ করছে। ২ দিনের এ সম্মেলনে মোট ৯২ টি গবেষণা পত্র উপস্থাপিত হবে। উক্ত সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ থেকে ৬ জন বিদেশী তাদের গবেষণা পত্র উপস্থাপন করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ