ঢাকা, রোববার 13 January 2019, ৩০ পৌষ ১৪২৫, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পুলিশ-পোশাক শ্রমিক ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া সংঘর্ষে ১৫ জন আহত ॥ গাড়ি ভাংচুর

স্টাফ রিপোর্টার : পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন নবম দিনে গড়াল। দাবি আদায়ে টানা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শ্রমিকরা। গতকাল শনিবারও  পোশাক শ্রমিকদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ১৫ জন শ্রমিক আহত হয় এবং ৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আন্দোলন দমাতে গতকাল রাস্তায় নামে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের মারমুখী অবস্থানের কারণে পিছু হটে পোশাক শ্রমিকরা।
আশুলিয়ায়  গতকাল শনিবার টানা নবম দিনের মতো ৩৫টি কারখানার শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে। এসময় তারা মহাসড়কে প্রায় ২০টি যানবাহনে ভাঙচুর চালায়। এঘটনায় অর্ধশত কারখানা বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।
 শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরাতে গেলে বেলা পৌনে এগারোটা থেকে পৌনে ১২টা পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে যাত্রীসহ ১০ জন শ্রমিক আহত হন। গতকাল শনিবার সকালে আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাপুর ও জিরাবো-কাঠগড়া এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। এছাড়াও শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে ৩৫টি কারখানাতে গতকাল শনিবারের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
কারখানার শ্রমিক ও পুলিশ সূত্র জানায়, সরকার নির্ধারিত মজুরি কাঠামোতে বৈষম্যের অভিযোগ এনে টানা নবম দিনের মতো কারখানায় শ্রবেশ করার কিছু সময় পরপরই একে একে ৩৫টি কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়কে নেমে আসে। এসময় তারা বাইপাইল-আব্দুল্লাপুর ও কাঠগড়া-জিরাবো সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। তবে অবরোধকালে তারা মহাসড়কে চলমান যাত্রীবাহী বাসসহ প্রায় ২০টি যানবাহনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। এতে পাঁচ যাত্রী আহত হন।
খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুঁড়তে থাকে। এসময় উভয়পক্ষে শুরু হয় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর পুলিশ লাঠিচার্জের পাশাপাশি টিয়ারশেল ও জলকামান দিয়ে গরম পানি নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে কমপক্ষে ৫ জন শ্রমিক আহত হন। পরে শ্রমিকরা মূল সড়ক থেকে সরে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।
এছাড়াও যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করে রাখা হয়েছে। এদিকে শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ করে রাখার কারণে আজ সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আব্দুল্লাপুর-বাইপাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। দুপুর ১২টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ওই এলাকায় ফের যানচলাচল শুরু হয়।
এদিকে সকালে সাভারের উলাইল এলাকাতেও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করে শ্রমিকরা। এসময় পুলিশ তাদেরকে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশের এসপি সানা সামিনুর রহমান বলেন, আশুলিয়া জামগড়া এলাকাসহ আশপাশের প্রায় ৩৫টি কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়কে নেমে এসে যানবাহনে ভাঙচুর ও অবরোধ করে রাখে। এসময় তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে জলকামান থেকে গরম পানি নিক্ষেপ করা হয় বলে তিনি জানান। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ওই এলাকার পোশাক কারখানাগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে রাজধানীর টেকনিক্যাল মোড় অবরোধ করে রাখা পোশাকশ্রমিকদের অবরোধ দুই ঘণ্টা হওয়ার পরও সেখানে মালিক সংগঠন, কিংবা পুলিশের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা ছিল না।
পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাংলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকে সড়কে অবস্থান নিতে যায়। ছাত্রলীগের নেতারা পোশাক শ্রমিকদের মুখোমুখি হওয়ার পর ধাক্কাধাক্কিও হয় সেখানে। পরে দুপুর ১টার দিকে টেকনিক্যাল মোড় থেকে সরে দাঁড়ান শ্রমিকরা। এতে ওই সড়কে যান চলাচল শুরু হয়।
এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, বাঙলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সহ-সভাপতি নাছির নঈম মুহিম, সাংগঠনিক সম্পাদক সাদ্দাম, সহ-সম্পাদক লাবু, সদস্য মানিক চৌধুরীসহ ছাত্রলীগের ৪০/৫০ জন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা-১ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের এসপি সানা সামিনুর রহমান বলেন, শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করলে তাদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরা মহাসড়কে টহল দিচ্ছে বলেও তিনি জানান।
গাজীপুর সংবাদবাতা জানান,সকাল ৯ টা থেকে আন্দোলনে নামে পোষাক শ্রমিকরা। এসময় তারা মহাসড়ক অবলোধ করেন। পরে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে জনকামান এবং টিয়ার সেল নিক্ষেপ করেন। টঙ্গীতে আন্দোলনরত ৫ শ্রমিককে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা তুলে নেওয়ার খবরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানা ও গাড়ি ভাংচুর এবং মহাসড়ক অবরোধ করেছে। এসময় একাধিক পয়েন্টে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়। এদিকে টঙ্গী এলাকায় গার্মেন্টসে ভাংচুর ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত ৫ জন সন্ত্রাসীকে আটক করেছে র‌্যাব-১ এর সদস্যরা। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে এদিন জেলার প্রায় অর্ধশত কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। পুলিশ ও কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, ভ্রান্ত ধারণা থেকে শ্রমিকরা অযৌক্তিকভাবে গত কয়েকদিন ধরে এ আন্দোলন করছে।
টঙ্গী (পূর্ব) থানার ওসি  মো. কামাল হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের বুঝিয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা পর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও টঙ্গী-নরসিংদী সড়ক থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সরিয়ে দিলে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। তিনি আরো বলেন, শ্রমিক অসন্তেষের ফলে স্থানীয় বিসিক এলাকার প্রায় ৪০টি কারখানা শনিবারের জন্য ছুটি হয়ে যায়। তবে সাদা পোশাকে পাঁচ শ্রমিককে ধরে নেয়ার খবরের সত্যতা স্বীকার করে ওসি কামাল বলেন, তাদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে কারা বা কি কারণে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সে ব্যাপারে কোন তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।
শিল্পাঞ্চল পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাহেব আলী পাঠান জানান, সরকার ঘোষিত মুজুরী কাঠামো অনুযায়ী বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলন করে আসছে। শ্রমিক অসন্তোষের মুখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শনিবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ভোগড়া বাইপাস সড়ক এলাকার স্কয়ার, চান্দনা-চৌরাস্তা ও আশেপাশের এলাকার বডি ফ্যাশন, টিএনজেড, টপ নিট ওয়্যার, কোনাবাড়ির রেজাউল গার্মেন্টস, টঙ্গী থানাধীন গাজীপুরার মন্ডল গ্রুপ, ওরিয়ন ও নিপ্পন, নলজানী এলাকার কোজিমা এবং টঙ্গী বিসিক এলাকার প্রায় সবক’টি সহ জেলার প্রায় অর্ধশত পোশাক কারখানা শনিবারের জন্য ছুটি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ