ঢাকা, রোববার 13 January 2019, ৩০ পৌষ ১৪২৫, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ইসলামী স্থাপত্যের অনুপম নিদর্শন মখদুম শাহদ্দৌলা জামে মসজিদ

মখদুম শাহদৌলা (রহ:) মাজার ও মসজিদ -সংগ্রাম

শাহজাদপুর : এ অঞ্চলে ১২৯২ খৃষ্টাব্দে আরবের ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য হযরত মখদুম শাহদ্দৌলা (রহঃ) একদল মুবাল্লিগ সহ শাহজাদপুরে আসেন। ঐতিহাসিকদের অনেকেই একমত যে, তয়োদশ মতাব্দীর মধ্যভাগে হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর সিলেট আগমনের অনেক আগেই মখদুম শাহদ্দৌলা (রঃ) তাঁর অনুচরদের নিয়ে আসতেন।  দি জার্নাল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল ভলিউম ৭০(১৯০৪)  প্রথম খ-ে মৌলভী আব্দুলওয়ালী লিখেছেন, আরব দেশের ইয়েমেনের গর্ভনর মুয়াজ ইবনে জাবালের  দুই পুত্র কন্যা সন্তান ছিল তাঁর মধ্যে বড়। পুত্র  মখদুম শাহদ্দৌলা (র.) পিতার অনুমতি নিয়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসেন। এ সময় তাঁরা বজরা নৌকা দিয়ে পোতাজিয়া নামক স্থানটিতে নোঙ্গর করেন। ওই সময় বর্ষা মৌসুম হওয়ায় থই থই পানিতে গোটা শাহজাদপুর ডুবে ছিল। দেখা যেত সাগরের মত। তখন তারা এক জোড়া কবুতর নিয়ে ছেড়ে দেন। আর নিশানার জন্য কবুতরের জোড়া  উড়ে গিয়ে শুকনো মাটি নিয়ে আসেন। অবশ্য এ কবুতর বর্তমান উজবেকিস্তানের বোখারা নগরীরর জালাল উদ্দিন তিবরীজির কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলেন। পরে কবুতরের অনুসরণ করে করতোয়া নদীর তীরে দরগাহপাড়া এসে তাবু টানান। এবং সাময়িকভাবে এখানে বসবাস করে ইসলাম প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। দরগাহপাড়ার এই স্থানটিতেই মখদুম শাহদ্দৌলা (রহঃ) তাঁর অনুচর  এবং ওস্তাদ শামসুদ্দিন তাবরেজীকে নিয়ে পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করতেন। ধীরে ধীরে এখানে গড়ে তোলেন জামে মসজিদ। তখনকার ওই মসজিদটি “মখদুমিয়া জামে মসজিদ” হিসেবেই পরিচিত লাভ করে। আর এই মসজিদকে ঘিরেই ইসলাম প্রচারণা চালাতে থাকেন  তখন এই অঞ্চলের সবটুকুই ছিল সুবা বিহারের রাজা বিক্রম কিশোরীর অধীনে।  ইসলাম প্রচারে ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা বিক্রম কিশোরী বাঁধা প্রদান করতে থাকলে সর্বমোট ৩৩বার মখদুম শাহদ্দৌলা (রহঃ) এর সাথে যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। প্রথম দুটি যুদ্ধে বিক্রম কিশোরী পরাজিত হলে প্রতিশোধের নেশায় মরিয়া হয়ে উঠে। পরে গুপ্তচর পাঠিয়ে ওই গুপ্তচর মখদুম শাহদ্দেীলা (রহঃ) এর বিশ্বস্ত সহচরে পরিণত হয়ে একদিন একাকী অবস্থায় আসর নামাজ পড়ার সময় ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে গুপ্তচর দেহ থেকে গর্দান মোবারক বিছিন্ন করে শহীদ করেন। পরে তাঁর দ্বিখন্ডিত মাথা সুবা বিহারের রাজা বিক্রম কিশোরীর নিকট নেয়া হলে সেখানেও জবান থেকে সোবহান আল্লাহ ধ্বণী উচ্চারিত হতে থাকে। এই অলৈাকিক দৃশ্য দেখে সুবা বিহারের রাজা সহ অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। দ্বি খন্ডিত দেহ মোবারক এই মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দাফন করা হয়। থেমে থাকেনি ইসলাম প্রচারের কাজ। শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবিত হয়ে মখদুম শাহদৌলা (রহঃ) অনুচররা অব্যাহত রাখেন প্রচার প্রসারের কাজ। সুযোগ্য উত্তরসূরী ইউসুফ শাহ (রহঃ), শাহ হাবিবুল্লাহ (রহঃ),শাহ বদর (রহঃ), ওস্তাদ শামসুদ্দিন তাবরেজী (রহঃ) এর প্রচেষ্টায় দিন দিন ইসলাম ব্যাপকভাবে বিস্তার করে। যার ফলে হিন্দুদের সংখ্যা কমে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করা হয়। এজন্য বহু সংখ্যক ঈমানদার মুসলমানকে শহীদ হতে হয়। দরগাহপাড়ার বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য শহীদের কবর রয়েছে। এমনকি এই মসজিদের  দক্ষিণ কোণে শহীদদের গণকবর বা গঞ্জে শহীদান রয়েছে। পরে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা শহীদী রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করে এ অঞ্চলে শাসনভার অর্পিত হয় ইউসুফ শাহ (রহঃ) এর উপর। অঅর তাঁর নামাুনসারেই এ অঞ্চলকে ইউসুফ শাহ পরগনার অধীনে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে (১৫০০-১৫৭৬) খৃষ্টাব্দে  বাংলার মুসলিম সুলতানী আমলে এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তৎকালীন মুসলিম স্থাপত্য শৈলীর অন্যতম কারুকার্য ব্যবহার করা হয় এর নির্মাণে। ১৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের উত্তর দক্ষিণ দৈর্ঘ্য ১৩.১৯ মিটার পূর্ব পশ্চিম প্রস্থ ১২.৬০ মিটারএবং ছাদের উপরিভাগের গম্বুজের ব্যাাস৩.০৮ মিটার। গম্বুজের প্রতিটি মাথায় পিতলের কারুকার্য মন্ডিত। যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। এটিই শাহজাদপুরের মুসলমানদের প্রথম বা বড় মসজিদ হিসেবে পরিচিত। প্রতি জুম্মাবার এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তদ থেকে শত শত মুছুল্লী এখানে নামাজ আদায় করতে আসে। সুলতানী আমলে ইসলাম প্রচারক হযরত মখদুমস শাহদ্দৌলা (রহঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত স্থানে তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা শাহজাদপুর দরগাহপাড়া “মখদুমীয়া জামে মসজিদ নির্মাণ করেছেন তা কালের গর্বে হারিয়ে যেতে বসেছে।  বিজড়িত স্থানে তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা শাহজাদপুর দরগাহপাড়া “মখদুমীয়া জামে মসজিদ নির্মাণ করেছেন তা কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। মসজিদটির ভিতর ও বাইরে শ্যাওলা জমে গেছে। সিমেন্ট, পাথর, চুন শরুকী নষ্ট হয়ে গেছে। সর্বমোট ২ বার এই মসজিদটি সংস্কার করা হয়েছে। গত ৪ মাস আগেও মসজিদটি ২য় দফা সংস্কার করা হয়। মসজিদের পাশে মখদুম শাহদ্দৌলা (রহঃ) এর কবরের উপরে বিশাল আকৃতির গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে। এই মসজিদ ও মাজারকে ঘিরে এখানে প্রতিদিন শত শত ধর্মপ্রাণ নারী পুরুষ জিয়ারত করতে আসে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এখানে এসে অলীর অছিলা করে কিছু চাইলে তা পাওয়া যায়। তাই মানতের জন্য গরু, ছাগল, মুরগী নিয়ে ছিরনী দেয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের  শাহজাদপুরের মানুষের বিশ্বাস এখানে এসে অলীর অছিলা করে কিছু চাইলে তা পাওয়া যায়। তাই মানতের জন্য গরু, ছাগল, মুরগী নিয়ে ছিরনী দেয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের  আওতায় এটি সংরক্ষণ ও দেখা শুনা করা হয়।  আওতায় এটি সংরক্ষণ ও দেখাশুনা করা হয়। প্রতি বছর মখদুম শাহদ্দৌলা (রহঃ) এর নামে বাৎসরিক ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। শাহজাদপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ এখানে আাসে নামাজ আদায় করতে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও আাসেন নারীÑপুরুষ্। তবে দুঃখজনক হলো এখানকার পুরাকীর্তি হিসেবে মখদুমিয়া জামে মসজিদ থাকলেও নতুন নির্মিত মাজারের উপরের বিশাল গম্বুজুিটই সর্বাধিক গুরুত্ব পায় এর স্মৃতিচিহৃ হিসেবে। তবে এর প্রকৃত ইতিহাস অনেকেই না জেনে এটাকে শাহ মখদুমের মাজার বলে অভিহিত করে থাকে। অথচ শাহ মখদুম হচ্ছেন রাজশাহী অঞ্চলের একজন ইসলাম প্রচারক।
এছাড়াও দরগাহ পাড়ার অদূরে ছয়আনী পাড়ায় একটি মসজিদ রয়েছে। যা শাহ বদর মসজিদ হিসেবে পরিচিত। সেটির শিলালিপি থেকে বোঝা যায়, সেটিও মখদুম শাহদৌলা (রহঃ) এর পরবর্তী সময়ে এিেট নির্মিত হয়েছে। তাই শাহজাদপুরের এই দুটি মসজিদই সবচেয়ে প্রাচীনতম বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। যার কারণে শাহজাদপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। এর প্রাক্তন তাত্ত্বিক স্মৃতিচিহৃগুলো যথাযথ সংরক্ষণ না করায় হারাতে বসেছে ঐতিহ্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ