ঢাকা, সোমবার 14 January 2019, ১ মাঘ ১৪২৫, ৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চোর মহাজনদের লাগাম টেনে ধরুন

তোফাজ্জল হোসাইন : দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশেষত ব্যাংক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ব্যাংকিং সেক্টর অনেক খানি এগিয়ে। গত ৯ বছরে দেশে আর্থিক খাতে এত বেশি কেলেঙ্কারি হয়েছে, যার কারণে ব্যাংকিং খাত নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। আর্থিক খাতের এই কেলেঙ্কারির দায় সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। যারা দেশের আর্থিক খাতকে ধ্বংস করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বুক ফুলিয়ে চলে, সরকারের দরকার ব্যাংক চোর ওইসব আসল মহাজনকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া। কারণ অপরাধ করে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই আমাদের দেশে অপরাধপ্রবণতা ক্রমবর্ধমান। শুধু আর্থিক বা ব্যাংকিং খাত নয়, রাষ্ট্রের সব বিভাগই এখন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে রিজার্ভ চুরি এবং পরবর্তী ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা দেশের সচেতন মানুষকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে। আসলে রাষ্ট্রের রিজার্ভ যদি অরক্ষিত হয়, তাহলে সার্বিক সুরক্ষাও রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। সচেতন জনগণের প্রশ্ন, আর্থিক সেক্টর কার হাতে, সরকার না অন্য কেউ? সদুত্তর কারো জানা আছে বলে মনে হয় না।
২০০৯ সালের পর এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠিত হয়েছে। শেয়ার বাজারের সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যা করেছেন অনেকেই। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, যুবক, ডেসটিনি, বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের ২০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। তা-ই নয়, জনতা ব্যাংকের এফডিআর পর্যন্ত চুরির ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত এত বড় লুণ্ঠনের দায়ে একজনেরও শাস্তি হয়নি। এভাবে চুরি-ডাকাতি প্রশ্রয় পেয়ে লুটেরা মহাজনেরা এত বেশি বেপরোয়া হয়েছে। যার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে হাত বাড়াতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি অপরাধী চক্র।
অতীতের কথা, মহাজনের কাছ থেকে কেউ ২০ টাকা কর্জ নিলে সুদাসলে সেই টাকা ২০০ টাকা হতো, পরিশোধ করতে না পারলে মহাজন তার লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে ঘরবাড়ি দখল করে নিত। রাস্তায় বসে আহাজারি করত কর্জ গ্রহিতা।
বগুড়ার টিপু সুলতান ছোট পরিসরে ব্যবসা করতেন। ঢাকা ট্রেডিং হাউজের নামে সীমিত পরিসরে পণ্য আমদানি করতেন, ২০০৯ সাল থেকে অপ্রত্যাশিত উত্থান হয় তার। প্রায় এক ডজন ব্যাংক থেকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিবহন ব্যবসা শুরু করেন। এ ব্যবসার মালিকানাধীন টিআর ট্রাভেলসের এসি, নন-এসি বাসগুলো চলাচল করত ঢাকা থেকে বগুড়া, রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটে। কিন্তু সেসবই এখন দূর অতীত। কোনো বাছবিচার না করে জামানত ছাড়াই টিপু সুলতানকে ঋণ দেয়া হয়। জনতা ব্যাংকের ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে ২০১৬ সালের মার্চে দুদকের মামলায় গ্রেফতার হন টিপু সুলতান। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের তদবিরে জামিন পেয়ে টিপু সেই যে গেলেন আর ফিরে এলেন না।
দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ নেয়া অন্তত চার হাজার অধিক তৈরী পোশাক কারখানা এখন বন্ধ। এর বেশির ভাগ গার্মেন্টেস মালিকদের নেয়া, ঋণ হাতে যেতে না যেতেই কারখানা বন্ধ করে উধাও। ঋণদাতা ব্যাংকগুলো তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পায় না। সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ না করে কয়েক শ’ উদ্যোক্তা সটকে পড়ছে। এর মধ্যে ১৬ হাজার কোটি টাকা আদায় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কোনোরকম যাচাই-বাছাই না করে লাপাত্তা। ঋণ দিয়ে বিপাকে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টির বেশি ব্যাংক। মোরশেদ ইব্রাহিম দেখাশুনা করত তার বাবার তৈরি করা ইব্রাহিম কটনমিল। সেই কটনমিল চালাতে গিয়ে অনেক বড় অঙ্কের দায় দেনা ঘাড়ে চেপে বসে। এত ঋণ মাথায় রেখে ইব্রাহিম কটনমিল বিক্রি করে নতুন করে গড়ে তোলেন ক্রিস্টাল গ্রুপ নামে একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে একের পর এক ঋণ নিতে থাকেন মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেয়া টাকার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকের কোনো ঋণ পরিশোধ তো করেননি বরং মালিক হয়েছেন ব্যাংকের। ফার্মাস ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক চট্টগ্রামের এই ব্যবসায়ী। দুদকের রিপোর্টে পাওয়া যায়- মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম আটটি ব্যাংক ও চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশন অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে। তাতে কোনো লাভ হয়নি। কারণ সরকারের উঁচু পর্যায়ে তাদের যোগসাজশ রয়েছে।
বিসমিল্লাহ গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে প্রাইমসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। শুধু প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ঋণ নিয়েছে ৩২৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ব্যাংকের এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বিসমিল্লাহ গ্রুপের নামে রাজধানীর তিনটি থানায় ১২টি মামলা হয়। দীর্ঘ তদন্ত করে দুদক এই মামলাগুলো দায়ের করে ২০১৩ সালে। শুধু মামলা করাই সার, বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেনি। কারণ উপরে তার হাত আছে।
হলমার্কের কথা তো সবার জানা, এমডি তানভীর মাহমুদ চার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সোনালী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক থেকে। কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়া ভুয়া জমির কাগজপত্র এবং ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ঋণ গ্রহণ করে। হলমার্কের নামে প্রতিষ্ঠান ছিল তানভীরের নামকাওয়াস্তে। ছিল তার বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। নিজে চলত প্রাডো গাড়িতে, চার পাশে থাকত ১৫ থেকে ২০টি মোটরসাইকেল; সবার হাতে অস্ত্র। ঋণ জালিয়াতির দায়ে তানভীরের নামে দুদক মামলা করে স্ত্রীসহ তাকে গ্রেফতার করে। কিন্তু অবাক করা কা-, জেলখানায়ই জামাই আদরে জীবন যাপন করছে তানভীর।
আর্থিক খাতের এই কেলেঙ্কারির জন্য সরকার এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তা কেউ দায় এড়াতে পারবেন না। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু অর্থনীতিবিদ, কয়েকজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা এবং কিছু সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ীÑ সেই সাথে সরকারের মদদপুষ্ট ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এত বেশি তৎপরতা দেখাচ্ছে, যেন ব্যাংকিং খাতে কোনো দুর্নীতি তথা ঋণ জালিয়াতি হয়নি। তাদের এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে দেশ এবং জাতির স্বার্থে। বাংলাদেশের অর্ধেক ব্যাংক ঋণ জালিয়াতের চক্রে পড়ে আজ দিশেহারা। বড় বড় ঋণখেলাপির কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা আটকা পড়েছে, তাদের নাম পর্যন্ত প্রকাশ করা হচ্ছে না। কারণ তদন্ত করতে গেলে কেঁচো নয়, অজগর বেরিয়ে আসবে।
বাংলাদেশের সরকারি কিংবা বেসরকারি ব্যাংকই বলি, গোটা ব্যাংকখাতকে ক্ষমতাসীনেরা অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে ব্যাংক খাতের দুর্নীতি আর লুটপাট নিয়ে পত্রপত্রিকায় যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা বর্ণনায় লিখে শেষ করা কঠিন। সরকার এসব দুর্নীতি আর লুটপাটের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, বরং ওই সব ঋণখেলাপি মহাজন সরকারের ছত্রছায়ায় আরো বেসামাল।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড গ্রাহকদের সূদৃঢ় আস্থার প্রতীক হিসেবে সুনামের সাথে ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বৃহত্তর বেসরকারি ইসলামী ব্যাংকের ওপর ক্ষমতাসীনদের নজর পড়েছে। বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক ১৯৮৩ সাল থেকে সব চেয়ে বড় ও লাভজনক ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৭ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন করে ক্ষমতাসীন সরকার। তাদের অধীনস্থ লোক বসিয়ে একের পর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করতে থাকে। যেন সরকার তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। আর তাই হলো।
পরিচালনা বোর্ডের পরিবর্তনের ১৬ মাসের মাথায় ব্যাংকটির আর্থিক সঙ্কটে বিশিষ্ট ব্যাংকার, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। গ্রাহকদের আস্থার নীড়, অব্যবস্থাপনা, একটি নির্দিষ্ট চক্রের হাতে রাতারাতি নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কারণে ব্যাংকটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ক্ষমতাসীনেরা এ ধরনের একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানকে অন্যান্য ব্যাংকের মতো ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশের বিবেকবান মানুষ এবং ব্যাংকটির আমানতকারীরা চান- বাংলাদেশ ব্যাংক এই জনপ্রিয় ব্যাংকটিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে।
রিজার্ভ চুরির মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাকেও সরকার ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সিআইডি গঠিত তদন্ত রিপোর্ট গত দুই বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। ১৭ বার সময় চেয়েছে আদালতের কাছে। রিজার্ভ চুরির মতো এত বড় ঘটনার সাথে যে সব চোর মহাজন জড়িত তাদের কোনো শাস্তি না হওয়ায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদে এ সিন্ডিকেট খুবই শক্তিশালী, যার কারণে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে।
গত ১৭ জুলাই একটি জাতিয় দৈনিকে ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ভুতুড়ে কাণ্ড’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়। ওই রিপোর্টে বলা হয়- শুল্ক, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের এক অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের স্বর্ণের ভয়ঙ্কর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। স্বর্ণ বা বুলিয়ন ভল্ট পর্যন্ত যেতে তিন তিনটি দরজা অতিক্রম করতে হয়। প্রত্যেকটি ভল্টের আলাদা আলাদা আলমারি এবং চাবিও আলাদা, সেই চাবিগুলোর জন্য রয়েছে সিন্দুকের ব্যবস্থা। রাতে ভল্ট বন্ধ করে যাওয়ার পর ব্যাংকের গভর্নর এসে ঢুকতে চাইলেও পারবেন না। এত নিরাপত্তার চাদর ভেদ করে যে কাণ্ড ঘটিয়েছে তা রীতিমতো আতঙ্ক। রিজার্ভ গেল, ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা গেল, নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ভল্টের স্বর্ণও গেল, এবার উধাও হলো বড়পুকুরিয়ার এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা; যার বাজারমূল্য ২২৭ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটলেও কয়লা উধাওয়ের ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। কারা এই চোর মহাজন, সরকারের উচিত তদন্তের মাধ্যমে রিজার্ভ চুরি, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, ভল্টের স্বর্ণে হেরফের এবং বড়পুকুরিয়ার কয়লা চোরদের মুখোশ উন্মোচন করা। না হয় জাতি মনে করবে, ওই চোর মহাজনদের পেছনে রাষ্ট্রীয় শক্তির হাত রয়েছে।
Tafazzalh59@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ