ঢাকা, মঙ্গলবার 15 January 2019, ২ মাঘ ১৪২৫, ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ড. কামালের হঠাৎ স্পর্শকাতরতা : একটি বিশ্লেষণ

গত কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে গণফোরাম সভাপতি ও ঐক্যজোট নেতা ড. কামাল হোসেনের একটি বক্তব্য টপ নিউজ হিসেবে বিরাজ করছে। গত শনিবার আরামবাগে গণফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আহূত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জামায়াতের সাথে ঐক্য করে রাজনীতি করবেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তড়িঘড়ি করে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে যেসব ভুল-ত্রুটি হয়েছে তা সংশোধন করা হবে। তার মতে, জামায়াতের সাথে রাজনীতি করার প্রশ্নই ওঠে না। ওদের সাথে রাজনীতি করিনি, করবো না। তিনি বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার পরামর্শ দেন এবং তা করার জন্য বিএনপির উপর চাপ সৃষ্টি করা হবে বলেও জানান। তিনি আরো জানান যে, যখন ঐক্যে তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন তখন জামায়াতের কথা তার জানা ছিল না। অনেকে প্রশ্ন করছেন ড, কামালকে জামায়াতের সাথে ঐক্য করে রাজনীতি করতে বলেছে কে? কেন তিনি এসব বলছেন। ড. কামাল হোসেন একজন অভিজ্ঞ ও বর্ষিয়ান রাজনৈতিক নেতা। তিনি যে বক্তব্যটি রেখেছেন তা অত্যন্ত সংবেদনশীল, যদিও এই সংবেদনশীলতার কারণ খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত মুষ্কিল। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে তিনি জাতীয় ঐক্যের দর্শন নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার দল গণফোরাম একটি বিস্মৃত দল, এই দলের নেতানেত্রীর তুলনায় অনুসারীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। তিনি আওয়ামী লীগের একজন নেতা ছিলেন। পরবর্তীকালে অনেকদিন ক্ষমতাহীন অবস্থায় থেকে তিনি দলটি থেকে বের হয়ে গিয়ে গণফোরাম গঠন করেন। কিন্তু এতে গণঅংশীদারিত্ব না থাকায় তার দলটি নিছক একটি ফোরাম হিসেবেই থেকে যায়। অতীতে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আদায়ের কোনো আন্দোলন সংগ্রামে তিনি কখনো সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন এমন নজির বিরল। তথাপি বিএনপিও ২০ দলীয় জোটের সভানেত্রীর অনুপস্থিতিতে তিনি যখন জাতীয় ঐক্যের বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসেন তখন তাকে সাদরে গ্রহণ করা হয়। তখনও কেউ কেউ জামায়াতের কথা বলেছিলেন। জামায়াত ২০ দলীয় জোটের অন্যতম সক্রিয় দল। তিনি জেনেশুনেই ২০ দলীয় জোটের প্রধান অনুঘটক বিএনপির সাথে ঐক্য করেছেন। একবার একজন সাংবাদিক জামায়াতের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি ‘খামোশ’ বলে তাকে চুপ থাকার পরামর্শ দেন এবং জিজ্ঞাসা করেন যে কার কাছ থেকে পয়সা খেয়ে তিনি এই প্রশ্ন করছেন। এই নিয়ে পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও সামাজিক মিডিয়ার আওয়ামী সমর্থক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীরা অনেকটা তুলকালাম অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এর মধ্যে পদ্মা যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। সরকার প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন মিলে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে নির্বাচনের আগের দিন রাতে এবং নির্বাচনের দিন বিরোধী দলের প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ও নির্বাচনী এজেন্টদের ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের যোগসাজশে ব্যালট পেপারে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করেছেন এবং নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করেছেন। বিবিসি, সিএনএন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই ভোট চুরির প্রামাণ্য চিত্র  সারা দুনিয়া দেখেছে।
গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার স্বাধীনতার রক্ষাকবচ। সরকার তার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নির্বাচনী তৎপরতা চালাতে দেয়নি। তারা মিছিল মিটিং করতে পারেনি, সিডিউল ঘোষণার আগে ও পরে পাইকারী হারে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে। অনেক প্রার্থী, তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা এখনো মুক্তি পায়নি। ড. কামাল ও ঐক্যজোট নেতারা সাংবাদিক সম্মেলন করে দেশবাসীকে বিষয়টি অবহিত করেছেন। বিভিন্ন দূতাবাসকে চা চক্রে আমন্ত্রণ জানিয়ে পরিস্থিতি তাদের গোচরে নিয়েছেন এবং নির্বাচনী ফলাফল ও নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করেছেন। ড. কামাল ও ঐক্যফ্রন্ট জাতিকে তার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে ভোটাধিকার হারিয়ে মানুষ বঞ্চনার শিকার হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের আগে তার ৭ দফা দাবি এবং ১১ দফা লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল। কিন্তু তার অর্জন শূন্য।
এই অবস্থায় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা হিসেবে জাতি আশা করেছিল যে ড. কামাল সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে এই ফ্রন্টকে সম্প্রসারণ এবং জাতীয় ঐক্যকে সংহত করে পরিস্থিতি মোকাবেলার কৌশল বের করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু তা না করে তিনি জামায়াতকে টেনে এনেছেন। তিনি যে ঐক্যফ্রন্টের নেতা সেই ফ্রন্টের কম্পোনেন্ট দল হচ্ছে বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য। জামায়াতের সেখানে নাম-গন্ধও নেই। আবার আমাদের জানা মতে, ঐক্য নামের ফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর মধ্যে এমন কোন চুক্তি বা বুঝাপড়া ছিল না যে তারা দলীয়ভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ফ্রন্টের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে। ২০ দলীয় জোটের (পরে ২৩ দলীয় জোট) নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি। ঐ জোট এখনও বহাল আছে। বিএনপি ঐক্যজোটের অংশ, ২০ বা ২৩ দলীয় জোট নয়। ২০ দলীয় জোটের শরিক হিসেবেই প্রচলিত আইন মেনে জামায়াত বিএনপির প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে গেছে। প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে ডিসেম্বরে, ঐক্যজোট গঠিত হয়েছে ১৩ অক্টোবর তারিখে। ড. কামাল বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার কথা বলার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যের কথাও বলেছেন। এটা পরস্পর বিরোধী প্রত্যাশা। মনে হয় তিনি অনেক কিছুই ভুলে গেছেন। আবার নতুন তথ্যমন্ত্রীকে তার সুরে সুর মিলাতেও দেখা যায়। বিষয়টি চমকপ্রদ। এতো স্পর্শকাতর না হয়ে ড. কামাল এই প্রসঙ্গটি ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করলে ভাল হতো।
এখন জামায়াত প্রসঙ্গে আসি। জামায়াত বাংলাদেশের মাটিতে নতুন কোন দল নয়, দলটি জনবিচ্ছিন্নও নয়; আল্লাহর উপর আস্থা ও তার সার্বভৌমত্ব, ইনসাফ, সততা, নিষ্ঠা প্রভৃতির ভিত্তিতে তার আইনকে সম্বল করে একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এর লক্ষ্য। ১৯৭৯ সাল থেকে এ দেশের মাটিতে দলটি গোপনে নয়, প্রকাশ্যে কাজ করে আসছে। দেশের ৬৪টি জেলার ৬৮ হাজার গ্রামের প্রত্যেকটিতে এই দলের নেটওয়ার্ক রয়েছে। তারা শুধু রাজনীতি করে না, মানুষের সেবাও করে। জামায়াত নামেই তাদের বিস্তৃতি। প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই দলটি জামায়াত নামেই অংশগ্রহণ করেছে, জামায়াত নামেই তারা নির্বাচন করেছে, পার্লামেন্টে গেছে, জামায়াতের নামেই এই দলের প্রতিনিধিরা দেশের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছে এবং সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জামায়াত নেতারা পাঁচ বছর মন্ত্রীত্ব করেছে। তাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি, দুর্নীতি, ঘুষ, রিসওয়াতের কোনও দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়নি। জামায়াত জেনেই বিভিন্ন আন্দোলনে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল তাদের সাথে একসাথে কাজ করেছে, কেয়ারটেকার ফর্মূলা নিয়েছে। রাজনীতির কারণে কেউ কেউ এ কথাগুলো ভুলে গেলেও দেশবাসী ভুলে নাই।
জামায়াতের রাস্তা কণ্টকাকীর্ণ। ভাল কাজ এবং ভাল মানুষের রাস্তা কখনো মসৃণ হয় না। বাধাবিপত্তি পার হয়েই জামায়াতকে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছতে হয়েছে। জামায়াত জোটবদ্ধভাবে যেমনি কাজ করতে জানে তেমনি একাও কাজ করতে জানে। ২০০১ সালে ৪ দলীয় জোট প্রতিষ্ঠার আগে জামায়াত একাই কাজ করেছে এবং সংসদ ও  সংসদের বাইরে তার ভূমিকা পালন করেছে। প্রয়োজনবোধে ভবিষ্যতেও তারা তাই করতে পারে বলে আমরা মনে করি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলের মনে থাকা দরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ