ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 January 2019, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন নিয়ে টিআইবি’র রিপোর্ট

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল বাংলাদেশ- টিআইবি বলেছে, এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারি ৫০টি আসনের ওপর প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্টে টিআইবি অভিযোগ করেছে, এসব আসনের ভোটকেন্দ্রে প্রতিপক্ষের তথা বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পোলিং এজেন্টদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি এবং প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বাহিনীগুলো নীরব ভূমিকা পালন করেছে। রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ৫০টির মধ্যে ৪৭টিতেই নানামুখী অনিয়ম ঘটেছে, ৪১টি আসনে বিপুল সংখ্যায় জাল ভোট পড়েছে। ফলে সব মিলিয়েই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হয়েছে। বিষয়টির বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি তার অনুসৃত গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বলেছে, তিনশ আসনের মধ্যে দ্বৈবচয়ন নীতি অনুসারে ৫০টি আসনকে বেছে নেয়া হয়েছিল। এসব আসনের অনিয়ম অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, ৫০টির মধ্যে ৩০টিতেই আগের রাতে ব্যালট পেপারে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পক্ষে সিল মেরে রাখা হয়েছিল। এছাড়া ৪১টি আসনে জাল ভোট দেয়ার এবং ৪২টি আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বাহিনীগুলোর নীরব ভূমিকা পালন সম্পর্কে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ৩৩টি আসনে আগের রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে রাখার এবং ৩০টি আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট দেয়ার তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে টিআইবি।
এর বাইরে ২১টি আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো হয়েছে, অনেককে ভোটকেন্দ্রেই প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট মার্কায় তথা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে ২৬টি আসনে। শুধু তা-ই নয়, ২০টি আসনে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রেখেছিল ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। তাছাড়া ২২টি আসনে নির্দিষ্ট সময় শেষ না হতেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে গেছে বলে ভোটারদের জানানো হয়েছিল এবং ২৯টি আসনে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সভা-সমাবেশ করার ব্যাপারে সব দলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বিরোধী দলকে দমনে সরকারকে বাধা না দেয়ার পাশাপাশি বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও চরম ব্যর্থতা দেখিয়েছে কমিশন। নির্বাচনী অনিয়ম ও আচরণবিধি লংঘনের ক্ষেত্রেও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী-প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কমিশনকে কোনো প্রতিরোধমূলক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এছাড়া নির্বাচনের সময় পর্যবেক্ষক ও সংবাদ মাধ্যমের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীন গতিকে লাগাম পরানো, মোবাইলের ফোর-জি ও থ্রি-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা এবং যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমেও কমিশন নির্বাচনের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরতে দেয়নি।
আগের সংসদ না ভেঙে নির্বাচন করার সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধা ভোগ করলেও কমিশন উদাসিনতা দেখিয়েছে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-প্রার্থীদের গ্রেফতার প্রতিরোধের জন্যও কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রচারণার প্রতিটি পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা সম্পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন এবং এককভাবে সক্রিয় থেকেছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের প্রার্থীরা থেকেছেন সুযোগবঞ্চিত অবস্থায়। ৫০টির মধ্যে ৩৬টি আসনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের প্রচারণাকাজে বাধা দেয়া হয়েছে। বাস্তব অবস্থ ছিল এর চেয়েও ভয়াবহ। তা-ই নয়, মনোনয়নপত্র চ’ড়ান্ত হওয়ার পর ৫০টির মধ্যে ৪৪টি আসনে বিরোধী দলের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। ১৯টি আসনে সহিংসতার শিকার হয়েছেন তারা। তাদের নির্বাচনী ক্যাম্পও ভাংচুর করেছে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী ও সমর্থকরা। কিন্তু কোনো বিষয়েই নির্বাচন কমিশনকে তৎপর হতে দেখা যায়নি। এভাবে সব মিলিয়েই কমিশনের ভ’মিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বলা যায়, কমিশন ক্ষমতাসীন দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছে।
টিআইবির এ প্রাথমিক রিপোর্টে অন্য আরো কিছু অনিয়মের তথ্যও রয়েছে। সেসব তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতেই টিআইবি একদিকে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, অন্যদিকে দাবি জানিয়েছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করার জন্য। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আসল কাজে ব্যর্থতা, উদাসিনতা ও অযোগ্যতা দেখালেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অবশ্য প্রতিক্রিয়া এসেছে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে। নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, টিআইবির এই রিপোর্ট নাকি ‘মনগড়া’ এবং ‘পূর্বনির্ধারিত’! টিআইবি নাকি এ ধরনের বিষয়ে গবেষণার যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তা না করেই ‘মনগড়া’ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে! সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য না থাকার কারণে রিপোর্টটিকে ‘পূর্বনির্ধারিত’ বলেও নাকচ করতে চেয়েছেন ওই নির্বাচন কমিশনার। তিনি অবশ্য আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, যথাযথভাবে তৈরি করা বিশ্বাসযোগ্য কোনো রিপোর্ট পেলে তারা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবেন এবং প্রয়োজনে তদন্তের ব্যবস্থাও নেবেন।
অন্যদিকে টিআইবির রিপোর্টটিকে সঠিক, তথ্যনির্ভর এবং বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে করা হচ্ছে। আমরা মনে করি ৩০০ সিটে যদি তদন্ত করা হয়, তাহলে টিআইবি রিপোর্টের চেয়েও উদ্বেগজনক চিত্র বেরিয়ে আসবে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত হতে পারে। রাজনীতিকরা তো আরও বড় দাবি জানিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও এরই মধ্যে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যাপারে সরকার এখনই তৎপর হতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ