ঢাকা, শনিবার 19 January 2019, ৬ মাঘ ১৪২৫, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শীতের পাখি-আমাদের অতিথি

মুহাম্মদ নূরে আলম: পাখিদের আকাশে কোন সীমান্তরেখা নেই। তারা অনায়াসে উড়ে বেড়ায় এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে। প্রতিবছর শীতকাল এলেই জলাশয়, বিল, হাওড়, পুকুর ভরে যায় নানা রংবেরঙের নাম না জানা পাখিতে। আদর করে আমরা সেগুলোকে বলি অতিথি পাখি। নাম অতিথি হলেও এই পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের দেশে হাজির হয় নিজেদের জীবন বাঁচাতে। খাদ্যের সন্ধানে ব্যস্ত থাকে তারা। বিচিত্র তাদের সন্তান পালন, বাসা তৈরির কৌশল। ঝড়, বৃষ্টি, তুষারপাতসহ প্রকৃতির হাজারও প্রতিকূলতা থেকে বাঁচতে তারা পাড়ি জমায় হাজার হাজার মাইল দূরের দেশে।
প্রাণী বিজ্ঞানীদের মতে, উপমহাদেশে ২ হাজার ১০০টি প্রজাতির পাখি আছে। তবে এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩শ' প্রজাতির পাখি হিমালয় পেরিয়ে আমাদের দেশে চলে আসে। এরা শীতের অতিথি পাখি। সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দলবেঁধে আসতে শুরু করে এসব পাখি। মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত এরা কলকাকলিতে আমাদের প্রকৃতিকে ভরিয়ে তোলে। এরপর শুরু হয় নিজ দেশে ফিরে চলা।
পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিসেম্বর-জানুয়ারি এ দু' মাসে সবচেয়ে বেশি পাখি এদেশে আসে। বাতাসে শীতের আমেজ লাগতেই আমাদের হাওর, বিল, চরাঞ্চলে দেখা যায় হাজার হাজার অতিথি পাখি। ইংল্যান্ডের নর্থ হ্যামশায়ার, সাইবেরিয়া কিংবা এন্টার্কটিকার তীব্র শীত থেকে বাঁচতে এরা পাড়ি জমায় দক্ষিণের কম শীতের দেশে। প্রকৃতিগতভাবেই এ পাখিদের শারীরিক গঠন খুব মজবুত। এরা সাধারণত ৬০০ থেকে ১৩০০ মিটার উঁচু দিয়ে উড়ে যায়। ছোট পাখিদের ঘণ্টায় গতি ৩০ কিলোমিটার। দিনে-রাতে এরা প্রায় ২৫০ কিলোমটার উড়তে পারে। বড় পাখিরা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার অনায়াসে উড়তে পারে। আশ্চর্যের বিষয় এসব পাখি তাদের গন্তব্যস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পাখির রয়েছে বংশগত সূত্রে পাওয়া বিশেষ দিক নির্ণায়ক ক্ষমতা। শীত মওসুমে এদেশে আসা পাখিদের মাঝে সোনাজঙ্গ, খুরুলে, কুনচুষী, বাতারণ, শাবাজ, জলপিপি, ল্যাঞ্জা, হরিয়াল, দুর্গা, টুনটুনি, রাজশকুন, লালবন মোরগ, তিলে ময়না, রামঘুঘু, জঙ্গী বটের, ধূসর বটের, হলদে খঞ্চনা, কুলাউ ইত্যাদি প্রধান। গ্রীষ্মকালে সুমেরুতে বাস করে এবং বাচ্চা দেয় হাঁস জাতীয় এমন পাখি শীতকালে বাংলাদেশে আসে। লাল বুকের ক্লাইক্যাসার পাখি আসে ইউরোপ থেকে। আর অন্য সব পাখিরা আসে পূর্ব সাইবেরিয়া থেকে। এসব পাখিদের মধ্যে বাংলাদেশের অতি পরিচিতি অতিথি পাখি নর্দান পিনটেইল। এছাড়া স্বচ্ছ পানির খয়রা চকাচকি, কার্লিউ, বুনো হাঁস, ছোট সারস পাখি, বড় সারস পাখি, হেরন, নিশাচর হেরন, ডুবুরি পাখি, কাদাখোঁচা, গায়ক রেন পাখি, রাজসরালি, পাতিকুট, গ্যাডওয়াল, পিনটেইল, নরদাম সুবেলার, কমন পোচার্ড, বিলুপ্ত প্রায় প্যালাস ফিস ঈগল (বুলুয়া) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও নানা রং আর কণ্ঠ বৈচিত্র্যের পাখিদের মধ্যে রয়েছে ধূসর ও গোলাপি রাজহাঁস, বালি হাঁস, লেঞ্জা, চিতি, সরালি, পাতিহাঁস, বুটিহাঁস, বৈকাল, নীলশীর পিয়াং, চীনা, পান্তামুখি, রাঙামুড়ি, কালোহাঁস, রাজহাঁস, পেড়িভুতি, চখাচখি, গিরিয়া, খঞ্জনা, পাতারি, জলপিপি, পানি মুরগি, নর্থ গিরিয়া, পাতিবাটান, কমনচিল, কটনচিল প্রভৃতি।
পৃথিবীতে প্রায় ৫ লাখ প্রজাতির পাখি আছে। এসব পাখিদের মধ্যে অনেক প্রজাতিই বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় অন্য দেশে চলে যায়। শুধু ইউরোপ আর এশিয়ায় আছে প্রায় ৬০০ প্রজাতির পাখি। কিছু কিছু পাখি তাই প্রতিবছর ২২ হাজার মাইল পথ অনায়াসে পাড়ি দিয়ে চলে যায় দূরদেশে। উত্তর মেরু অঞ্চলের এক জাতীয় সামুদ্রিক শঙ্খচিল প্রতিবছর এই দূরত্ব অতিক্রম করে দক্ষিণ দিকে চলে আসে। আমাদের দেশে অতিথি পাখিরা অতটা পথ পাড়ি না দিলেও তারাও অনেক দূর থেকেই আসে। বরফ শুভ্র হিমালয় এবং হিমালয়ের ওপাশ থেকেই বেশির ভাগ অতিথি পাখির আগমন ঘটে। এসব পাখিরা হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত তিব্বতের লাদাখ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়ান ইন্ডিয়ান ফ্লাইওয়ে দিয়ে প্রবেশ করে। এ ছাড়া ইউরোপ, দূরপ্রাচ্য (যেমন সাইবেরিয়া) থেকেও এসব পাখি আসে। এরা কিছু সময় পর আবার ফিরে যায় নিজ দেশে।
অতিথি পাখি কেন আসে কেন যায়: এর উত্তর খুব সহজেই দেওয়া যায়, শীত এলে এরা সহ্য করতে না পেরে অন্য দেশে যেখানে শীত অপেক্ষাকৃত কম সেখানে চলে যায়। তাছাড়া এ সময়টাতে শীতপ্রধান এলাকায় খাবারেও দেখা যায় প্রচ- অভাব। কারণ শীতপ্রধান এলাকায় এ সময় তাপমাত্রা থাকে অধিকাংশ সময় শূন্যেরও বেশ নিচে। সেই সাথে রয়েছে তুষারপাত। তাই কোনো গাছপালা জন্মাতেও পারে না। তাই শীত এলেই উত্তর মেরু, সাইবেরিয়া, ইউরোপ, এশিয়ার কিছু অঞ্চল, হিমালয়ের আশপাশের কিছু অঞ্চলের পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে চলে আসে কম ঠা-া অঞ্চলের দিকে। বসন্তের সময় মানে মার্চ-এপ্রিলের দিকে শীতপ্রধান অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করে, কিছু কিছু গাছপালা জন্মাতে শুরু করে। ঘুম ভাঙতে শুরু করে পুরো শীতকালে ঘুমিয়ে থাকা অনেক প্রাণীদের। ঠিক এ রকম এক সময়ে অতিথি পাখিরা নিজ বাড়িতে ফিরে যায় দলবলসহ। আবার এখানে বেশ মজার একটা ব্যাপার আছে। তারা ফিরে গিয়ে ঠিক তাদের বাড়ি চিনে নেয়। অদ্ভুত এক ব্যাপার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখন পাখির কলরব মুখরিত: মওসুমী অতিথি পাখির কলরব আর গুঞ্জনে দেশের অন্যতম উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখন মুখরিত। প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন লেকসহ এখানকার বিভিন্ন লেকে প্রায় ২০-২৫ প্রজাতির পাখি আসে। তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পাখি হচ্ছে জেন্ডাসিগলা। জাডানিক বা সরালী হাঁস। দলবেঁধে শিস দিয়ে গান গেয়ে উড়ে যায় এরা। কালচে বড় লম্বা গলার এ সরালী পাখিকে দেখলে অনেকটা দেশী হাঁসের মতো মনে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিদা বিভাগের অধ্যাপক সোহরাব উদ্দিন জানান, এ পাখিগুলো দিনের বেলা লেকের পানিতে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায়। রাতে খাবারের সন্ধানে অন্য জায়গায় চলে যায়। সাধারণত দিনের মিষ্টি রোদে থাকতে এরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাড়া মিরপুর চিড়িয়াখানার লেক, বরিশালের দুর্গাসাগর, নীলফামারীর নীল সাগর, সিরাজগঞ্জের হুরা, আর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এসব অতিথি পাখিদের প্রিয় অবকাশ কেন্দ্র। বাংলাদেশের জলাশয়গুলোই যেন এদের পছন্দের স্থান। নিরাপদ আশ্রয়। বেশ কয়েক বছর যাবত নিঝুম দ্বীপ। দুবলার, চরকুতুবদিয়া এলাকাতেও শীতের পাখিরা বসতি গড়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা জানায়, কর্তৃপক্ষের সহায়তায় গত দু' বছর ধরে ভিসি‘র কার্যালয় ও প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন লেক দু'টোতে পাখি শিকার বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। ২০০৭ সালে তারা এ দু'টো লেক বার্ষিক লিজ দেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তাদের সহযোগিতায় এ সময় পাখি সংরক্ষণ কমিটিও গড়ে উঠেছে। এবার মিরপুর চিড়িয়াখানায় অতিথি পাখি প্রায় নেই বললেই চলে। এতে বিশেষজ্ঞরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। বিস্মিত হয়েছেন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিড়িয়াখানার অপরিচ্ছন্ন লেক পাখিদের আর আকৃষ্ট করছে না। অন্যদিকে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের মত হলো এ বছর সাধারণ সময়ের চেয়ে কিছু আগে লেকের কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ পরিষ্কার করা হয়েছে। তাই শীতের পাখিরা আকৃষ্ট হয়নি।
পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, একদশক আগেও এদেশে ২০০ থেকে ২১৫ প্রজাতির অতিথি পাখি আসতো। এ সংখ্যা প্রতি বছরই হ্রাস পাচ্ছে। ব্যাপকহারে পাখি শিকার ও জলাভূমির সংখ্যা কমে যাওয়ায় অতিথি পাখিরা এদেশকে আর নিরাপদ ভাবছে না। গ্রামের গরীব মানুষ পেটের দায়ে পাখি শিকার করে বিক্রি করছে। কিন্তু যারা কিনছে তারা শহরে শিক্ষিত ও ধনী শ্রেণি। প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর জন্যে নয়, রুচির পরিবর্তনের জন্যেই তারা নিজেরা শিকার করে কিংবা কিনে নেয় অতিথি পাখি। এটা বক বা সরালী হাঁস আর কতটুকুই গোশত হয়। অতিথি পাখি ছাড়াও তাদের প্রোটিনের চাহিদা মেটানো কিংবা রুচির পরিবর্তন করা যায়। এক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা ও প্রকৃতিপ্রেমই সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে। ইনাম আল হক আরও বলেন, জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য পত্র-পত্রিকা রেডিও-টেলিভিশনে বিভিন্ন ডকুমেন্টারি প্রচার করা যেতে পারে।
পাখি আইন: অতিথি পাখির জন্যে সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১২টি অভয়ারণ্য থাকার কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অভয়ারণ্য বলতে যা বুঝায় তা আজও পরিপূর্ণভাবে গড়ে উঠেনি। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনের ২৬ ধারা মতে পাখি শিকার ও হত্যা দন্ডনীয় অপরাধ। শীতের শুরুতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় অতিথি পাখি হত্যা, জাল ব্যবহার ও শিকার ইত্যাদির ক্ষেত্রে কিছু আইনগত কার্যকারিতা দেখায়। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই এ তৎপরতায় ভাটা পড়ে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সংস্থা জাতীয় সংসদের সামনেও দিনের বেলা অতিথি পাখি অবাধে বিক্রি হতে দেখা যায়। পত্র-পত্রিকায় এর ছবিও ছাপা হয়। কিন্তু এতে কারও টনক নড়ে না। বার বার একই ছবির পুনরাবৃত্তি ঘটে। পাখির দেশ, গানের দেশ, কবিতার দেশ-বাংলাদেশ। অনিন্দ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এদেশ এবার পেয়েছে অতিথি পাখি সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে বিশেষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সম্প্রতি ফ্রেন্ডশীপ ইস্ট এশিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান ফ্লাইওয়ে নামক অতিথি পাখি সংরক্ষণ ও গবেষক সংস্থা বাংলাদেশকে এই স্বীকৃতি দিয়েছে।
এ বিষয়ে বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে জানান, ফ্রেন্ডশীপ ফর ইস্ট এশিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান ফ্লাইওয়ের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে এ স্বীকৃতিমূলক সনদপত্র হস্তান্তর করে। সংস্থাটির দেয়া সনদ অনুযায়ী বাংলাদেশের টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, হাটল হাওর, নিঝুম দ্বীপ ও সোনাদিয়া-এই পাঁচটি এলাকা অতিথি পাখিসমৃদ্ধ অঞ্চল। তাদের মতে, এসব এলাকায় বহু বছর ধরে অতিথি পাখিরা নিরাপদে বাস করছে। অবিলম্বে এসব অঞ্চল সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ