ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 January 2019, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সত্যের সংগ্রামে নিবেদিত : দৈনিক সংগ্রাম

ড. সাইয়েদ মুজতবা আহমাদ খান : ‘দৈনিক সংগ্রাম’ আজ থেকে আটচল্লিশ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৯৭০ সালের ঠিক এই তারিখ ১৭ জানুয়ারী ঢাকা হতে প্রথম প্রকাশিত হয়। একটি সুচিন্তিত ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বল করে ‘সংগ্রাম’ সেইদিন আত্মপ্রকাশ করেছিল । 

এক সুবিশাল বন্ধুর পিচ্ছিল পথে যাত্রা করেছিল। একদল সত্যনিষ্ঠ তরুণদল, একটি সত্যনিষ্ঠ আর্দশের অনুপ্রেরণায় বাংলার এই ভূখন্ডে প্রথম আলোয় এসেছিল সংগ্রাম। বাংলার এই ভূখন্ডের অধিকাংশ মানবমন্ডলী যে বিশ্বাস ও আদর্শ চেতনায় লালিত তার উপর নির্ভর করে গণমানুষের চিন্তা চেতনার মুখপত্র হিসেবে একটি বাংলা দৈনিকের আত্মপ্রকাশ ছিল সত্যি অতীব প্রয়োজনীয় বিরল ঘটনা। সে প্রয়োজন যখন বাস্তবে রূপ নিল- সে ঘটনা ছিল অবিস্মরণীয় তদুপরি আলোড়ন সৃষ্টিকারীও বটে। শুধু আদর্শ তাও কেবল মানব রচিত মতাদর্শের মুখপত্র হিসেবে সংবাদপত্র এর পূর্বে যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমন পরেও এই জনপদে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দেশের এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের আদর্শের মুখপত্র হিসেবে এই ধরনের একটি দৈনিকের প্রকাশ এই প্রথম বলেই  সর্বত্র এবং সর্বমহলে আলোচিত হয়েছিল। ‘সংগ্রাম’ যে নাম ধারন করে ছিল তাও বুঝে শুনে ভেবে চিন্তে করা হয়। মানব রচিত মতাদর্শগুলোর প্রচারক পত্রিকা গুলোর নাম ধাম দেখে প্রমাণিত হয় না যে ঐসব পত্রিকা গুলোর আসল উদ্দেশ্য কি ও কি রূপ? কিন্তু দৈনিক সংগ্রামের নাম পরিচয়ই জানিয়ে দেয় সকল ক্ষেত্রেই  লড়াই করেই চলতে হবে। এবং টিকে থাকতে হয় এবং আজও শত হাজার বাধা বিপত্তি এবং ঝামেলা ঝঞ্ঝাট অতিক্রম করে টিকে রয়েছে। 

(১০-এর পাতায় দেখুন) 

(৯-এর পাতার পর)

এইটে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনেরই অপার রহমত ও বরকতেরই বহি: প্রকাশ মাত্র। দীর্ঘ তেতাল্লিশ বছরের সংগ্রামের পথযাত্রা তাই কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ঝামেলা সংকট এর নিত্যসঙ্গী-নিরালা নিঝর্ঞ্ঝাট কাটেনি তেমন সময়। সুবিশাল ও ব্যাপক কন্টকাকীর্ণ  চড়াই-উতরাই পেরিয়েই চলতে হয়েছে। সংগ্রামের সংগ্রামী জনবল জেনে বুঝেই এই বন্ধুর পথ বেছে নিয়ে এই সংকটময় পথ যাত্রাকে স্বীকার করেই যাত্রা অব্যাহত রেখেছে আজ অবধি।

এই দেশের তামাম জনতার হৃদয় কন্দরের যে বিশ্বাস প্রত্যয় তারই বাহক-সারথির ভূমিকায় অবতীর্ণ সংগ্রাম। তাদের প্রত্যয় বিশ্বাসের নিরিখে দেশ সমাজ পরিচালিত করবার জন্য ‘সংগ্রাম’ সংগ্রাম করে যাচ্ছে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত। যে আদর্শ পার্থিব এবং অপার্থিব জীবনকে সুন্দর ও নির্ঝঞ্ঝাট করবার গ্যারান্টি প্রদান করে-সে আদর্শের পয়গাম ঘরে ঘরে, জনে জনে পৌঁছে দেয়ার যে নিরবচ্ছিন্ন অভিযাত্রা-তারই মুখপত্রের ভূমিকায় সংগ্রাম দায়িত্ব প্রতিপালন করছে একনিষ্ঠ দৃঢ়তার সঙ্গেই। দৈনিক সংগ্রাম বুঝেশুনেই সীমাহীন অনটন কষ্ট ও দৈন্যের হলাহল করেছে পান। সমস্যা ও সংকটের পর্বত তার কাঁধে কিন্তু পরাভব কাকে বলে তা সে জানে না। পরাভূত হওয়াকে সর্বান্তকরণে অপছন্দ করে। দৈনিক সংগ্রাম পার্থিব লাভালাভকে প্রাধান্য দেয় না। বরং অপার্থিব প্রাপ্তিকেই অগ্রাধিকার দেয় বেশি। সমগ্র জনতার শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির সীমান্ত রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকাও সে পালন করে অতীব নিষ্ঠার সঙ্গে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করার নিমিত্তে দৈনিক সংগ্রাম তার সকল শক্তি ও সত্তা দিয়ে আপ্রাণ প্রচেষ্টা অব্যাহত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছে। এটা যে তার অস্তিত্ব ও জীবন রক্ষারই মুখ্য ব্যাপার। 

অন্যদিকে মানুষের জন্য শান্তি ও স্বস্তির পথ কোনটি? কোথায় রয়েছে অনাবিল প্রশান্তির জীবন? কোন্ জীবনাদর্শ অনুসরণে মানুষের ইহ পরকালীন জীবন হবে একদম চিরকালীন মুক্তির সোপান- সেপথ ও পাথেয় বাতলে দিতে সদা সক্রিয় দৈনিক সংগ্রাম। মানুষকে অন্য মানুষের গোলামী না করার জন্য উদাত্ত আহবান জানায় সংগ্রাম। গোলামী বা দাসত্ব যদি করতেই হয় তবে একমাত্র তারই করা উচিত- যিনি বিশ্বের সকল মানুষ ও সৃষ্টির একমাত্র ¯্রষ্টা ও মহান প্রভু। জীবন ও মৃত্যুর যিনি একমাত্র মালিক ও নিয়ন্ত্রক। অথচ একদল মানুষ- শিক্ষিত বটে- নিজেদেরকে আলোকিতও ভাবেন গর্বের সঙ্গেই। অথচ অন্য মানুষকে বলেন ঃ এসো আমরা অমুক মহাজনের অমুক তত্ত্বে দীক্ষিত হই। মহাদার্শনিক মহামনীষীর শরণাপন্ন হই- তার পদাংক অনুসরণ অনুকরণ করি। জীবন ও জীবিকা বিলিয়ে দিই, এতে অনেক লাভ ও বিশাল প্রাপ্তি বর্তমান। কিন্তু ঐসব মুখরোচক কথা ও আহ্বানের মধ্যে যে কোন কল্যাণ ও মুক্তির দিশা নেই বরং প্রচন্ড ধোকা ও চাতুর্য ব্যতীত অন্যকিছুর আশা বাতুলতা মাত্র। আসলেই এক মানুষ আরেক মানুষের ত্রাণ কর্তা ও মুক্তিদাতা হওয়ার যোগ্যতা সংরক্ষণ করেনা। তার প্রমাণ ভুরিভুরি থাকা সত্বেও সরল প্রানের মানুষেরা ধোকা খায়, পোড় খেয়ে খেয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে জীবন বিনষ্ট করে হারিয়ে যায় চিরতরে। অথচ যে ¯্রষ্টা তাদের কে অনেক যতেœ, অনেক পরিকল্পনা করে এই বিশ্বে প্রেরণ করলেন তার, কোন খবর তাদের ধারে কাছেও থাকে না। তাকে এড়িয়ে তার আদর্শ বাদ দিয়ে অন্য আরেক তারই মতো মানুষের মিষ্টি কথা শুনে বিভ্রান্ত হন। এ যে কত বড় ট্রাজেডী এবং আত্মঘাতী প্রয়াস তা কল্পনাও করা যায় না। এযে নিজ পায়ে কুড়াল মারার সামিল, তাও এরা বুঝেন না।

দৈনিক সংগ্রাম কেউ এমনতরো মহা বিনষ্টের শিকার যাতে না হয় তার জন্য প্রয়াস অব্যাহত রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। এই পৃথিবীতে কত যে ফাঁদ পাতা রয়েছে বিভ্রান্তি ও ভেলকিবাজির- সুড়সুড়ি দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবার কত যে পথ ও পন্থা আবি®ৃ‹ত হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এইসব গোলক ধাঁধাঁর খপ্পর হতে  মানুষকে বাঁচানোর প্রয়াস অব্যাহত গতিতে চালাচ্ছে দৈনিক সংগ্রাম তার সূচনা লগ্ন হতেই। এই প্রয়াস কোন ক্ষান্ত হওয়ার নয়। মানুষ ও মানবতা সংরক্ষণে সংগ্রাম কখনো পিছপা হয় না। এটা যে তার মিশন। এটাযে তার সকল কর্মের মূল। এই মূল দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনই তার আসল লক্ষ্য। দৈনিক সংগ্রাম তার যাত্রালগ্ন হতে এই্ পর্যন্ত কত যে বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে- তা এক কথায় সীমাহীন ও অগণন। কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই চরম ধৈর্য ও নিষ্ঠা তাকে সংযমী করেছে। অপরিসীম আত্মসংযম কখনো ব্যর্থ হয় না বিফলে যায় না। বরং অপরিমীত ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থ মানবপ্রেম তার পথ চলার পথকে সুগম ও মসৃণ করে দেয়। নিষ্কন্টকও করে মাঝে মধ্যে।   যে আদর্শ নিষ্ঠা নিয়ে ‘সংগ্রাম’ সংগ্রামে অবতীর্ণ সে আদর্শের ছায়াতলে যদি শিক্ষিত মানুষেরা দীক্ষিত হয়ে একত্রিত হয় তবে সংগ্রামই সবচেয়ে লাভবান এবং কৃতার্থবোধ করে। তার মিশন সার্থক ও সফল প্রমাণিত বলেই প্রতীয়মান। কেননা সংগ্রাম তো পার্থিব বা আর্থিক লাভের চেয়ে নৈতিক ও আর্দশিক লাভালাভকে বেশি মূল্য দিতে বাধ্য, প্রতিশ্রুত এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধও বটে।

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ