ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 January 2019, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জাতীয়তাবাদ এবং সাম্যবাদ

শেখ দরবার আলম:

॥ এক ॥

একটা লেখার সূত্র ধরেই একটা লেখা শুরু করছি। গত ১লা ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ শনিবার ঢাকার দৈনিক ‘যুগান্তর’ এর পঞ্চম পৃষ্ঠায়’ বামপন্থীদের মঞ্জিলে মকসুদ কতদূর?, এই শিরোনামে গল্পকার ও প্রাবন্ধিক জয়া ফারহানার একটা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। এই প্রবন্ধের শেষ স্তবকের শুরুতেই জয়া ফারহানা লিখেছেন:

‘ঐতিহাসিক টয়েনবি বলেছিলেন মার্কসবাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে জাতীয়তাবাদ। তখন ভাবা হতো, এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে জাতীয়তাবাদ একদিন পরাস্ত হবে। জাতীয়তাবাদের মধ্যে সংকীর্ণতা আছে; কিন্তু মার্কসবাদ বিশ্ব মানবতার পথ দেখায়।’

॥ দুই ॥

যখন যে দেশেই বাস করি না কেন, সবার সব লেখাপড়ার সুযোগ কিংবা সৌভাগ্য অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই হয় না, একথা স্মরণ রেখেই উল্লেখ করছি যে, জাতীয়তাবাদ এবং সাম্যবাদের ওপর এদেশের কারো কোনো লেখাপড়ার সুযোগ কিংবা সৌভাগ্য ইতোপূর্বে আমার হয়নি। এ বিষয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের গুণীজনদের একাধিক লেখা পড়েছি স্বাধীন ভারতের পত্র-পত্রিকায়। স্বাধীন ভারতের সাম্যবাদী ঐতিহাসিকরা উপলব্ধি করেছেন যে, জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথাটা নীতি হিসাবে রাখা হলেও তা তেমন কাজ করে না। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজ অর্থাৎ বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজ বিশেষ করে ১৭৫৭’র ২৩ শে জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ প্রহসন পরবর্তীকাল থেকে ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্ট পর্যন্ত, এই একশ’ নব্বই বছর যাবত ক্রুসেডের চেতনাসম্পন্ন সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বণিকদের জাতীয়তাবাদী সমাজের সহযোগী সমাজ হিসাবে সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে একচেটিয়াভাবে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে অর্থনীতিতে, ভাষাচর্চায় ও সাহিত্যে, কাব্যে, নাটকে, সাংবাদিকতায়, শিক্ষানীতিতে ও রাজনীতিতে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে সনাক্ত করে আক্রমণাত্মক ও আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রবলভাবে জাতীয়তাবাদী হয়েছেন। এই উভয় সমাজের জাতীয়তাবাদের চাপে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত হয়ে হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, অসচেতন, অসংগঠিত, লক্ষ্যভ্রষ্ঠ ও লক্ষ্যহীন, অদূরদর্শী ও অপরিণামদর্শী হয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চার ক্ষেত্রে ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজ একটা ধারাবাহিকতা সেই মুসলিম শাসনামল থেকেই বজায় রাখতে পেরেছিলেন। এর ফলে সবকিছু গভীরভাবে খতিয়ে দেখার মানসিক সামর্থ্য, একটা দিকের সঙ্গে আরো বিভিন্ন দিক মিলিয়ে দেখার মননশীলতা, সংবেদনশীল মন, সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং মানসিক সুস্থিতি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ আলাপযোগ্য অনেক মানুষও ওই সমাজে এখনও পাওয়া যায়।

সম্মানজনক জীবিকার ও সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে ওই একশ’ নব্বই বছর যাবত অধিকারবঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করার ফলে হতদরিদ্র, অশিক্ষিত, অসচেতন ও অসংগঠিত হয়ে সমাজহীন সমাজের লোক হয়ে পড়ার ফলে সাধারণভাবে মুসলমানদের মধ্যে ত্যাগের মনোভাবের গঠনমূলক চিন্তা-ভাবনার, সূক্ষ্ম অনুভূতির, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সব কিছু গভীরভাবে খতিয়ে দেখার মানসিকতার, বিবেকবান ও চিন্তাবোধসম্পন্ন এবং পরমতসহিষ্ণু হওয়ার মানসিকতার অভাব দেখা দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের অনেকের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। পঁচিশ বছরে একটা প্রজন্ম হয়। ১৭৫৭’র ২৩ শে জুন থেকে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত প্রায় আট প্রজন্মব্যাপি ভারতীয় উপমহাদেশের এখনকার মুসলিম প্রধান দেশের মুসলমানরা সাধারণভাবে সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত হওয়ার ফলে মুসলিম প্রধান দেশের মুসলমানদের একটা অংশের অবস্থা এ রকমই হয়েছে। কিন্তু সাতচল্লিশের মধ্য আগস্ট পরবর্তী হিন্দু জাতীয়তাবাদী স্বাধীন ভারতে সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের ক্ষেত্রে ১৭৫৭’র ২৩ শে জুন পরবর্তী অবস্থার ধারাবাহিকতাটা এখনও বজায় আছে বা অব্যাহত আছে। কেননা, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজ অর্থাৎ বৈদিক ব্রাহ্মণ শাসিত বর্ণ ও অধিকার-ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজ সাতচল্লিশের মধ্য-আগস্টে বৃটিশ ভারত ভাগ করে আশি শতাংশ জায়গা নিজেদের এখতিয়ারে নিয়ে এর সঙ্গে ৫৬২টির মত দেশীয় রাজ্য যোগ করে নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের নব্বই শতাংশ জায়গা নিজেদের এখতিয়ারে নিয়েছিলেন হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ব আরোপকামী দৃষ্টিভঙ্গিতে। হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতিয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং হিন্দুধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ব আরোপকামী সেই দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আর.এস.এস)-এর অঙ্গ সংগঠন ভারতীয় জনতা পা্ির্ট (বিজেপি) শাসন ক্ষমতায় এসেছেন। ইসলাম এবং মুসলিম উৎখাত কামনায় হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতিতত্ব আরোপকামী দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা কি কি করছেন সে বিষয়ে অনেক খবর কেবল ভারতের পত্র-পত্রিকায় নয়, এদেশের অনেক পত্র-পত্রিকায় ইতোমধ্যেই ছাপা হয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিতত্ব আরোপকামী দৃষ্টিভঙ্গিতে তারা যা যা করছেন সে বিষয়ে প্রতিবাদও কিন্তু জানাচ্ছেন হিন্দু সমাজেরই মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ মহৎ মানুষরা। কিন্তু এটাও ঠিক যে, হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠাকামী এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক একজাতিত্ব আরোপকামীদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা হিন্দু সমাজের মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ অসংগঠিত মহৎ মানুষদের নেই। তবে এটাও ঠিক যে, প্রতিবাদ যেটুকু করার তা মূলত হিন্দু সমাজের মনুষ্যত্ববোধে উত্তীর্ণ মহৎ মানুষরাই করছেন। এ বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করার ক্ষমতা ভারতের মুসলমানদের আদৌ নেই। এ বিষয়ে আপত্তি আলোচনা ও প্রকাশ করার একটু ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায়িত্ব ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম প্রধান দেশ দুটির থাকলেও তারা তা করছেন কিনা তা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে আলোচনা করার এবং আপত্তি প্রকাশ করার ঐতিহাসিক দায়িত্ব কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি মুসলিম প্রধান দেশের।

॥ তিন ॥ 

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকে অবিভক্ত মুসলিম প্রধান বাংলায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন কমরেড মুজফফর আহমদ, কমরেড আবদুল হামিদ, কমরেড আবদুর রাজ্জাক খাঁ এবং কমরেড শামসুল হুদা। ভারতের মাটিতে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার কথা প্রথমে চিন্তা করেছিলেন এবং এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন মুজফফর আহমদ এবং কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সেই সা¤্রাজ্যবাদী বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে, বিশেষ করে বাঙলা, বিহার, উড়িষ্যার মুসলমানদেরকে সম্মানজরক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত হয়ে থাকা অবস্থা থেকে উদ্ধার করার প্রয়োজনে মুসলমান ঘরের সন্তানদের তরফে সাম্যবাদী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের বৃত্তে আবদ্ধ থাকাটা কবি কাজী নজরুল ইসলামের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল না বলে একটা পর্যায়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২৯-এর পর এই সাম্যবাদী রাজনৈতিক সংগঠনটির সঙ্গে আর সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। কিন্তু কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার জীবদ্দশায় সুস্থাবস্থায় সবসময়ই অর্থনৈতিক সাম্য ও সামাজিক সাম্যই কামনা করেছেন। অত্যন্ত আন্তরিকভাবেই অর্থনৈতিক সাম্য, সামাজিক সাম্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের কবি ছিলেন তিনি। 

 

তিনি এও বিশ্বাস করতেন যে, সাম্যবাদ এবং সমাজতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে, ইসলামী জীবন বিধান থেকে এসেছে, ইসলামী জীবনব্যবস্থা থেকে এসেছে। অর্থনৈতিক সাম্য ও সামাজিক সাম্য ও বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্থান ইসলামে আছে বলেই ইসলামকে তিনি অত্যন্ত গভীরভাবে ভালোবাসতেন। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে ভালোবাসতেন। ইসলামকে কোনো অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম বলে তিনি মনে করতেন না। ব্যবহারিক জীবনে ইসলাম তাঁর কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং অপরিহার্য প্রয়োজনীয় ছিল।

॥ চার ॥

জাতীয়তাবাদ এবং একজাতিতত্ব সম্পর্কে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়া অনেকের মধ্যে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। জাতীয়তাবাদ ধর্মভিত্তিক হোক, বর্ণ বা গায়ের রঙভিত্তিক হোক, ভাষা ভিত্তিক হোক কিংবা কোনো অঞ্চল বা আঞ্চলিকতা ভিত্তিক হোক, যে কোনো জাতীয়তাবাদেরই প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে চিহ্নিত একটা জনগোষ্ঠী থাকতে হয়। যেমন, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রতিবেশী বড় সমাজের অর্থাৎ বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে বিশেষ করে ১৭৫৭’র ২৩ শে জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের সময় থেকে চিহ্নিত হয়ে আছে মুসলমানরা। এই জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে সম্মানজনক জীবিকার এবং সম্মানজনক জীবিকার্জনের সহায়ক শিক্ষার ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত করে রাখতে চান।

ধর্মের ভিত্তিতে, বর্ণ বা গায়ের রঙের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে কিংবা কোনো অঞ্চল বা আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে সনাক্ত করে জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে অধিকারবঞ্চিত করাটাই কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা। আর জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো জনগোষ্ঠীকে অধিকার বঞ্চিত করার অংশ হিসাবে তাদের জানমাল কেড়ে নেয়ার ব্যাপারে গণমন সৃষ্টি করে নৃশংসতা চালানোটাই হলো ফ্যাসিবাদ।

১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টে সৃষ্ট ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমপ্রধান দেশে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যদের প্রভাবে, অনুশীলন সমিতির সভ্য মনি সিংহের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদের, ও যুগান্তর দলের সভ্যদের, অন্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের সভ্যদের প্রভাবে এবং অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টির অনুশীলন সমিতির সভ্যদেরও যুগান্তর দলের সভ্যদের ও অন্যান্য  আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসাবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের প্রভাবে আমরা যে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলেছিলাম তা কাজ করেছে ভারতীয় উপমহাদেশের দশ শতাংশের মত জায়গায় সৃষ্ট মুসলিম প্রধান দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী প্রধান মুসলিম প্রধান প্রদেশের মুসলমানদের বিরুদ্ধে, মুসলিম উম্মার ঐক্য ও সংহতির বিরুদ্ধে এবং মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্বার বিরুদ্ধে। ব্যাপারটা আক্ষরিক অর্থেই ঠিক এ রকমই ছিল বলে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট থেকে ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত খোদ পাকিস্তান আমলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাকিস্তানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা বিভাগের এম.এ. ক্লাসে মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো সাহিত্য পাঠ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সাম্য ও সহাবস্থানের কবি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও অবশ্য পাঠ্য হয়নি। ব্যাপারটি একাডেমিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা হওয়ার অপরিহার্য প্রয়োজন আছে। কেননা, এর ফলে আমরা আমাদের মুসলমান সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইসলামী সংস্কৃতির পরম্পরা এবং এই পরম্পরা ভিত্তিক মুসলিম জাতিসত্বা থেকে এবং মুসলিম জাতিসত্তা সংশ্লিষ্ট সাহিত্য সঙ্গীত, শিল্প ইত্যাদি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। ১৭৫৭’র ২৩ শে জুন থেকে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত, এই একশ’ নব্বই বছরের অত্যন্ত অপরিহার্য প্রয়োজনীয় ইতিহাসচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অপরিসীম অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছি।

॥ পাঁচ ॥

কোথাও কোনো সমস্যা দেখলে সমস্যার কারণ নিশ্চয়ই জানা উচিত। যে হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ১৯৫৭’র ২৩শে জুনের পলাশীর ষড়যন্ত্রমূলক যুদ্ধ যুদ্ধ প্রহসনের সময় থেকে অত্যন্ত প্রবলভাবে দেখা দিয়েছিল সেটার সংজ্ঞা লিখিতভাবে ১৮৭২ খ্রী. নিধারণ করে দিয়েছিলেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

তাঁর ‘ভারতকলঙ্ক’ শিরোনামে প্রবন্ধে। সেখানে হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের মূল বক্তব্যটা এই যে, ‘পৃথিবীতে হিন্দু ছাড়া অনেক জাতি আছে’, তাদের ‘মঙ্গলমাত্র’ হিন্দুদের ‘মঙ্গল’ নয়। অন্য জাতির ‘অমঙ্গল সাধন’ করেও যদি ‘হিন্দু জাতির মঙ্গল সাধন’ করতে হয় সেটাও হিন্দুদেরকে করতে হবে। এ রকম জাতীয়তাবাদ দেখছি মিয়ানমারের জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধরাও গ্রহণ করেছেন।

 কেবল ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নন, অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগের, বিশেষ করে সমগ্র ঊনবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতি, রাজনীতি, ভাষা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নীতি, শিক্ষানীতি, ইতিহাস বিষয়ক লেখা, সাংবাদিকতা, কাব্য, নাটক, ভোটগল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সব কিছুতে হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রতিপক্ষ ও শত্রু হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছিল কেবল মুসলমানদের। 

১৮৮২ খৃ. ১৫ই ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ইসলাম ও মুসলিম উৎখাতকামী উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’। ইতোমধ্যে মুসলমানরা সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও অন্যান্য চাকরি-বাকরি এবং ভূসম্পত্তি থেকে উৎখাত হয়ে মূলত ক্ষেতমজুর শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিলেন। কলকাতার দু’একটা অফিসে ১৮৭১ এর দিকে এসে চাপরাসী ছাড়া কোনো মুসলমান দেখা যেত না। মুসলিমপ্রধান বাংলাটা তখন ইতোমধ্যেই হয়ে উঠেছিল আক্ষরিক অর্থেই হিন্দু জমিদারদের সোনার বাঙলা। হিন্দু জমিদাররা মুসলমান প্রজাদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে আনন্দ পাওয়ার অনেক রুচিহীন এবং নিষ্ঠুর পদ্ধতিও আবিষ্কার করেছিলেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরদের ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় এর একটা তালিকা পাওয়া যায়।

১৮৮২ সালে মুসলমানরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, তারা সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ আর না চালিয়ে যেভাবে হোক ইংরেজদের প্রবর্তিত শিক্ষা গ্রহণ করেই কালক্রমে শাসন ক্ষমতার অংশিদার হওয়ার চেষ্টা করবেন। এই ১৮৮২ খৃ. জাস্টিস সৈয়দ আমীর আলী ‘আ ক্রাই ফ্রম দা ইন্ডিয়ান মহামেডানস’ (ভারতীয় মুসলমানদের অভিযোগ) শিরোনামে একটা স্মারকলিপি সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশনের তরফে লর্ড রিপনের কাছে পেশ করলেন। প্রবন্ধাকারে তা বিলাতের সাময়িকপত্রেও প্রকাশ করলেন।

মূলত এসব চেষ্টার ফলে ১৫ই জুলাই ১৮৮৫ তারিখে বড়লাট লর্ড ডাফরিনের আমলে মুসলমানদের শিক্ষা সম্পর্কে একটা প্রস্তাব পাশ হলো মুসলমানদেরকে শিক্ষার সুযোগ দেয়ার জন্য।

॥ ছয় ॥

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা লেখাপড়া শিখে চাকরি-বাকরির সুযোগ-সুবিধার এবং শাসন ক্ষমতায় শরীক বা অংশীদার হন এটা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত সুবিধাভোগী বৈদিক ব্রাহ্মণশাসিত বর্ণ ও অধিকার ভেদাশ্রয়ী মনুসংহিতার সমাজের নেতৃবৃন্দ চাননি। ইতোমধ্যে বৈদিক ব্রাহ্মণরা শাসন ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত হয়ে উঠেছেন। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী নেতা মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর তিলকের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৯২-এ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইংরেজ উৎখাতকামী আধাসামরিক সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠন সমিতি। বরোদায় মহারাষ্ট্রের আধাসামরিক সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠন গুপ্ত সমিতির নেতা পুনার ঠাকুরের কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন শ্রী অরবিন্দ কুমার ঘোষ। 

মহারাষ্ট্রের এই জাতীয়তাবাদী আধা সামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়ে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ (১৫ই ডিসেম্বর ১৮৮২)-এর সন্তান দল সৃষ্টির আদর্শে ইসলাম ও মুসলিম উৎখাতের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখে ইংরেজ উৎখাতকামী আধা সামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’ গঠিত হয়েছিল ১৯০২ খৃ.। এই ১৯০২ খৃ. বোমা-বন্দুক ও পিস্তলের অধিকতর ব্যবহারের আশঙ্কায় শ্রী বারীন্দ্রকুমার ঘোষের নেতৃত্বে ‘অনুশীলন সমিতিরই একটা অংশ গঠন করেছিলেন যুগান্তর দল। অনুশীলনের সমিতির আরো অনেক অংশ বিভিন্ন সময়ে মুসলিম প্রধান অবিভক্ত বাঙলায় আরো অনেক আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। 

ওদিকে ১৯০৪ খৃ. মহারাষ্ট্রে দামোদর বিনায়ক সাভারকারের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল আরো উগ্র একটি আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সংগঠন ‘অভিনব ভারত’।

তবে আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভিন্ন প্রদেশে ও বিদেশে শাখা সংগঠনের বিস্তার ঘটিয়ে সবচেয়ে বড় আধাসামরিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠন হয়ে উঠেছিল ‘অনুশীলন সমিতি’ (১৯০২)। কেবল এই পূর্ববঙ্গেই অনুশীলন সমিতির পাঁচশতাধিক শাখা সংগঠন ছিল।

অনুশীলন সমিতির সভ্য, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য এবং কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা ডাক্তার কেশব বলিরাম হেডগেয়ার ১৯২৫ খৃ. বিজয়া দশমীর দিন নাগপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আর.এস.এস)। উল্লিখিত এই সমস্ত সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতো অনুশীলন সমিতির। অনুশীলন সমিতির সভ্য মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর স্মৃতিকথায় আছে সে কথা।

॥ সাত ॥

জাতীয়তাবাদ এবং মার্কসবাদ বা সাম্যবাদ প্রসঙ্গে একটা বিষয় আগেই আমরা লক্ষ্য করেছি যে, অনুশীলন সমিতির সভ্য মণি সিংহের নেতৃত্বাধীনে ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টের পর ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম প্রধান দেশে অনুশীলন সমিতির সভ্য, যুগান্তর দলের সভ্য ও অন্যান্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি। আবার অনুশীলন সমিতিরই আর এক সভ্য মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টিও গঠিত হয়েছিল অনুশীলন সমিতির সভ্য। যুগান্তর দলের সভ্য ও অন্যান্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের সভ্যদের নিয়ে। 

মনে রাখা দরকার যে, অনুশীলন সমিতির সভ্য, যুগান্তর দলের সভ্য ও অন্যান্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের সভ্যরা ১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টের আগেও কিন্তু একাধিক রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে ঢুকে এবং একাধিক রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক আঙ্গিনা নিজেদের প্রভাবাধীনে এনেছেন।

১৯১০ খৃ. ডিসেম্বর মাসের ২৬ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত এলাহাবাদে স্যার উইলিয়াম ওয়েডার বার্ণের সভাপতিত্বে চারদিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ২৫তম অধিবেশনে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবং ভূপেন্দ্রনাথ বসুর প্রস্তাবক্রমে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের কট্টর জাতীয়তাবাদীদের একটা অংশ যখন নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠা করেন তখন অনুশীলন সমিতির ও যুগান্তর দলের এবং অন্যান্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের অনেক সভ্য এর অন্তর্ভুক্ত হন।

অনুশীলন সমিতির, যুগান্তর দলের ও অন্যান্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের একটা বড় অংশ বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের গোড়ার দিক থেকেই খোদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের অজ্ঞতার ও ভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে ঢুকেছিলেন।

বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে অনুশীলন সমিতির, যুগান্তর দলের ও অন্যান্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের আর একটা অংশ দলে দলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে ঢুকেছেন।

অনুশীলন সমিতির সভ্যদের, যুগান্তর দলের সভ্যদের ও অন্যান্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের সভ্যদের একটা অংশ ১৯৪০ খৃ. রেভলিউশনারী সোস্যালিস্ট পার্টি (আর.এস.পি) গঠন করেন।

২৭ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা ৯, এই ঠিকানাস্থিত পুস্তক বিপণি থেকে ফেব্রুয়ারি ১৯৯১-এ প্রকাশিত সুজিত সেন সম্পাদিত ‘সাম্প্রদায়িকতা/সমস্যা ও উত্তরণ’ শীর্ষক গ্রন্থে বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজ বিষয়ক গবেষক, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক বহু মূল্যবান গবেষণা গ্রন্থের প্রণেতা, বিশিষ্ট ব্রাত্য জাগরণপন্থী বুদ্ধিজীবী এবং ‘দলিত ভয়েস’ পত্রিকার সম্পাদক ভি.টি. রাজশেখরের একটি ইংরেজি প্রবন্ধের রঞ্জিতা দেবীর করা অনুবাদ ‘অ-মানবিক’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত গ্রন্থের ৬৫ পৃষ্ঠায় ভি.টি. রাজ শেখরের লেখা ‘অ-মানবিক’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই নিবন্ধে আছে:

‘ব্রাহ্মণরা আবার দুটো দলে বিভক্ত। ‘গোঁড়া’ ব্রাহ্মণরা আর.এস.এস’কে নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রগতিশীল যারা, তারা কমিউনিস্ট দলসহ অন্যান্য জাতীয় দলগুলিকে নেতৃত্ব দেয়। ব্যাপারটা এই রকম যে, যে দলই ভোটে জিতুক না কেন, দেশ শাসনের ভার একমাত্র ব্রাহ্মণদের হাতেই বর্তানো উচিত।’

ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ (১৫ই ডিসেম্বর ১৮৮২) উপন্যাসে বর্ণিত ইসলাম ও মুসলিম উৎখাতের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত ‘অনুশীলন সমিতি’র ‘আদ্য প্রতিজ্ঞা’ ‘মধ্য প্রতিজ্ঞা’ ‘অন্ত্য প্রতিজ্ঞা’, এ সবের কথা বিস্তারিত ছেড়ে দিয়েও ‘অন্ত্য প্রতিজ্ঞা’র এবং ‘বিশেষ প্রতিজ্ঞা’র এক একটি ক্ষুদ্র অংশের উদ্ধৃতি দিচ্ছি। ২ গ্রীক চার্চ রো এক্সটেনশন, কলকাতা ৭০০ ০২৬, এই ঠিকানাস্থিত অনুশীলন ভবন ট্রাস্ট রোড থেকে মহারাজ ত্রৈকোল্যনাথ চক্রবর্তীর স্মৃতিরক্ষা কমিটির পক্ষে শ্রী দীনেশচন্দ্র ঘটক কর্তৃক প্রকাশিত ‘জেলে ত্রিশ বছর/ ও পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ শীর্ষক গ্রন্থের ২১ শে এপ্রিল ১৯৮১ তারিখে প্রকাশিত পঞ্চম সংস্করণে ১৭ থেকে ১৯ পৃষ্ঠায় অনুশীলন সমিতির সভ্য ও পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টির নেতা মহারাজ শ্রী ত্রৈকোল্যনাথ চক্রবর্তী অনুশীলন সমিতির সভ্যদের বিভিন্ন প্রতিজ্ঞা গ্রহণ এবং দীক্ষা গ্রহণ প্রণালীর কথা লিখেছেন ‘অনুশীলন সমিতির গণতন্ত্র প্রতিজ্ঞাপত্র ও দীক্ষা, এই শিরোনামে। সেখানে ‘অন্ত্য প্রতিজ্ঞা’র এক জায়গায় তিনি লিখেছেন:

‘আমি সমিতির উদ্দেশ্য সিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত ইহার বেষ্টনী পরিত্যাগ করিয়া যাইব না। আমি পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগিনীর স্নেহের মোহ ত্যাগ করিব ।’

বিশেষ প্রতিজ্ঞা’য় আছে:

‘আমার জীবন ও ঐত্তিকের সমস্ত সম্পদের বিনিময়ে আমি সমিতির প্রসারের কার্যে আত্মনিয়োগ করিব। সমিতির কোনো গোপন বিষয় লইয়া কাহারও সহিত আলোচনা করিব না। ইহা ছাড়া কোনো বিষয়ে সমিতির কোনো সভ্যের নিকট কোনো প্রকার অযথা প্রশ্ন করিব না।

‘প্রতিজ্ঞাকরণের সময় সাধারণত কোনো দেবী মন্দিরে লইয়া গিয়া দেবীর সম্মুখে দীক্ষা দেওয়া হইবে।... দীক্ষা গ্রহণ প্রণালী এইরূপ ছিল:

‘পূর্বদিন একবেলা হবিষ্যান্ন ভোজন করিয়া, সংযমী হইয়া, পরদিন প্রাতে স্নান করিয়া দীক্ষা গ্রহণ করিতে হইত। দেবীর সম্মুখে ধূপ-দীপ, নৈবেদ্য সাজাইয়া, বৈদিক মন্ত্র পাঠ করিয়া যজ্ঞ করিতে হইত। পরে প্রত্যালীয় আসনে বসিয়া (বাম হাঁটু গাড়িয়া শিকারোদ্যত সিংহের প্রতীক) মস্তকে গীতা স্থাপন করা হইত। গুরু শিষ্যের মস্তকে অসি রাখিয়া দক্ষিণ পাত্রে দ-ামান থাকিতেন। শিষ্য যজ্ঞাদির সম্মুখে দুই হাতে প্রতিজ্ঞাপত্র ধরিয়া প্রতিজ্ঞা পাঠ করিতেন। 

‘পুলিন বাবু (অধ্যাপক পুলিন বিহারী দাস) ঢাকা অনুশীলন সমিতির সভ্যদিগকে রমনা সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িতে বা বুড়া শিবের মন্দিরে দীক্ষা দিতেন। দীক্ষা গ্রহণের পর প্রত্যেক সভ্যকে দুধ, ঘি, চিনি মিশ্রিত এক গ্লাস সরবৎ পান করিতে দেওয়া হইতো।.. কেহ ইচ্ছা করিলেই যখন খুশি অনুশীলন সমিতির সভ্য হইতে পারিত না। আবার যখন ইচ্ছা দল ছাড়িয়া যাইতে পারিত না। অনুশীলন সমিতির নিয়মাবলীতে ছিল, কেহ দল ত্যাগ করিলে সমিতির সম্পর্কে তাহার জ্ঞান নষ্ট করিতে হইবে, অর্থাৎ দল ত্যাগ করিয়া পাছে সে দলের অনিষ্ট করে বা গুপ্ত খবর প্রকাশ করে এ জন্য তাহাকে সরাইয়া দেওয়া হইবে।...’

এভাবেই তৈরি হতেন ‘অনুশীলন সমিতি’ (১৯০২)’র ‘যুগান্তর দল’ (১৯০২) এর এবং অন্যান্য আধাসামরিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠনের সভ্যরা। তাদের লক্ষ্য ছিল জাতীয়তাবাদী ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ (১৫ই ডিসেম্বর ১৮৮২) উপন্যাসের দিকনির্দেশনা অনুসারে ইসলাম ও মুসলিমমুক্ত জাতীয়তাবাদী স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের দশম পরিচ্ছেদে মহেন্দ্রকে ভবানন্দ বলেছেন:

‘ধর্ম গেল, জাতি গেল, মান গেল, এখন তো প্রাণ পর্যন্ত যায়। এ নেশাখোর দেড়েদের না তাড়াইলে কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?’

জাতীয়তাবাদী ঋষি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ (১৫ই ডিসেম্বর ১৮৮২) উপন্যাসের চতুর্থ খ-ের প্রথম পরিচ্ছেদে আছে:

‘গ্রাম্য লোকেরা মুসলমান দেখিলেই তাড়াইয়া মারিতে যায়। কেহ কেহ সে রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুটিয়া লইতে লাগিল। অনেক যবন নিহত হইল, অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল, জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল, ‘মুই হেঁদু!’

এই হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দু ধর্মীয় সাংস্কৃতি এক জাতিতত্ত্ব আরোপকামীরাই হিন্দু জাতায়তাবাদী সমাজ প্রধান স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রে এবং ১৯৪৭-এর ১৪ই আগস্টে সৃষ্ট মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস (১৮৮৫), নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভা (১৯১০) এবং “ফরওয়ার্ড ব্লক’ (৩রা মে ১৯৩৯) এর মত জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোকে কেবল নয়, ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, রেভলিউশনারী সোস্যালিস্ট পার্টি (১৯৪০), পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (১৯৪০), পূর্ব পাকিস্তান সোস্যালিস্ট পার্টি (১৯৪৭), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী (১৯৬৪), ফরোয়ার্ড ব্লক (মার্কসবাদী) প্রভৃতি জাতীয়তাবাদী এবং মার্কসবাদী বা সাম্যবাদী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে দীর্ঘকাল যাবৎ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে তাই তারা এত অসুহিষ্ণু। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ