ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 January 2019, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিলেতে বাংলা চর্চা ও বাংলা ভাষার বিশ্বায়ন

সাঈদ চৌধুরী : বিলেতে বাংলা ভাষার চর্চা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের পর লন্ডনে সবচেয়ে বেশি বাংলা চর্চা হয়। ব্রিকলেন ‘বাংলা টাউন’ এখন ‘তৃতীয় বাংলা’ হিসেবে খ্যাত। গ্রেট বৃটেনে প্রায় ৫লাখ বাংলাদেশির বসবাস। শুধু টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে বাস করেন ৫০ হাজারের অধিক। 

ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে সিলেট অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চায়ের চাষ শুরু হলে চা রফতানির কাজে সিলেটের মানুষ বিলেত যাত্রা শুরু করেন। এরপর জাহাজ শ্রমিক হিসেবে ব্যাপক হারে মানুষ বিলেত পাড়ি জমিয়েছেন। উচ্চতর পড়ালেখার জন্যও গিয়েছেন অনেকে। ভ্রমণ, কর্মসংস্থান এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ নিয়েও হাজার হাজার মানুষ প্রবাসী হয়েছেন। উচ্চ শিক্ষিতরা বিভিন্ন পেশায় জড়িত হলেও অসীম সাহসী সাধারণ মানুষ বিলেতে গড়ে তুলেছেন একের পর এক রেষ্টুরেন্ট। গত শতকে বাংলাদেশিদের প্রতিষ্ঠিত প্রায় দশ হাজার রেস্টুরেন্ট এখন বৃটেনের কারি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশি ব্যবসা-বাণিজ্যের নাম ঠিকানা ও ফোন নাম্বার সম্বলিত ইউকে বাংলা ডাইরেক্টরিতে এ তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে।

নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা গড়ে তুলেছেন মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। যেখানে ধর্ম ও ভাষা চর্চা চলছে সমান্তরাল ভাবে। বহুজাতিক সমাজের আবাসস্থল মাল্টিকালচারাল লন্ডন সিটিতে ১৩১টি স্পোকেন ল্যাঙ্গুয়েজ আছে। ভাষার দিক থেকে বাংলার অবস্থান এখন চতুর্থ। এভাবে বিলেতে বাংলাদেশিরা বাংলা ভাষার বিশ্বায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।  

বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জে বসবাসের শতক অনেক আগেই পেরিয়েছে অভিবাসী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠি। বৃটেনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৩জন এমপি রয়েছেন। বৃটিশ পার্লামেন্টে রুশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিক, রুপা হক শক্তিশালী অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। হাউজ অব লর্ডসে আছেন পলা মঞ্জিলা উদ্দিন। বিভিন্ন কাউন্সিলে মেয়র ও কাউন্সিলর হয়েছেন বহু বাংলাদেশি। বৃটিশ বাংলাদেশী কূটনীতিবিদ আনোয়ার চৌধুরী বৃটিশ হাই কমিশনার হিসেবে বেশ খ্যাতি কুড়িয়েছেন। 

ব্রিকলেন বাংলা টাউন বিলেতের মানচিত্রে একটা আইকনের মর্যাদা পেয়েছে। কিছু কিছু স্কুল-কলেজে জিসিএসই ও এ-লেভেলে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ একটা বিষয় হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। বিলেতের মাধ্যমিক স্কুলে ছেলে-মেয়েদের বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে দ্বিতীয় কোন ভাষা পড়তে হয়। টাওয়ার হ্যামলেটসের স্মিদি স্ট্রিট স্কুলে পাইলট প্রজেক্টের অধীনে মডার্ন ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে বাংলা পড়ানো শুরু হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে।  

বাংলাদেশ প্রেমিক ড. উইলিয়াম রাদিচে বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক কাজ করছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সোয়াস (স্কুল অব ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ)-এর শিক্ষক। সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গুরুত্বের সঙ্গে চর্চা হয়। অভিবাসিদের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ায় বৃটেনে বাংলা ভাষাও গুরুত্ব পাচ্ছে। 

বাংলা টাউন থেকে শুরু করে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড বাংলায় হয়েছে। মসজিদ, দোকানপাট, হাসপাতাল, পার্ক সবখানে বাংলার ব্যবহার বেড়েছে। নিউহাম, ওয়েস্টহাম, ক্যামডেন, বার্মিংহাম, ম্যানচেষ্টার, কার্ডিফ ও নিউক্যাসলের মতো এলাকাগুলোতে অনেক প্রতিষ্ঠান ও রাস্তার নাম বাংলায় লেখা আছে ।

বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় আলোচনা ও জাতীয় দিবসগুলো বাংলা চর্চার প্রধান অবলম্বন। বাংলা সংবাদপত্র ও রেডিও-টেলিভিশন এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বাংলা ভাষা ও ধর্মীয় সংস্কৃতি চর্চার লক্ষ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক প্রবাসী স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য বিলেতে চলে এসেছেন।

লন্ডনে বঙ্গবন্ধু স্কুল, ওসমানী স্কুল, কবি নজরুল প্রাইমারি স্কুল, আলতাব আলী পার্ক, বাংলাদেশ সেন্টার, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাঙ্গালি জাতি ও বাংলা ভাষার পরিচয় ধারণ করে আছে। ড্রাইভিং টেস্টের থিওরি পরীক্ষায় এবং এনএইচএস হাসপাতালগুলো ভয়েস ডিরেকশনে অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি বাংলা ও সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় নির্দেশনা চালু হয়েছে। স্থানীয় স্কুলগুলোতে স্বকীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ও সিলেটি ভাষা তালিকাভুক্ত হয়েছে। অসংখ্য লাইব্রেরিতে এখন বাংলা বই গুরুত্বের সাথে রাখা হয়।

বিলেতে বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার শতবছর পুর্ণ হয়েছে। ১৯১৬ সালের ১ নভেম্বর পাক্ষিক ‘সত্য বাণী’ প্রকাশিত হয়।  এরপর মাসিক, পাক্ষিক, সাপ্তাহিকসহ বহু পত্রিকা ও ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে। রেডিও-টেলিভিশন এবং বেশ কয়েকটি অনলাইন পত্রিকাও সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রবাসী বাংলাদেশি কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত  ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) ৫৭টি দেশের তত্ব ও তথ্য সমৃদ্ধ ডাইরেক্টরি মুসলিম ইন্ডেক্স  ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছে।বৃটেনের সকল এশিয়ান রেষ্টুরেন্ট নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ইউকে এশিয়ান রেষ্টুরেন্ট ডাইরেক্টরি। এতে প্রমাণিত হয়েছে এশিয়ান ১৮ হাজার রেষ্টুরেন্টের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশি। এভাবেই বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা আলোচনায় আসছে বার বার। ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় দিন একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ বিশেষ ভাবে বিদেশিদের বাংলা চর্চায় উৎসাহ যুগিয়েছে। বাংলাদেশি হিসেবে নোবেল  বিজয়ী ডক্টর  মুহাম্মদ  ইউনুসের জন্য বাংলার প্রতি আন্তর্জাতিক বিশ্বের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে।২০০৬  সালের ১৫ ডিসেম্বর লন্ডনের আলেক্সজান্ডার প্যালেসে ডক্টর ইউনুসকে দেয়া সম্বর্ধনা সভায় বৃটিশ ও ইউরোপীয় এমপিসহ প্রায় ২ হাজার মানুষের উপস্থিতি ও ইউরোপীয় মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার এরই প্রমাণ বহন করে। বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা, ডয়েচে ভেলে, রেডিও জাপান, চীন আন্তর্জাতিক বেতার, মস্কো রেডিও, রেডিও ভেরিটাস, কানাডার বাংলা রেডিও চ্যানেল সহ বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বাংলা ভাষার প্রচার-প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। 

 

বিলেতে অধ্যয়ন শেষে অনেক বাংলাদেশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। দেশ থেকেও অনেকে গিয়েছেন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার দেশে দেশে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কাজ করছেন বাংলাদেশের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর বহু সদস্য। ফলে সেসব স্থানেও বাংলা ভাষা চর্চা হচ্ছে নানাভাবে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, টেকনোলজিক্যাল গ্লোবালাইজেশন মানবজাতির ভাষাকেও বিশ্বায়িত করে তুলছে দ্রুতগতিতে। সম্প্রতি সিয়েরা লিয়ন বাংলা ভাষাকে তাদের দেশে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। এভাবেই বাংলা ভাষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে পৃথিবীব্যাপী। 

দীর্ঘদিন বিদেশে বসবাসের ফলে অনেক বাংলাদেশি বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছেন। রাজনীতিতে আপন কর্মদক্ষতা গুণে অনেকে লাভ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি। এতে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশি জাতির মর্যাদা বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি দেশেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের শাখা সংগঠন। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন, বিশ্বে জনমত গঠন, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম আয়োজন করে প্রবাসিরা বাংলা ভাষাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পঠন-পাঠনে বিদেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অবদান রাখছে। ইউনিভার্সিট অব লন্ডন, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়, মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়, সরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়, অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়, এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, প্যাট্রিস লুলুম্বা বিশ্ববিদ্যালয়, করাচি বিশ্ববিদ্যালয় সহ অনেক নামি দামি প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার গবেষণা হয়। সম্প্রতি প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পঠন-পাঠন ও গবেষণা চালু হয়েছে। বিশ্বখ্যাত কেম্ব্রিজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষার চর্চা করে চলেছেন বেশ গুরুত্বের সাথে। বাংলা ভাষার বিশ্বায়নে এসবই নতুন মাত্রার সৃষ্টি করেছে। 

বিদেশিদের মধ্যে ইংল্যান্ডের জেমস কিথ, ড. সু লয়েড উইলিয়াম ও জেমস লয়েড উইলিয়াম এবং চেকাস্লাভিয়ার প-িত কে সানি বাংলা ভাষাচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। এছাড়া বাংলা চর্চায় রাশিয়ার দানিয়েল চুক এবং মাদাম দিকোভা, জাপানের কাজিমো আজুমা এবং ৎসুইয়োসি নারা, চীনের দং ইউ চেন এবং ম্যা লি উন প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। এদের বাইরেও আরও বহু বিদেশি বাংলা ভাষাচর্চা ও গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। বর্তমান পৃথিবীতে ২৯ কোটি লোকের ভাষা বাংলা। জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর ৭ হাজারের অধিক ভাষার মধ্যে এর অবস্থান সপ্তম, মাতৃভাষার দিক থেকে পঞ্চম। বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ, আরো ১২ কোটি বাস করেন ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে। বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে এ-ভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা। ফলে ক্রমাগতভাবে বাড়ছে এর চর্চা ও পঠন-পাঠন।  বিলেতের মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কাজের ভাষা হিসাবে বাংলা শেখার দরকার পড়ছে সেদেশের নাগরিকদের। ক্রমবর্ধমান বাংলাভাষী মানুষের কারণেই এমনটি সম্ভব হচ্ছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, মধ্যপ্রাচ্যের কোন কোন দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চল এমনকি কানাডার কিছু এলাকার প্রধান ভাষা বাংলা। বাংলাভাষী মানুষ বিশ্বায়নের এ যুগে যেখানেই সমাজবদ্ধ হয়েছেন, সেখানেই মুখরিত হয়েছেন নিজেদের সংস্কৃতি ও ভাষা চর্চায়। এভাবেই অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে বিশ্বময় বাংলাভাষা।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ