ঢাকা, রোববার 20 January 2019, ৭ মাঘ ১৪২৫, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গৌরবময় সংগ্রাম ও বিজয়ের প্রতীক ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : লাল ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা চারদিক। মাঝখানে প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকতেই সরাসরি চোখ চলে যায় জাতীয় স্মৃতিসৌধের উঁচু মিনারের দিকে আর মনে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী অসংখ্য শহীদের স্মরণে তৈরী বিভিন্ন স্মৃতিসৌধ ও ভাস্কর্যের মধ্যে প্রধানতম সাভারের এই জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এই স্মৃতিসৌধ আপামর জনসাধারণের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের স্মরণে নিবেদিত এবং শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সাভারে নির্মিত এই সৌধ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মৃতিসৌধ। এই স্মৃতিসৌধ আমাদের অস্তিত্ব আর জাতীয়তাবোধের প্রতীক। আমাদের ইতিহাসের স্মারক। প্রতিবছর স্বাধীনতা আর বিজয় দিবসে জাতীয়ভাবে এ স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু এই জাতীয় স্মৃতিসৌধ শুধু মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি স্মরণের জন্যই নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের আরও ইতিহাস। যে ইতিহাস, যে ঘটনা আমাদের স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে দ্রুতগতিতে এবং স্বল্প সময়ে। আমরা হয়ে উঠেছি অপ্রতিরোধ্য। একটি স্বাধীন দেশের নেশায় বাংলার নারী-পুরুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে, ছিনিয়ে এনেছে বিজয়। আর তাই বীর বাঙালির গৌরবগাঁথা সংগ্রাম ও বিজয়ের প্রতীক হিসাবে দন্ডায়মান ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’।
স্মৃতিসৌধের ধারণা : কোনো ধরণের স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিফলক নেই, এমন স্বাধীন দেশ পৃথিবীতে খুব কম। সাধারণ অর্থে স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ হলো এমন একটি বস্তু যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা ঘটনাকে স্মরণ করা হয়। নামফলক, সমাধিক্ষেত্র, কবরফলক, ভাস্কর্য, গণকবর, বধ্যভূমি থেকে শুরু করে দেয়াল, ভবন, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা, পার্ক যে কোনো কিছুই স্মৃতিচিহ্ন বা স্মৃতিসৌধ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে। যুদ্ধের স্মৃতিসৌধও মূলত একই জিনিস। তবে এটি এমন একটি স্থাপনা, যা কোনো যুদ্ধে জয়ের প্রতীক হিসেবে বা যুদ্ধে হতাহতদের স্মরণ করার জন্য নির্মিত হয়। বাইবেলসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও পুরাণে স্মৃতিস্তম্ভ বা এ ধরণের স্মারক নির্মাণের কথা উল্লেখ আছে। ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে ভবিষ্যতের মানুষদের জানানো এবং তাদের স্মরণ করার উপায় হিসেবেই স্মৃতিফলকের ধারণা এসেছে বলে মনে করে যুক্তরাজ্যের ওয়ার মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। একেকটি স্মৃতিসৌধ ইতিহাসের দেয়ালের একেকটি ইট। এছাড়াও ঘটনা ঘটার স্থান চিহ্নিত করাও এর একটি উদ্দেশ্য বলে মনে করেন ইতিহাসবিদেরা। শুধু যুদ্ধের কারণে নির্মিত স্মৃতিফলকের কথা বলা হলে, বিশ্বজুড়ে এ ধরণের অসংখ্য স্থাপনা রয়েছে। সবগুলো নির্মাণের সঠিক সময়কাল এবং নিখুঁত ইতিহাসও নথিবদ্ধ করা হয়নি এখনো। তবে সবগুলোই যে কোনো না কোনো যুদ্ধ বা যুদ্ধে প্রাণ হারানো যোদ্ধাদের স্মরণে তৈরি, সে কাহিনী স্থানীয় লোকজন তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ঠিকই সংরক্ষণ করে আসছে।
স্মৃতিসৌধে কি আছে? : স্মৃতিসৌধে প্রবেশের পর প্রথমেই চোখেপড়ে শ্বেতপাথরে উৎকীর্ণ একটি লেখা। ‘বীরের এ রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রুধারা/এর যত মূল্য সে কি ধরার ধূলোয় হবে হারা’-এর একটু সামনেই শ্বেতপাথরের ভিত্তিপ্রস্তর। এরপরেই ডানদিকে রয়েছে নজরকাড়া উন্মুক্ত মঞ্চ। সোজা হেঁটে গেলে মূল স্মৃতিসৌধ। ১৫০ ফুট বা ৪৫ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট স্মৃতিসৌধটিতে রয়েছে ৭টি ফলক। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি পর্যায়কে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাতটি পর্যায়ের প্রথমটি সূচিত হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। এরপর চুয়ান্ন, আটান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুথ্থানের মাধ্যমে অগ্রসর হয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা বিবেচনা করে এবং মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচনা করে রূপদান করা হয়েছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সৌধটি ভিন্ন ভিন্নভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। স্থপতি মইনুল হোসেন সৌধের মূল কাঠামোটি কংক্রিটের এবং কমপ্লেক্সের অন্যান্য স্থাপনা লাল ইটের তৈরি করেন। মূল সৌধের গাম্ভীর্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য এই পার্থক্য। এর দ্বারা রক্তের লাল জমিতে স্বাধীনতার স্বতন্ত্র উন্মেষ নির্দেশ করা হয়েছে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি খ্যাতনামা স্থপতি সৈয়দ মঈনুল হোসেন। এছাড়া আশেপাশের অন্য সকল নির্মাণ কাজের স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তর। মূল স্মৃতিসৌধের বাম পাশে রয়েছে সৌধ চত্বর। যেখানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নাম না জানা দশজন শহীদের সমাধি। আর ডান পাশে রয়েছে একটি পুস্পবেদী। যেখানে এক সময় শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হতো।
স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সের প্রধান ফটক দিয়ে কেউ যখন এ এলাকায় প্রবেশ করেন তখন তিনি প্রথমেই স্মৃতি সৌধটি চোখের সামনে দেখতে পান। যদিও সৌধ পর্যন্ত যেতে হলে তাকে অনেক দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। এই পথের মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো উঁচু নিচু চত্বর । এই চত্বরগুলো পার হতে হলে তাকে কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে বেশ কয়েক বার ওঠা নামা করতে হয়। তারপর পার হতে হয় বড় একটি কৃত্রিম জলাশয়। জলাশয় পার হওয়ার জন্য রয়েছে সেতু। এই পথের দু’পাশে রয়েছে গণকবর। এই প্রতিটি চত্বর ও সিঁড়ি লাল ইটের তৈরি। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জাতিকে যে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, চড়াই উতরাই পার হতে হয়েছে। তার প্রতীক এই দীর্ঘ হাঁটা পথ। স্বাধীন স্বদেশ পাওয়ার জন্য যে রক্ত দিতে হয়েছে তার প্রতীক লাল ইট। জলাশয় অশ্রুর প্রতীক। আর গণকবর স্মরণ করিয়ে দেয় শহীদদের আত্মদানের ইতিহাস।
ঢাকা ২৫ কি.মি. অদূরে সাভারের নবীনগরে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ। পুরো এলাকাটির আয়তন ৩৪ হেক্টর। এর চারপাশে আরো ১০ হেক্টর জায়গা জুড়ে রয়েছে সবুজ ঘাসের বেষ্টনী। এই সবুজ বেষ্টনী সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের প্রতীক । বিজয় দিবস,স্বাধীনতা দিবস সহ বিশেষ জাতীয় দিবসে এখানে লাখো জনতার ঢল নামে। মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের প্রতি নিবেদিত হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি।
বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কিংবা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন এদেশে আসেন, এদেশের জাতীয় বীরদের শ্রদ্ধা জানাতে তারা জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান এবং সফরের স্মৃতিস্বরূপ স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গনে রোপণ করেন বিভিন্ন গাছের চারা। এসব ছাড়াও স্মৃতিসৌধে রয়েছে হেলিপ্যাড, মসজিদ, অভ্যর্থনা কক্ষ, ক্যাফেটেরিয়া। তাছাড়া জাতীয় স্মৃতিসৌধের অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ সব সময়ই সঙ্গ দেয় এর দর্শকদের।
সাতটি স্তম্ভের বিশেষত্ব : যারা শুধু স্মৃতিসৌধের সামনের ছবি দেখেছেন, তারা কখনোই এর গঠন সম্পর্কে জানতে পারবেন না, বুঝতে পারবেন না এটা কীভাবে আর কী ইতিহাস মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। এটা বুঝতে হলে সৌধের খুব কাছে যেতে হবে, পাশ থেকে দেখতে হবে। ভালোভাবে দেখলেই বোঝা যাবে স্মৃতিসৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজ নিয়ে গঠিত।অনেক বয়স্ক মানুষও জানেন না, জাতীয় স্মৃতিসৌধের সাত জোড়া দেয়াল স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ভিন্ন পর্যায় নির্দেশ করে। পর্যায়গুলো হলো : ১. ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। ২. ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন। ৩. ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন। ৪. ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন। ৫. ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন। ৬. ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭. ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা হিসেবে বিবেচনা করেই সৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই সাত সংখ্যাটি একটু অন্যভাবেও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। এই সালটির দুটি সংখ্যার যোগফল ৫+২= ৭। আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ০৭ তারিখেই। আমাদের বিজয় দিবস হচ্ছে- ১৬ ডিসেম্বর। এই তারিখের দুটি সংখ্যার যোগফলও কিন্তু ১+৬= ৭। আবার স্কুলে থাকতে আমরা পড়েছিলাম (নবম শ্রেণীর English For Today বই দ্রষ্টব্য) ৭ দিয়ে বোঝানো হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠকে।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের ইতিহাস : ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত বিজয়, তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ স্মরণ করে স্মৃতি সৌধ সাভারে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে নবীনগরে এই স্মৃতি সৌধের শিলান্যাস করেন। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্মৃতিসৌধটি নির্মাণের উদ্যাগ গ্রহণ করেন এবং নক্‌শা আহবান করা হয়। ১৯৭৮-এর জুন মাসে প্রাপ্ত ৫৭টি নকশার মধ্যে সৈয়দ মাইনুল হোসেন প্রণীত নকশাটি গৃহীত হয়। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে মূল স্মৃতিসৌধের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বিজয় দিবসের অল্প পূর্বে সমাপ্ত হয়। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত প্রকল্প অনুযায়ী এখানে একটি অগ্নিশিখা, সুবিস্তৃত ম্যুরাল এবং একটি গ্রন্থাগার স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশ সফরকারী বিদেশী রাষ্ট্র প্রধানগণের নিজ হাতে এখানে স্মারক বৃক্ষরোপণ করে থাকেন। স্মৃতিসৌধের মিনার ব্যতিত প্রকল্পটির মহা-পরিকল্পনা ও নৈসর্গিক পরিকল্পনাসহ অন্য সকল নির্মাণ কাজের স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থাপত্য অধিদপ্তর। নির্মাণ কাজের গোড়া পত্তন হয় ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে এবং শেষ হয় ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর সমগ্র নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে। বর্তমানে সৌধটির নির্মাণ কাজ তিন পর্যায়ে মোট ১৩.০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন হয়।
জাতীয় স্মৃতি সৌধ নির্মাণের কাজ তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ১৯৭২ সালে। সে সময় ২৬ লাখ টাকা খরচ করে ভূমি অধিগ্রহণ ও সড়ক নির্মাণের কাজ করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৭৪ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত কাজ চলে। এ সময় ৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা খরচ করে গণকবরের এলাকা, হেলিপ্যাড, গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান,চত্বর ইত্যাদি নির্মিত হয়। ১৯৮২ সালের আগস্ট মাসে শুরু হয় মূল স্মৃতি সৌধ তৈরির কাজ। ৮৪৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় স্মৃতি সৌধ। এর পর এখানে তৈরি হয় কৃত্রিম লেক, সবুজ বেষ্টনী, ক্যাফেটেরিয়া, রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য আবাসিক এলাকা ইত্যাদি ।
স্মৃতিসৌধের স্থপতি মইনুল হোসেন : জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেনের জন্ম ১৯৫২ সালের ৫ মে। জন্মস্থান মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে। তার বাবা মুজিবুল হক ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ইতিহাস পড়াতেন। ছেলেবেলায় মইনুল চেয়েছিল প্রকৌশল বিষয়ে পড়তে। ঢাকায় তখন গণঅভ্যুত্থানের ডামাডোল চলছে। ওই সময় মইনুলকে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৯৭০ সালে তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসে সিট পেলেও সেখানে তার মন টিকত না। সুযোগ পেলেই চলে যেতেন ধানমন্ডির খালার বাসায়। ১৯৭১ সালে দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায় বুয়েটে। মইনুল তার পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে আশ্রয় নেন। খুব কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বরের পর সৈয়দ মইনুল হোসেন ফিরে যান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসে।
১৯৭৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক হন। ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে EAH Consultant Ltd-এ জুনিয়র স্থপতি হিসাবে যোগ দেন। কয়েক মাস পর চাকরি ছেড়ে ওই বছরের আগস্টে যোগ দেন ‘বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’-এ। তার কর্মজীবন বেশ বৈচিত্র্যময়।  ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের গণপূর্ত বিভাগ মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরপর নকশা আহ্বান করা হয়। তখন ২৬ বছরের তরুণ স্থপতি মাইনুল স্মৃতিসৌধের নকশা জমা দেন। প্রায় ১৭-১৮ জন প্রতিযোগীর মধ্যে তিনি প্রথম হয়ে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার পান। আর তার করা নকশা অনুসারে ঢাকার অদূরে সাভারে নির্মিত হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এরপর তিনি স্থপতি সংসদ লিমিটেড, শহীদুল্লাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড এবং কুয়েতের আল ট্রুট লিমিটেডে কাজ করেন।
১৯৭৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সৈয়দ মইনুল হোসেন ৩৮টি বড় বড় স্থাপনার নকশা করেন। এর মধ্যে জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ওজউচ ভবন কাওরানবাজার, ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন, চট্টগ্রাম ইপিজেড, বাংলাদেশ চামড়াজাত প্রযুক্তির কর্মশালা ভবন, উত্তরা মডেল টাউন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার খাদ্য গুদামের নকশা, কফিল উদ্দিন প্লাজা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ভবন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের নকশা করেছেন তিনি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে মহান এই স্থপতি একুশে পদক লাভ করেন।
কীভাবে যাবেন : আগে ঢাকা থেকে স্মৃতিসৌধে সরাসরি যাওয়ার তেমন ভালো কোন পরিবহন ব্যস্থা ছিল না। কিন্তু এখন যাতায়াতের সুবন্দোবস্ত রয়েছে। সম্প্রতি চালু হয়েছে বিআরটিসি বাস সার্ভিস। যা মতিঝিল-গুলিস্তান থেকে শাহবাগ, ফার্মগেট, আসাদগেট, শ্যামলী, গাবতলী, সাভার হয়ে স্মৃতিসৌধে যায়। এ ছাড়া যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসবেন তাদের প্রথমে ঢাকায় আসতে হবে তার পর বিভিন্ন বাসে চেপে সাভারে স্মৃতিসৌধে পৌঁছাতে হবে। এ ছাড়া যারা যমুনা সেতু হয়ে কিংবা ফেরিঘাট পার হয়ে  মানিকগঞ্জ হয়ে রাজধানীতে আসতে চান তারা রাজধানীতে পৌঁছানোর আগেই দেখতে পারবেন এই নান্দনিক স্থাপনাটি।  
পরিবার-পরিজন নিয়ে একটু আরামে যেতে চাইলে যাওয়া যেতে পারে ট্যাক্সি ক্যাবে। সেক্ষেত্রে খরচ কিছুটা বেশী পড়বে। সব মিলিয়ে খুব সহজেই ঘুরে আসা যায় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে। যেখানে গেলে শুধু প্রকৃতির কাছেই যাওয়া যাবে না তার সাথে নিজের মত করে উপলব্ধি করা যাবে মহান মুক্তিযুদ্ধকে। সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রবেশের জন্য কোন প্রবেশ মূল্য নেই। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সৌধে বেড়ানো যায়। চাইলেই যে কোনো দিন আপনারা সেখান থেকে ঘুরে আসতে পারেন।
যা করবেন না : চকলেট আর চিপস খেয়ে প্যাকেটগুলো যেখানে সেখানে ফেলে দেবেন না। বরং পড়ে থাকা ময়লা আবর্জনা তুলে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলতে পারেন। আর গাছ থেকে ভুলেও কখনো ফুল ছিঁড়বেন না। অনেকেই স্মৃতিসৌধের পাশে থেকে হেঁটে হেঁটে সৌধের উপরে উঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু মনে রাখবেন এটা কিন্তু একেবারেই অনুচিত কাজ। কারণ এতে স্মৃতিসৌধের অসম্মান হয় আর স্মৃতিসৌধকে অসম্মান করা মানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের অসম্মান। প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ এই স্মৃতিসৌধ দেখতে যান এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ