ঢাকা, রোববার 20 January 2019, ৭ মাঘ ১৪২৫, ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শিক্ষানগরী রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ও গর্বিত প্রতিষ্ঠান কলেজিয়েট হাইস্কুল

রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান গেট ও ভবন

রাজশাহী অফিস : রাজশাহী মহানগরী একটি ‘শিক্ষানগরী’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পেছনে যে সকল প্রতিষ্ঠান গর্ব করতে পারে তার অন্যতম হলো রাজশাহী কলেজিয়েট হাইস্কুল। ১৯০ বছর আগে ‘বু-আউলিয়া ইংলিশ স্কুল’ হিসেবে যাত্রা করে তা আজ কলেজিয়েট হাইস্কুল নামে ঐতিহ্যবাহী ও গর্বিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে এই স্কুলের গোড়াপত্তন হয় এবং এর নামকরণ হয় ‘বু-আউলিয়া ইংলিশ স্কুল’ (ইংরেজদের উচ্চারণে ‘বাউলিয়া’)। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্যালয়টি তৎকালীন বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা উইলিয়াম অ্যাডামের শিক্ষাবিবরণীর অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তার স্বীকৃতি লাভ করে। সারদা প্রসাদবসু সর্বপ্রথম বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন বিদ্যালয়টি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে।
১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী জেলার সদর দপ্তর নাটোর থেকে রাজশাহী শহরে স্থানান্তরিত হয়। সকল প্রকার প্রশাসনিক দপ্তরসহ ফৌজদারি ও দিওয়ানি আদালত রাজশাহীর গঙ্গা (পদ্মা) তীরবর্তী শ্রীরামপুর মৌজায় স্থাপিত হয়। বৃহত্তর রাজশাহীর ছোট বড় প্রায় সকল জমিদার, জোতদার, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পীসহ নানা ধরনের পেশার সাথে সম্পৃক্ত মানুষেরা বিভিন্ন স্থান থেকে এসে রাজশাহী শহরে বসতি স্থাপন করতে থাকেন। সে সময়ে রাজশাহী শহরের নাম ছিল বু-আউলিয়া বা বোয়ালিয়া। শ্রীরামপুর মৌজায় নতুন প্রশাসনিক ভবনসহ আদালত ইত্যাদি নির্মিত হওয়ার ফলে শহরের নামকরণ করা হয় রামপুর বোয়ালিয়া। খুব বেশিদিন শ্রীরামপুর মৌজায় জেলার প্রশাসনিক ভবনগুলো টিকে থাকেনি। ১৮৫০ ও ১৮৫৫ সালের প্লাবনে গঙ্গা-তীরবর্তী শ্রীরামপুর মৌজার বৃহৎ অংশ গঙ্গার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। এর সঙ্গে বিলুপ্ত হয় প্রশাসনিক স্থাপনাসমূহ। কর্র্তৃপক্ষ শহরের বুলনপুর মৌজায় নতুন করে প্রশাসনিক ও আদালত ভবন নির্মাণ করে ১৮৬৪-৬৫ খ্রিষ্টাব্দে। এর অনেক আগেই অর্থাৎ ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী জেলার সদর দপ্তর নাটোর থেকে বোয়ালিয়ায় স্থানান্তরিত হওয়র পর এই শহরের কলেবর বৃদ্ধি পায় অনেকগুণ। সে সময়ে শহরে বসবাসকারী দেশী-বিদেশী রাজ-কর্মচারী, জমিদার ও অভিজাত শ্রেণীসহ উচ্চবিত্ত সম্পন্ন মানুষেরা তাদের সন্তানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার তাগিদ অনুভব করেন। রাজশাহীতে বসবাসকারী প্রায় ৫শ’ ইউরোপীয়ানের অনেকেই পরিবারসহ বসবাস করতেন এই শহরে। তাদের সন্তানদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ছিল। এ কারণে বোয়ালিয়ায় সদর দপ্তর স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুল’ নামে একটি বেসরকারি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান কলেজিয়েট স্কুল ভবন যে স্থানে অবস্থিত সেখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় দেড় মাইল দূরে ছিল প্রথম প্রতিষ্ঠিত বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুল’। পদ্মানদীর তীরে বড়কুঠির কাছাকাছি খড়ের দোচালা ঘরে টাইল নির্মিত বারান্দায় এর প্রথম কার্যক্রম শুরু হয়। এখন এই স্থানটি পদ্মার চরভুক্ত। সেসময় স্কুলের জন্য কোন সরকারি সাহায্য বরাদ্দ ছিল না। ফলে ১৮২৮ থেকে ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শহরের দানশীল ব্যবসায়ী, জমিদার এবং রাজশাহীতে ব্যবসারত ইংরেজ কোম্পানির আর্থিক সহায়তায় ও অনুদানে স্কুলটি পরিচালিত হতে থাকে। ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানি সরকারের শিক্ষা কমিশনার উইলিয়াম অ্যাডাম নাটোরে শিক্ষা সম্পর্কিত জরিপের কাজ শেষ করে বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুলটি পরিদর্শন করেন। তিনি স্কুলটির জীর্ণ ও দৈন্যদশা স্বচক্ষে দেখে হতাশ হন। তবে স্কুলটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি ছিলেন আশাবাদী। স্কুলটির আশু উন্নতির পক্ষে তাঁর অভিমত সরকারকে জানান তিনি।  ফলে ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুলটি জেলা স্কুল হিসেবে সরকারিভাবে মর্যাদা লাভ করে। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সারদা প্রসাদ বসু এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। সেই বছর স্কুলের মোট ছাত্র ছিল ৮৩ জন, যার মধ্যে ৭৮ জন হিন্দু, ২ জন মুসলমান এবং ৩ জন খ্রিষ্টান। ১৮৩৬ সালে ছাত্র সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৮ জন। স্কুলের শিক্ষার মান ছিলো অনেক উন্নত।
ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন অখ- বাংলায় ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে যে তিনটি স্কুল সরকারি উচ্চমাধ্যমিক স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় তার মধ্যে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল একটি। অন্য দু’টি হচ্ছে কোলকাতার হেয়ার স্কুল এবং মুর্শিদাবাদ ইংলিশ হাইস্কুল। ১৮৫০ সালে প্রথমবারের মত উঁচু শ্রেণীর মাথাপিছু ১ টাকা হারে বেতন ধার্য করা হয়। ফলে ছাত্র সংখ্যা কিছু কমে যায়। রাজশাহী কলেজিয়েটে ১৮৪৪ ও ১৮৪৫ সালে ১ জন করে মোট ২ জন এবং ১৮৪৭ সালে তিন জন ছাত্র জুনিয়র বৃত্তি লাভ করে। ১৮৪৯ সালে স্কুলে একটি প্রশস্ত পাকা ভবন নির্মিত হয়। ১৮৫৭ সালে ছাত্র সংখ্যা হয় ১৪৬ জন। ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে সারদা প্রসাদ বসু পরলোকগমন করলে বিহারের ভাগলপুর থেকে মি. সি. রিজ স্কুলের প্রথম ইংরেজ প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ১ এপ্রিল (মতান্তরে জানুয়ারি মাসে) বোয়ালিয়া সরকারি ইংলিশ স্কুল (জেলা স্কুল) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে। তবে এর পূর্ব থেকেই এই স্কুলে এফ.এ (First Arts) ক্লাস সংযোজিত ছিল। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কলেজের মর্যাদা লাভ করে। তখনো নতুন সৃষ্ট কলেজটির নাম ছিলো বোয়ালিয়া হাইস্কুল। ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম শ্রেণীর কলেজ হিসেবে অনুমোদন লাভের পর বোয়ালিয়া হাইস্কুলের পরিবর্তে নতুন নামকরণ হলো রাজশাহী কলেজ। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে বোয়ালিয়া হাইস্কুলের নাম পরিবর্তন হয়ে নতুন নামকরণ হলো ‘কলেজিয়েট স্কুল’। এর এক বছর পর ১৮৭৮ সালে রাজশাহী কলেজ কলেজিয়েট স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে সরে পশ্চিম দিকে স্থাপতি হয়। ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বোয়ালিয়া ইংলিশ স্কুল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে এবং প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে।
এক পর্যায়ে বিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবনটি পদ্মা নদীর ভাঙনের কবলে পড়লে ভাড়া করা একটি বাড়িতে  বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৮৬২ সালে বিদ্যালয়টির বর্তমান স্থানে কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়। ১৮৭৩ সালে বোয়ালিয়া সরকারি ইংলিশ স্কুলের সঙ্গে মহাবিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণী সংযোজিত হয়। সম্ভবত তখন থেকেই এর নামকরণ হয় ‘রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল’। ১৮৭৪ সালে পুঠিয়ার মহারাণী শরৎসুন্দরী দেবীর আর্থিক সহায়তায় স্কুলের অতিরিক্ত দুইটি নতুন ভবন নির্মিত হয়। বাংলার গভর্ণর মি. ফুলারের আর্থিক সহায়তায় এবং রাজনীতিবিদ খানবাহাদুর এমাদুদ্দীন আহম্মদের সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯০৭ সালে ফুলার হোস্টেল নির্মিত হয়। ঐ বছরই বিদ্যালয়ের জন্য পৃথক হিন্দু হোস্টেল নির্মাণ করা হয়।
১৯৯০ সাল পর্যন্ত স্কুলে প্রভাতী শাখায় ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী এবং দিবা শাখায় ৭ম থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান কর্মসূচি চালু ছিলো। ১৯৯১ সালের মে মাস থেকে সরকারি এক আদেশে বিদ্যালয়ে পুরোপুরি ‘ডাবল শিফট’ কার্যক্রম শুরু হয় এবং তখন থেকেই প্রভাতী শাখায় ৩য় থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি শ্রেণীতে দু’টি করে এবং দিবাকালীন শাখায়ও ৩য় থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রতি শ্রেণীতে দু’টি করে শাখায় পাঠদান কার্যক্রম চালু আছে। বর্তমানে এখানে একাধারে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর ক্লাশ অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছেন ড. নুরজাহান বেগম। ২০০৮ সালে এই স্কুলে একাদশ শ্রেণী চালু করা হয় এবং এই শ্রেণীতে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শাখা খোলা হয়। ২০১০ সালে সর্বপ্রথম এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় ছাত্ররা অংশগ্রহণ করে। এখানকার স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব খানবাহাদুর আহসানউল্লাহ। শুরুতে স্বল্প সময়ের জন্য আহ্ছানউল্লা স্কুলের সুপারনিউমেরারি টিচার পদে নিয়োগ পান। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন।  রাজশাহী নগরীর প্রাণকেন্দ্র সাহেব বাজার সোনাদিঘি মোড়ে অবস্থিত এই স্কুলের জমির পরিমাণ প্রায় এক একর। এই জমি কিভাবে পাওয়া গেছে সে সম্পর্কিত কোন রেকর্ড বা তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে কিছু জমি শহরের রাস্তা সম্প্রসারণের সময় সরকারি আদেশে ছেড়ে দিতে হয়। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার প্রেক্ষিতে স্কুলের স্বার্থে এখন স্কুল প্রাঙ্গণে বেশকয়েকটি নতুন বহুতল ভবন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ