ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 January 2019, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

উপমহাদেশের মুসলিম জাগরণে ‘দৈনিক আজাদ ’ এর ভূমিকা

আহমদ মনসুর : মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাটের  হাকিম পুরে ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। আকরাম খাঁ কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর সাংবাদিকতাকে পেশা হিসবে গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৩৫ সালে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি ‘দৈনিক খাদেম’ ও ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মদীর’ও প্রতিষ্ঠাতা।   মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ শুধু বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রকাশক এবং প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না। সম্পাদক হিসাবে ও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তিনি  ছিলেন মূলতঃ চিন্তাশীল সাহিত্যিক ও সুপণ্ডিত এবং একজন প্রধান গদ্য রচয়িতা।  মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর মধ্যে  পণ্ডিত, লেখক, আলেম , সমাজ সংস্কারক , সাংবাদিক রাজনীতিবিদ ইত্যাদি একাধিক সত্তার সমন্বয়  ঘটেছিল এবং সর্বক্ষেত্রেই তিনি তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতার সাক্ষর রেখে গেছেন। অধিকন্তু তাঁর ছিল ভাষার উপর অপ্রতিহত অধিকার ও চমৎকার দখল। তার ভাষা ছিল অত্যন্ত জোরালো ও  সাবলীল ।  তার রচিত ‘মোস্তফা চরিত’, ‘সমাজ ও সমাধান’, ‘মোছলেম বাংলার সামাজিক ইতিহাস’  ও ‘তাফসীরে কুরআন’ নামে বিখ্যাত তাফসীর তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।  বাঙালি মুসলমানদের নিজস্ব সাহিত্য প্রতিষ্ঠান গঠনেও তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি বঙ্গীয়  মুসলমান সাহিত্য সমিতি ’- এর বিভিন্ন বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন।  

মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯০৬ সাল থেকে।  স্যার সলিমুলাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের গোড়া পত্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি লীগে যোগদান করেন। তিনি ছিলেন মুসলিম লীগ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। ১৯৩৫ সালে তিনি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন এবং ‘বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদ’ - এর সদস্য নির্বাচিত হন।    মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল বিভিন্ন মুখী। দেশবন্ধু চিত্ত রঞ্জন দাসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসাবে তিনি কংগ্রেেেসর সঙ্গে জড়িত ছিলেন , কিন্তু কংগ্রেস কর্তৃক ‘ নেহেরু রিপোর্ট ’ প্রকাশের পরে তিনি যখন দেখলেন যে ভবিষ্যতের স্বাধীন ভারতে মুসলমানদের উপরে অবিচারের ইঙ্গিত রয়েছে তখন তিনি ১৯২৯ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করলেন। 

রাজনৈতিক জীবন শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পারলেন যে, অচেতন মুসলিম সমাজকে সচেতন করার জন্য সবচেয়ে বড় হাতিয়ার সংবাদ পত্র। .. মুসলমান স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সাপ্তাহিক পত্রিকা যথেষ্ট নয় , বিশেষ করে , কংগ্রেস ও হিন্দু প্রভাবিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা শুধু বাংলা ভাষাতেই যখন দু’ ডজনের উপর তখন মুসলমানদের একটিও পত্রিকা নেই। এই দুঃখ জনক অবস্থার অবস্থান চাই। সে জন্য মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ ১৯২১ সালে ‘দৈনিক সেবক’ প্রকাশ করেন।’ বস্তুত ১৯৩৬ সালে দৈনিক আজাদ ও প্রকাশ হয়েছিল ঐ একই প্রয়োজন ও অনুপ্রেরণা থেকে। ‘আজাদ’ পত্রিকার আদর্শ , উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তুলে ধরে সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘ .. বিংশ শতাব্দীর মধ্য ভাগে , মোছলেম বঙ্গের জাতীয় জীবনের একমাত্র অবলম্বন হইতেছে ক’এক খানা সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। এই শোচনীয় দৈন্যের অনুভূতি মোছলেম বঙ্গের জাতীয় অন্তরকে যাতনা দিয়া আসিতেছে বহদিন হইতে। .... তিন কোটি মুসলমানের সত্যকার সেবক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি রূপে ‘দৈনিক আজাদ’ হাতে করিয়া সমাজের খেদমতে উপস্থিত হইতে পারিলাম। তাই মোছলেম বঙ্গের জাতীয় জীবনের এই শুভ প্রভাতে সর্বপ্রথম আল্লাহর হুজুরে অবনত মস্তকে অন্তরের  কৃতজ্ঞতা নিবেদন করিতেছি। .. ‘দৈনিক আজাদ ’ সত্যকার আজাদীর নির্বিঘœ ও নির্ভীক অগ্রদূত হিসাবে , বাঙ্গালী মুসলমানের ভিতর বাহিরের সব অশুভ বন্ধন পাশকে ছিন্ন করিয়া তাহাকে  মুক্তির মঙ্গলকার্যে পরিচালিত করিতে সমর্থ হউক। .. [ দৈনিক আজাদ, ১ম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা; ৩১ শে অক্টোবর। ]         

‘দৈনিক আজাদ’ প্রকাশিত হয়েছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক আন্দোলন , স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুসলিম নবজাগরণের পটভূমিতে এক ঐতিহাসিক সংকট -সন্ধিক্ষণে।  সুতরাং ‘ দৈনিক আজাদ’- এর ঐতিাসিক ভূমিকা ও অবদানের মূল্যায়ন করতে হলে শুধু একটি দৈনিক সংবাদপত্র রূপে বিচার করলে চলবে না, এই পত্রিকার আদর্শ, উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যের কথাও বিশেষ ভাবে মনে রাখতে হবে।  ‘আজাদ’ ছিল উপমহাদেশের বিশেষ করে , তদানীন্তন আসাম ও বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীর মুখপত্র- নবজাগরণ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের, স্বাধীনতা সংগ্রামের বাণী বাহক এবং হাতিয়ার।

বাংলার নব জাগরণের প্রধান পুরোহিত ছিলেন রাজা রামমোহন রায় । রামমোহন বাঙ্গালীর চিন্তা বোধ ও সংস্কৃতিতে মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদের বীজ বপন করেন। বাংলার নব জাগরণে রামমোহনের যোগ্য উত্তরসুরী ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর পরবর্তী সাহিত্যিকগণের লেখনীেেত বাঙালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে।  ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের জাতীয়তাবদের যে সূচনা হয় তার অগ্রণী ছিলেন রামনারায়ণ বসু।  রামনারায়ণ বসুর উৎসাহে ও পৃষ্ঠপোষকতায় ন্যাশনাল পেপার প্রকাশিত হয়।  হিন্দু সম্পাদিত পত্রিকাগুলি আগা গোড়া মুসলমান স্বার্থ বিরেধী ভুমিকা পালনে ছিল সব সময় তৎপর। যেমন মহা বিদ্রোহের সময় ঈশ্বরচন্দ্রগুপ্ত ‘ সংবাদ প্রভাকরে’ মুসলমানদেরকে উপদেশ দিয়ে লিখলেন ,“তোরা এখন ক্ষান্ত হ..তোমাদের কুমন্ত্রণাতেই তৈমুর বংশ  একেবারে ধ্বংস হইল, তোদের দোষেই প্রাচীন রাজধানী দিলীনগর রসাতলশায়ী হইল, তোদের  দোষেই দিলীশ্বরের কারাবাস হইল.. ওরে দুরাত্মারা ..গলবস্ত্রে বিশ্বজয়ী ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের নিকট শির নত কর, দয়াবান গবর্ণমেন্ট অপরাধ মার্জনা করিবেন.. রাজানুগত্য স্বীকার করিলে জগদীশ্বর তোদের প্রতি কৃপানেত্রে নেত্রপাত করিবেন। ”মুসলমান বিদ্বেষের এমন মনোভাবপূর্ণ ‘যুগান্তর’, ‘আনন্দবাজার’, ‘বসুমতী’, ‘হিন্দুস্থান ষ্টান্ডার্ড’,‘অমৃত বাজার’ প্রভৃতি বাংলার নবজাগরণে ও বাংগালী জাতীয়তাবাদের প্রচারে মুখ্যভূমিকা পালন করে। সেকালে মুসলমান পরিচালিত অপর কোনও দৈনিক পত্রিকা না থাকায় দৈনিক আজাদ’কে  একক ভাবে  এ সব পত্রিকার মোকাবেলা করে কলমী লড়াই চালাতে হয়েছে। 

মুসলমানদের নবজাগরণে এবং হৃত মনোবল পূনরুদ্ধারে ‘ আজাদ’ এর দান অতুলনীয়।  আজাদ যেকালে প্রকাশিত হয় সেকালের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমি বিশেষণ করতে গিয়ে আবুল কালাম শামসুদ্দীন লিখেছেন, “ সে সময়ে মুসলিম লীগের নবজন্ম লাভের ফলে ভারতের মুসলিম রাজনীতিতে যে উৎসাহ উদ্দীপনার জোয়ার এসেছিল তাতে দেশের বিভিন্ন স্থান ও মহল থেকে মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁর কছে অবিলম্বে একখানা দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশ করার তাগিদ অনবরত আসছিল। .. মওলানার সম্পাদনায় ‘দৈনিক আজাদ’ প্রকাশিত হল নির্দিষ্ট স্থানে। .. ‘আজাদ’ বাংলার মুসলিম সমাজে উৎসাহ উদ্দীপনার যে জোয়ার এনেছিল , তা ছিল অভূতপূর্ব। অল্পদিনের মধ্যেই ‘আজাদ’ মুসলিম বাংলার জাতীয় দৈনিক মুখপত্র হয়ে উঠল।

দৈনিক আজাদ প্রকাশের রাজনৈতিক সামাজিক -সাংস্কৃতিক পটভূমি এবং এই পত্রিকা প্রকাশের অপরিহার্য আবশ্যকতার অতীত ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে পত্রিকার প্রথম বার্তা সম্পাদক প্রবীণ সাহিত্যিক -সাংবাদিক সৈয়দ মোদাব্বের লিখেছেন, ‘১৯৩৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অবশ্য এ.কে. ফজলুল হক  সাহেব মনে করেছিলেন যে , তার প্রজাপার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে। কিন্তু তা সম্ভবপর হয়নি।, এজন্য যে মুসলিম লীগের হাতে ‘মোহাম্মদী’র মত একটি শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল।  নির্বাচনের পর যখন লীগ প্রজা কোয়ালিশন মন্ত্রী সভা গঠিত হল , তখন একটি শক্তিশালী দৈনিকের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারলেন ফজলুল হক সাহেব।  তাঁর দ্বারা উৎসাহিত হয়ে মওলানা আকরাম খাঁ ১৯৩৬ সালের ৩১ শে অক্টোবর তারিখে ‘আজাদ’ বের করলেন। এই ‘আজাদ’ পত্রিকাই মুসলিম জাতীয় ইতিহাসের দিকদর্শন। .. এবার মনে হল মুসলমান জাতি নতুন জীবন ফিরে পেল। মুসলিম লীগ মুসলমান জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবী নিয়ে এগিয়ে চললো, ‘আজাদ’ জাতির সামনে তুলে ধরল এক নতুন আদর্শ। মিঃ জিন্নাহর নেতৃত্ব ও ‘আজাদের’ সমর্থন উপমহাদেশে এক অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের সূত্রপাত করলো। যার ফলশ্রুতিতে [সাবেক] পাকিস্তান।”  

উপমহাদেশের জনগণের বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক , সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায় এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য দৈনিক আজাদকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। জমিদার মহাজনদের শোষণ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান চাষীদের বাঁচানোর সংগ্রামে দৈনিক আজাদকে পালন করতে হয়েছে সংগ্রামী ভূমিকা।  মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ কৃষক- প্রজা আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংষ্টি ছিলেন। তিনি কৃষক সমিতির সম্পাদক ছিলেন। জমিদার মহাজনদের কবলে শোষিত মুসলমান কৃষকদের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে ‘দৈনিক আজাদ’- এর মাধ্যমে। এ ব্যাপারে দৈনিক আজাদ এর ভূমিকা সম্পর্কে আবুল কালাম শামসুদ্দীন বলেন, ‘ শেরে বাংলা ফজলুল হক  , খাজা নাজিমুদ্দীন এদের উদ্যোগেই ১৯৪২ সালে প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হয়।  নাজিমুদ্দীন তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী।  এই প্রজাস্বত্ব আইনে কৃষি ঋণের  ব্যবস্থা হল এবং ঋণ সালিশী বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। ঋণ সালিশী বোর্ডের কারণেই মুসলমানরা রক্ষা পায়। এর ফলে টিকে গেল  মধ্যবিত্ত শ্রেণী। বলা চলে মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হল। .. তখন কলকাতা রাজধানী। ঐ সময় মুসলমানদের কোন পত্র-পত্রিকা ছিল না। এই সময় মুসলমানদের মুখপত্র হিসাবে ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত হয় দৈনিক আজাদ। আজাদ পত্রিকা মুসলমানদের দাবী- দাওয়া , অভাব-অভিযোগের কথা খুব জোরেসোরে বলতে লাগল। মুসলমানদের জন্য চাকুরী নিশ্চিত করার দাবী তোলে।  একই সময় চাকুরীর ক্ষেত্রেও মুসলমানদের জন্য শতকরা ৪৫ ভাগ চাকুরী সংরক্ষরণের ব্যবস্থা হয়। সাম্প্রদায়িক কথাটা তখনই চালু হয়।  মুসলমানরা যা বলতো হিন্দুরা তাকেই সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যা দিতো। হিন্দুদের পত্র-পত্রিকায়ও এ নিয়ে প্রচুর লেখা হতো।  আজাদ পত্রিকা এর বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে দাঁড়ায়।’ 

মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সংরক্ষণে আজাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ‘ দৈনিক আজাদ’কে এই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং আজাদী  অর্জনের স্বপক্ষে লড়াই করতে হয়েছে সংখ্যালঘুু এবং অবহেলিত , বঞ্চিত, ও শোষিত জনগোষ্ঠীর মুখপত্র হয়ে।  মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবীকে হিন্দুদের পক্ষথেকে শুধু সাম্প্রদায়িক রূপেই চিহ্নিত করা হয়নি, এ সবের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা ও সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৩৬ সালেই আজাদ এর সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছিলঃ “ বাংলার হিন্দুসমাজ আজ মোছলেম বঙ্গের গুরুতর স্বার্থগুলির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ভাবে সমর ঘোষণা করিয়াছেন। হিন্দুস্তান হিন্দুর দেশ , হিন্দুর ধর্ম , সং¯কৃতি ও ভাষাই এখানে প্রবল হইয়া থাকিবে , অন্য কোন ধর্মের সংস্কৃতির বা সাহিত্যের স্থান হিন্দুদের এই পবিত্র আর্যাবর্তে হইতে পারিবে না বলিয়া দাম্ভিক স্বরে ঘোষণা প্রচার করা হইতেছে।’  

‘দৈনিক আজাদ ’একটি সংবাদ পত্রের সাধারণ দায়িত্ব অর্থাৎ দেশ- বিদেশের সংবাদ পরিবেশনা , আন্তর্জাতিক দুনিয়ার খবরাখবর তুলে ধরা এবং বিভিন্ন  সমস্যা সংকট সম্পর্কে মন্তব্য, মতামত রাখা ছাড়াও সেই বৃটিশ আমলে – পরাধীনতার যুগে স্বদেশের রাজনৈতিক , সামাজিক , সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক  তথা সার্বিক মুক্তি আন্দোলনে পথপ্রদর্শক ও প্রেরণা সঞ্চারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল .. সাধারণ দায়িত্ব পালন ছাড়াও ‘দৈনিক আজাদ’কে সাহিত্য- সংস্কৃতির আন্দোলনের ক্ষেত্রেও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মুখপত্র রূপে সেকালে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। ”      

ভাষা আন্দোলনে ‘আজাদ’-এর রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে ১১ মার্চ ঢাকায় যে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়  তার সমর্থনে তখনই কলকাতা থেকে প্রকাশিত  ‘ দৈনিক আজাদে’ একটি জোরালো সম্পাদকীয় লেখেন আবুল কালাম শামসুদ্দীন। ১৯৪৮ সালের১৭ই মার্চ ‘দৈনিক আজাদ’-এ প্রকাশিত  ‘মোবারকবাদ ’ শীর্ষক এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “জনমতের জয় হইয়াছে। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার  যে দাবীতে পূর্ব পাকিস্তানে স্বতঃস্ফুর্ত গণবিক্ষোভ জাগিয়া উঠিয়াছিল  র্প্বূবঙ্গ গভর্ণমেন্ট তা অকুন্ঠ চিত্তে মানিয়া লইয়াছেন।  রাষ্ট্রভাষা আন্দেলনে পূর্ব বাংলার ছাত্র সমাজ প্রভূত  শ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন; আন্দেলনের কর্মসূচীতে আমরা বিশেষ করিয়া তাহাদিগকে অভিনন্দন জানাইতেছি।”   ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন- যা ’৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারীতে শহীদের রক্তের বিনিময় অর্জন করে অমর মহিমা।  এই ভাষা আন্দেলনে ‘দৈনিক আজাদ’-এর ভূমিকা ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বায়ান্নোর ২১শে ফেব্রুয়ারীর মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘দৈনিক আজাদ- এর সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়,“গত দুইদিন ধরিয়া ঢাকা শহরের বুকে যে সব কান্ড ঘটিয়াছে ,  সে সবকে শুধু শোকবহই নয় , বর্বরোচিতও বলা চলে। জনাব নুরুল আমিন পুলিশী জুলুম সম্বন্ধে তদন্তের কথা বলিয়াছিলেন এবং ১৪৪ ধারা জারির যৌক্তিকতা সম্বন্ধেও ইতঃস্ততার ভাব প্রকাশ করিয়াছিলেন।  কিন্তু সে তদন্তের কোন ব্যবস্থা হইল না এবং ১৪৪ ধারাও বলবৎ রহিয়াছে।  ফলে গুলিতে মানুষ হতাহত হইতেছে এবং মানুষের রক্তে পথ রঞ্জিত হইতেছে।  নুরুল আমিন মন্ত্রীসভার ব্যর্থতা চরম ভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। আমরা এই মন্ত্রীসভার পদত্যাগ দাবী করিতেছি। .. [ ২৩ শে ফেব্রুয়ারী -১৯৫২] 

বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সমকালেই ‘দৈনিক আজাদ’একটি ‘বাঙলা একাডেমী’ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে । ১৯৫২ সালের ২৯ শে এপ্রিল ‘ দৈনিক আজাদ’-এ ‘আমাদের অতীত ’ এক নিবন্ধে বলা হয়,“পূর্ব- পাকিস্তানের বাংলাভাষী মুছলমানদের তামাদ্দুনিক  জীবন এক সংকটজনক পর্যায়ে উপস্থিত হইয়াছে। ঐতিহ্যবিহীন বা ঐতিহ্যভোলা  মানব- সমষ্টি পরিণামে দাসত্ব বরণ করিতে বাধ্য হয়; কেবল রাজনৈতিক অধিকার দ্বারা - সে গোলামী রোধ করা যায় না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে , বাঙ্গালী মুছলমানদের একটা বিরাট অতীত ইতিহাসের অস্তিত্ব সত্ত্বেও, তাহা আজ আমাদের নিকট অজ্ঞাত ও অপরিচিত। সেই সামাজিক ও জাতীয় ইতিহাস উদ্ধার , গঠন ও রচনাই আজ দেশের সুধীবৃন্দের প্রধানতম কর্তব্য। ..ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আমরা সত্বর একটি ‘বাংলা একাডেমী’ প্রতিষ্ঠা করিতে অনুরোধ জানাই।      

আজাদের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা মোহম্মদ আকরাম খাঁ ছিলেন বাংলা ভাষার সুপণ্ডিত শক্তিমান লেখক।, মাতৃভাষার প্রতি তার গভীর অনুরাগ এবং প্রেম ছিল বলেই, ‘বাংলাভাষা বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা কি না’ এই হঠকারী  ও বিভ্রান্তিমূলক জিজ্ঞাসার উত্তরে ১৩২৫ সালে মওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ বলেছিলেন, “দুনিয়ায় অনেক রকম অদ্ভুত প্রশ্ন আছে, বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা কি? এ প্রশ্নটা তাহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত।.. বঙ্গে মোছলেম ইতিহাসের সূচনা হইতে আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষাই তাহাদের লেখ্য ও কথ্য মাতৃভাষা রূপে ব্যবহৃত হইয়া আসিয়াছে । এবং ভবিষ্যতেও মাতৃভাষা রূপে ব্যবহৃত হইবে। ” 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ