ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 January 2019, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রথম বিশ^যুদ্ধোত্তর কবিতার পালাবদল

ড. ফজলুল হক তুহিন : প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমগ্র পৃথিবীকে বদলে দেয়। জীবনের সবদিকের আমূল পরিবর্তন ঘটে। সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতি-সাহিত্য এবং সভ্যতায় একটি ক্রান্তিকালের সূচনা হয়। ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের ভেতর বাহিরের পালাবদলে কবিতায়ও আসে বিপ্লব। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত মহাযুদ্ধের ফলে ইউরোপের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক মেরুদণ্ড একেবারে ভেঙে পড়ে। মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে হতাশার সৃষ্টি হয়। চার বছর যে অমানবিক বর্বরতা ও পাশবিকতা ইউরোপে ধ্বংসলীলার সৃষ্টি করে, তারপর সেই সভ্যতা আবার সঞ্জীবিত হয়ে উঠবে, এমন আশা করতে অনেকেই দ্বিধান্বিত বোধ করেন। পুরাতন মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবশ্য এই অবক্ষয় শিল্প-বিপ্লবোত্তর যুগের প্রকট অর্থনৈতিক, সামাজিক ধ্যান-ধারণা ভিক্টোরিয়ান (Victorian) যুগের অচঞ্চল বহিরাঙ্গকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয়; আঘাত করে এমন কি খ্রিষ্টিয় বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে। সাহিত্যে তার প্রতিফলন ঘটে; রবার্ট ব্রাউনিং (১৯১২-৮৯) ও টেনিসন (১৮০৯-৯২), আর্নল্ড ও জি.এম. হপকিন্স (১৮৪৪-৮৯) ব্যক্তির উপর আর আস্থা রাখতে পারেননি, ফিরে গেছেন সমষ্টিতে, এবং যদিও বিশ্বাস করেন সত্যই ধ্রুব, সত্য আপেক্ষিক নয়, কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তির নিরন্তর বিবাদকে মনের চিলেকোঠায় পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারেন। আবার বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার ও প্রসার এবং নৃতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব বিদ্যায় অনেক অভাবিত আবিষ্কার হতে থাকে। স্যার জর্জ জেমস ফ্রেজার (১৮৫৪-১৯৪১) আধুনিক মানুষের বিভিন্ন আচার-সংস্কার ও বিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ম ও যাদুর ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা করেন। আবার সিগমন্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৯) মনোসমীক্ষণ তত্ত্বের আবিষ্কারের মাধ্যমে মনস্তত্ত্বের ইতিহাসে রীতিমত ঝড় তোলেন। এই দু’জনের আবিষ্কার শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে, বিশেষভাবে কবি-লেখক গোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনায় একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সঞ্চার করে। অপরদিকে ১৯১৭-তে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে নতুন এক জীবনাদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়।  পশ্চিম ইউরোপে তেমনভাবে এই বিপ্লব না ঘটলেও ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানীর সমাজ জীবনের ভিত্তি আমূল পালটে যায়; যার প্রভাব সমগ্র পশ্চিমা সাহিত্যে অবসম্ভাবী হয়ে ওঠে। 

মহাযুদ্ধের চার বছর পর বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি টি. এস. এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) রচনা করেন ‘The Waste Land’ (১৯২২)। নিদারুণ হতাশা, কুৎসিত জীবনধারণের সমারোহ, ক্লেদাক্ত মানসিকতাÑ সবকিছু মিলে মানব ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছিলো যুদ্ধোত্তর যুগের সমাজব্যবস্থা ও চিন্তাধারায়। এক কথায়, সে ছিলো পাশ্চাত্য সভ্যতার এক অন্ধকার অধ্যায়।  ডধংঃব খধহফ-এর মাধ্যমে এলিয়ট তাঁর প্রতিবাদকে বলিষ্ঠ ভাষায় রূপ দিয়েছেন। কবির মনে হয়েছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা এক ভয়াবহ পথে এগিয়ে চলেছে। স্বাভাবিক যৌন জীবনের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই। বন্ধ্যাত্ব দেখা দিয়েছে নর নারীর জীবনে। এই যে বন্ধ্যাত্বের শেষ এখানেই নয়। এর ফলে চিন্তায়, কর্মে, সাধনায় মানুষ তাবৎ মূল্যবোধ হারিয়ে পাশ্চাত্য সভ্যতাকে Waste Land বা পতিত জমিনে রূপান্তরিত করেছে।

What are the roots that clutch, what branches grow

Out of this stony rubbish? Son of man,

You cannot say, or guess, for you know only

A heap of broken images, where the sun beats,

And the dead tree gives no shelter, the cricket no relief,

And the dry stone no sound of water. Only

There is shadow under this red rock,

[Waste Land] 

এ সবই হচ্ছে মহাযুদ্ধের ভয়াবহ পরিণাম। পরবর্তী সময়ে এলিয়ট পাশ্চাত্য সভ্যতার মর্মান্তিক চিত্র আঁকেন ‘Hollow Man’ (১৯২৫)-এ যেখানে নামগন্ধহীন, সৌন্দর্যহীন এক ধূসর জগৎ প্রত্যক্ষ করা যায়। অবশ্য ‘Arial Poems’ (১৯২৭-৩০), ‘Ash Wednesday’ (১৯৩০) এবং ‘Four Quartets’ (১৯৩৬)-এই তিনটি অসামান্য কাব্যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন জিজ্ঞাসা ও বিশ্বাসের ধারাক্রমিক বিবর্তন স্বাক্ষরিত। নৈরাশ্য, সংশয়, আত্মগ্লানিকে জয় করে তিনি আত্মনিবেদনের মাধ্যমে অতীত ও ভবিষ্যতের অন্বয় ঘটান এবং ঈশ্বরের দিকে যাত্রা শুরু করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ডের বেশকিছু কবি যোগ দেয় এবং কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি নিহত হন- যাদেরকে ‘যুদ্ধকবি’ (War Poet) হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ দলের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত উইলফ্রেড ওয়েন (১৮৯৩-১৯১৮)। অন্যান্য কবিদের মধ্যে রুপার্ট ব্রুক (১৮৮৭-১৯১৫), সিগফ্রেড সেশন, এডমুনড ব্লানডেন (১৮৯৬-১৯৭৬), কেইথ ডগলাস, এলাম লুইস (১৯১৯-৪৪), জিলিয়ান গ্রিনফিউ (১৮৮৮-১৯১৫) অন্যতম। এরা যুদ্ধের ভয়াবহতা, দুঃখ, নির্দয়তা, মর্মান্তিক মৃত্যু এবং জাতির স্বার্থে আত্মত্যাগের কথা উচ্চারণ করেন কবিতার ভাষায়।

অপরদিকে বিশ্বযুদ্ধ কালেই কয়েকটি সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা হয় এবং এর ভেতর থেকেই Modernism বা ‘আধুনিকতা’র জন্ম। আমেরিকার কবি এজরা পাউন্ডের (১৮৮৫-১৯৭২) নেতৃত্বে শুরু হয় Imagist Movement। অবশ্য এই আন্দোলনের পথিকৃৎ ছিলেন টি.ই. হিউম।  তবে ১৯১২ থেকে ১৯২২ পর্যন্ত সময়পর্ব প্রতীকী লেবেল আবিষ্কার এবং এজরা পাউন্ডের একাধিপত্যের পর্ব। এই কালপর্বে কবিতার বিরাট বাজার সৃষ্টি হয়; ১০০০-এরও বেশি কবি ২০০০-এরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশ করেন; হ্যারল্ড মনরোর (১৮৭৯-১৯৩২) ‘Poetry Review ও জর্জিয়ান সংকলন ‘The Poetry Bookshop’ প্রকাশিত এবং ডেভনশায়ার স্ট্রিটের প্রেক্ষাগৃহে কবিতা পাঠের আসর অনুষ্ঠিত হয়। এই পর্বেই ১৯১২-তে প্রতিষ্ঠিত হয় শিকাগোর বিখ্যাত ‘Poetry’ পত্রিকা; প্রকাশিত হয় Imagist সংকলনসহ আলোড়ন সৃষ্টিকারী সব পত্রিকা ও সংকলন।  এই ধারার কবিদের মতে, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতি কবিতার উপজীব্য হতে পারে না; কবিতার উদ্দেশ্য হবে কতকগুলো Image উপস্থিত করা।  এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন টি. এস. এলিয়ট, এমি লুই, রিচার্ড অলডিংটন (১৮৯২-১৯৬২), অলডাস হাক্সলি (১৮৯৪-১৯৬৩), এফ. এস. ফ্লিন্টসহ আরো অনেকে। তবে কাব্যগজতে Imagist Movement দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। কেননা এজরা পাউন্ড ছাড়া অন্যরা এ আন্দোলনের নীতি অগ্রাহ্য করেন। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রায় অনেক দূর পর্যন্ত সঞ্চারিত এবং এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ‘Modernism’ বা আধুনিকতার সোপান রূপে চিহ্নিত। এজরা পাউন্ডের ‘Contos’ (১৯২৫-১৯২৮-১৯৪০) নামের কাব্যগ্রন্থটি আধুনিক কবিতার ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ কবিতা এবং একটি মাইফলক হিসেবে অভিহিত। আবার মহাযুদ্ধের দুই বছর পরে প্রকাশিত তাঁর ‘Hugh Selyn Mauberley’ (১৯২০) এবং এলিয়টের ‘The Waste Land’ আধুনিক কবিতার জগতে স্মারক চিহ্ন রূপে পরিচিত। বস্তুত এরা প্রকাশভঙ্গির (Style) অভিনবত্ব, বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সচেতন সংমিশ্রণ, মনস্তত্ত্ব-নৃতত্ত্ব-পদার্থ বিজ্ঞানের প্রভাব, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জীবনের অবসাদ-নৈরাশ্য-অমঙ্গলবোধ, নিখিল নাস্তি, মননধর্মিতা প্রভৃতিকে কবিতায় গুরুত্ব ও প্রাধান্য দেন।

আবার আইরিশ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ও বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯) হলেন আধুনিক কাব্যান্দোলনের অগ্রচারী নায়ক। আয়ারল্যান্ডের জাতীয় পুনরুজ্জীবনের চেতনা বা সামষ্টিক বিজ্ঞানের আকর্ষণে অথবা অন্য কোন দুর্জ্ঞেয় রহস্যে প্রথম জীবনে ইয়েটস সমকালীন জীবনের যন্ত্রবিজ্ঞান শাসিত কদর্যতা থেকে পলায়ন করেছিলেন, নিস্পৃহ মনোভঙ্গিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রেম ও প্রতীকের দুর্গে। ইংরেজি সাহিত্যে ইয়েটসের কৃতিত্ব আয়ারল্যান্ডের লোকগাঁথা ও কাহিনীকে নতুন ছন্দে উপস্থাপন।  আয়ারল্যান্ডের রূপকথা ও ধর্মবিশ্বাসকে তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন। ম্যাজিকের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ছিলো, তবে তার স্বকীয়তা ফুটে ওঠে আয়ারল্যান্ডের রহস্যপুরে। সেজন্য তাকে বলা হয় প্রাচীন আয়ারল্যান্ডের নবীন রূপকার।

I Am of Ireland,

And the Holy Land of Ireland,

And time runs on,’ cried she.

‘Come out of charity,

Come dance with me in Ireland.

[ÔWords For Music PerhapsÕ, Selected Poetry ]

কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালে অকস্মাৎ তিনি সমকালীন বাস্তব জীবনের সম্পর্কে জেগে উঠলেন, তাঁর যেন জন্মান্তর হলো; জীবনের সংঘাত প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি এই পর্বে গোলাপকে প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রতীক রূপে না দেখে বিপ্লব, আদর্শবাদ ও দেশপ্রেমের প্রতীকরূপে দেখেছেন। তিনি জীবনের কোলাহল ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফিরে এলেন। ‘The Wild Swans at Coole’ (১৯১৯), ‘The Tower’ (১৯২৮), ‘The Winding Stair And Poems’ (১৯৩৩)- এই তিনটি শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থে তাঁর এইসব মনোভাবের পরিচয় ও শিল্পদৃষ্টির স্বাক্ষর মুদ্রিত। অবশ্য ইয়েটসের কাব্যধারার পরিবর্তনের পেছনে এজরা পাউন্ডের মতো প্রাজ্ঞ কবির সংস্পর্শ অনেকাংশে দায়ী। পাউন্ডের মাধ্যমেই ইয়েটস পরবর্তী যুগের প্রাণচাঞ্চল্য ও বস্তুগত স্বরূপ নিগূঢ়ভাবে অনুভব করেন।  অন্যদিকে ডি.এইচ.লরেন্স (১৮৮৫-১৯৬০) উপন্যাসের মতো কবিতায়ও বিদ্রোহীভাবের সঞ্চার করেন। তিনি শুধুমাত্র পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে ওঠেননি, প্রজ্ঞাবাদী মননেও তিনি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেন। প্রবাহিত জীবনে আস্থাহীন বুদ্ধিজীবীদের তিনি শোণিত দিয়ে চিন্তা করার (To think with the blood) ও সহজাত প্রবৃত্তি নির্দেশিত জীবনে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।  এছাড়া সমসাময়িক অন্যান্য কবিদের মধ্যেও যুগের নেতিবাদী মনোভাব ও বাণীভঙ্গি লিপিবদ্ধ হতে দেখা যায়। ইংরেজি কবিতার এই প্রসঙ্গ ও প্রকরণ বাংলা কবিতায় প্রবলভাবে পড়ে।

আধুনিক ইংরেজি কবিতায় ফরাসি প্রতীকী কবিদের প্রভাব প্রত্যক্ষ ও গভীর। মূলত ইংল্যান্ডের আধুনিক চেতনার উৎসে ফরাসী প্রতীকবাদ বিদ্যমান। এজরা পাউন্ড ও জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪১) আধুনিক ইংরেজি ভাষার প্রধান দুই পুরুষ যৌবনকালে প্যারিসে নিজস্ব শিল্পকর্মে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন। তাঁরা ফরাসী প্রতীকবাদ ও রূপকল্প দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। ফরাসী প্রতীকী কবিদের মধ্যে স্টেফেন মালার্মে (১৮৪২-৯৮) ও লা ফ্রগ সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। অন্যান্যদের মধ্যে জারার দ্য নেরভাল (১৮০৮-১৯৪৫), রাইনে মারিয়া লিরকে (১৮৭৫-১৯২৬) অন্যতম। এলিয়টের কাব্যে মালার্মে ও লা ফ্রগ এবং ইয়েটসের কবিতায় মালার্মে প্রতীক সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেন। প্রতীকী আন্দোলনের ক্ষেত্রে দুই শক্তিমান অগ্রজ ফরাসী কবি শার্ল বদলেয়ার (১৮২১-৬৭) ও রিমবন্ড র‌্যাবো (১৮৫৪-৯১) বিশেষভাবে অগ্রগণ্য। প্রতীকী কবিরা সমাজ ও নৈতিক প্রসঙ্গ এবং সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব বর্জন করে কবিতার ভিত্তিভূমি তৈরি করেন সৌন্দর্যের সংবেদনা ও শুদ্ধ অনুভূতির উপরে। প্রতীকী কবির যাত্রা তাই ক্ষণিক ও বৈষয়িক জগতের অন্তরালবর্তী সত্যের সংস্থানে, এই জগতের মধ্যেই অদৃশ্য জগতের প্রতিচ্ছায়া, বস্তুর মধ্যেই অরূপের আভাস। বাস্তবপন্থা ও প্রকৃতিপন্থা ক্ষণিক ও সাময়িক; প্রতীক এই সাময়িকতার মধ্যে আবিষ্কার করতে চায় শাশ্বতের প্রতিভাস, অনন্তকে চায় কণার মধ্যে ধারণ করতে।  প্রতীকী আন্দোলন ফ্রান্স থেকে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি ও রাশিয়ায়। বস্তুত আধুনিক ইংরেজি কবিতার পটভূমিকায় ফরাসী প্রতীকী কবিদের উপস্থিতি লক্ষণীয়।

পাশ্চাত্য কাব্যান্দোলনে Imagist I Symbolist Movement-এর স্রোতধারার সাথে অসংখ্য শাখাস্রোত যুক্ত হয়। এগুলো মধ্যে Post-Impressionism, Futurism, Surrealism, Dadaism, Expressionism, Existentialism প্রভৃতি সাহিত্যিক মতবাদ উল্লেখযোগ্য। এইসব আন্দোলনের উৎসমূলে পাশ্চাত্য চিত্রকলার প্রত্যক্ষ প্রভাব সক্রিয়।

চল্লিশের দশকে ইংরেজি কবিতা আবার নতুন মোহনায় বাঁকবদল করে। উত্তর-তিরিশ পর্যায়ের ইংরেজি কাব্যের প্রধান পুরুষেরা হলেন ডব্লিউ. এইচ. অডেন (১৯০৭-৭৩), স্টেফেন স্পেনডার (জ.১৯০৯), ডে লুইস (১৯০৪-৭২) ও লুইস মেকনিস (১৯০৭-৬৩)। এদের কবিতায় এলিয়ট চিত্রিত মৃত পৃথিবী ও বিবশ চেতনার প্রতি তীব্র আক্রোশ ও ঘৃণা প্রকাশিত। এইসব কবি পৃথিবীর হত চৈতনের আশাহত তরঙ্গ থেকে উদ্ভূত, তাই তাঁদের বিশ্ববোধ প্রশান্তিতে স্থিত হতে পারেনি। তাঁরা অন্যায়-অসমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পৃথিবীর সন্তান; কিন্তু তাঁদের চোখে এক নতুন মানববিশ্বের সবুজ স্বপ্ন, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত দেখার গরজে তারা সমাজের বিধিবিধান ও মূল্যবোধের আশ্রয়গুলোকে নির্মমভাবে আক্রমণ করেছেন। আবার এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যে তাঁরা বিশ শতকের সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাপ্রবাহ ও বিশ্লেষণধর্মিতা অবলম্বন করেন; অন্যকথায় মার্কসের সমাজচিন্তা ও ফ্রয়েডের মনস্তত্ত্বে আস্থা রাখেন।  তবে অডেন, স্পেনডার ও ম্যাকনিসের প্রথম যুগের কবিতায় মার্কসবাদের আদর্শ স্বাক্ষরিত হলেও এই তিনজন পরবর্তী সময়ে এ-আদর্শ পরিত্যাগ করেন। কিন্তু তিরিশোত্তর কালে ‘সমাজসচেতন কবি’ বলে তাদের অভিহিত করা হতো।  অবশ্য এ-সময় মার্কসবাদের প্রসারের অন্যতম কারণরূপে চিহ্নিত করা হয় স্পেনের গৃহযুদ্ধকে। এ-যুদ্ধকে কবি-সাহিত্যিকরা ন্যায়-অন্যায়ের পরীক্ষা এবং ইতালি ও জার্মানীর ফ্যাসিবাদ ও নাৎসীবাদের সঙ্গে মার্কসবাদের দ্বন্দ্বরূপে চিহ্নিত করেন। ফলে কাব্যজগতে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ভারতীয় রাজনীতি ও কবিতায় এর প্রভাব দারুণভাবে পরিলক্ষিত হয়।

কালের রূপ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার রূপান্তরও সম্পন্ন হয়ে যায়। বিশ শতকের বিশ্ব ও সমাজ সংগঠন অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ধনবাদী বা Capitalist সমাজব্যবস্থা নামে পরিচিত; আর সমাজতাত্ত্বিকগণ নামকরণ করেছেন ইন্দ্রিয়বেদী বা Sensuous সভ্যতা। বলা বাহুল্য, এই সভ্যতা যন্ত্রভিত্তিক। বিজ্ঞান উদ্ভাবিত এই যন্ত্র যেমন ধনসম্পদ উৎপাদনের ব্যবস্থাগুলোকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত করে চলেছে, তেমনি স্থান ও কালকে জয় করে তা সমগ্র পৃথিবীকেও অবিশ্বাস্য রকমে ক্ষুদ্র করে ফেলেছে। আর এই ক্রমবর্ধিষ্ণু রূপান্তরের অবসম্ভাবী পরিণাম মানুষের চিন্তায় ও প্রচলিত বিশ্বাসে পরিবর্তন, সনাতন মূল্যবোধের ক্ষয় ও নতুনতর আচরণের উদ্ভব ঘটে। ফলে এই সমাজ মানুষকে মানবিক সত্তা থেকে বঞ্চিত ও বিচ্যুত করে তাকে নিছক এক বস্তুতে পরিণত করেছেÑ যার মূল্য ধনোৎপাদনে প্রয়োজনীয় বস্তু বা পণ্য অপেক্ষা কম। সুতরাং এই মানুষকে শোষণে, অত্যাচারে, পীড়নে, অস্বীকারে কোনো বাধা নেই; আর যন্ত্রের যেহেতু কোনো বিবেক নেই, সেহেতু মানুষের প্রতি এবং বিধি ব্যবহারে বিবেকের কোনো দংশন নেই। এমন পরিবেশে ভাল-মন্দ, সুন্দর-কুৎসিত, স্থূল-সূক্ষ্ম ইত্যাদির বিচারও যেনো কেমন হাস্যকর। সবকিছুই অস্তিত্বশীল, অথচ কোনো কিছুরই যেনো কোনো সর্বসম্মত মূল্য নেই। 

জীবনের সমস্ত দিকে সবকিছুকে গ্রাস করে নিয়ে সৃষ্টি হয় এক নৈরাজ্যকর রাজত্ব। এই রাজত্বের চিত্রাবলী প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের কবিতায় অঙ্কিত হয়ে আছে। এই সময়ই ইউরোপ ও আমেরিকা উভয় মহাদেশে আধুনিক কবিতার প্রকৃতি ও প্রবণতার মৌলিক পরিবর্তন ও প্রসার ঘটে। আধুনিক বাংলা কবিতা প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে পশ্চিমের যুদ্ধ-সংঘাত ও আধুনিক কবিতা দ্বারা প্রভাবিত ও সম্প্রসারিত।

ইতিহাসের পটভূমি ও কাব্যপ্রকৃতি বিচারে ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’কে আবু সয়ীদ আইয়ুব (১৯০৬-৮২) কালের দিক থেকে মহাযুদ্ধ পরবর্তী এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত, অন্তত মুক্তিপ্রয়াসী রূপে গণ্য করেছেন।  এই মতটিকে আমরা এই আলোচনায় গ্রহণ করেছি। যদিও মাইকেল মধুসূদন দত্তকে (১৮২৪-৭৩) রবীন্দ্রনাথ আধুনিক বাংলা কবিতার পথিকৃৎ বলেছেন।  অন্যদিকে সৈয়দ আলী আহসানের মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা কাব্যে আধুনিকতার সূত্রপাত করেছেন। 

রবীন্দ্রনাথ ‘আধুনিক সাহিত্য’ (১৯০৭) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়, বিহারীলাল, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টপাধ্যায়, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার, শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, আবদুল করিম, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, যতীন্দ্রমোহন প্রমুখ। মোহিতলাল মজুমদার ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যে’ (১৯৩৬) বঙ্কিমচন্দ্র, বিহারীলাল, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, দীনবন্ধু মিত্র, দেবেন্দ্রনাথ সেন, অক্ষয়কুমার বড়াল, শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে বিষয়ীভূত করেন। আবু সায়ীদ আইয়ুব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ (১৯৪০) এবং বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ (১৯৫৪) সংকলন দুটি শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়ে, শেষ হয়েছে তৎকালীন তরুণতম কবির কবিতার মাধ্যমে। অন্যদিকে দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীপক রায় সম্পাদিত ‘বাংলা আধুনিক কবিতা-১’ (১৯৯২) জীবনানন্দ দাশকে দিয়ে সূচিত হয়েছে। 

রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত তিরিশোত্তর কালের ‘কল্লোল’ (১৩৩০) প্রভৃতি পত্রিকাবাহিত নতুন ভাবধারা ও আঙ্গিকশৈলীর কবিতাকেই আমরা আধুনিক কবিতারূপে চিহ্নিত করছি।

‘আধুনিক’ শব্দটি সময়ের দিক থেকে ক্রম-অগ্রসরমান, ক্রমপরিবর্তমান ও সঞ্চরণশীল। রবীন্দ্রনাথ ‘পাঁজি মিলিয়ে’ আধুনিকতার সীমানা নির্ণয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, “এটা কালের কথা ততটা নয় যতটা ভাবের কথা। নদী সামনের দিকে সোজা চলতে চলতে হঠাৎ বাঁক ফেরে। সাহিত্য তেমনি বারবার সিধে চলে না। যখন সে বাঁক নেয় তখন সেই বাঁকটাকেই বলতে হবে মডার্ন। বাংলায় বলা যাক আধুনিক। এই আধুনিকটা সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।”  এই ‘মর্জি’র সাথে তিনি শাশ্বত গুণের কথা বলেন: “আধুনিক বিজ্ঞান যে নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবকে বিশ্লেষণ করে আধুনিক কাব্য সেই নিরাসক্ত চিত্তে বিশ্বকে সমগ্রদৃষ্টিতে দেখবে, এইটেই শাশ্বতভাবে আধুনিক।”  জীবনানন্দ দাশের (১৮৯৯-১৯৫৬) মত রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত কাছাকাছি: “সব সময়ের জন্যেই আধুনিক-এ রকম কবিতা বা সাহিত্যের স্থিতি সম্ভব। ... মানুষের মনের চিরপদার্থ কবিতায় বা সাহিত্যে মহৎ লেখকদের হাতে যে বিশিষ্টতায় প্রকাশিত হয়ে ওঠে তাকেই আধুনিক সাহিত্য বা আধুনিক কবিতা বলা যেতে পারে।”  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০) আধুনিক কবিকে অনাদি কালের ‘চারণের উত্তরাধিকারী’ এবং আধুনিক কবিতাকে ‘মহৎ কবিতা’ রূপে অভিহিত করেন।  অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪) বিচিত্র দৃষ্টিতে আধুনিক কবিতাকে চিহ্নিত করেন: “আধুনিক কবিতা এমন কোনো পদার্থ নয় যাকে কোনো একটা চিহ্নদ্বারা অবিকলভাবে শনাক্ত করা যায়। একে বলা যেতে পারে বিদ্রোহের, প্রতিবাদের কবিতা, সংশয়ের, ক্লান্তির, সন্ধানের, আবার এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বিস্ময়ের জাগরণ, জীবনের আনন্দ, বিশ্ববিধানে আস্থাবৃত্তি।”  আধুনিক কবি ও কবিতা বলতে অধিকাংশ লেখক রবীন্দ্রোত্তর তথা তিরিশোত্তর কবি ও কবিতার দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। যাকে সমকালে ‘অতি আধুনিক’ বা ‘অত্যাধুনিক’ বাংলা কবিতা বলা হতো। প্রকৃতপক্ষে, আধুনিকতার দুটি অর্থই বর্তমান; এক অর্থে সে সাম্প্রতিক, সমকালীন ও সমসাময়িক; অন্য অর্থে চিরকালীন, শাশ্বত, ভাস্বর। এই অর্থময় আধুনিক বাংলা কবিতার স্রষ্টারা হলেন: জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-৭৬), প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-৮৮), বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে (১৯০৯-৮২), অজিত দত্ত (১৯০৭-৭৯) প্রমুখ।

‘কল্লোল’ পর্বের এই কবিদের লক্ষ্য মূলত দুটি দিকে প্রবাহিত; এক. সচেতনভাবে ‘রবীন্দ্রেতর হওয়া’, দুই. নিজস্ব কাব্যলোক সৃষ্টির প্রচেষ্টা। ‘কল্লোলে’র লেখকদের মানসিকতার পরিচয় মেলে জীবনানন্দ দাশের আলোচনায়: “কল্লোলের লেখকেরা মনে করেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ অনেক সার্থক কবিতা লিখেছেন- কিন্তু তিনি যাবতীয় উল্লেখ্য বিষয় নিয়ে কবিতা লেখবার প্রয়োজন বোধ করেন নাÑ যদিও তাঁর কোনো-কোনো কবিতায় ইতিহাসের বিরাট জটিলতা প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে হয়; তিনি ভারত ও ইউরোপের অনেক জ্ঞাত ও অনেকের মনে শাশ্বত বিষয় নিয়ে শিল্পে সিদ্ধি লাভ করেছেন, কিন্তু জ্ঞান ও অন্তর্জ্ঞানের নানা রকম সংকেত রয়েছে যা তিনি ধারণ করতে পারেননি বা করতে চাননি।”  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সমকালের সাথে রবীন্দ্রনাথের দূরত্ব সম্পর্কে বলেন: “এ-কথা না মেনে তার উপায় নেই যে প্রত্যেক সৎকবির রচনাই তার দেশ ও কালের মুকুর, এবং রবীন্দ্রসাহিত্যে যে-দেশ ও কালের প্রতিবিম্ব পড়ে, তাদের সঙ্গে আজকালকার পরিচয় এত অল্প যে উভয়ের যোগফলকে যদি পরীর রাজ্য বলা যায়, তাহলে বিস্ময় প্রকাশ অনুচিত।”  অন্যদিকে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত রবীন্দ্রদ্রোহের ফলে ‘নতুন পথ’ ও ‘নতুন পৃথিবী’র সন্ধান পেয়েছেন: ‘‘ভাবতুম, রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যের শেষ, তাঁর পরে আর পথ নেই, সংকেত নেই। তিনিই সবকিছুর চরম পরিপূর্ণতা। কিন্তু “কল্লোলে” এসে আস্তে আস্তে সে-ভাবকেটে যেতে লাগল। বিদ্রোহের বহ্নিতে সবাই দেখতে পেলুম যেন নতুন পথ, নতুন পৃথিবী। আরো মানুষ আছে, আরো ভাষা আছে, আছে আরো ইতিহাস। সৃষ্টিতে সমাপ্তির রেখা টানেননি রবীন্দ্রনাথÑ তখনকার সাহিত্য শুধু তাঁরই বহুকৃত লেখনির হীন অনুকৃতি হলে চলবে না। পত্তন করতে হবে জীবনের আরেক পরিচ্ছেদ’’।  আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি কবিতায় ইশতেহার রচনা করলেন:

পাশ্চাত্যে শত্রুরা শর অগণন হানুক ধারালো,

 সম্মুখে থাকুন বসে পথ রুধি রবীন্দ্রঠাকুর,

 আপন চক্ষের থেকে জ্বালিব যে তীব্র তীক্ষè আলো

 যুগ-সূর্য ম্লান তার কাছে। মোর পথ আরো দূর।

[কল্লোল যুগ]

তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের ‘পথ’ অনেক দূরবর্তী বন্দরের দিকে এবং ‘আপন চক্ষের’ আলোয় তারা সেইখানে পৌঁছাতে চান। আর পৌঁছাতে চান বলেই দ্রোহী মনোভাবের প্রতিধ্বনি শোনা যায় বিষ্ণু দে-র কণ্ঠে:

রবীন্দ্রব্যবসা নয়, উত্তরাধিকার ভেঙে ভেঙে

 চিরস্থায়ী জটাজালে জাহ্নবীকে বাঁধি না, বরং 

আমরা প্রাণের গঙ্গা খোলা রাখি, গানে গানে নেমে

 সমুদ্রের দিকে চলি, খুলে দেই রেখা আর রং

 সদাই নূতন চিত্রে গল্পে কাব্যে হাজার ছন্দের

 রুদ্ধ উৎসে খুঁজে পাই খরস্রোত নব আনন্দের।

[‘২৫ শে বৈশাখ’, নাম রেখেছি কোমল গান্ধার]

‘বরীন্দ্রব্যবসা’ ছেড়ে আধুনিকরা ‘সমুদ্রের দিকে’ যাত্রা করেন নতুন দিগন্তের প্রত্যাশায়। এ ক্ষেত্রে বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: “বাঙালি কবির পক্ষে, বিশ শতকের তৃতীয় ও চতুর্থ দশকে, প্রধানতম সমস্যা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে পারস্পরিক বৈসাদৃশ্য প্রচুর- কোনো-কোনো ক্ষেত্রে দুস্তর; দৃশ্যগন্ধস্পর্শময় জীবনানন্দ আর মননপ্রধান অবক্ষয়চেতন সুধীন্দ্রনাথ দুই বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, আবার এ-দু’জনের কারো সঙ্গেই অমিয় চক্রবর্তীর একটুও মিল নেই। তবু যে এই কবিরা সকলে মিলে একই আন্দোলনের অন্তর্ভূত, তার কারণ এঁরা নানা দিক থেকে নতুনের স্বাদ এনেছেন; এদের মধ্যে সামান্য লক্ষণ এই একটি ধরা পড়ে যে এঁরা পূর্বপুরুষের বিত্ত শুধু ভোগ না-করে, তাকে সাধ্যমতো সুদে বাড়াতেও সচেষ্ট হয়েছেন, এঁদের লেখায় যে-রকমেরই যা-কিছু পাওয়া যায়, রবীন্দ্রনাথে ঠিক সে-জিনিসটি পাই না। কেমন ক’রে রবীন্দ্রনাথকে এড়াতে পারবো- অবচেতন, কখনো বা চেতন মনেই এই চিন্তা কাজ ক’রে গেছে এঁদের মনে; কোনো কবি, জীবনানন্দের মতো, রবীন্দ্রনাথকে পাশ কাটিয়ে স’রে গেলেন, আবার কেউ-কেউ তাঁকে আত্মস্থ ক’রেই শক্তি পেলেন তাঁর মুখোমুখি দাঁড়াবার। এই সংগ্রামে-সংগ্রামই বলা যায় এটাকে, এঁরা রসদ পেয়েছিলেন পাশ্চাত্য সাহিত্যের ভা-ার থেকে, পেয়েছিলেন উপকরণরূপে আধুনিক জীবনের সংশয়, ক্লান্তি ও বিতৃষ্ণা। এঁদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্বন্ধসূত্র অনুধাবন করলে ঔৎসুক্যকর ফল পাওয়া যাবে; দেখা যাবে, বিষ্ণু দে ব্যঙ্গানুকৃতির তির্যক উপায়েই সহ্য করে নিলে রবীন্দ্রনাথকে; দেখা যাবে সুধীন্দ্রনাথ, তাঁর জীবন ভুক্ পিশাচ-প্রমথর, রাবীন্দ্রিক কাব্যবিন্যাস প্রকাশ্যভাবেই চালিয়ে ছিলেন, আবার অমিয় চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথেরই জগতের অধিবাসী হয়েও, তার মধ্যে বিস্ময় আনলেন প্রকরণগত বৈচিত্র্যে, আর কাব্যের মধ্যে নানা রকম গদ্য বিষয়ের আমদানি করে। অর্থাৎ এঁরা রবীন্দ্রনাথের মোহন রূপে ভুলে থাকলেন না, তাঁকে কাজে লাগাতে শিখলেন, সার্থক করলেন তাঁর প্রভাব বাংলা কবিতার পরবর্তী ধারায়।”  অর্থাৎ ‘রবীন্দ্রেতর’ হওয়ার সংগ্রামে এইসব আধুনিক কবি রবীন্দ্র-ব্যতিক্রমী মন ও মর্জি, ভাষা ও ভঙ্গির অবলম্বন করেন। এর প্রমাণ তাঁদের প্রাথমিক কাব্যপ্রয়াসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে: জীবনানন্দ দাশের ‘ঝরা পালক’ (১৯২৭) ও ‘ধূসর পা-ুলিপি’ (১৯৩৬); সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘তন্বী’ (১৯৩০); বিষ্ণু দে-র ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ (১৯৩৩); বুদ্ধদেব বসুর ‘বন্দীর বন্দনা ও অন্যান্য কবিতা’ (১৯৩০); প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘প্রথমা’ (১৯৩০) ইত্যাদি।

১৯৩০-এ ‘পরিচয়ে’র প্রথম সংখ্যায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘কাব্যের মুক্তি’ প্রকাশিত হলে আধুনিক কবিদের মধ্যে আধুনিকতার অন্তর্গূঢ় চেতনা ও বহুমাত্রিক ধারণা সঞ্চারিত হয়। এই লেখার মাধ্যমে আধুনিক কবিরা এলিয়ট, পাশ্চাত্যের আধুনিক কাব্য ও কাব্যতত্ত্বের সাথে পরিচিত হন এবং নিজেদের পূর্ব ভাবনা-চিন্তার পুনর্বিবেচনা করেন। এই রচনা থেকেই আধুনিক কবিরা কবিতায় ‘রূপে’র গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে যান। সুধীন্দ্রনাথের মতে, “...ভাবানুষঙ্গ অভিধানের সাহায্যে স্পষ্ট হয় না। কারণ এদের অনিবর্চনীয়তার মূলে শুধু শব্দার্থ নেই, আছে শব্দের অন্তঃশীল আবেগ। সমাবেশ ও ধ্বনিবৈচিত্র্য, এবং ছন্দের শোভনতা। এই গুণসমষ্টির নাম রূপ; এবং রূপের প্রত্যেক অঙ্গ অপরিহার্য। রূপ আর প্রসঙ্গের পরিপূর্ণ সঙ্গমেই কাব্যের জন্ম। তাই কাব্যের ভাষান্তর অসাধ্য; তাই কাব্যের ভাষা আর কথ্যভাষা স্বভাবত স্বতন্ত্র; তাই আধুনিক কাব্যে রূপের এত প্রাধান্য।”  অন্যদিকে তিনি ‘প্রেরণা’র সনাতন ধারণাকে পুনর্মূল্যায়ন করে বলেন, “আধুনিক কবি প্রেরণা মানে বটে, কিন্তু প্রেরণা বলতে সে বোঝে পরিশ্রমের পুরস্কার।”  অর্থাৎ সে মননধারায় স্নাত হয়ে কবিতা সৃজন করবে। কবিতার প্রয়োজনেই সে বিশ্বভ্রমণে বের হবে; “বিশ্বের সেই আদিম উর্ববতা আজ আর নেই। এখন সারা ব্রহ্মাণ্ড খুঁজে বীজ সংগ্রহ না করলে, কাব্যের কল্পতরু জন্মায় না।”  এইভাবে ‘কাব্যের মুক্তি’ রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কবিদের ‘রবীন্দ্রেতর’ হবার সাধনায় উৎসাহ ও সাহস যোগায়; অপরদিকে ‘পাশ্চাত্য সাহিত্যের ভাণ্ডার’ এবং ‘আধুনিক জীবনের সংশয়, ক্লান্তি ও বিতৃষ্ণা’ তাদের স্বতন্ত্র স্বরায়ণের ক্ষেত্রে ‘রসদ’ হিসেবে কাজ করে। ফলে তিরিশোত্তর কবিরা বাংলা কাব্যে নতুন পথ ও নতুন পৃথিবীর স্রষ্টারূপে আত্মপ্রকাশ করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে আধুনিক কবি ও কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নানা সময় নানা মন্তব্য করেন- যেখানে তাঁর কাব্যাদর্শের সাথে নতুনদের সাদৃশ্য অনুপস্থিত। তিনি তরুণদের কখনো স্বাগত জানিয়েছেন, কখনো সমালোচনা করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ‘সর্বমানবের’ ‘চির আধুনিক’ সাহিত্যে বিশ্বাসী। সে কারণে তিনি মনে কারেন: “সাহিত্যের সম্পদ চিরযুগের ভাণ্ডারের সামগ্রী- কোনো বিশেষ যুগের ছাড়পত্র দেখিয়ে সে আপনার স্থান পায় না।”  তবে অনস্বীকার্য, এই নতুন যুগের নতুন মেজাজ ও চরিত্রের সাহিত্য তাকে চিন্তিত করে তোলে; আবার সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর পূর্বতন আদর্শের পুনর্মূল্যায়নে রচনা করেন ‘সাহিত্য’, ‘সাহিত্যের পথে’ ও ‘সাহিত্যের স্বরূপ’ গ্রন্থসমূহ। কিন্তু তিনি এসব গ্রন্থে তাঁর আজন্মলালিত সাহিত্যাদর্শকেই প্রতিষ্ঠা করেন।

রবীন্দ্রনাথ নিজের পরিচয় নিজেই দিয়েছেন ‘আমি জন্ম রোম্যান্টিক’  বলে। আবু সয়ীদ আইয়ুব তাঁকে ‘রোম্যান্টিকতার পরাকাষ্ঠা’  বলেছেন । সে জন্যে রবীন্দ্রকাব্যে সত্য, সুন্দর, স্বপ্ন, কল্পনা, অস্তিবাদ, প্রেরণা, অতিন্দ্রীয় বিশ্বাস, মঙ্গলবোধ ইত্যাদি রোম্যান্টিক (Romantic) গুণাগুণের রূপায়ণ হয়েছে বিস্তৃতভাবে। বিষ্ণু দেণ্ডর মতে, ‘‘রোম্যান্টিকের পরিবর্তন-অভীপ্সা, হৃদয়বৃত্তির সূক্ষ্ম সৌকুমার্য, পেলবতা তাঁরই দান। বড়ো কথা, সৌন্দর্যতত্ত্বের প্রথম পরীক্ষাতেই প্রয়োজন যে নিছক সৌন্দর্যের চেতনা, সেও আমরা রবীন্দ্রনাথেই দেখেছি। ভিক্টোরীয় চরিত্রের বলিষ্ঠ সততা, কর্মের দায়িত্ববোধও বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের রচনা।”  কিন্তু ‘মানসী’ প্রকাশের পর অর্ধ-শতাব্দী গত না-হতেই রবীন্দ্র-কাব্যবিচারে খুব বড় রকমের পটপরিবর্তন দেখা যায়; কাব্যের মানদণ্ড ই যায় পাল্টে। ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম মহাযুদ্ধের পর রোম্যান্টিক মনন ও সংবেদনা, বিচার ও রচনাশৈলী খুব দ্রুত গতিতে অশ্রদ্ধেয় হয়ে পড়ে। বিশ শতকের তৃতীয় দশকের মধ্যভাগে যে-মেজাজ ও রুচি ইংরেজি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার কাছে রবীন্দ্রনাথ অকস্মাৎ অত্যন্ত ছোটো হয়ে যান, অন্যান্য রোম্যান্টিক কবিরা যতোটা হয়েছিলেন তার চেয়েও যেন কিছুটা বেশি।  সে কারণেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ‘পরিশেষ’ (১৯৩২) এর “আগন্তুক” কবিতায়:

কালের নৈবেদ্যে লাগে যে-সকল আধুনিক ফুল

 আমার বাগানে ফোটে না সে।

[‘আগন্তুক’, পরিশেষ]

কিন্তু ‘দানের একান্ত দুঃসাহসে’ তাকে ‘বড়ো কিছু দান’ যে দিতে হবে, সে সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। ফলে তিনি রচনা করেন গদ্যছন্দ ও আটপৌরে জীবন আশ্রিত কাব্যগ্রন্থ ‘পুনশ্চ’ (১৯৩২)। যদিও গদ্যছন্দের সূচনা ‘লিপিকা’ (১৯২২) থেকেই। ‘অসংকুচিত গদ্যরীতিতে কাব্যের অধিকারকে অনেকদূর বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব’Ñ এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর গদ্যছন্দের অবলম্বন। ‘পরিশেষ’ ও ‘পুনশ্চ’- একই বছরে (১৯৩২) প্রকাশিত এই দুটি কাব্যগ্রন্থ রবীন্দ্র-কাব্যের রূপান্তরে বিশেষভাবে স্মরণীয়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায়: “এই গ্রন্থ-দুখানিতে রবীন্দ্রনাথ ভাষা, ধ্বনি ও প্রসঙ্গের দিক দিয়ে যেখানে পৌঁছেছেন, তার পরে আর এগোনো অসম্ভব।”  গদ্যছন্দের বৈচিত্র্য ও সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র নিয়ে এই দুটি কাব্যের ধারাবাহিকতায় রচনা করেন ‘শেষ সপ্তক’ (১৯৩৫), ‘পত্রপুট’ (১৯৩৬) ও ‘শ্যামলী’ (১৯৩৬)। অবশ্য এইসব কাব্যে রবীন্দ্রনাথের নানা রূপ দৃশ্যমান: ‘নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা।’ প্রকৃতপক্ষে, সদাচলিঞ্চু, বৈচিত্র্য সন্ধানী ও বিপুল সৃজনীশক্তির অধিকারী রবীন্দ্রনাথ নিজেকে বারবার ভেঙেছেন, আবার নতুনভাবে গড়েছেন, নতুন কালের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলার চেষ্টাও করেছেন।

তিরিশের দশকে প্রকাশিত তাঁর গদ্যকাব্যগ্রন্থগুলোতে তিনি নবযুগের ধর্ম ও ছন্দের মুক্তির মাধ্যমে তরুণ কবিদের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারপরে ১৯৩৭-১৯৪১ পর্যন্ত লেখা তাঁর শেষ পর্যায়ের কবিতায় তিনি প্রত্যাবর্তন করেন আপন জগতে, যা আজীবনের সাধনায় নির্মিত। আসলে রবীন্দ্রকাব্যে বারবার প্রসঙ্গ ও প্রকরণের নব্যতা ঘটলেও ‘আজন্মলালিত বিশ্বাসের ধ্রুববীজটি’ কোনো না কোনোভাবে বর্তমান থেকেছে। তবে তিনি বুঝেছিলেন জন্মদিনের ধারাকে বহন করে ‘মৃত্যুদিনের দিকে’ চলেছেন, কালের নিয়মেই পুরোনো কবি চলে যাবেন, নতুন কবির আগমন ঘটবে, তার জন্যে ‘পথ ছেড়ে দিতে’ হবে:

সব লেখা লুপ্ত হয়, বারম্বার লিখিবার তরে

  নতুন কালের বর্ণে, জীর্ণ তোর অক্ষরে অক্ষরে

 কেন পট রেখেছিস পূর্ণ করি। হয়েছে সময় 

নবীনের তুলিকারে পথ ছেড়ে দিতে। হোক লয়

 সমাপ্তির রেখা-দুর্গ। নবলেখা আসি দর্পভরে...

[‘লেখা’, পরিশেষ]

ইতিহাসের এই ধর্ম রবীন্দ্রনাথের গভীরভাবে জানা ছিলো বলেই বাংলা কাব্যের পরিবর্তন সত্ত্বেও তিনি নিজ আদর্শচ্যুত হননি। বরং ‘আধুনিক কাব্যে’ সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন। তবে অনস্বীকার্য যে, সামাজিক-রাজনৈতিক-দৈশিক-বৈশ্বিক ও সাহিত্যিক উপপ্লবে রবীন্দ্রনাথের অটুটপ্রায় অস্তিত্ববাদ, শান্তিস্বর্গ, স্থৈর্য ও আত্মপ্রত্যয় ভেঙে যাবার উপক্রম হয় শেষ দিকে। তিরিশোত্তর বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্রীয় প্রবহণগুলি- অনিশ্চয়তা, মানববিচিত্রতা, সংহতি, গদ্য-পদ্যের সমীকরণ প্রয়াস, সমকালীন বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহ, বিশ্বের সঙ্গে একাত্মবোধ তথা বিশ্ব পটভূমিকায় মাতৃসাহিত্যের স্থাপনা, বাস্তবতা, শারীরিকতা, মনস্তত্ত্ব, নিখিলনাস্তি, অমঙ্গলবোধ, নিম্নবিত্তের সম্পর্কে আগ্রহ, আঞ্চলিকতার প্রতি আগ্রহ, সামাজিক সাম্য, অনীশ্বরবোধÑ এইসব কেবলি তাঁর সাহিত্যিক প্রত্যয়ে অস্বস্তির সৃষ্টি করে।  অন্যদিকে রবীন্দ্রোত্তর কবিতায় উল্লিখিত প্রবণতাগুলো অঙ্কিত হতে থাকে নতুন কবিদের হাতে। তবে ‘কল্লোল’ ও ‘পরিচয়’-যুগের এই নতুন কবিরা শিক্ষা পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের পাঠশালাতেই, তাদের চোখ, কান, কণ্ঠ ও মন তৈরি হয়েছিলো তাঁরই ঝরণাতলায়। স্নাতকোত্তর কালে তাঁরা অবশ্য অনুভব করলেন রবীতন্ত্র থেকে মুক্তিলাভের প্রবল তাগিদ, একাধারে স্বতন্ত্রের প্রেরণা এবং ‘আধুনিক’ অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পাশ্চাত্য সাহিত্যের আকর্ষণ।  অর্থাৎ রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক কবিদের ‘রবীন্দ্রেতর’ হবার সাধনা এবং স্বতন্ত্ররূপে আত্মপ্রকাশের প্রেরণা বাংলা কাব্যে সৃষ্টি করে আধুনিতার নতুন এক ধারা।

ভারতবর্ষের জনগণের মৌলিক অধিকার বিপন্ন হবার ফলে যে মর্মস্পর্শী অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাতে জীবনের শেষ দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথকে আলোড়িত করে। ১৩৪৮, ১ বৈশাখে তিনি রচনা করেন ‘সভ্যতার সংকট’। এখানে তিনি বলেন:

সেদিন ভারতবর্ষের জনসাধারণে যে নিদারুণ দারিদ্র্য আমার সম্মুখে উদঘাটিত হল তা হৃদয়বিদারক। অন্ন বস্ত্র পানীয় শিক্ষা আরোগ্য প্রভৃতি মানুষের শরীরমনের পক্ষে যা-কিছু অত্যাবশ্যক তার এমন নিরতিশয় অভাব বোধ হয় পৃথিবীর আধুনিক শাসনচালিত কোনো দেশেই ঘটেনি। অথচ এই দেশ ইংরেজকে দীর্ঘকাল ধরে তার ঐশ্বর্য জুগিয়ে এসেছে। যখন সভ্যজগতের মহিমাধ্যানে একান্তমনে নিবিষ্ট ছিলাম তখন কোনো দিন সভ্য-নামধারী মানব-আদর্শের এত বড়ো নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ কল্পনা করতেই পারিনি; অবশেষে দেখছি, একদিন এই বিকারের ভিতর দিয়ে বহুকোটি জনসাধাণের প্রতি সভ্যজাতির অপরিসীম অবজ্ঞাপূর্ণ ঔদাসীন্য। 

যে ইংরেজ জাতি ও ইংরেজি সাহিত্য একদিন রবীন্দ্রনাথের মন ও মননকে আন্দোলিত করেছিলো, জীবন সায়াহ্নে এসে তাঁর সেই বিশ্বাস ও আস্থা একদম ‘দেওলিয়া’ হয়ে যায়। তবে তিনি মানুষের প্রতি বিন্দু পরিমাণ আস্থাহীন হননি; বরঞ্চ জীবনের শেষ মুহূর্তে ‘মহামানবে’র আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন, বিজয় ঘোষণা করেছেন।

তথ্যসূত্র:

  জে. আইজাকস্, হুমায়ূন কবির (অনূ.), আধুনিক কাব্যের পটভূমি (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮২), পৃ. ১১-৩৫।

  সিদ্দিকুর রহমান, স্মৃতি-সত্তার আলোকে টি. এস. এলিয়ট (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৪), পৃ. ৪০-৪৩। 

 T.S. Eliot, Waste Land, `ª. www.english.illinois.edu /maps/poets/ a_f/eliot/wasteland.htm

  T. E. Hulme Imagist আন্দোলনের মূলনীতি প্রকাশ করেন। এই আন্দোলনের তিনটি নীতি হলো: (১) বস্তুগত বা ভাবগত যে কোন বিষয়ের প্রত্যক্ষ ব্যবহার, (২) এমন কোনো শব্দের ব্যবহার আদপেই না করা বিষয়ের উপস্থাপনায় যা সাহায্য করবে না ও (৩) বাক্-লক্ষণা রীতির পরিবর্তে সঙ্গীতিক ভাষারীতি অনুযায়ী কাব্য রচনা। 

দ্র. জে. আইজাকস্, আধুনিক কাব্যের পটভূমি, পৃ. ৩২-৩৩।

  জে. আইজাকস্, আধুনিক কাব্যের পটভূমি, পৃ. ২৮-৩০।

 F.S. Flint I Ezra Pound  ১৯১৩-এর মার্চে মার্কিন পত্রিকা ‘Poetry’-তে Imagist Movement -এর নীতি প্রকাশ করেন।

  অরবিন্দ পোদ্দার, ইংরেজী সাহিত্য পরিচয় (কলকাতা: পুস্তক বিপণি, ১৯৯৯), পৃ. ১৭০।

  Ezra Pound never shrinks from work... a learned companion and a pleasant one... he is full of the Middle Ages and helps me to get back to the definite and concerted, away from modern abstractions’. Yeats-র কাছ Lady Gragory-এর নিকট তাঁর ঋণের কথা লিখিত একটি পত্রে এভাবে স্বীকার করেন। 

দ্র. Ezra Pound (ed.), Peter Russell (London: Peter Nevill Limited, ১৯৫০), p. 9.

  অরবিন্দ পোদ্দার, ইংরেজী সাহিত্য পরিচয়, পৃ. ১৭১।

  আবদুল মান্নান সৈয়দ, করতলে মহাদেশ (ঢাকা: শিল্পতরু প্রকাশনী, ১৯৯৩), পৃ. ৪১-৪৫।

  অরবিন্দ পোদ্দার, ইংরেজী সাহিত্য পরিচয়, পৃ. ১৭৫। 

  Edward J. Gordon and Others, English Literature (Boston: Ginn and Company), pp. ৭৯২-৮৫২.

  আবু সয়ীদ আইয়ুব, “ভূমিকা”, আধুনিক বাংলা কবিতা (১ম সং; কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯৯), পৃ. ৮।

  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সাহিত্যরূপ”, ‘সাহিত্যের পথে’, রবীন্দ্র রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড (কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৪০২), পৃ. ৫১১।

  সৈয়দ আলী আহসান, আধুনিক বাংলা কবিতা: শব্দের অনুষঙ্গে (ঢাকা: মুক্তধারা, ১৯৯৬), পৃ. ১৯।

  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “আধুনিক কাব্য”, ‘সাহিত্যের পথে’, পৃ. ৪৬৩।

  তদেব, পৃ. ৪৬৯।

  জীবনানন্দ দাশ, কবিতার কথা (৮ম সং.; কলকাতা: সিগনেট প্রেস, ১৪০৫), পৃ. ১১৬।

  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, “কাব্যের মুক্তি”, ‘স্বগত’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধ সংগ্রহ (কলকাতা: হীরেন্দ্র দত্ত ফাউন্ডেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩৯০), পৃ. ১৩-৩২।

  বুদ্ধদেব বসু, “ভূমিকা”, আধুনিক বাংলা কবিতা (কলকাতা: এম. সি. সরকার এ্যান্ড সন্স প্রা.লি., ১৯৬৩), পৃ. আট।

  জীবনানন্দ দাশ, “অসমাপ্ত আলোচনা”, কবিতার কথা, পৃ. ৯০।

  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, “সূর্যাবর্ত”, ‘কুলায় ও কালপুরুষ’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধ সংগ্রহ, পৃ. ৩৬৫।

  অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, কল্লোল যুগ, পৃ. ৮৪।

  বুদ্ধদেব বসু, “রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক”, প্রবন্ধ সংকলন, পৃ. ৭৪-৭৫।

  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, “কাব্যের মুক্তি”, ‘স্বগত’, পৃ. ২৩।

  তদেব, পৃ. ৩০।

  তদেব।

  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সাহিত্যরূপ”, ‘সাহিত্যের পথে’, রবীন্দ্র রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৫১৪।

  ঐ, “অনসূয়া”, ‘সানাই’, রবীন্দ্র রচনাবলী, দ্বাদশ খণ্ড (কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৪০২), পৃ. ১৯৩।

  আবু সয়ীদ আইয়ুব, আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ (পু.মু.; কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯৫), পৃ. ১৯।

  বিষ্ণু দে, “বাংলা সাহিত্যে প্রগতি”, সাহিত্যের ভবিষ্যৎ (কলকাতা: সিগনেট প্রেস, ১৩৫৯), পৃ. ১৪।

  আবু সয়ীদ আইয়ুব, আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ, পৃ. ১৯-২০।

  সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, “ছন্দোমুক্তি ও রবীন্দ্রনাথ”, কুলায় ও কাল পুরুষ, পৃ. ২৫৪।

  আবদুল মান্নান সৈয়দ, “রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক সাহিত্য”, রবীন্দ্রনাথ (১ম পু.মু., ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯২), পৃ. ৬৮-৬৯।

  আবু সয়ীদ আইয়ুব, আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ, পৃ. ২০।

 

  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “সভ্যতার সংকট”, রবীন্দ্র রচনাবলী, দ্বাদশ খণ্ড (কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৪০২), পৃ. ৩০২।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ