ঢাকা, মঙ্গলবার 22 January 2019, ৯ মাঘ ১৪২৫, ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সরাইলে ১০ গ্রামবাসীর চলাচলে ভরসা ৬৫০ ফুট লম্বা বাঁশের সাঁকো!

মোঃ আকরাম হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার প্রত্যন্ত অরুয়াইল এবং পাকশিমুল  ইউনিয়নের ১০ গ্রামের মানুষের প্রতিদিন স্থানীয় ছেতরা নদী পারাপারের একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে ৬৫০ ফুট লম্বা একটি বাঁশের সাঁকো। শুষ্ক মওসুমে এই সাঁকোর ওপর দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও নদীর ওপর কোনো ব্রিজ নির্মাণ হচ্ছে না। 

একটি ব্রিজ নির্মাণের জন্য এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসলেও তারা কোন আশার আলো দেখছেন না। তবে সরাইল উপজেলা প্রকৌশলী জানিয়েছেন প্রকল্প প্রস্তাব উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন আগেই পাঠানো হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ইউনিয়নের রাজাপুর, কাকুরিয়া, চর-কাকুরিয়া, সিঙ্গাপুর, রাণীদিয়া, বানিয়ারটেক, পাকশিমুল ইউনিয়নের পরমানন্দপুর, ষাটবাড়িয়া, হরিপুর, ফতেপুরসহ কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব, কুলিয়ারচর ও বাজিতপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ  অরুয়াইল বাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সাঁকোর ওপর দিয়ে আসা যাওয়া করে।

বিশেষ করে এসব গ্রামের প্রায় সহ¯্রাধিক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকোর ওপর দিয়ে অরুয়াইল আবদুস সাত্তার কলেজ ও অরুয়াইল উচ্চ বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করতে হয়। আসা-যাওয়া করতে শিক্ষার্থীরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। অরুয়াইল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশিকুল ইসলাম আদনান, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়ামিন, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল হাকিম, দশম শ্রেণির হুমায়রা ও নবম শ্রেণির ছাত্রী শ্রাবন্তি জানায়, তাদের সবার বাড়ি রাণীদিয়া ও বানিয়ারটেক গ্রামে। তারা বলে, এই সাঁকোর ওপর দিয়ে চলতে গিয়ে প্রায়ই পায়ে পেরেক ঢুকে যায়। বৃষ্টির মধ্যে চলতে গিয়ে পা পিছলে যায় আবার অনেক সময় পা তরজার ভেতর ঢুকে যায়। শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানান।

এলাকার কাকুরিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী গোলাম আলীর ক্ষোভ ও হতাশার সাথে বলেন, এমন অবহেলিত আর কোনো এলাকা আছে বলে আমার জানা নাই। নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণ করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও পাস করার পর তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়।

এলাকাবাসী জানান, এই বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করে থাকেন। তবে এই সাঁকো নির্মাণে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কোনো ভূমিকা নেই। রাণীদিয়া গ্রামের ১৭টি দরিদ্র পরিবার যৌথভাবে তাদের নিজেদের অর্থে এ সাঁকো নির্মাণ করেন। বিনিময়ে সাঁকো ব্যবহারে তারা জনপ্রতি ২টাকা করে টোল আদায় করেন। ৬৫০ ফুট দৈর্ঘ্য এই সাঁকো নির্মাণে প্রথমে সাড়ে তিন লাখ  টাকা ব্যয় হয় বলে দাবি করেন নির্মাতাদের একজন রহমত আলী। তিনি জানান, এলাকাবাসীর সিদ্ধান্তে তারা নিজেদের অর্থে এই সাঁকো নির্মাণ করেন। তিনি  বলেন, কার্তিক মাসে তারা সাঁকো বসান এবং জৈষ্ঠ মাসে সাঁকো খুলে ফেলেন। প্রতিদিন দেড় দুহাজার টাকা আয় হয় বলে তিনি জানালেও প্রকৃতপক্ষে দৈনিক আয় আরো বেশি বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে অরুয়াইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আসিফ ইকবাল খোকন বলেন, এলাকার হাজার হাজার মানুষের কথা বিবেচনা করে ছেতরা নদীর ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণ খুবই জরুরি। বিশেষ করে এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর দুর্ভোগের জন্য হলেও এখানে ব্রিজটি হওয়া খুবই প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে অরুয়াইল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও সরাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মিজানুর রহমান জানান, তিনি চেয়ারম্যান হওয়ার আগেই তৎকালীন সরাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হালিমের সহায়তায় উল্লেখিত স্থানে একটি ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব আমব্রেলা প্রকল্পভূক্ত করিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন করাতে পারেন নি। সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য এডভোকেট জিয়াউল মৃধাও প্রকল্পটি নিয়ে ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও সফল হতে পারেন নি। তিনি আরো জানান শুধু অরুয়াইল ও পাকশিমুল ইউনিয়নের ৮/১০ গ্রামের মানুষজনই নয় এপথ দিয়ে পাশ্ববর্তী ভৈরব, কুলিয়ারচর ও বাজিতপুর উপজেলার ১০/১৫টি গ্রামের মানুষ এখান দিয়ে চলাচল করে থাকেন। ছেতরা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

এ ব্যাপারে অরুয়াইল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বলেন, ব্রিজটি খুবই জরুরি। অরুয়াইল ও পাকশিমুল ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এ পথ দিয়ে চলাচল করে। মানুষের কষ্টের শেষ নাই। এখানে একটি ব্রিজ হলে অরুয়াইল বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। ছেতরা নদীতে ব্রিজ নির্মাণ এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি। এ ব্যাপারে অরুয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেনের সাথে যোগাযোগের জন্য তার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। 

এ ব্যাপারে সরাইল উপজেলা প্রকৌশলী ইমদাদুল হক বলেন, বৃহত্তর কুমিল্লা প্রজেক্টে এ ব্যাপারে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ