ঢাকা, বুধবার 23 January 2019, ১০ মাঘ ১৪২৫, ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চলে গেলেন গানের মানুষ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

স্টাফ রিপোর্টার : চলে গেলেন গানের মানুষ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। সুরের মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নিলেন বরেণ্য সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল। আজ বুধবার তাকে মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আফতাবনগরের বাসায় হার্ট অ্যাটাক হলে বুলবুলকে মহাখালীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে গীতিকার কবীর বকুল জানান। একুশে পদক পাওয়া এই গানের মানুষটির বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি হৃদযন্ত্রের জটিলতায় ভুগছিলেন। হার্টে ব্লক ধরা পড়ায় গতবছর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে তার অস্ত্রোপচারও করা হয়েছিল।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা বুলবুলের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করলে গতকাল পরিবারের সদস্যরা বুলবুলের মরদেহ নিয়ে যান আফতাবনগরের বাসায়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই গীতিকার- সুরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, বুলবুলের মরদেহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমঘরে রাখা হয়। বুধবার বেলা ১১টায় তার কফিন নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের আগে এই মুক্তিযোদ্ধার প্রতি জানানো হবে রাষ্ট্রীয় সম্মান। বুলবুলের ছেলে সমীর আহমেদ জানান, বুধবার জোহরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে তার বাবার জানাযা হবে। আসরের পর মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
দীর্ঘ চার দশকের ক্যারিয়ারে দুইশর বেশি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে গেছেন তিনি। ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্যর মত দেশাত্মবোধক গানে তার দেওয়া সুর বাংলাদেশের মানুষের বুকে চিরদিন বাজবে।
মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল: ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন মাত্র ১৫ বছর বয়সে। তখন তিনি ঢাকার আজিমপুরের ওয়েস্টটেন্ট হাইস্কুলের ছাত্র।
গানের ভুবনে চার দশক: ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ সিনেমায় সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন বুলবুল। এরপর আমৃত্যু তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন সংগীতের সাধনায়। বেলাল আহমেদের পরিচালনায় ১৯৮৪ সালে নয়নের আলো চলচ্চিত্রের সংগীতায়োজন করেন বুলবুল। ওই সিনেমার জন্য তার লেখা ‘আমার সারাদেহ খেয়োগো মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমি তোমার দুটি চোখের দুটি তারা হয়ে’ গানগুলো সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এর পরের চল্লিশ বছরে মরনের পরে, আম্মাজান, প্রেমের তাজমহল, অন্ধ প্রেম, রাঙ্গা বউ, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, পরেনা চোখের পলক, তোমাকে চাই, লাভ স্টোরি, ভুলোনা আমায়, আজ গায়ে হলুদ, লাভ ইন থাইল্যান্ড, আন্দোলন, মন মানে না, জীবন ধারা, সখি তুমি কার, হুলিয়া, অবুঝ দুটি মন, লক্ষ্মীর সংসার, মাতৃভূমি, মাটির ঠিকানাসহ দুইশ শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন বুলবুল।
প্রেমের তাজমহল সিনেমার জন্য তিনি ২০০১ সালে এবং হাজার বছর ধরে সিনেমার জন্য ২০০৫ সালে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। দেশের সংগীত অঙ্গনে অবদানের জন্য ২০১০ সালে সরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে একুশে পদকে ভূষিত করে। চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত আয়োজনের পাশাপাশি দেশের সমকালীন শিল্পীদের নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করেছেন বুলবুল। তার কথা আর সুরের গান নিয়ে সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আবদুল হাদি, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনক চাঁপাসহ দেশের বহু জনপ্রিয় শিল্পীর অ্যালবাম বের হয়েছে।
কালজয়ী বিভিন্ন গানের সুরস্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে শোক, শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন তার দীর্ঘকালের সহকর্মীরা। তার মৃত্যুতে সঙ্গীতাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার আফতাবনগরের বাসায় ছুটে আসেন অনেকে। আসেন কণ্ঠশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ, অ্যান্ড্রু কিশোর।
কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, চলে গেলেন আমাদের সঙ্গীতের মহাজন। আমি যদি বলি এই হার্টের ৫টা ভেসেল, তবে আজ সেই ৫ ভেসেলের একটি চলে গেল। সুরের জগতে অনেক দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার।
গীতিকবি ফরাজী বলেন, বাংলা গানকে অন্য এক উচ্চমাত্রা তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন৷ দেশাত্মবোধক গানের আইকন ছিলেন বুলবুল।
গীতিকার কবির বকুল বলেন, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল একজন বড় মাপের মানুষ ছিলেন। সুরস্রষ্টা ও গীতিকার এ মানুষটি দেশের জন্য কতটা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, তার দেশপ্রেমের গানগুলোই তা প্রমাণ করে।
কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন বলেন, তার শেষ জীবন ছিল ভীষণ কষ্টের। শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি শেষ জীবনে প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি যেন আজ সব কিছু থেকে মুক্তি পেয়ে গেলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ