ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 January 2019, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নজরুল পলিটিসিয়ান নন  ছিলেন স্টেটসম্যান

 

শফি চাকলাদার:

বিচারক! তব ধর্মদণ্ড ধরো,

ছোটদের সব চুরি করে আজ বড়রা হয়েছে বড়

যারা যত বড় ডাকাত-দস্যু জোচ্চোর দাগাবাজ

তারা ততো বড় সম্মানী গুণী জাতিসংঘেতে আজ।

স্টেটসম্যান ছিলেন বলেই তো নজরুল সত্যকে এমন করে বলতে পেরেছেন।

নজরুল সত্যিই কি রাজনীতিবিদ ছিলেন? আমার প্রশ্নটা তো এটাই- সত্যিই নজরুল রাজনীতিবিদ ছিলেন কিনা? এটা সর্বজনবিদিত যে, রাজনীতির সাথে আরো একটি শব্দ আছে, যা পাশাপাশি চলে। কিন্তু বৈশিষ্ট্য অনেক তফাৎ। রাজনীতির পরিভাষা দুটো? Politics এর সাথে জড়িত তাদের Politician অথবা রাজনীতিবিদ বলা হয়। যারা নীতির প্রশ্নে বাচবিচার না করে যে ব্যক্তি কেবলমাত্র জীবিকারূপে রাজনীতি চর্চা করে আর STATESMAN যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় নিযুক্ত অত্যন্ত দায়িত্ববান। এর কোনটা নজরুলের সাথে যায়। বলবো দ্বিতীয়টি। নজরুল এক সময় রাজনীতির সঙ্গে সময় ব্যয় করেছেন। নির্বাচনও করেছেন। ১৯২৬ সালে ঢাকা বিভাগ (ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ) কেন্দ্রীয় আইনসভার দুজন মুসলমান সদস্য প্রেরণের জন্য। নজরুল স্বরাজ দলের হয়ে দাঁড়িয়ে ভালোভাবেই পরাজিত হয়েছিলেন। এরপর নজরুল আর এ লাইনে ছিলেন না। কমরেড মুজফফর আহমদ একবার নজরুলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রাজনীতিতে যোগ দিবেন না। নজরুল জবাব দিয়েছিলেন, তাই যদি না দেব তবে ফৌজে যোগ দিয়েছিলাম কেন? নজরুল গণতন্ত্র নিয়ে ভাবতেন। নজরুল শ্রমিক, জেলে, নিপীড়িতদের নিয়ে ভাবতেন। দরিদ্র নিয়ে ভাবতেন। কিভাবে তাদের জীবন-যাত্রায় কষ্ট থেকে রেহাই দেয়া যায়, এসবই ছিল নজরুলের ভাবনার আদি-অন্ত এবং এদের মঙ্গল করতে নজরুল যে পরিশ্রম দিয়েছেন তার সাথে সাহায্যকারী খুব একটা কেউ ছিলেন না। সুবিধাবাদির সংখ্যা সব সময় মেজরিটি ছিল। তবে আপোসহীন ছিলেন। জেল খেটেছেন। তিনি ছিলেন একাই একশ। আমি এখানে কিছু নজরুল কবিতা, প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি তাতে স্পষ্ট বুঝা যাবে নজরুল পলিটিসিয়ান ছিলেন না, নজরুল ছিলেন দারুণ একজন স্টেটসম্যান। আর স্টেটসম্যানরা পথ দেখান, কোন পথে কিভাবে অগ্রসর হলে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে। কোন লোভ বা পদ পাবার লোভ তাদেরকে টলাতে পারে না। উন্নয়ন করা ভালো কথা খাঁটি কথায় তাদের পাওয়া যায়। আর রাজনীতিবিদরা স্টেটসম্যানদের সেই দেখানো পথে এগিয়ে চলেন। নজরুল তো তেমনি একজন সৎ, নিষ্ঠাবান, সাহসী, দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তাই তিনি রাজনীতি করতেন না বরং রাজনীতি বুঝতেন। রাজনীতিকরা মানুষদের সৎপথ দেখাতে ব্যস্ত থাকবেন। তার কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প, চিঠিপত্র উপন্যাসে এরই ধ্বনি শোনা যেত। তিনি অঙ্গুলি তুলে ভুলটা দেখিয়ে দিতেন। ‘নবযুগ’ পত্রিকার প্রবন্ধগুলো ‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থের কবিতাগুলো তো তারই প্রমাণ। ‘লীগ অব নেশন’ কবিতাটি পড়লেই বুঝতে পারা যায় নজরুল কতটা রাজনীতি এবং রাজনৈতিক চরিত্রগুলো বুঝতেন। পশুদের বৈশিষ্ট্যের সাথে দেশের বৈশিষ্ট্যকে তিনি তুলনা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন কোন দেশের বৈশিষ্ট্য কোন পশুর বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে। এ এক অবাক করা রাজনীতির চরিত্র-ধরার কবিতা। দেখা যাক, নজরুল কিভাবে কোন পশুকে কোন দেশের সঙ্গে বৈশিষ্ট্যে মিল রয়েছে- 

সিংহ = ইংরাজ। ভল্লুক = রুষিয়া। শিবা = গ্রীস। হস্তী = ভারতবর্ষ। হাঙর = ইটালি। হায়েনা = আমেরিকা। বাঘ = ফ্রান্স। নেকড়ে = অস্ট্রিয়া। ঈগল = জার্মানি। 

কবিতাটি ৪ লাইন করে ২১ স্তবকের। প্রয়োজনীয় কিছু স্তবক উদ্ধৃত করছি। এর থেকেই বুঝে নেয়া সহজ হবে-

* বসেছে শান্তি-বৈঠকে বাঘ,

সিংহ, হাঙর, নেকড়ে।

বৈষ্ণব গরু, ছাগ, মেষ এসে

হরিবোল বলে দেখরে॥

শিবা, সারমেয়, খটাস, শকুনি-

দু’নয়ন লবণাক্ত

কেঁদে কয়, ‘দাদা, নামাবলী নেবো

আর রবো নাকো শাক্ত।

পশুরাজ ক’ন, ‘পশুদল শোনো

 শোনো মোর বাণী স্বস্তির।’

বাঘা কয়, ‘প্রভু! দন্ত বেজায়

বাড়িয়া উঠিছে হস্তীর।’

 

হাঙর কহিল, ভালুক মামা যে

ক্রমেই আসিছে রুষিয়া।

প্রভু কন, আর কটা দিন ব্যাটা

বাঁচিবে আমড়া চুষিয়া।

হাড়গোড়-ভাঙা ঈগল পক্ষী

কহিল পক্ষ ঝাপটি,

প্রভু, তব পিছে চাপকান-ঢাকা

আফগান মারে ঘাপটি।

 

প্রভু ক’ন, ওরি ভাবনায় বাবা

ধরেছে রক্ত-আমেশা!

গোস্ত খাওয়ায়ে দোস্ত করিতে

তাই তো চেষ্টা হামেশা।

 

সাত হাত দাঁত বের করে এলো

এমন সময় হস্তী,

শুন্ড বুলায়ে মুন্ডে কহিল

‘কর মোরও সাথে দোসতী’!

 

 ‘ রে গজমুর্খ! বলি প্রভুপাদ

পশুরাজ ওঠে গর্জি

‘কার মর্জিতে তুই এলি হেথা

চিড়িয়াখানারে বর্জি।’

 

শকুনি, খটাস, শিবা, সারমেয়

তুলিল ভীষণ কলরোল

ভক্ত প্রভুর তুলি পশুদল

বলে, ‘বল হরি হরিবোল!”

নজরুল এই কবিতা লিখে বুঝাতে চেয়েছেন, রাজনীতি তিনি বুঝেন এবং রাজনীতি তিনি কেন করেন না। এই ‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থটি প্রকাশ পায় ১৯৩১ সালে। এর বহু আগেই তিনি রাজনীতিতে যতটুকুই সংশ্লিষ্ট ছিলেন তা থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন। নজরুল একজন সৈনিক ছিলেন। তিনি একটি কবিতাতে (আল্লাহর রাহে ভিক্ষা দাও) (ফি সাবিলিল্লাহ) বলেছিলেন ‘যাহারা বুদ্ধিজীবী, সৈনিক হবে না তাহারা কভু’। সৈনিক অর্থাৎ তারা দেশকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়ে থাকে। এ কারণেই নজরুল রাজনৈতিক অনাদর্শ চতুষ্পার্শে লক্ষ্য করে তার থেকে সম্পূর্ণ সরে আসেন এবং পরবর্তীতে নজরুলের সমস্ত লেখা এমনকি পূর্ববর্তী লেখাতেও অনাদর্শিক কিছুই ছিল না। আদর্শিক ছিলেন বলেই তিনি ‘স্টেটসম্যান’ ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তি নন। ‘ডোমিনিয়ন স্টেটাস’-এ নজরুল বলেন,

রাজা শুধু রাজাই রবেন/পগার-পারে নির্বাসন,

রাজ্য নেবে দু’ভাই মিলে/দুর্যোধন আর দুঃশাসন॥

অন্ধ ধৃত রাষ্ট্র রবে/ সিংহাসনে মাত্র নাম।

 কোঁৎকা যাবে, রইবে শুধু/ঠোঁটকা খানিক পাত্র ঘাম॥

হিন্দু পুরানের কাহিনীও এনে জড় করেন নজরুল তার লেখনীতে। যার ফলে রাজনীতি ও স্টেটসম্যানশিপের পার্থক্যটা সকল সময়ে বুঝাতে সচেষ্ট ছিলেন। ‘নবযুগ’-এর রচনাগুলো ‘ধূমকেতু’র লেখাগুলো থেকে ফুটে উঠেছে নজরুল লোভী নয়, নজরুল আদর্শিক। সংস্কার মুখ্য কবিতা ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’তে নজরুল যা তখনকার সমাজে দেখেছেন তারই একটি রূপ উইট এ- হিউমারকে মাথায় রেখে বলে গেছেন স্পষ্ট কথাগুলো। আমাদের বর্তমান সমাজেও কি এই কবিতাটির মূল্য কমে গেছে? মোটেও না। কিম্বা ‘রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স, ‘সাহেব ও মোসাহেব’ এর লাইনগুলো তো আজো উড়ে যায়নি। বিখ্যাত কবিতা ‘সাইমন কমিশনের রিপোর্ট প্রথম ভাগ ভারতের যাহা দেখিলেন এবং দ্বিতীয় ভাগ ভারতকে যাহা দেখাইলেন’ নজরুল যেভাবে উইট এন্ড হিউমারকে সাথে করে সাইমন কমিশনের রিপোর্ট-এর সমালোচনা করেছেন তা একজন সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতার হত না, নজরুলই এমনটা করেছেন। কারণ নজরুল দেশকে ভালোবেসেছিলেন। আদর্শ তৈরি করে সেখানে উচ্চ শিরে দাঁড়িয়ে। কারণ নজরুল তো বলেন, ‘যে মুসলমানের ক্ষাত্র শক্তি নাই, সে মুসলমান নয়। যে ভীরু সে মুসলমান নয়’ এবং নজরুলই চিহ্নিত করে বলেন, ‘সাহিত্যের আসর যে পলিটিক্যাল আখড়ার চেয়েও নোংরা তা কে জানত।

(বড়র পিরীতি বালির বাঁধ)। এই প্রবন্ধতেই নজরুল আরো বলেন, কবিগুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্যপঞ্জীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তাঁদের কাছ থেকে টুপি আর চাপকান চায় না। 

চায় মাঝে মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গির সুর শুনতে, ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বুলবুলির সুর।

এতেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল যারা মনে করেন, তারা সাহিত্যসভায় ভিড় না করে হিন্দুসভারই মেম্বর হন গিয়ে।’...

“আরো একটা কথা। যেটা সম্বন্ধে কবিগুরুর একটা খোলা কথা শুনতে চাই।

ওরা আমাদের উদ্দেশ্য করে আজকালকার লেখাগুলোর সুর শুনে মনে হয়, আমাদের অভিশপ্ত জীবনের দারিদ্র নিয়েও যেন তিনি বিদ্রƒপ করতে শুরু করেছেন। আমাদের এই দুঃখকে কৃত্রিম বলে সন্দেহ করবার প্রচুর ঐশ্বর্য তার আছে, জানি এবং এও জানি, তিনি জগতের সবচেয়ে বড় দুঃখ ঐ দারিদ্র ব্যতীত হয়তো আর সব দুঃখের সাথেই অল্প-বিস্তর পরিচিত। তাই এতে ব্যথা পেলেও রাগ করিনি।

কী ভীষণ দারিদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করে অনশনে অর্ধশনে দিন কাটিয়ে আমাদের নতুন লেখকদের বেঁচে থাকতে হয়, লক্ষ্মীর কৃপায় কবি গুরুর তা জানা নেই। ভগবান করুন, তাকে যেন জানতে না হয়। কবিগুরু কোনে দিন আমাদের মত সাহিত্যিকের কুটিরে পদার্পণ করেননি, হয়তো তার মহিমা ক্ষুণœ হতো না তাতে, নইলে দেখতে পেতেন, আমাদের জীবন যাত্রার দৈন্য কত ভীষণ। এই দীন-মলিন বেশ নিয়ে আমরা আছি দেশের একটেরে আত্মগোপন করে। দেশে দেশে প্রোপাগা-া করা তো দূরের কথা, বাড়ি ছেড়ে পথে দাঁড়াতে লজ্জা করে। কিছুতেই ছেঁড়া জামার তালিগুলোকে লুকাতে পারিনি। ভদ্র শিক্ষিতদের মাঝে বসে সর্বদাই মন খুঁত খুঁত করে, যেন কত বড় অপরাধ করে ফেলেছি। বাইরের দৈন্য-অভাব যত ভিতরে ভিতরে চাবকাতে থাকে, তত মনটা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে থাকে।..

‘তাঁর কাছে নিবেদন, তিনি যত ইচ্ছা বাণ নিক্ষেপ করুন, তা হয় সইবে, কিন্তু আমাদের একান্ত আপনার এই দারিদ্র-যন্ত্রণাকে উপহাস করে যেন আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে না দেন। শুধু ওই নির্মমতাটাই সইবে না।’

সাহিত্য রাজনীতি কোন অংশেই রাজনীতি থেকে কম নয়। এই রকম কার্যকলাপ লক্ষ্য করে নজরুল তার ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ লিখতে পারলেন এদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করে-

রবির শিখা ছড়িয়ে পড়ে দিক হতে আজ দিগন্তরে,

 সে কর শুধু পশল না মা অন্ধকারার বন্ধ ঘরে।

গগন পথে রবি-রথের সাত-সারথি হাঁকায় ঘোড়া,

মর্তে দানব মানব-পিঠে সওয়ার হয়ে মারছে কোঁড়া।

এটা লক্ষ্য করা যায় নজরুল জন্ম মৃত্যু বার্ষিকীতে আলোচনায় বক্তারা রবীন্দ্রনাথ যে নজরুলের ধূমকেতুতে আশীর্বাদ করেছিলেন কিন্তু আলোচনায় কখনো রবীন্দ্রনাথের প্রতি রবীন্দ্র-কারণেই নজরুলের ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ থেকে কিছু বলেন না। কারণ হয়তোবা আলোচকরা সাহিত্য-রাজনীতি পছন্দ করেন সত্যকে নয়।

‘জন-সাহিত্য’তে নজরুলের যে বাণী পাওয়া যায় তা একজন নির্ভেজাল স্টেটসম্যান-এর কাছ থেকেই পাওয়া যায়, এমন বাণীর জন্য যে কোন জাতি গর্ববোধ করতেই পারে-

‘নিজের কওমের যদি মঙ্গল করতে চাই, তবে তার জন্য অপর কাউকে গাল দেয়ার দরকার পড়ে না। যারা অপরকে গাল দিয়ে ‘কওম’ ‘কওম’ করে চিৎকার করে, তারা ঐ এক পয়সায় মক্কা-মদিনা দেখানেওয়ালাদেরই মত। তারা কওমের জন্য চিৎকার করতে করতে হয়ে যান মন্ত্রী, আর ত্যাগ করতে করতে বনে যান জমিদার। কওমের খেদমত করতে করতে কওম যাচ্ছে গরিব হয়ে, আর গড়ে উঠেছে নেতাদের দালান-ইমারত। হযরত ওমর, হযরত আলি এঁরা অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছেন; কিন্তু নিজেরা কুঁড়ে-ঘরে থেকেছেন, ছেঁড়া কাপড় পরেছেন, সেলাই করে, কেতাব লিখে, সেই রোজগারে দিনপাত করেছেন। ক্ষিধেয় পেটে পাথর বেঁধে থেকেছেন; তবু রাজকোষের টাকায় বিলাসিতা করেননি। এমন ত্যাগীদের লোকে বিশ্বাস করবে না কেন?

কওমের সত্যিকার কল্যাণ করতে হলে ত্যাগ করতে হবে হযরত ইব্রাহিমের মত।’

স্বাধীনতা চাই। আর পরাধীন নয়। পরাধীন হয়ে মনুষ্যত্বকে জলাঞ্জলি আর কতকাল? তাই নজরুল চাইলেন পূর্ণ স্বাধীনতা। ‘ধূমকেতু’র পথ’-এ নজরুল বলেন, ‘অনেকেই লোভের বা নামের জন্য মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনে নেমেছিলেন। কিন্তু আত্ম-প্রবঞ্চনা নিয়ে নেমেছিলেন বলে অন্তর থেকে সত্যের জোর পেলেন না, আপনি সরে পড়লেন। রবীন্দ্র-অরবিন্দ-ভক্তদের মধ্যেও ঐ একই প্রবঞ্চনা-ফাঁকি এসে পড়েছে। এরা অন্ধভক্ত, চোখওয়ালা ভক্ত নয়, বীরু ভক্ত নয়। এরা বুঝেও বুঝে না যে, পূজার নামে এরা তাদেরকে অপমান করছে, বড় করবার নামে তাদের লোকচক্ষুতে আরো খাটোই করে তুলছে। এদের এতটুকু দুঃসাহস নেই যে, যেটুকু বুঝতে পারছে না। সেটুকু ‘বুঝতে পারছি না’ বলে বুঝে নিতে, পাছে তার গুরুর কাছে সে কম বুদ্ধিমান হয়ে পড়ে বা গুরুর রোষদৃষ্টিতে পড়ে। এসব অন্ধলোক দিয়ে কোনো কাজ হবে না। কেননা, অন্তরে মিথ্যা আর ফাঁকি নিয়ে কাজে নামলে কাজেও মস্ত ফাঁক পড়ে যায়। যাঁকে বুঝি না, যার মত বুঝতে পারি না, তার মুখের সামনে মাথা উঁচু করে বলতে হবে যে, আপনার মত বুঝতে পারছি নে বা আপনার এ-মত এই এই কারণে ভুল। তা যিনি সত্যকার দেবতা, তিনি কখনই রুষ্ট হবেন না, বরং তোমার সরলতা ও সত্যপ্রিয়তার দুঃসাহসিকতার জন্য শ্রদ্ধাই করবেন। বিদ্রোহ মানে কাউকে না-মানা নয়, বিদ্রোহ মানে যেটা বুঝিনা, সেটাকে মাথা উঁচু করে ‘বুঝি না’ বলা।’

নজরুল অবশেষে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। ‘ধূমকেতু’র পথ’এ নজরুলই প্রথম স্বাধীনতার কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন এই ভাষায়-

‘সর্বপ্রথম, ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।

স্বরাজ-টরাজ বুঝিনা, কেননা, ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন, ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করছেন, তাদেরে পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুটলি বেঁধে সাগর-পারে পাড়ি দিতে হবে প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদেরও এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।

পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।’

নজরুলের এই পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ঘোষণা প্রকাশ পায় ‘ধূমকেতু’ ১৯২২ এর ১৩ অক্টোবরে। অপরদিকে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন আহমেদাবাদে মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসের যৌথ সম্মেলন ৩০ ডিসেম্বর ১৯২১ মুসলিম লীগের মঞ্চ থেকে সভাপতির ভাষণে উর্দু কবি হযরত ফজলুল হাসান মোহানী (১৮৭৮-১৯৫১) সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন, “ Everyone of us knows that the word Swaraj has been definitely left vagae and undefined in the creed of the Congress. The object of it has been that if the Khilafat and the Punjab wrongs are settled on the lines of our demands that Swaraj within the British Empire will be cansidered sufficient, otherwise efforts will be directed towards the attainment of complete independenee” এই ঘোষণা গান্ধীসহ মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যান হয়। এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। রায়ে ১১ই জুলাই ১৯২২ তার যাবজ্জীবন কারাদ- হয় যদিও শাস্তি মৃত্যুদ- ছিল। পরাধীন ভারতে এমন দুটি স্বাধীনতা ঘোষণার সাথে অপর একটি স্বাধীনতা ঘোষণার কথা অমর হয়ে থাকবে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সেই অসাধারণ স্বাধীনতার ভাষণটি দেন রেসকোর্স ময়দান ঢাকা। শেখ মুজিব দ্ব্যার্থ কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন উদাত্ত কণ্ঠেÑ

“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা’। এই ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃঙ্খল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।... রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’

এবার ২০১৮ বঙ্গবন্ধুর জন্ম দিবসে ঢাকার কোন এক চ্যানেল থেকে এক অনুষ্ঠানে (মিডিয়া চ্যানেলে) আলোচকরা বঙ্গবন্ধুর জীবন সংগ্রামের রবীন্দ্রনাথের মিলন ঘটান। তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ বঙ্গবন্ধুর মতো কোন সংগ্রামটি করেছিলেন? বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের সাথে তো নজরুলের সংগ্রামী জীবনের মিল পাওয়া যায়Ñ দুজনেই স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন। অথচ ইতিহাস-বিকৃতকাব্য আলোচকরা এমন আলোচনাই করলেন। তারা কি জাতীয় কবির জীবনী কখনো পড়েছেন বা জানেন?

নজরুল স্টেসম্যান এটাই আমি বলতে চাই এবং আবারও বলতে চাই নজরুল রাজনীতিক নন। নজরুল তার এক প্রবন্ধে বলেন, ‘নিজেরা সাততলা দালানের আশ্রয়ে থেকে নিরাশ্রয় জনগণের জন্য কাঁদলেÑ তা কখনো তাদের হৃদয় স্পর্শ করে না।” অন্যত্র বলেন, ‘লিডারের কাছে শক্তি ভিক্ষা করো নাÑ আল্লাহ এতে নারাজ হনÑ শক্তি ভিক্ষা করো একমাত্র আল্লাহর কাছে। জয়ধ্বনি মহিমা কীর্তন করো একমাত্র আল্লাহর) আল্লাহর পথে আত্মসমর্পণ হইতে পারে অশিক্ষিত সে, কিন্তু ইহার প্রাণ তোমার চেয়ে অনেক বড়, সে প্রাণে বিরাট বিপুল শক্তি মিশ্র সুপ্ত হইয়া রহিয়াছে যদি পারো সেই শক্তিকে জাগাও।) উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন।

আমরা দেশ সেবক চিনিব ত্যাগে, বক্তৃতায় নয়।) সত্য শিক্ষা।

এরকম শত শত বাণী যার লেখায় তিনিই তো স্টেটসম্যান। তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

নজরুল দৃপ্ত প্রত্যয়ে বলেনÑ বিখ্যাত ‘শিখা’ কবিতায়Ñ

যে হাতে পাইত শোভা খর তরবারি

সেই তরুণের ৃহাতে ভোট-ভিক্ষা ঝুলি

বাঁধিয়া দিয়াছে হায়! রাজনীতি ইহা!

পলায়ে এসেছি আমি লজ্জায় দু’হাতে

নয়ন ঢাকিয়া! যৌবন এ লাঞ্ছনা

 দেখিবার আগে কেন মৃত্যু হইল না?

‘আজাদ’ কবিতায় নজরুল আবারও বলেনÑ

হায় গণ-নেতা ভোটের ভিখারি নিজের স্বার্থ তরে

জাতির যাহারা ভাবী আশা, তারে নিতেছ খরিদ করে।

শুধু নেতা হওয়াই উদ্দেশ্য। তাই দল করতে হবে। সে দল যে কজনেরই হোক না। শুধু লোভ আর লোভÑ ‘অগ্রনায়ক’ কবিতায় তাই নজরুল ক্ষোভ প্রকাশ করেনÑ

সবাই মোড়ল, সবাই শুনিবে আপন জয়ধ্বনি:

সৈনিক নাই, শত শত দলে শত সেনাপতি গণি।

দেশ আর জাতি হলো ছারখার নেতৃত্বের লোভে;

দু’জনে মিলেছে, তারও দল আছে, দেখে হেসে মরি ক্ষোভে।

‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে নজরুল তরুণদের উদ্দেশ্য করে উপদেশ দেনÑ

“তোমরা ঐ শকুনির দলের নওÑ তোমরা বাহিরে এস, এই দুর্দিনে তাড়াও ঐ গো-ভাগাড়ে পড়া শকুনির দল। তোমরা আগুনের শিখা, তোমাদের জাতি নাই। তোমরা আলোর, তোমরা গানের তোমরা কল্যাণের।”

‘আজ চাই কি’ নিবন্ধে নজরুল দারুন একটি লাইন লিখেছেনÑ

“এই পরতন্ত্রতার হীনতা হতে না এড়ালে তোমরা স্বর্গ নেই, আছে বীভৎস নরক।”

‘আল্লাহর পথে আত্মসমর্পণ’এ পাইÑ

‘বদ্ধ পুকুরের পানি দিয়ে দেশকে শ্যামল করা যায় না।”

তাই নজরুল পথ-প্রদর্শক স্টেটসম্যান। তাঁর দেখানো পথে রাজনীতির নেতারা পথে এগিয়ে যায়। পথ চলে।

বিদ্র: কবি নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে প্রকাশিত স্যুভেনির জাতীয় নজরুল সম্মেলন, সাতক্ষীরা (৪-৬ আশ্বিন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ : ১৯-২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ) এর নিবন্ধ ‘জাতীয় কবি ও জাতির পিতা’ মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক পৃষ্ঠা ৩১-এ বর্ণিত “এক পর্যায়ে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বরে কবিকে দেখভালের দায়িত্বে থাকা কবির পুত্রবধূ উমাকাজী কবি ভবন ছেড়ে চলে গেলে কবিকে দেখভালের দায়িত্বে অর্পিত হয় শফি চাকলাদার চিকিৎসক ও নার্সদের উপর। এ অবস্থায় এক সময় স্বাস্থ্যের অবনতি হলে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুলাই কবিকে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি করা হয় এবং তার জন্য ১১৭ নং কেবিন বরাদ্দ করা হয়।” এই তথ্যগুলোর সংশোধনের প্রয়োজন মনে করি ১৯৭৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর নয় হবে ১৯৭৪ সালের ১৪ই ডিসেম্বর। দায়িত্ব অর্পিত হয় শুধু চাকলাদারের উপর। চিকিৎসক এবং নার্সদের উপর নয়। বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করেই তৎকালিন সংস্কৃতি মন্ত্রী ইউসুফ আলী সাহেব এ দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করেন। এবং ‘স্বাস্থ্যের অবনতি’ নয়, কারণটা অন্যরকম ছিল। যারা কবিকে পিজিতে নিয়ে যেতে এসেছিলেন তারা তো স্ট্রেচার পেতে ছিলেন, তাদের বলা হয়েছিল কবি নাকি বিগত একমাস যাবৎ শয্যাশায়ী (?)। কবি মাত্র লনে পায়চারি করে এসে সান্ধ্যকালীন নাস্তা খাওয়ার অপেক্ষায়। তাদের বললাম স্ট্রেচার তুলুন, কবি হেটে হেটেই গিয়ে এ্যম্বুলেন্সে উঠবেন। তারা অবাক। এবং পরবর্তীতে কবি যখন সিঁড়ি বেয়ে নামছিলেন রেলিংটাকে যথাসাধ্য আঁকড়ে ধরে চীৎকার করছিলেন- সেই হৃদয় বিদারক মর্মন্তুদ দৃশ্যও আমিসহ উপস্থিত সবাইকে দেখতে হয়েছিল। আমার ‘জীবন সায়াহ্নের নজরুলকে যেমন দেখেছি’ (১৯৮৮) সহ আমার অন্যান্য গ্রন্থেও এই সমস্ত তথ্য রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ