ঢাকা, বৃহস্পতিবার 17 January 2019, ৪ মাঘ ১৪২৫, ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

খুলনায় কবি নজরুল : কিছু প্রস্তাবনা

সৈয়দ আলী হাকিম : আমাদের জাতীয় কবি, বিশ্ব কবি কাজী নজরুল ইসলাম বর্তমান ভারতের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়াতে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি বাংলাদেশের অনেক স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন, অনেকস্থানে অবস্থান করে গান-কবিতা রচনাসহ সাহিত্য চর্চা করেছেন, গান গেয়েছেন, বক্তৃতা করেছেন এমনকি ১৯২৬ সালে এখানকার ফরিদপুর-ঢাকা কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। কবি নজরুল বাংলাদেশের অনেক স্থানের মত খুলনাতেও এসেছিলেন। কবি নজরুলের স্বহস্তে লেখা তিনটি চিঠির মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হই যে তিনি খুলনায় এসেছিলেন। ৯ অক্টোবর ১৯২৬ সালে তার লেখা চিঠি প্রিয় মুরলী।

আজ সকাল ৬টায় একটি পুত্ররত্ন প্রসব করেছেন শ্রীমতি গিন্নি। ছেলেটা খুব হেলদি হয়েছে। শ্রীমতিও ভাল। আমি উপস্থিত ছিলাম না। হয়ে যাবার পর এলাম খুলনা হতে, খুলনা যশোর, বাগেরহাট, দৌলতপুর বনগ্রাম প্রভৃতি ঘুরে ফিরলাম আজ... ‘নজরুল’।

কনি নজরুল দ্বিতীয় চিঠি লেখেন ৯ অক্টোবর ১৯২৬ সালে কবি খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীনকে। সেখানে কবি নজরুল লেখেন: 

স্নেহভাজনেষু মঈন,

আজ সকালে আমাদের একটি খোকা এসেছে। তোর ভাবী ভাল আছে। খোকা, বেশ মোটা তাজা হয়েছে। নাসিরুদ্দীন সাহেবকে খবরটা দিস, চট্টগ্রাম থেকে কোন কবিতা পেয়েছিল কি। আমার ‘সর্বসহা’ দিবিতো সওগাতে? নতুন লেখা শিগগিরই দেবো। আমি যশোর খুলনা ঘুরে আজ ফিরছি...।

ইতি কাজী ভাই।

কবি নজরুলের তৃতীয় চিঠি ঐ একই তারিখ ৯ অক্টোবর ১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগর থেকে ব্রজবিহারী বর্মনকে। 

“পরম স্নেহভাজনেষু স্নেহের ব্রজ,

আজ সকাল ছ’টায় আমার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে। তোমার বৌদি আপাতত ভাল আছে। আমিও আজ সকালে ফিরে এলাম যশোর খুলনা বাগেরহাট দৌলতপুর প্রভৃতি ঘুরে...।

ইতি

তোমার কাজী দা।

উল্লেখিত তিনটি চিঠি থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে কবি নজরুর ৮ অক্টোবর ১৯২৬ বা তার পূর্বে খুলনায় এসেছিলেন।

এবার আর একটি তথ্যের দিকে নজর দেয়া যাক। খুলনার একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ডা. আবুল কাশেম ১৯৬২ সালে কবি নজরুলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে বলেন “কাজী দা খুলনায় এসে প্রথমে আমার এখানেই ওঠেন (দৌলতপুর আঞ্জুমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী রাস্তার বিপরিত পাশে ডা. আবুল কাশেমের বাড়ি)। কলিকাতা হতে ট্রেনে এসে গোয়ালন্দ মেইলে তিনি ফরিদপুর ও ঢাকায় যেতেন...। 

খুলনার দৌলতপুর কলেজে আমরা এক অনুষ্ঠানে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম।

(সূত্র: খুলনা জেলায় কবি নজরুল গোলাম মোস্তফা সিন্দাইনী কাজী নজরুল ইসলাম জন্ম শতবার্ষিকী স্মরণিকা, জেলা প্রশাসন, খুলনা।)

অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা সিন্দাইনী তাঁর ‘খুলনা জেলায় কবি নজরুল’ শীর্ষক প্রবন্ধে ড. সৈকত আসগর এবং ডা. আবুল কাশেমের বক্তব্যের সাথে যুক্তি নির্ভর একমত হয়ে মন্তব্য করেছেন যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একাধিকবার খুলনায় আসেনি, তিনি খুলনায় ডা. আবুল কাশেমের বাড়ির বৈঠকখানায় বসে মানুষের সাথে খোশ গল্পে মেতে উঠেছেন। আজকের দৌলতপুর বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে (তখনকার নাম দৌলতপুর হিন্দু একাডেমী) তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। নজরুল সেই সংবর্ধনা সভায় ভাষণ দেবার পর তার লেখা কবিতা পাঠ করেছিলেন বলে জানা যায়। কিছুদিন আগে আমি (সৈয়দ আলী হাকিম) দৌলতপুরস্থ ডা. আবুল কাশেম সাহেবের বাড়ি কবি নজরুলের স্মৃতিধন্য স্থান দেখতে যাই। সেখানে আমি ডা. আবুল কাশেম সাহেবের দৌহিত্র (পুত্রের ছেলে) বিশিষ্ট সাহিত্যিক সাংবাদিক আবু আসলাম বাবুর সাথে দেখা করি। সাংবাদিক আবু আসলাম বাবু তাঁর বাড়ির ও এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে কবি কাজী নজরুল একাধিকবার যেমন খুলনায় এসেছিলেন তেমনি একাধিক দিন তিনি খুলনায় অবস্থানও করেছেন।

 

 কবি নজরুল ডা. আবুল কাশেম সাহেবের বাড়ির কোথায় অবস্থান করবেন বলে জেনেছিলেন তাও আমাকে জানান। ফরিদপুরের কবি নজরুল চর্চা কেন্দ্র কবি নজরুলের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে একটি স্মরণীকা বের করে। তাতে কবি নজরুল কখন কিভাবে ফরিদপুর বাগেরহাট হয়ে খুলনায় এসেছিলেন তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সুতরাং উপযুক্ত ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা ও যুক্তির আলোকে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে কবি কাজী নজরুল এক বা একাধিকবার খুলনায় এসেছেন। কবিতা পড়েছেন, গান গেয়েছেন, সংবর্ধিত হয়েছেন এবং একাধিক দিন অবস্থানও করেছেন। এ বিষয়ে আর দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই।

খুলনায় আমাদের জাতীয় কবি, বিশ্ব কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগমনের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে খুলনাঞ্চলের কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবীসহ সকল শ্রেণির সূধীমহল কতকগুলি উদ্যোগসহ প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছেন।

এক. ফুলতলার আটরা থেকে খান জাহান আলী সেতু পর্যন্ত বাইপাস সড়কের নামকরণ কবি কাজী নজরুল মহাসড়ক নাম করণ করা।

দুই. বটিয়াঘাটার জিরো পয়েন্ট চত্বরকে ‘কবি কাজী নজরুল ইসলাম চত্তর নামকরণ করা এবং ঐ চত্ত্বরে কবি নজরুলের ভাস্কর্য স্থাপন করা।

তিন. কবি নজরুল খুলনায় অবস্থানকালে যেখানে যেখানে অবস্থান করেছেন, গান-কবিতা উপস্থাপন করেছেন, সেখানে তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। সে সকল স্থানে স্মারক স্মৃতিফলক স্থাপন করা।

চার. খুলনার নজরুল চর্চাকারী, নজরুল বিষয়ক সংগ্রাহক সৈয়দ আলী হাকিম (লেখক) এর সংগৃহিত বিষয়সমূহ সংরক্ষণের জন্য সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, এ ক্ষেত্রে খুলনায় একটি কবি নজরুল আর্কাইভ করা।

উল্লেখিত প্রস্তাবনা সমূহ বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ একটি স্মারকলিপি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গবেষণা পরিষদের উদ্যোগে প্রদান করা হয়। সে আলোকে সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এক ও দুই নং প্রস্তাবনা গ্রহণ ও অনুমোদন করেন। এ সংক্রান্ত একটি সংবাদ স্থানীয় একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে (দৈনিক সময়ের খবর) প্রকাশিত হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে উল্লেখিত প্রস্তাবনার সাথে একমত পোষণ করেন খুলনার অধিকাংশ সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন যেমন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গবেষণা পরিষদ, খুলনা নজরুল একাডেমি, নজরুল সংগীত শিল্পী পরিষদ, খুলনা সাহিত্য পরিষদ, খুলনা সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংস্থা (খুসাস), খুলনা সাহিত্য একাডেমি, দুখু মিয়ার পাঠশালা। বয়রা সাহিত্য সংসদ, খুলনা লেখিকা সংঘ, খুলনা সাহিত্য মজলিস, গাঙচিল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিষদ, আলীজ একাডেমি, ইকরা ইসলামী পাঠাগার, বয়রা সাহিত্য সংসদ, মোহনা সাহিত্য সংসদ, জাতীয় কবিতা পরিষদ, নন্দিনী সাহিত্য পাঠচক্র, বনলতা, তন্ময় প্রকাশনা আলোড়ন, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, সমন্বিত সাহিত্য পরিষদ, মাওলানা ভাষানী স্মৃতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ খুলনা, প্রতিভা সাহিত্য সংসদ, জাতীয় কবিতা আবৃত্তি সংঘ, রাজশাহী হেরিটেজ মিউজিয়াম প্রভৃতি।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ