ঢাকা, বুধবার 23 January 2019, ১০ মাঘ ১৪২৫, ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

লুঠকে বললাম ভোট, ভোট হলো সে

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘আমার চেতনা রঙে পান্না হলো সবুজ, চুনি হলো লাল/ গোলাপকে বললাম সুন্দর, সুন্দর হলো সে।’ গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে যে ভোট ডাকাতির উৎসব হয়ে গেলো, তার সঙ্গে এই পংক্তি দুটির তুলনা করা চলে। এই নির্বাচনে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট বাংলাদেশের কোনো কেন্দ্রেই হয়েছে বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কীভাবে এই ভোট ডাকাতির পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তার বিবরণ আমরা আগেই লিপিবদ্ধ করেছি। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা এই ভোটকে ¯্রফে জালিয়াতি বলে উল্লেখ করেছে। এই নির্বাচনকে স্বীকার করে নেয়নি জাতিসংঘসহ গোটা পশ্চিমা বিশ্ব। অথচ সরকার ও তার বশংবদ নির্বাচন কমিশন তাদের ভাঙ্গা ঢেরা পিটিয়েই যাচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। এই মিথ্যাচার সরকার যেমন করছে, তেমনি করছে বিভিন্ন মিডিয়ায় সরকারের উচ্ছিষ্ঠভোগী কিছু বিবেকবর্জিত তথাকথিত বুদ্ধিজীবী।
কিন্তু এ পর্যন্ত এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে ভারত, নেপাল, চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব ও পাকিস্তান। চীন বা ভারত তাদের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থে এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত সঠিকভাবে বলেছেন যে, ভারতের স্বার্থে তিনি যা করেছেন, সেটা ভারতকে সারা জীবন মনে রাখতে হবে। রাশিয়ারও এখানে আছে প্রভূত বাণিজ্যিক স্বার্থ। আর চীনের প্রভাবে এই নির্বাচনকে স্বীকার করে নিয়েছে পাকিস্তান। আর সরকার তো জানে, তারা কী নির্লজ্জ কৌশলে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। ফলে যে সরকার পাকিস্তানের নাম শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে, তারা পাকিস্তানের অভিনন্দনবার্তাকে নীরবে স্বাগত জানিয়েছে। এর মধ্যে চীন-রাশিয়ায় তো কোনো গণতন্ত্রই নেই। পাকিস্তানের গণতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে সেখানকার সেনাবাহিনী। আর সদ্য গণতন্ত্রে প্রত্যাগত নেপাল সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেনি যে, এইভাবে ভোট ডাকাতির কথা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ চিন্তা করতে পারে। উপরন্তু নেপালের উপর থাকতে পারে চীনের বিপুল প্রভাব।
কিন্তু ভারত সরকার তাদের স্বার্থের সুরক্ষার জন্য এই নির্বাচনকে অভিনন্দন জানালেও ভারতীয় থিংকট্যাঙ্কগুলো ভিন্নমত পোষণ করেছে। ভারতীয় গবেষক ও বিশ্লেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখলেও ভারতের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে এই নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। থিংকট্যাঙ্কগুলো বলেছে, এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি এবং এর ফলাফল সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। অথচ সরকার সমর্থক ব্যক্তিরা ভারত সরকার তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে এরকম ডামাডোল প্রচার করে আসছে। নির্বাচন সম্পর্কে প্রধান বিরোধীদল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রথম থেকেই বলেছিল যে, এই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সহয়তায় আগের রাতে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরাট করে রাখা হয়েছে। ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা দেয়া হয়েছে। বিএনপির ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতেই দেয়া হয়নি। প্রিজাইডিং অফিসাররা নাস্তার নামে, লাঞ্চের নামে বুথ বন্ধ করে আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যাপক সিল মেরেছে। সেই হিসেবে ৩০শে ডিসেম্বরের ভোটকে অর্থহীন প্রহসনে পরিণত করেছে।
ভোটের পরদিন গত ৩১শে ডিসেম্বর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই ভোট সম্পর্কে বলেছে যে, নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত আহত হওয়া, বল প্রয়োগসহ আচরণবিধি লঙ্ঘন করা প্রভৃতি কারণে এই নির্বাচনের ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত। তারা এক বিবৃতিতে এই নির্বাচনের ফলাফলের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা-হামলা ও নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। এমনকি নির্বাচনের আগের রাতে এবং নির্বাচনের দিনও এমন হয়রানি হয়েছে বলে অভিযোগ  উঠেছে।  সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো এতে করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি দেশের জনগণের আস্থাহীনতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, একটি জোটের পোলিং এজেন্টরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্রে আসতে না পারা অভিযোগের বিষয়টি যেভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। তা একদিকে বিব্রতকর। অন্যদিকে তার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এর সাংবিধানিক দায়িত্ব কার্যকর করতে পেরেছে কিনা সে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত করেছে। তিনি বলেন, “গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ লঙ্ঘন করে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির নামে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজধানীতেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে যেভাবে সচিত্র প্রতিবেদন আকারে এই খবর প্রকাশিত হয়েছে তাকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। এছাড়াও ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার ভর্তি বাক্স নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, বহু ভোটার ভোট দেয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া, প্রার্থীকে ভোট কেন্দ্রে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা ইত্যাদি ঘটনার প্রতিটির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করে টিআইবি।” ড. জামান বলছেন, “নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তদন্ত করে এসব ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যর্থতা নিরূপণ করা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা অপরিহার্য। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে আস্থার সংকটের প্রেক্ষিতে কমিশনের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান থাকবে, এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নিন।” যে অভূতপূর্ব নির্বাচনের মাধ্যমে সৃষ্ট অবিশ্বাস্য ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নতুন সরকার গঠিত হবে তার আত্মবিশ^াস, মর্যাদা, আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই তদন্ত অবশ্যকরণীয় বলে মন্তব্য করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক।  অপর দিকে নির্বাচনের সব অনিয়ম তদন্তের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ও যুক্তরাজ্য। তারা বলেছে, বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নির্বাচনের অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্ত তারা প্রত্যাশা করে। জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, লোকজন ও সম্পদের উপর হামলা এবং সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনের অনিয়মের খবর ও সহিংসতার বিষয়ে জাতিসংঘ অবগত। তিনি বলেন, গত দশ বছরে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে বিরোধীদলের অংশগ্রহণকে আমরা স্বাগত জানাই। জনগণের মত প্রকাশ ও সমবেত হওয়ার স্বার্থে সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানাই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্র জানান, সহিংসতা নির্বাচনের দিনটিকে নষ্ট করে দিয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা ছিল। এটি নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটে প্রভাব ফেলেছে। অপরদিকে বাংলাদেশে নির্বাচনের দিন ভোটার ভোট দানে বিরত রাখার মতো অনিয়মের অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর আস্থা খর্ব হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয় সব পক্ষকে গঠনমূলকভাবে সমাধান করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবার্ট পালাদিনো বলেছেন, নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়র হয়ারনি, ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্টের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। ঐ সব কারণে বিরোধীদলীয় বহু প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা মুক্তভাবে সভা, র‌্যালি ও নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেনি। নির্বাচনের দিন কিছু মানুষকে ভোট দিতে দেয়া হয়নি। এতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা খর্ব করেছে। নির্বাচনের দিনের এই অনিয়মের বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। নির্বাচনের সর্বপ্রকার অনিয়ম নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিটেন। নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ সমাধানের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে তারা। তিনি বলেছেন, গ্রেফতারসহ সব রকম বিশ্বোসযোগ্য প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে যুক্তরাজ্য অবহিত। এমন গ্রেফতারের কারণে বিরোধী দলগুলোতে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের প্রচারণায় বিরত রাখা হয়েছে। অনেক মানুষকে ভোট দিতে দেয়া হয়নি। ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। অন্যায়ভাবে সহিংসতা করা হয়েছে। সে জন্য যুক্তরাজ্য হতাশা প্রকাশ করেছে।
গত ৩ জানুয়ারি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মারাত্মক সব অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন কমিশন গঠনের আহবান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, এই সব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে, নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন বিরোধীদলীয় সদস্যের উপর হামলা, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, ভোট জালিয়াতি ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ। দীর্ঘ এক বিবৃতিতে এইচআরডাব্লিউ বলেছে, সহিংসতা, বিরোধীদের গণগ্রেফতার ও স্বাধীন মত প্রকাশের বিরুদ্ধে দমন পীড়নের পরে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনী বিজয়ী হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এই নির্বাচনে পার্লামেন্টের ২৯৯ টি আসনের মধ্যে ২৮৮ তে জয়ী হয়েছে এই দল। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন হয়েছে অবাধ ও সুষ্ঠু। তবে বিরোধীরা এ নির্বাচনকে হাস্যকর বলে অভিহিত করেছে। হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড এডামস বলেছেন, নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়টা ছিল বিরোধীদের উপর সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন ও বিরোধীদের প্রচারণা অনুষ্ঠানে হামলা। স্বাধীনমত প্রকাশকে সীমিত রাখতে আইনের অপপ্রয়োগ করা হয়েছে। নির্বাচনের দিনে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন, ভোট কেন্দ্র ক্ষমতাসীনদের দখলে থাকার অর্থ হলো নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ। এটি তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ও পক্ষপাতহীন কমিশন গঠন করা উচিত। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নির্বাচনের আগে বিরোধীদলের কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ও সহিংসতার ভয়ে সাংবাদিকরা তাদের রিপোর্ট সেন্সর করেছেন। নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন থ্রিজি ও ফোরজি ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। এতে যোগাযোগ ও তথ্য শেয়ার ব্যাহত হয়। নির্বাচনের দিনে সহিংসতায় কমপক্ষে ১৭ জন নিহত হয়েছেন।
বিরোধীদলগুলো সাংবাদিক ও ভোটাররা অনিয়মের গুরুতর সব অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে আগেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করা, ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে না দেয়া, ক্ষমতাসীনদের ভোটকেন্দ্র দখলে রাখা ও ভোটাদের ভোট দিয়ে দেয়া। নির্বাচনী কর্মকর্তা ও পুলিশ দলীয় আচরণ করেছে। ভয়াবহ এক ভীতিকর পরিবেশে ভোটারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিএনপি বলেছে, ২২১ টি সংসদীয় আসনে তাদের কোনো পোলিং এজেন্ট দিতে দেয়া হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা নির্বাচনের দিনের নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনাকে বিক্ষিপ্ত ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে পুলিশ প্রধান জাভেদ পাটোয়ারি ভোটের পরিবেশকে শান্তিপূর্ণভাবে অভিহিত করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিরোধীদলকে ভোট দেয়ার অপরাধে নোয়াখালীতে ৪ সন্তানের এক মাকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। এ অভিযোগে অবশ্য ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ বলেছে, অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের পরিবর্তে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট করার জন্য সাংবাদিকদের গ্রেফতার করেছে। তারা রিপোর্ট করেছিলেন যে, খুলনা ১ আসনে মোট বৈধ ভোটারের চেয়ে বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা ভোটারদের ভীতি প্রদর্শনের প্রামাণ্য চিত্রের ভিডিও মুছে ফেলতে বাধ্য করছেন সাংবাদিকদের। দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার রিপোর্টার কাফি কামাল বলেছেন, ভোট কেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের উপর হামলার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করার সময় তাকে প্রহার করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচের এক রিপোর্টে নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে সরকার ও রাষ্ট্রীয় শক্তি কীভাবে নির্যাতন করেছে তা তুলে ধরা হয়েছে। ঐক্যফ্রণ্ট বলেছে, তাদের ৮২০০ সদস্য ও সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে ১২৩০০ জনকে। এর মধ্যে রয়েছে কয়েক ডজন প্রার্থী। প্রচারণাকালে তাদের উপর আওয়ামী সমর্থকরা হামলা চালিয়েছে। বিরোধীদল বলছে, কর্তৃপক্ষ দলীয় আচরণকারী হিসেবে এসব অভিযোগ অবজ্ঞা করেছে। নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের বাংলাদেশে আসতে বাধা দেয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মিডিয়ার কাছে ভোটাররা বলেছেন, কর্মকর্তারা তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। অথবা বুথের ভেতরে তাদেরকে যোগ দিতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সাথে যারা তার পক্ষে ভোট দিয়ে দিয়েছে। সারা দেশ থেকে এরকম বিপুল সংখ্যক রিপোর্ট করেছে সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট পত্রিকা রিপোর্ট করেছে যে, ভোট শুরু হতে না হতেই ব্যালট বাক্স ছিল পূর্ণ। মাঠ ছিল অসমতল। ভোটাভোটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। গণনায় ছিল অস্বচ্ছতা। জালিয়াতি ছিল ভয়াবহ। ৩০ ডিসেম্বরের এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা মিলে ৯৬ শতাংশ আসন লাভ করেছে। ক্ষমতাসীন ২০১৪ সালে যত আসন পেয়েছিল এবার পেয়েছে তার চেয়ে বেশি। কিন্তু ২৯৯ টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ ও তার দলের নেত্রী শেখ হাসিনার জয় কি এটাই বোঝায় যে, তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে? সেটা জানার কোনো উপায় নেই। এই নির্বাচনে মাঠ এতটাই অসমতল ছিল, ভোটাভুটি এতটাই ত্রুটিপূর্ণ ছিল, ও ভোট গণনা এতটা অস্বচ্ছ ছিল যে খোদ দলের অনেক সদস্যই এই ফলাফল নিয়ে সন্দিহান।
ইকোনোমিস্ট বলেছে, আওয়ামী লাগের ছাত্র সংগঠনের গু-ারা কাউকে শত্রু মনে করলেই মেরে ফেলে। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ঢাকায় ছাত্ররা বিক্ষোভ করলে সরকারের ঐ গু-ারা বেশ নৃশংস প্রক্রিয়া দেখায়। তাদের আচরণ ছিল এমন যে, খোদ রাষ্ট্রই বিপদে আছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ এমন সব আইন প্রণয়ন করেছে যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে সীমিত করেছে। অনেকই ধারণা করেছিলেন যে, এই পরিস্থিতিতে ২০১৪ সালের মতো বিএনপি নির্বাচন বর্জন করতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের সময় ব্যাপক ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানি সত্ত্বেও তারা মাটি কামড়ে পড়ে ছিল।
এর মধ্যে বিএনপির ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া হয়। আটক করা হয় প্রায় ১০ হাজার কর্মী। দেশ জুড়ে প্রায় ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে ভোটাভুটি শুরু না হতেই কিছু ব্যালট বাক্স সন্দেহজনকভাবে পরিপূর্ণ হয়ে যেতে লাগল। ঢাকার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেল, আওয়ামী লীগের অসংখ্য ব্যানার আর পোস্টারের বিপরীতে বিএনপির কোনো পোস্টার পাওয়া যায় না বললেই চলে। প্রত্যেকটি বুথে বহু আওয়ামী লীগ সহায়তাকারীর বিপরীতে কোনো বিরোধী এজেন্ট পাওয়া গেল না। অর্থাৎ সেখানে ভোটাভুটি পর্যবেক্ষণ কিংবা ভোট গণনা প্রত্যক্ষ করার কেউ ছিল না। ইকোনোমিস্ট ঢাকা ১৫ আসনের চিত্রের কথা উল্লেখ করেছে। তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, মনিপুর হাই স্কুলে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ নারী পুরুষ স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেকে শেষ অবধি রাগে ক্ষোভে চলেও গেছেন। কারণ পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা খুব সামান্য ভোটারকে একটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে দিচ্ছিল না। অথচ কেন্দ্রের ভেতরে ৩৬টি ব্যালট বাক্স ছিল। দুপুরের মধ্যে দেখা দেখা গেল, একটি কক্ষে মাত্র ৪১ জন ভোটার ভোট দিতে পেরেছিলেন। অথচ এখানে ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধিত ছিলেন ১০০০ জন। সারাদেশ থেকে একই ধরনের প্রতিবেদন আসতে শুরু করলো যে, বিরোধীদলের এজেন্টদের হুমকি দেয়া হয়েছে, কিংবা মার দেয়া হয়েছে। অনেক ভোটারকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। বুথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, মধ্যাহ্নভোজের জন্য কিংবা ব্যালট শেষ হয়ে গেছে এই অযুহাতে। প্রত্যাশিতভাবেই সরকার মনোনীত নির্বাচন কমিশন দাবী করেছে ভোট হয়েছে শান্তিপূর্ণ। এরপর ১০ জানুয়ারি ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট এক প্রতিবেদন তৈরী করে বলেছে, গণতান্ত্রিক কিংবা ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই। একে ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট অগণতান্ত্রিক হাইব্রিড রেজিইম বলে উল্লেখ করেছে। এরপর গত ১৫ জানুয়ারী টিআইবি তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরী করার জন্য টিআইবি দ্বৈবচয়নভিত্তিতে ৫০টি আসন নির্দিষ্ট করে। এই ৫০টি আসনের মধ্যেই ৪৭টিতেই অনিয়মন পাওয়া গেছে টিআইবি গবেষণায়। এই গবেষণায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত বলে মন্তব্য করা হয়েছে। নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রশাসনের একাংশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা গ্রহণ ছিল আইনের লঙ্ঘন ও নীতি বিবর্জিত। এই কারণে সুশাসনের স্বার্থে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবী করেছে টিআইবি। সংস্থাটির নির্বাচন পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৫০টির মধ্যে ৪৭তেই অনিয়ম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪২ টি কেন্দ্রে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল নীরব। ৪১ টি কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগের রাতে সিল মেরে রাখা হয় ৩৩টি আসনে। বুথ দখল ও জালভোট পড়ে ৩০ আসনে। পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয় ২৯ আসনে। ভোটাদের নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয় ২৬ আসনে। ভোট শেষ হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায় ২২ আসনে। কোথায়ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না। এর বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবী করেছে টিআইবি। আর নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার বলেছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কার্যত এক দলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে দ্য টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে প্রধানমন্ত্রী দৃশ্যত সর্বত্র স্বৈরতন্ত্রের বিভ্রান্তি নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেছেন। তিনি বলেছেন, একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ হলো একটি প্রান্তিক বিষয়। তিনি বলেছেন, যদি আমি খাদ্য, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও সেবা দিতে পারি সেটাই হলো মানবাধিকার। বিরোধীরা বা নাগরিক সমাজ অথবা আপনারা এনজিওরা যা বলছেন তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আমি আমার দেশকে জানি। এবং আমি জানি কীভাবে আমার দেশের উন্নতি করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সিঙ্গেল কান্ট্রি বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। সেই যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনী প্রচারণার সময় হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন, ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এবং এসব সমস্যার সমাধানে সব পক্ষকে নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনের প্রতি। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার ও বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলা, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নিকৃষ্টতম নির্বাচন হলো বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন। আসল কথা হলো, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী নির্বাচনী ফলাফল চুরি করেছে। আর যারা নিজেদের সরকার বলে দাবী করছে, তারা অবৈধ। বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন ভঙ্গুর গণতন্ত্র, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারিতাসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে দ্য ফ্রাইডে টাইমস-এর চলতি সংখ্যায় তিনি এক নিবন্ধ লিখে এ কথা বলেছেন। নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে নিবন্ধে কড়া সমালোচনা করে মাইলাম বলেন, তাতে বিশ্ব শান্তিরক্ষা মিশনে এই বাহিনীর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং প্রশ্ন তৈরী হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে ২০১১ সাল থেকেই বিদেশী পর্যবেক্ষকরা ধারণা করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তা প্রমাণ করে দিলো। বিরোধীদলগুলোর উপর যত রকমের সন্ত্রাস চালানো যায় তার সব প্রয়োগ করেই ৩০ ডিসেম্বরের ভোট হয়েছে। ভোট চুরির সব নোংরা কৌশল প্রয়োগ করে শেখ হাসিনা ও তার দল ৯৭.৬৬ শতাংশ ফলাফল নিজেদের দলের জন্য ভাগিয়ে নিয়েছেন। মাইলাম সরকারি নীলনকশার বাকি দিকগুলোও তার নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন যে, কোনো বিবেচনায়ই বাংলাদেশের নির্বাচন যথাযথ হয়নি। মহাসচিবের এই বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, পৃথিবীর কোথায়ও শতভাগ নিখুঁত নির্বাচন হয় না। তিনি বরং জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরাসকে বলেছেন, “কোথায় শতভাগ নিখুঁত নির্বাচন হয়!” তার আগের দিন বঙ্গবন্ধু পরিষদ এ বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে, পৃথিবীর কোথায়ও শতভাগ নিখুঁত নির্বাচন হয় না। এসব জায়গায় যে যতটুকু পারে নিজেদের মতো করে জালিয়াতি করে। তাদের কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে এই নির্বাচন নিখুঁত হয়নি। অতএব ওবায়দুল কাদের বললেন, তার চেতনার রঙে নির্বাচন নিখুঁত হয়েছে এবং নির্বাচন নিখুঁত হলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ